বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪

জইশ-ই-মহম্মদ কেবল একা দায়ী নয়

জিষ্ণু বসু

পুলওয়ামার কাপুরুষোচিত ঘটনাতে শহিদ হওয়া, আটত্রিশজন জওয়ানের নামের সম্পূর্ণ তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। এঁদের মধ্যে রয়েছেন হাওড়ার বাউড়িয়ার চককাশী গ্রামের বাবলু সাঁতরা বা নদীয়ার হাঁসপুকুরিয়ার সুদীপ বিশ্বাস।

বাবলু অসাধারণ ভলি খেলত। জেলাস্তর থেকে রাজ্য। ২০০৪ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল নিজের যোগ্যতায়। বীরের মতোই। চার চারটে বোনকে এক এক করে বিয়ে দিয়েছে বাবলু। তাই নিজের বিয়ের একটু দেরিই হয়ে গিয়েছে। বাবলুর চার বছরের মেয়ে তিতিল। তিতিলের বাবা আর ফিরবে না। তার বাবা দেশের কোটি কোটি মানুষ যাতে সুখে বাঁচতে পারে তার জন্য তিতিলকে একা ফেলে রেখে চলে গেছেন।

ভারতীয় জওয়ান বীর, সাহসী, সিংহহৃদয় কিন্তু নির্বোধ নয়। অথচ এঁদের নিয়েই কত কথা বললেন কানাহাইয়া কুমাররা।

এরা কেউ ধর্ষণকারী ছিল না কানহাইয়া কুমার!

কানহাইয়া কুমার একটি প্রতীক মাত্র। এমন শত শত কানহাইয়া কুমার কাশ্মীরে কর্তব্যরত সেনা জওয়ানের নামে অনেক অসম্মানজনক  কথা বলেন।

জওয়ানদের নির্বোধ ভাবাটাই আপনাদের বড় নির্বুদ্ধিতা কানহাইয়া! একটা ছোট্ট চ্যালেঞ্জ নেবেন কানহাইয়া কুমার? আপনি নালন্দা মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ করে দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন। আফ্রিকার বর্ণবিদ্বেষের যে বিষয় নিয়ে আপনি গবেষণা করেছেন আপনার বিভাগে তার ওপর একটা সেমিনার করুন। আর মাত্র সাতদিন আগে খবর দেবেন। বাবলু বা সুদীপের ব্যাটেলিয়ন থেকে দু’জন জওয়ান বলতে যাবেন। তাঁরা আপনার থেকে বেশি ভালো বলবেন। চ্যালেঞ্জ। আমি অনেক ভারতীয় সেনা জওয়ানের সঙ্গে বহু বিষয়ে বহুক্ষণ কথা বলেছি। তারা মূর্খ নয়! আপনি কম বয়সে রাজনীতিটা ভালো বুঝেছেন, সুদীপরা দেশটাকে,দেশের মানুষকে ভালোবাসতে শিখেছে। যে বৌদ্ধিক যোগ্যতা আর রাজনৈতিক যোগসাজসে আপনি চাকরি পাবেন, তার থেকে বেশি যোগ্যতা আর অনেকটা দেশপ্রেম নিয়ে এরা সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন।

বাবলুদের হত্যার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে আইইডি বা ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস। এই ভয়ানক বিস্ফোরক প্রযুক্তি আফগানিস্তানের তালিবানদের থেকে কাশ্মীরের মুজাহিদিনদের কাছে পৌঁছতে সাহায্য করেছিল মাওবাদীরা। ২০১০ সালে কলকাতার সেন্ট্রাল ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরির ডিরেক্টর সাংবাদিক বৈঠক করে জানিয়েছিলেন যে কীভাবে বাম অতিবিপ্লবীরা ‘রিমোট কন্ট্রোলড ডিভাইস’ মুজাহিদিনদের জন্য এদেশে এনেছে।

শহরের আরবান নকশালদের কাছে প্রশ্ন, আপনারা তো ধর্ম, ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরোধী। তবে হিজবুল মুজাহিদিন বা জইস-ই-মহম্মদের মতো উগ্র ধর্মান্ধদের এত বড় সাহায্য কেন করেছিলেন? ‘ভারত তেরে টুকরো হোঙ্গে ইনশাল্লা ইনশাল্লা’ – কেবল এর জন্য? দেশপ্রেম তো ছেড়ে দিন, ন্যূনতম মানবতাতে বাধেনি?

কলকাতাতেও আফজল গুরু, বুরহান ওয়ানির জন্য মিটিং মিছিল হয়েছে। প্রতিবাদ হয়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ‘অত্যাচার’-এর বিরুদ্ধে। গত বছর কাশ্মীরের ভয়াবহ বন্যার সময় খাবার, ওষুধপত্র নিয়ে ওই মুজাহিদিনদের ঘরে ঘরে দিয়ে এসেছিলেন এই সেনা জওয়ানরা। আর ধর্ষণ? ১৯৯০ এর গণধর্ষণ, অত্যাচারের পরে উপত্যকার একটি হিন্দু পরিবারকেও থাকতে দেওয়া হয়নি। গান্ধীপুরায় শিক্ষিকা গিরিরাজ টিপ্পুকে প্রকাশ্য রাজপথে দিনের বেলায় গণধর্ষণ করা হল। ১৯৯১-৯২ সাল নাগাদ কাশ্মীর উপত্যকা হিন্দু শূন্য।

এরপর মুজাহিদিনরা সুদান থেকে, লিবিয়া থেকে জেহাদি জড়ো করা শুরু করল। এবার এই অশান্ত বাহিনীর নজর পড়ল কাশ্মীরি মুসলমান মেয়েদের দিকে। যদি ভারতীয় সেনা না থাকত তবে আজকে আইএসআইএসের যৌনদাসীদের সব চেয়ে বড় যোগান যেত এই কাশ্মীর থেকে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কাশ্মীরি মেয়েদের লোভ দেখিয়েই ওয়াজিরিস্তান থেকে বর্বর দখলদারি বাহিনী পাঠিয়েছিল। সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। কাশ্মীরের মা বোনেদের ইজ্জত বাঁচিয়েছে, ভারতীয় সেনা। কেউ গোর্খা, কেউ দক্ষিণ ভারতীয়, কেউ বা আমাদের ঘরের বাবলু সাঁতরা, সুদীপ বিশ্বাস।

ঘটনার ঠিক পরের দিন মানে ১৫ ফেব্রুয়ারি, পাকিস্তানের ‘দ্য নেশন’ পত্রিকার প্রথম পাতার খবর, ‘স্বাধীনতা সংগ্রামীরা আঘাত হেনেছে। ইন্ডিয়ান অকুপায়েড কাশ্মীরে অধিগ্রহণকারী সেনার ৪৪ জন মৃত।’

একদম একই সুরে সবসময় কথা বলেন লেখিকা অরুন্ধতী রায়। বলেন কাশ্মীরে ভারতীয় সেনার অত্যাচার বন্ধ হোক। গত বছর ২৬ অক্টোবর, পাকিস্তান সরকার অরুন্ধতীর ভিডিও সরকারিভাবে মিডিয়াতে চালিয়েছে।

কলকাতার সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সেসের পূর্বতন অধিকর্তা পার্থ চ্যাটার্জি। পার্থবাবু কাশ্মীরে অমানবিক আচরণের জন্য মেজর লিটন গগৈকে ইংরেজ জেনারেল ডায়ারের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। কলকাতার নামজাদা সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় কাশ্মীরে জঙ্গীর মরদেহ বাড়িতে আনার ছবি থাকে।

অরুন্ধতী থেকে সংবাদমাধ্যম, সবাই বার বার বলে কতগুলো সত্যি কথা ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এই মুজাহিদিন জইস-ই-মহম্মদ, লস্কর-ই-তৈবার অমানবিক অত্যাচারের জন্যই কাশ্মীরে হিন্দু পণ্ডিতরা নিজ দেশে উদ্বাস্তু। কাশ্মীর বুরহান ওয়ানিদের হলে নীলকণ্ঠ গঞ্জু, টিকালাল টাপ্পুদের হবে না কেন? কাশ্মীরের রাজা ললিতাদিত্য মুক্কাপীড়কে ইউরোপের ঐতিহাসিকরা ভারতের আলেকজান্ডার বলেছিলেন। সংস্কৃত সাহিত্যের অন্যতম প্রাচীন গ্রন্থ রাজতরঙ্গিনী কাশ্মীরে বসেই লিখেছিলেন কলহন। দশম শতাব্দী ভারত বিখ্যাত দার্শনিক অভিনবগুপ্তের জন্মস্থান কাশ্মীর।

কেবলমাত্র পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর আত্মশ্লাঘার জন্য কাশ্মীরে আজকের এই সমস্যা। সর্দার পটেল বিরোধিতা করেছিলেন, বাবাসাহেব আম্বেদকর প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন ৩৭০ ধারার বিরুদ্ধে। ডা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় নিজের জীবন দিয়ে শোধরাতে চেয়েছিলেন কাশ্মীরের ভুলকে। এগুলো সবকটিই ঐতিহাসিক সত্য। আজ বোধহয় কেবল মোমবাতি মিছিল করলেই আমাদের দায়িত্ব সম্পূর্ণ হবে না। বিস্ফোরকের দায়িত্ব নিয়েছে জইস-ই-মহম্মদ, কিন্তু যাঁরা দায়িত্ব নেননি, যাঁরা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বলে বেড়ান, যাঁদের বক্তৃতার ভিডিও পাকিস্তান লাগাতার প্রচার করছে, যাঁরা মেজর লিটুল গগৈকে ডায়ারের সঙ্গে তুলনা করছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাঁরা নিয়মিত কাশ্মীরের তথাকথিত মুক্তির দাবীতে মিটিং-মিছিল করেন কিংবা কলকাতার সেই সংবাদপত্র যারা জঙ্গির পরিবারের বেদনাবিধুর ছবি কাগজের প্রথম পাতায় বীরের সম্মান দিয়ে প্রকাশ করে – এরা সকলে সমানভাবে দায়ী।

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

লেখক সাহা ইনস্টিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স এ কর্মরত। বাংলায় প্রবন্ধগল্প ও উপন্যাস লেখেন।

Comments are closed.