বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪

বাজেট অথবা শুধুই চশমার গল্প

সুপর্ণ পাঠক

বেড়ালটা খুশি হয়ে বলল, “হ্যাঁ, এ তো বোঝাই যাচ্ছে — চন্দ্রবিন্দুর চ, বেড়ালের তালব্য শ, রুমালের মা — হল চশমা। কেমন, হল তো?”

এবারের ভোটের আগের বাজেট শুনে সুকুমার রায়কে টানার লোভ সামলানো খুব কঠিন। আয়কর দেওয়া সাধারণ মানুষ করের ফাঁস থেকে রেহাই পাওয়ার প্রতিশ্রুতি পেল পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয়ে। এর সঙ্গে রেহাই-যোগ্য সঞ্চয় আরও দেড় লক্ষ যোগ করলে ছাড়ের সীমা বেড়ে দাঁড়াল সাড়ে ছয় লক্ষ টাকা। বেতনভোগীদের ক্ষেত্রে স্ট্যান্ডার্ড ডিডাকশন বৃদ্ধি পেয়ে ৪০ থেকে ৫০ হাজার ছাড়ের প্রতিশ্রুতি ধরলে এক লাফে সাত লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয়ে কর নাকি থাকবে না।

নাকি! হ্যাঁ। এই বাজেটে নির্বাচনের আগে করের পরিবর্তন না-করাটাই প্রথা। তাই ছাড়ের সুযোগ পেতে গেলে অপেক্ষা করতে হবে নতুন সরকারের জন্য। আর সেটা হবে নির্বাচনের পরেই।

একই গল্প বাকি সব কর ছাড়ের গল্পেই। মন টানার প্রতিশ্রুতি। কিন্তু তা রাখার চাপ নেওয়ার ক্ষমতা নিকট ভবিষ্যতে কোষাগারের হবে তো? আর এইখান থেকেই শুরু বেড়ালের চশমার বানান।

বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র এবং এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির আর্থিক চিত্র কিন্তু বেশ অপরিষ্কার। বাজেট বিচার, তা সে পূর্ণাঙ্গই হোক অথবা আজকের বাজেটের মতো নতুন সরকার আসার অপেক্ষায় খরচ চালানোর অনুমোদনই হোক, তার বিচার তো হয় দেশের আর্থিক পরিস্থিতির অঙ্কে। সরকারের দাবি খতিয়ে দেখতে লাগে দেশের আর্থিক স্বাস্থ্যের খতিয়ান। কিন্তু সেই খতিয়ানই এই মুহূর্তে ধোঁয়াশায়।

নেওয়া যাক বেকারের সংখ্যার গল্প। ন্যাশনাল সাম্পেল সার্ভের পরিসংখ্যান নাকি বলছে গত পাঁচ বছরে বেকারের সংখ্যা যা বেড়েছে, তা গত ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। কিন্তু সরকার তা মানতে নারাজ। এই দাবি নস্যাৎ করে সরকারি পাল্টা দাবি, এই তথ্য মনগড়া। অপপ্রচার। এই তথ্যে তাদের শীলমোহর নেই। সমস্যা এখানেই। এটা মেনে নিলে আর্থিক বৃদ্ধি নিয়ে যে দাবি তা মানা সমস্যা হয়ে যায়। একই সঙ্গে সরকারের কাল ঘাম ছুটে যাবে এই দুই তথ্যকে পাশাপাশি বিশ্বাস্য করে তুলতে। আমরা এটাও জানি যে বৃদ্ধির হারের হিসাবও বদলান হয়েছে এবং তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা তাঁদের বিস্ময়ও প্রকাশ করায় গণমাধ্যমেও প্রচুর আলোচনা হয়েছে।

মজার ব্যাপার হল বাজেট বক্তৃতায় অর্ন্তবর্তী অর্থমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলও বলেছেন তাঁরা চান চাকরির মুখাপেক্ষী না থেকে স্বনিযুক্তির দিকে যুব সম্প্রদায় আরও বেশি করে ঝুঁকুন, যাতে তাঁরা অন্যদের কর্ম সংস্থানের উৎস হয়ে উঠতে পারেন! অনেকেই এটাকে বেকারের সংখ্যা যে বাড়ছে তার পরোক্ষ স্বীকারোক্তি বলে মানছেন।

আর্থিক দাবির অন্যতম সুবিধা হল কেউ যদি বলেন তাঁর ব্যক্তি অভিজ্ঞতা সরকারের দাবির সঙ্গে মিলছে না তখন উল্টোদিকের যুক্তি হবে, “আমরা তো বলিনি সবার জন্য আমরা এটা করতে পেরেছি। কিন্তু আমাদের প্রচেষ্টার ফল খুব শীঘ্রই যাতে আপনার কাছে পৌঁছয় তার জন্য আমরা রাতদিন কাজ করছি।”

আর্থিক সমস্যার আর একটি সুবিধা হল যতক্ষণ না রান্নাঘরের আঁচে হাত পড়ছে ততদিন তার ভোট বাক্সে কোনও প্রতিফলন হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাই নির্বাচনের আগের বাজেট সব সময়ই ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতিশ্রুতিতে ভরে থাকে। জিতে এলে মোটা দাগের প্রতিশ্রুতি ছাড়া বাকিগুলো সময়ের গহ্বরে তলিয়ে যায়। পরের পাঁচ বছরে।

কিন্তু সবই বা খারাপ বলি কী করে? আমরা জানি আয়ুষ্মান ভারতে যে টাকা গত বছর বরাদ্দ করা হয়েছিল তা সিন্ধুতে বিন্দু। কিন্তু পরবর্তীতে যেই সরকারে আসুক তার পক্ষে এই প্রকল্প ছেঁটে ফেলা মুশকিল। এই প্রকল্প পরিকল্পনায় কিছু সমস্যা আছে যা আগামীতে পরিমাজর্না করা হবে বলে আশা। যেমন জি এস টি। পূর্ববর্তী সরকার এটা নিয়ে কাজ শুরু করেছিল এই সরকার তা এগিয়ে নিয়ে গিয়ে রূপায়ণ করেছে। গ্রামীণ রাস্তা বা গরিবের জন্য রোজগার প্রকল্প, সবই পূর্ববর্তী সরকারের সময় চালু হওয়া প্রকল্প।

একই ভাবে অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের ক্ষেত্রে সামাজিক সুরক্ষা তৈরি করার প্রচেষ্টা নিশ্চয়ই একটা ভাল পদক্ষেপ। কিন্তু যখন দেখি গোরক্ষায় সরকারের প্রচেষ্টার পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্দ শতাংশের হারে তলানিতে এবং উচ্চশিক্ষায় বরাদ্দ হ্রাস পাচ্ছে তখন সরকারের সংকল্প আর বরাদ্দের মধ্যে মিল খুঁজে পাওয়া ওই চশমার বানানের মতোই হয়ে দাঁড়ায়।

উচ্চ শিক্ষায় বরাদ্দ কমালে মৌলিক গবেষণার টাকা আসবে কোথা থেকে? কী ভাবেই বা ভারত বিশ্বের অন্যতম দেশ হয়ে উঠবে? আমরা চাইছি ডিজিটাল দুনিয়ায় বিপ্লব। আমরা চাইছি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের প্রয়োগ। সম্ভব। আই আই টি-র মতো  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই তো পাশ করা ছাত্ররা বিদেশে সীমান্ত প্রযুক্তির উপর কাজ করে দেশের নাম উজ্জ্বল করছে। অথচ সেই আই আই টি-র মতো প্রতিষ্ঠানগুলির জন্য বরাদ্দেই কাঁচি চালানো হচ্ছে। বলছি কর্ম দক্ষতা বাড়ানোর কথা কিন্তু সেই কাজের আঁতুর ঘরেই তো বাতি দেওয়ার তেলের উপর রেশনের ব্যবস্থা হচ্ছে!

এ বছরের আর্থিক সমীক্ষা সরকার প্রকাশ করেনি। বাজেট বিচারের জন্য তথ্যের ঘাটতি ক্রমাগত বাড়ছে। এই প্রেক্ষিতে যদি হযবরল-র চশমার বানানের কথা মনে পড়ে তা হলে কি খুব ভুল হবে?

লেখক প্রাক্তন সাংবাদিক ও বর্তমানে তথ্য প্রযুক্তি উদ্যোগপতি

আরও পড়ুন

করযোগ্য আয় ৫ লক্ষ টাকা হলে, সিধে সাশ্রয় সাড়ে ১২ হাজার

Comments are closed.