শুক্রবার, নভেম্বর ২২
TheWall
TheWall

অভিজিৎও আমাদের গর্ব, ভুলে গেলে চলবে না

রন্তিদেব সেনগুপ্ত

শুরুতেই বলে নেওয়া ভাল, অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অর্থনৈতিক তত্ত্বের আমি সমর্থক নই। বরং তাঁর তত্ত্ব সম্পর্কে আমার সমালোচনা এবং বিরোধিতা রয়েছে। তবু বলব, একজন বাঙালি হিসাবে তাঁর নোবেল প্রাপ্তিতে আমি খুশিই হয়েছি। এও বলব, অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়কে আমি কখনওই আধা বাঙালি মনে করিনি, করিও না। বরং তাঁর জীবনচর্চা এবং সংস্কৃতি বোধ থেকে বুঝতে পারি, তিনি একশো শতাংশ খাঁটি বাঙালি। তিনি অন্তত বাঙালি হয়ে হিন্দি উচ্চারণে বাংলাটা বলেন না। বরং নোবেলপ্রাপ্তির পর বিদেশের মাটিতে তিনি যখন বাংলায় তাঁর মনোভাব ব্যক্ত করেন তখন ভালই লাগে তা দেখতে। সম্প্রতি নোবেলজয়ী এই বাঙালি অর্থনীতিবিদ সম্পর্কে বঙ্গ বিজেপির একাংশ যে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন – আমার এই সংক্ষিপ্ত লেখাটির প্রতিপাদ্য তা নিয়েই।

অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অর্থনৈতিক তত্ত্বের সবাই যে সমর্থক হবেন তার কোনও অর্থ নেই। বরং অনেকেই তার বিরোধীও হতে পারেন। একজন নোবেলজয়ীর সব তত্ত্ব যে নির্বিবাদে মাথা পেতে গ্রহণ করতে হবে বিষয়টি এমনও নয়। কাজেই কেউ যদি তত্ত্বগত ভাবে অভিজিৎ বিনায়কের মতকে খারিজ করেত চান তাতে অন্যায়ও কিছু নেই।

বঙ্গ বিজেপির কিছু কিছু নেতা এবং অতি উৎসাহী সমর্থকদের সমস্যাটা অন্য জায়গায়। এঁরা অভিজিতের অর্থনৈতিক তত্ত্বের কোনও তাত্ত্বিক সমালোচনা করছেন না। বা বলা ভাল, তাত্ত্বিক সমালোচনা করার কোনও আগ্রহও প্রকাশ করছেন না। বরং এঁরা অভিজিৎ বিনায়কের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খুব নিম্নমানের কুরুচিকর আলোচনা করছেন। যে ধরনের আলোচনায় নিজেদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার বদলে অপরিণামদর্শী রাজনৈতিক চিন্তাভাবনাই ফুটে উঠছে বেশি।

বঙ্গ বিজেপির নেতারা একটি জায়গায় গোল বাধিয়েছেন। অর্মত্য সেন এবং অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁরা এক আসনে বসিয়ে ফেলেছেন। এঁদের বোঝা উচিত, অমর্ত্য সেনের মতো অভিজিৎ ঘোষিত বিজেপি বিরোধী নন। অকারণে এবং ব্যক্তিগত অসূয়াবশত অমর্ত্য  সেনের মতো তিনি নরেন্দ্র মোদীর সমালোচনা করেন না। বরং অভিজিৎ হচ্ছেন সেই বাঙালি অর্থনীতিবিদ, যিনি মোদী সরকারের কিছু কিছু আর্থিক নীতিকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। এখন মোদী সরকারের কোনও আর্থিক নীতির যদি তিনি সমালোচনা করেই থাকেন, তার বিরোধিতাও নীতিগত ভাবে হতেই পারে। তার জন্য অভিজিতের ব্যক্তিগত জীবন টেনে এনে মুখরোচক আলোচনা করা শুধু অশালীন নয় নিম্নরুচিরও পরিচায়ক।

প্রয়োজনে মোদীকেও সাহায্য করতে রাজি, দিল্লিতে এসে বললেন নোবেলজয়ী অভিজিৎ

অভিজিৎ বিনায়কের এই ধরনের ব্যক্তিগত সমালোচনা করে বঙ্গ বিজেপির কী লাভ হচ্ছে? এককথায় কিছুই নয়। বরং বঙ্গ বিজেপির কিছু নেতার এই ধরনের অপরিণামদর্শী কথাবার্তা বাঙালি শিক্ষিত সমাজের কাছে বিজেপিকে আরও ব্রাত্য করে তুলবে, তুলছেও। বঙ্গ বিজেপি নেতৃত্বকে এটা মনে রাখতে হবে, ২০২১ সালে ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন দেখার আগে বাঙালি শিক্ষিত সমাজের মন জয় করাটাও জরুরি। বাংলা বিজেপির কতিপয় নেতার এই ধরনের রুচিহীন কথাবার্তা শিক্ষিত বাঙালি সমাজের মন জয় করতে তো পারছেই না, উপরন্তু বাঙালি সমাজের কাছে নিজের রাজনৈতিক অগভীরতা তাঁরা আরও বেশি করে প্রমাণ করে দিচ্ছেন। বঙ্গ বিজেপির নেতারা অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তত্ত্বের বিরোধী হতেই পারেন, কিন্তু তাঁদের এটাও মনে রাখতে হবে হার্ভার্ড বা এমআইটি-র মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থান পেতে গেলে খুঁটির জোর নয়, যোগ্যতার প্রয়োজন। অভিজিৎ বিনায়কের সেই যোগ্যতাকে তাঁরা অন্তত সম্মান জানান।

আবার দেখলাম, অতি উৎসাহী কেউ কেউ আরও একধাপ এগিয়ে বলছেন, অভিজিৎ ভারতীয় নন, তিনি মার্কিন নাগরিকত্ব নিয়েছেন। এঁরা নিজেদের পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে খোঁজ নিলে জানতে পারবেন, শুধু অভিজিৎ কেন, এমন অনেক বাঙালি চাকরিবাকরি বা গবেষণার সূত্রে বিদেশে রয়েছেন, যাঁরা সেই সব দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন। গ্রহণ করেছেন চাকরিবাকরি এবং গবেষণার স্বার্থেই। অতি উৎসাহীরা খোঁজ নিলে এও জানতে পারবেন এই প্রবাসী ভারতীয়রাই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সভায় স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে অংশগ্রহণ করেন। অতি উৎসাহীদের তুলনায় এঁরা কোনও অংশে কম ভারত প্রেমী নন। যাঁরা অভিজিৎ বিনায়কের নাগরিকত্ব নিয়ে ছেলেমানুষি প্রশ্ন তুলছেন, তাঁরা কিন্তু যে প্রবাসী ভারতীয়রা মার্কিন মুলুকের নাগরিকত্ব নিয়েছেন, প্রকারান্তরে তাঁদেরও অপমান করছেন।

এই ধরনের অপ্রয়োজনীয় কুৎসার ভিতর প্রবেশ করে বঙ্গ বিজেপি কি তা হলে তার প্রকৃত লক্ষ্য থেকে ভ্রষ্ট হবে? বঙ্গ বিজেপির যে অপরিণামদর্শী কতিপয় নেতা অভিজিতের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কুৎসায় মেতেছেন, তাঁরা বুঝছেন না এতে প্রকৃত লক্ষ্য থেকে দূরে সরে যাবেন। তাতে বিজেপির লাভের লাভ কিছুই হবে না। বিজেপির লাভ হবে তখনই, যখন এই অতিকথনে অভ্যস্থ বিজেপি নেতারা সংযত এবং সতর্ক আচরণ শিখবেন।

মতামত সম্পূর্ণভাবে লেখকের নিজস্ব

লেখক সঙ্ঘ-ঘনিষ্ঠ বিজেপি নেতা 

Comments are closed.