বুধবার, জুন ১৯

ক’টা গণহত্যা হয়েছে এই আমলে যে এত গেল গেল রব?

সুখেন্দু শেখর রায়

এ বারে নির্বাচনের নির্ঘন্ট প্রকাশ হতে না হতেই বাংলার বিরোধীরা সমস্বরে চীৎকার করে উঠল, রাজ্য পুলিশ নয়। ভোটে কেন্দ্রীয় বাহিনী চাই। শুনলে মনে হবে, যেন এর আগে কেন্দ্রীয় বাহিনী এই রাজ্যে আসেনি।অথচ সবাই জানেন, বিভিন্ন বিধানসভা, লোকসভা কেন্দ্রে আধা সামরিক বাহিনী বরাবর মোতায়েন থেকেছে। যত বাহিনীর সংখ্যা বেড়েছে, ততই তৃণমূলের আসন সংখ্যা বেড়েছে। ২০০৯,২০১১,২০১৪ ও ২০১৬-র লোকসভা/বিধানসভার ফলাফল তা প্রমাণ করে। সুতরাং, কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়ে তৃণমূলের কোনও মাথাব্যথা নেই। কিন্তু এ বার এক অন্য দৃশ্য দেখা গেল।

নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ জানাতে গেলেন বিজেপির তাবড় তাবড় নেতা এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ, স্বাস্থ্য মন্ত্রী জেপি নডডা, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ। দাবি তুললেন, সারা বাংলাকেই উত্তেজনাপ্রবণ ঘোষণা করতে হবে। দু’দিন ধরে সরকারি-বেসরকারি চ্যানেলে মন্ত্রীদের যুগলবন্দী শোনা গেল। সানাইয়ে পোঁ ধরল সিপিএম আর কংগ্রেসও। কেন?

বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে সাত বছরের শাসনে এক-আধখানা মরিচঝাঁপি, বিজন সেতু, কেশপুর, ছোট আঙারিয়া, নানুর, সিঙুর, নন্দীগ্রাম, নেতাই-এর মত গণহত্যা ঘটেছে? বিহার, উত্তরপ্রদেশের মত লভ জেহাদি, গোরক্ষক, রোমিও বাহিনীর হাতে কেউ খুন হয়েছে? রাজস্থানে যেভাবে সংঘ সদস্য শম্ভুলাল, মালদার কালিয়াচকের শ্রমিক আফরাজুলকে প্রথমে কুড়ুল দিয়ে কুপিয়ে, পরে গায়ে পেট্রোল ঢেলে জ্যান্ত পুড়িয়ে মেরে ভিডিও ছবির মাধ্যমে সংঘিদের বীরত্ব প্রচার করল, তখন কেন কারোর আধা সেনার কথা মনে পড়ল না? শুধু ইউপি-তে ২০১৭-১৮ সালে ১৪৫৮টি ভূয়ো সংঘর্ষে ৪৭ জন নিরপরাধ পুলিশের গুলিতে খুন হয়েছে। ওই সবই বুঝি সামান্য খুনের ঘটনা?

তো ভোটের দেড়মাস আগেই বাংলায় বাহিনী আসতে শুরু করল। নইলে বর্গীরা নাকি বাংলা আক্রমণের সাহস পাচ্ছে না। বাহিনীকে ওরা বাহন হিসেবে চায়। তাই বাহিনী এসেই ধমকাতে-চমকাতে শুরু করল। বৃদ্ধাকেও ইনসাস উঁচিয়ে বলল – ‘দাদাগিরি নেহি চলেগি।’ নির্বাচন কমিশন এমন আচরণের অভিযোগ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিল। সাবাশ! এমনই তো চায়।

কমিশন এখানেই থেমে থাকল না। বিজেপি যে সব অফিসারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিল তাদের মধ্যে কয়েকজনকে দুমদাম বদলি করে দিল। এরা প্রত্যেকেই সৎ, অভিজ্ঞ, দক্ষ অফিসার বলে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু তাদের জায়গায় যাদের নিয়ে আসা হলো তাঁরা তুলনায় অনেক পিছিয়ে। পুলিশের এমন একজন বড় কর্তা তো একসময় বিজেপি নেতার ব্যক্তিগত সচিব ছিলেন। দমদম বিমানবন্দরের ডেপুটি পুলিশ কমিশনার সম্প্রতি কয়েক কোটি কালো টাকা উদ্ধারে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। অথচ তাঁকেও বদলি করা হল। নিন্দুকরা বলছে, ওই কালো টাকা শাসক দলের লোকজনের ছিল। তাই নাকি এই বদলি।

৭ এপ্রিল কোচবিহারে ছিল প্রধানমন্ত্রীর জনসভা। সেই সভামঞ্চ থেকে এক নেতা প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে হুমকি দিলেন-“ আমি আরও দশ বছর রাজনীতি করব। এই জেলার ডিএম – এসপি কোথায় থাকে দেখব।” সমর্থকদের বললেন, “ওই এসপি-র উর্দি খুলে নিন।” ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোচবিহারের এসপিকে বদলি করে দিল নির্বাচন কমিশন। কাকতালীয় নাকি হাততালীয়? তালে তাল দেওয়া নয় তো? এই প্রশ্ন উঠবেই। কারণ, তামিলনাড়ুতে পুলিশের এক বড় কর্তার বিরুদ্ধে সিবিআই তদন্ত চলছে। অথচ, তিনি বহাল তবিয়তে আছেন। কমিশন জানে না ? দেশের ৬৪ জন বিশিষ্ট প্রাক্তন আমলা রাষ্ট্রপতির কাছে কমিশনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগের তালিকা পেশ করেছেন। তাঁরা তৃণমূল কংগ্রেসের কেউ নন। তবু কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হল না।

দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন কর্তৃপক্ষর উপর নানা সাংবিধানিক ও আইনি ক্ষমতা ন্যস্ত হয়েছে। এই ক্ষমতা শুধুমাত্র সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য। এখন যদি এই সমস্ত সাংবিধানিক বা আইনি কর্তাব্যক্তিরা নিজেদের খেয়াল খুশিমতো ক্ষমতার অপব্যবহার করেন অথবা কর্তাভজা হয়ে পড়েন, তাহলে গণতন্ত্রের লেশমাত্র বজায় থাকবে না। দাবি উঠেছে, ভারতীয় সেনা নাকি ‘মোদী সেনা’। প্রকাশ্যে একজন মুখ্যমন্ত্রী বললেন, কমিশন ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’। তিনি যে একাধারে যোগী, আবার মুখ্যমন্ত্রীও। আইএএস, আইপিএস হলে ভেবে দেখা যেত। আবার কোনও দিন এই দাবি উঠবে না তো, যে কমিশনও ‘মোদী কমিশন’!

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

লেখক তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ।

Comments are closed.