মঙ্গলবার, মে ২১

আমাদের লড়াইটা কাশ্মীরের জন্য, কাশ্মীরিদের বিরুদ্ধে নয়!

জিষ্ণু বসু

দিন দুয়েক আগে জয়পুরে এক সভায় ঠিক এই কথাটাই বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। পুলওয়ামায় ভারতীয় সেনা জওয়ানদের উপর কাপুরুষোচিত হামলা হয়েছে। ৪০ জন সিআরপিএফ জওয়ানকে বর্বরোচিত ভাবে হত্যা করা হয়েছে। ঠিক ১৩ দিনের মাথায় জবাব দিল ভারত, সার্জিক্যাল স্ট্রাইক ২.০-এর মাধ্যমে। তবে কোনও ভারতীয়কে হত্যা করে নয়, সীমান্তের ওপারে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর তত্ত্বাবধানে থাকা জইশ-ই-মহম্মদের জঙ্গি প্রশিক্ষণ শিবির থেঁতলে দিয়েছে ১২টি আইএএফ মিরাজ ২০০০ যুদ্ধবিমান। তথ্যাভিজ্ঞ মহল একে “লাস্ট অ্যান্ড লস্ট ওয়ার অফ পাকিস্তান” বলছেন। এই লড়াইয়ে ভারতের জেতাটা আসলে কাশ্মীরের আমজনতার জন্যই ভীষণ জরুরি।

১৯৪৭ সালে কাশ্মীরে যুদ্ধ জেতার পরে যে কাজ সম্পূর্ণ হয়নি, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যুদ্ধে ৯৩ হাজার পাক যুদ্ধবন্দি মুক্তির সময় সিমলা চুক্তিতে যে শর্ত অনায়াসে অন্তর্ভুক্ত করা যেত, সেই পাক অধিকৃত কাশ্মীরের ভারতভুক্তি কতটা সম্ভব, সেটাই আজকের প্রশ্ন। ১৯৪৭ সাল থেকে আজ পর্যন্ত ভারতবর্ষ, ভারতীয় সেনা, কাশ্মীরকে বহিঃশত্রুর হাত থেকে বাঁচানোর কাজ করে এসেছে। ১৯৪৭ সালের ২৩ অক্টোবর, কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিং ভারতবর্ষের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হবেন বুঝতে পেরে পাকিস্তান এক জঘন্য পন্থা নিয়েছিল। পাক সরকার পাস্তুন উপজাতিদের পরিকল্পিত উপায়ে কাশ্মীর উপত্যকায় প্রবেশ করিয়েছিল। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল লুঠ আর ধর্ষণ। ইংরেজ তখনও পুরোপুরি ভারতীয় উপমহাদেশ ছেড়ে যায়নি। লাহোরের ব্রিটিশ হাই কমিশনার ছিলেন বি.সি. ডুক। পাকিস্তানের ওই নিষ্ঠুর আচরণ দেখে ডুক লিখেছিলেন, “কাশ্মীর সব সময়ই দুধ আর মধুর জায়গা। ভারতবর্ষের সীমান্তে পশ্চিম দিকের সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে উপজাতি নেতাদের ভূস্বর্গ লোটার জন্য উস্কেছিল। আর লোকদেখানো নির্দেশ দিয়েছিল অবদমিত মুসলমানদের রক্ষা করার।” সত্যিই সেই আক্রমণ ভয়ানক চেহারা নিতে পারত। রাজা ভারতের শরণাপন্ন হলেন। সর্দার পটেল সেনা পাঠালেন। ভারতীয় সেনা পাস্তুন দুষ্কৃতীদের তাড়া করে ভাগিয়ে দিল। কাশ্মীরের মানুষের ধন, প্রাণ আর ইজ্জত বাঁচল।

যে দিন নেহরুজির সরকার কাশ্মীরে যাওয়ার জন্য ভারতীয়দের পারমিটের ব্যবস্থা স্বীকার করেছিল, সেদিনই কাশ্মীরিদের মানসিকভাবে ভারত থেকে দূর করার কাজ শুরু হলো। সে দিন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। শ্যামাপ্রসাদ এক দেশে এক প্রধান, এক বিধান আর এক নিশানের দাবি করেছিলেন। তিনি এই দাবিতে কাশ্মীর যাত্রা করলেন। ১৯৫৩ সালের ১১ মে যখন কাশ্মীরে ঢোকার সময় তাঁকে লখিনপুরে গ্রেফতার করা হলো, তখন তাঁর সঙ্গে ছিলেন সে যুগের তরুণ সাংবাদিক অটলবিহারী বাজপেয়ী। গ্রেফতার হয়ে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, “বাজপেয়ী তুমি ফিরে যাও, আর সারা দেশকে জানাও যে আমি কাশ্মীর ঢুকেছি, কিন্তু পারমিট করিনি।” শেখ আবদুল্লা কৈশোর বয়স থেকেই নির্দয় ছিলেন। কাশ্মীরে জেলে শ্যামাপ্রসাদের মতো একজন দেশবরেণ্য মানুষকে তিল তিল করে হত্যা করা হলো। তাঁর জন্য উপযোগী পথ্য, প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র, কিছুই দেওয়া হয়নি। নেহরুজির কেন্দ্রীয় সরকার শ্যামাপ্রসাদকে কাশ্মীরের কারাগারে মরতে দিয়েছিল। ১৯৫৩ সালের ২৩ জুন বাংলার বীর সুপুত্র শ্যামাপ্রসাদ কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের জন্য প্রাণ দিলেন। শ্যামাপ্রসাদ সে দিন সফল হলে কাশ্মীরে এত হাজার লোকের প্রাণ যেত না। কাশ্মীর থেকে ৩ লক্ষ হিন্দুকে তাঁদের চোদ্দ পুরুষের ভিটে থেকে উৎপাটিত হয়ে নিজের দেশেই উদ্বাস্তু হতে হত না। বাঙালি, বিহারি, রাজস্থানি, তামিল, তেলুগুর মতো কাশ্মীরিরাও ভারতের জনসম্পদের অভিন্ন অঙ্গ হতো।

প্রকৃতপক্ষে আজও যারা কাশ্মীরের হিজবুল মুজাহিদিন, জইশ ই মহম্মদ বা লস্কর ই তৈবার সমর্থন করে মতপ্রকাশ করছেন, তাদের অস্ত্রশস্ত্র দেওয়ার ব্যবস্থা করছেন, সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা বলে জেহাদি একটি আন্দোলনকে স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে চালাচ্ছেন তারা সকলেই কাশ্মীরের মানুষের বিরুদ্ধে।

দিনের আলোতে যে মিথ্যে কথাটা বলা হচ্ছে সেটা প্রথমে আলোচনা করা প্রয়োজন। জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যের মোট আয়তন ১, ০১, ৩৮৭ বর্গকিলোমিটার। এই ভূমিখণ্ডের কেবল ১৫.৭৩ শতাংশ জমি জুড়ে আছে কাশ্মীর উপত্যকা। ২৫.৯৩ শতাংশ স্থান দখল করেছে জম্মু আর ৫৮.৩৩ শতাংশ জমি লাদাখ ক্ষেত্রের অন্তর্ভুক্ত। এই জম্মু বা লাদাখের একজন নাগরিকও ভারতবর্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চান না। মানে জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যের ৮৪.২৬ শতাংশ জায়গার মানুষ ভারতের অংশ হিসেবেই থাকতে চান। আর বাকি ১৫.৭৩ শতাংশ জমি, যেখানে কাশ্মীর উপত্যকা, সেখানে ১৯৯০ সাল পর্যন্তও বহুল সংখ্যায় হিন্দু ছিলেন। হিন্দু পণ্ডিতদের হিজবুল-সহ মৌলবাদীরা ১৯৮৯ সালের অগস্ট থেকে ১৯৯০ সালের ১৯ জানুয়ারির মধ্যে মেরে-কেটে, বাড়ি লুঠ করে, ধর্ষণ করে তাড়িয়ে দিয়েছে। তাই হিন্দুশূন্য কাশ্মীর উপত্যকাতে পাথর ছোড়া, আরডিএক্সের পাহাড় বানানো সহজ হয়েছে। তবুও এখনও এই ১৫.৭৩ শতাংশ জমির মুসলমান সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ মানুষই ভারতের বাইরে যেতে চান না। কারণ, পাক অধিকৃত কাশ্মীরের মানুষ কত সুখে আছে, তার খবর তাঁরা ভালোভাবেই জানেন। কিন্তু জেহাদিদের বিরোধিতা করলে মরতে হবে। আর প্রকৃত নিরীহ ভারতপন্থীরা খবরের কাগজের কাছে ‘নিউজ’ নয়। আর এই কতিপয় জঙ্গির সাহায্য পাকিস্তান, চিন, ইরান-সহ বহুদেশ থেকে আসে। সেই টাকায় পাথর ছোড়ার মাইনে দেওয়া হয়। আর খবরের কাগজের উত্তর সম্পাদকীয়তে পণ্ডিত, অধ্যাপক, কর্তব্যরত মেজরকে ইংরেজ জেনারেল ডায়ারের সঙ্গে তুলনা করেন। বাংলার কোনও এগিয়ে থাকা কাগজের প্রথম পাতায় ভারতীয় সেনার গুলিতে ৭জন ‘নিরীহ’ মানুষের হত্যার খবর বের হয়। অথচ কেউ আসল কথাটা বলে না, হাতে গোনা কিছু জেহাদির তাণ্ডব ১ লক্ষ বর্গকিলোমিটারের একটি রাজ্যের স্বাধীনতা সংগ্রাম হতে পারে না। কাশ্মীরের আদি বাসিন্দা পণ্ডিতদের চোদ্দপুরুষের ভিটে থেকে উচ্ছেদের অধিকার হুরিয়তকে কে দিয়েছে?

সারা পৃথিবীর জেহাদের খবর পরিবেশনে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা। ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর আল-জাজিরায় সওকত সাফির একটি লেখা প্রকাশিত হয়। লেখাটির বিষয় ছিল, জম্মুতে কীভাবে পরিকল্পিতভাবে বসানো হচ্ছে মায়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের। কোথায় মায়ানমার, সেখান থেকে আসা বাংলাভাষী রোহিঙ্গাদের দিল্লিতে রেখে উদ্বাস্তু কার্ড করিয়ে জম্মুতে পাঠানো, এ এক ঠাণ্ডা মাথার পরিকল্পনা, বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। এর পিছনের কারণ কাশ্মীরের জেহাদিরা জানে, যে তাদের ‘ন্যুইসেন্স ভ্যালু’ যত বেশিই হোক না কেন, আসলে তারা রাজ্যের কেবল ষোল শতাংশ জমির প্রতিনিধি। জম্মুর জনবিন্যাস যতক্ষণ না পরিবর্তন হচ্ছে, জম্মুতে যতক্ষণ না পর্যন্ত জেহাদের পক্ষে কণ্ঠ মেলাবার লোক তৈরি হচ্ছে, ততদিন তাদের অরণ্যে রোদনে বিশেষ কাজ হবে না।

হুরিয়ত, লস্কর বা জইশের সহযোগীদের কৃতকর্ম দেখলেই বোঝা যায় যে তারা আসলে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের ভালো চায় না। ২০১০ সালে তহেলকা পত্রিকায় মাওবাদী তাত্ত্বিক বারবারা রাও কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সপক্ষে একটি বড়সড় সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। বারবারা বলেছিলেন, “কাশ্মীরের স্বাধীনতাই সেখানকার সমস্যা সমাধানের একমাত্র রাস্তা।” ওই বছরই ডিসেম্বর মাসে কলকাতার সেন্ট্রাল ফরেনসিক ল্যাবরেটরির নির্দেশক সি.এন. ভট্টাচার্য মাওবাদীদের সঙ্গে কাশ্মীরের জেহাদিদের আঁতাতের কথা বলেন। এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন, কীভাবে মাওবাদীরা কাশ্মীরের জেহাদিদের জন্য আফগানিস্তানের তালিবানদের কাছ থেকে রেডিও কন্ট্রোল্ড এবং ভয়েস অ্যাক্টিভেটেড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস এনেছিল ( টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ডিসেম্বর ৮, ২০১০ )। এই দুই ভারত বিরোধী শক্তি এক না হলে বিগত ১০ বছরে অন্তত ১০টি ভয়ানক নাশকতা সংঘটিত হতো না। এরা কাশ্মীরে আদিল আহমেদ দারের মতো যুবকদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়ে নিজেদের উদ্দেশ্য সফল করেছে। এরা যে কেউই কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের মঙ্গল চায় না, তা যে কোনও ধান্ধাহীন, বাস্তববুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ বলতে পারবেন।

গত বছর ২৬ অক্টোবর পাকিস্তানের সূচনা প্রসারণ মন্ত্রকের সরকারি টুইটার হ্যান্ডেলে লেখিকা অরুন্ধতী রায়ের বিবিসিকে দেওয়া কাশ্মীর বিষয়ে সাক্ষাৎকার সারাদিন প্রচার করেছে। অধ্যাপক তাঁর কলমে কাশ্মীরে কর্তব্যরত মেজরকে কুখ্যাত ইংরেজ জেনারেল ডায়ারের সঙ্গে তুলনা করেছেন। দিল্লির বা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রক্তপিপাসু জঙ্গি জেহাদি নেতাদের সম্বর্ধনা দেওয়া হয়েছে এই সেদিনও। বারবারা রাও কাশ্মীরের জেহাদকে স্বাধীনতা সংগ্রাম বলেছেন। সেখানকার জেহাদিরা মাওবাদীদের সাহায্যে ভয়ানক বিস্ফোরক প্রযুক্তি ভারতবর্ষে এনেছে। এরা এইসব কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের ভালোর জন্য করছেন?

নাকি লেফটেন্যান্ট জেনারেল কে.জে.এস ধিলোঁ উপত্যকার মানুষের জন্য বেশি ভালো কাজ করছেন? গত ১৯ ফেব্রুয়ারি উনি সব কাশ্মীরি যুবকদের মায়ের কাছে আবেদন করেছেন, “আপনাদের ছেলেদের বলুন, সন্ত্রাসের পথ ছেড়ে বের হয়ে আসতে। নির্ভয়ে জমা দিয়ে দিক সব অস্ত্রশস্ত্র।“ ২৬ ফেব্রুয়ারি ভারতীয় বিমান সীমান্ত পেরিয়ে বালাকোটে জইশ-ই-মহম্মদের সবচেয়ে বড় জঙ্গি প্রশিক্ষণ শিবির ধ্বংস করেছে। এই লড়াইটা কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের মঙ্গলের জন্য। এই লড়াইয়ে সারা দেশ এক হয়ে কাশ্মীরের পাশে আছে।

আজ কবিগুরুর ‘গান্ধারীর আবেদন’ কবিতায় রাজমাতা গান্ধারীর সেই কথাগুলো বার বার মনে আসছে,

“অধর্মের মধুমাখা বিষফল তুলি

আনন্দে নাচিছে পুত্র; স্নেহমোহে ভুলি

সে ফল দিও না তারে ভোগ করিবারে-

কেড়ে লও, ফেলে দাও, কাঁদাও তাহারে।”

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

লেখক সাহা ইনস্টিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স এ কর্মরত। বাংলায় প্রবন্ধগল্প ও উপন্যাস লেখেন।

Shares

Comments are closed.