সাবধান, মৌলবাদ! ধর্মের বেশে মারতে পারো, মেরে ফেলতে নয়!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    হিন্দোল ভট্টাচার্য

    সনাতন হিন্দুধর্ম এক অত্যন্ত সহিষ্ণু ধর্ম। এমনই তার সহিষ্ণুতা, যে, সেখানে সত্যের বিপরীত মিথ্যা নয়, অ-সত্য, যা সত্যের এক অংশ। এর অর্থ, প্রতিযুক্তি হল যুক্তির এক অংশ। যুক্তি ও প্রতিযুক্তি একে অপরকেই প্রতিষ্ঠিত করে। এই দর্শন যে সনাতন ধর্মের, তা থেকে হিন্দু নামক সম্প্রদায়ের জন্ম (ধর্মের নয়, কারণ হিন্দু বলে কোনও ধর্ম নেই)। সেই হিন্দু অনুশাসনেও একপ্রকার সহিষ্ণুতা ছিলই, যার কারণে শৈব, শাক্ত থেকে শুরু করে সব রকমের লৌকিক ও অনার্য দেবতা ও ধর্ম সেই অনুশাসনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। সমস্যাটি শুরু হয় ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের সময় থেকে। কারণটি হল, ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র ছিল ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। তারা ক্ষমতাকে যেমন নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তেমন জনগণকেও। এরা ক্ষমতা, জনগণ ও ধর্মের শাসক হয়ে ওঠে। এই ছোট্ট ইতিহাস বা ভাবনা আবার বিধৃত করার কারণ হল এই, যে হিন্দু ধর্মের সঙ্গে বা সনাতন ধর্মের সঙ্গে কখনওই একত্ববাদী ধারণা কাজ করে না। বরং বহুত্ববাদী ধারণাই এই ধর্মে প্রধান। ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র আসার পর ক্ষমতার সঙ্গে ধর্মবেত্তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের কারণে শুরু হয় ধর্মীয় স্বৈরতন্ত্র। উগ্র বা কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা সেই ধর্মীয় স্বৈরতন্ত্রের উত্তরাধিকারী।

    বিভিন্ন পুরাণ যখন লিখিত হয়, তখন তার শিল্পজ্ঞান ও সাহিত্যজ্ঞানে অনেক সূক্ষ্মতা থাকে। অনেক প্রতীক থাকে।  অলংকার থাকে। শিবের ত্রিশূলের যে পৌরাণিক অর্থ, সেই সব অর্থ নিয়ে চর্চা সম্ভবত খুব কম হয়। উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের বা উগ্র মুসলিম বা উগ্র খ্রিষ্টানদের মধ্যে ধর্মের মধ্যে থাকা প্রতীকী অর্থ নিয়ে চর্চা করতে কখনও দেখা যায় না। তারা ধর্মের বিভিন্ন প্রতীকের বাহ্যিক অর্থ নিয়েই উন্মাদনা তৈরি করেন। আর সে থেকে তৈরি হয় প্রচলিত অর্থকেই অন্ধ বিশ্বাস করার প্রবণতা। তাঁদের কাছে ঈশ্বর বা ঈশ্বরের পয়গম্বর বা অবতার মানে মানুষের মতো দেখতে এমন সব অস্তিত্ব, যাঁরা মানুষের জৈবিক চাহিদা ও জীবনযাত্রার ঊর্ধে। আর সে সব নিয়ে যদি কেউ চর্চা করেন, তবে তিনি পাপী। অতএব তাঁর মৃত্যু অনিবার্য। এই চর্চা এবং বিশ্বাস কিন্তু এক জিনিস নয়। বিশ্বাস করার মধ্যে যে শান্তি আছে, তার মধ্যে যদি কুসংস্কার বাসা বেঁধে থাকে, আর সেই বিশ্বাস যদি এমন হয়, যে তাকে কেন্দ্র করে মানুষ উগ্র অসহিষ্ণু হয়ে হিংসা পর্যন্ত করতে পারে, তবে তার সঙ্গে নিশ্চিত ভাবে দর্শনের সম্পর্ক নেই। বরং সম্পর্ক আছে ক্ষমতার হিংসাত্মক ও প্ররোচনামূলক ভ্রুকুটির।

    একজন শিল্পী যখন ছবি আঁকেন বা একজন কবি যখন কবিতা লেখেন, তখন তাঁর বা তাঁদের শিল্পচর্চায় কোন শব্দ বা কোন অলংকার বা কোন রূপক ব্যবহৃত হবে, তা নির্ভর করে কী তিনি বলতে চাইছেন তার উপর। ঠিক যে কারণে একজন শিল্পী বা কবির কল্পনাতেই মহাদেবের অনবদ্য রূপকল্পনা, কালীর অপরূপ ভাস্কর্য, বিষ্ণুর অনবদ্য কাঠামো দেখতে পাওয়া যায়, যে কারণে তাদের নিয়ে তৈরি হয় অনবদ্য সব  রূপক-সাহিত্য। ঠিক তেমনি, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লিখতে বা আঁকতে গিয়ে একজন কবি বা লেখক বা শিল্পী কী অলংকার ব্যবহার করবেন্, কীভাবে ব্যবহার করবেন, তা নির্ভর করে, তিনি কীভাবে, কতটা মাত্রায় অভিঘাত সৃষ্টি করতে চাইছেন তার উপর। এটি একটি নান্দনিক বিষয়, যা শিল্পীর স্বাধীনতা না থাকলে সম্ভব নয়।

    এই সব কথাগুলি বলে বলে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছি যখন আমরা, তখন আবার আমাদের বন্ধু শ্রীজাতকে আক্রমণ ও হেনস্থা করা হল একদা তাঁর কবিতায় শিবের ত্রিশূলে কন্ডোম পরানো হয়েছে কেন, তার জবাব চেয়ে। কারা চাইলেন? উগ্র হিন্দুত্ববাদী কিছু লোক, বজরং দলের লোক। এর আগেও শিলিগুড়িতে ঘেরাও করেছিল্ শ্রীজাতকে হিন্দুত্ববাদীদের একটি সংগঠন। এবার ব্যাপারটা আরও ভয়ংকর। শিলচরে, অজস্র বাঙালি থাকেন। আশা করি যুক্তিবাদী বাঙালিও থাকেন এবং প্রগতিশীল বাঙালিরাও থাকেন। আমরা পেয়েছি সেখান থেকেই কবি রণজিৎ  দাশ এবং কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্যের মতো ব্যক্তিত্বকে। এখনও আমাদের প্রচুর বন্ধু থাকেন সেখানে। তাই কিছুটা অভিমানী কণ্ঠেই আতঙ্ক অনুভব করছি এই কথা ভেবে যে এই উগ্র হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্টদের আগ্রাসন আর কত আমাদের লজ্জা দেবে? এ কথা বোঝাই যাচ্ছে, যে ভারতের হিন্দু ফ্যাসিস্ট শক্তি যথেষ্ট পরিমাণে নগ্ন ভাবে সন্ত্রাস সৃষ্টি করার পথে এগিয়ে গেছে। একজন কবি বা লেখক বা সাধারণ মানুষ যদি প্রকাশের ভাষায় মুক্ত এবং স্বাধীন অনুভব করতে না পারে, তবে, সে কীভাবে অনুভব করবে যে সে একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক? কেন শ্রীজাতকে বারবার আক্রমণ করবে হিন্দু বজরং দল বা উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো? আজ যদি শ্রীজাত এমনি বেড়াতেও যায় ভারতের কোথাও, যদি ঠিকমতো প্রশাসনের সুবিধা না পাওয়া যায়, তবে তো তার প্রাণসংশয় হতে পারে যে কোনও  সময়। এ তো প্রায় উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের তৈরি করা জ়ীহাদের মতো ব্যাপার। অলিখিত লাল সিগন্যাল। এই অবস্থা আজ শ্রীজাতর, কাল আমার আপনার যে কারোর হতে পারে। এমনকী যিনি লিখছেন না, তাঁকে যদি বলা হয় ( এটা আমরা দেখেওছি বিভিন্ন ভিডিওয়) জয় শ্রীরাম না বললে ছাড়া হবে না, মারা হবে, আর যদি তিনি না বলেন, তবে তাঁকে মারাও হতে পারে। মোদ্দা কথা কণ্ঠ তোলা যাবে না। কথা বলা যাবে না। শিব, ত্রিশূল কন্ডোম ইত্যাদি বাজে কথা, আসল কথা প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর যদি থাকে, তবে তাকে আগে আটকাও, থামাও, দরকার হলে, কুচলে ফেলে দাও।

    কিন্তু বন্ধুরা, বলুন, আদৌ এর সঙ্গে ধর্মের কোনও সম্পর্ক আছে কি? আছে এর সঙ্গে সৃজনের সম্পর্ক, সংস্কৃতির সম্পর্ক? না কি আছে অসহিষ্ণুতার সম্পর্ক, ক্ষমতার সম্পর্ক, স্বৈরতন্ত্রের সম্পর্ক? আজ আমরা, সত্যি কথা বলতে গেলে, এ রাজ্যে ধর্মীয় সন্ত্রাস, উগ্র হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাস টের পাচ্ছি না। কিন্তু স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিক হিসেবে কর দিচ্ছি ভারত সরকারকে। কারণ ভারতবাসী আমরা। এই ২৬ জানুয়ারির প্রবল বর্ডার আর দেশপ্রেম-চর্চিত প্রজাতন্ত্র দিবসের আগে, স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে একজন কবি যদি তাঁর শহর বা তাঁর ঘর ছেড়ে অন্য রাজ্যে পাড়ি দেন, তাহলে একটি লেখার অপরাধে তাঁর প্রাণ কেড়ে নেওয়া হতে পারে? তাঁকে হেনস্থা করা হতে পারে? সে দিন হয়ত দূরে নয়, যে তাঁর ঘরে এসেও গুলি করে গেল উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা। ঠিক যেমন বাংলাদেশে ব্লগার হত্যা হয়, তেমন শুরু হল এখানে। ঠিক যেমন গৌরী লঙ্কেশকে হত্যা করা হয়, সুজাত বুখারিকে মেরে ফেলা হয়, তেমন। মৌলবাদের এই ভারত কি আমার-আপনার? এই গণতান্ত্রিক দেশের নামে মৌলবাদী একটা দেশে যখন আমরা বসবাস করছি, তখন কি আমরা বলতে পারি, যে খুব নিরাপদ আছি? আজ একটা অনুষ্ঠান করতে গিয়ে যেভাবে শ্রীজাতকে ঘিরে ফেলে স্রেফ হেনস্থা করা হল, তাতে তাঁর দোষ কীসের? তিনি লিখেছিলেন, প্রতিবাদ করেছিলেন ভারতের মৌলবাদী সরকারের মৌলবাদের বিরুদ্ধে। তখন ধর্মের নামে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা যা শুরু করল, তা কি আদৌ কোনও গণতান্ত্রিক দেশে হয়? এর পর আমরা আমাদের দেশের কথা ভেবে গর্বে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াব? না কি নাসিরুদ্দিন শাহ-এর মতো আশঙ্কিত হব এই দেশে কীভাবে বেঁচে থাকব তার কথা ভেবে?

    কণ্ঠ, ভাষা, শব্দ, প্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা উগ্র ফ্যাসিবাদী শক্তি করেই। কিন্তু করলেও, সেই চেষ্টা ফলপ্রসূ হয়নি কখনও। একজন পিকাসো উদ্ধত ফ্যাসিস্ট সৈন্যদের সামনেই গ্যয়েরনিকা ছবি সম্পর্কে বলেন- এই ছবি এঁকেছেন আপনারাই। লোরকা প্রাণ দেন। রুখে দাঁড়ান স্পেন্ডার। উগ্র ফ্যাসিস্ট শক্তি বড়জোর হুমকি দিতে পারে, হেনস্থা করতে পারে, ঘেরাও করতে পারে, আঘাত করতে পারে, প্রাণ পর্যন্ত নিতে পারে। কিন্তু যা পারবে না তা হল, সেই শিল্পী বা সেই কবির মেরুদণ্ড গুঁড়িয়ে দিতে। একজন শিল্পী বা একজন কবি কবিতা লেখেন, শিল্প সৃষ্টি করেন, কারণ তিনি আদতে কোনও ক্ষমতাকে পরোয়া করেন না। সেই ক্ষমতা যদি উগ্র হিন্দুত্ববাদী বা মুসলিম মৌলবাদী বা কমিউনিস্ট স্বৈরতান্ত্রিক হয়, তাহলেও না।

    আজ আবার প্রমাণিত, আমাদের সামনে অশনি সংকেত। শ্রীজাত আমাদের বন্ধু, আমাদের আত্মার আত্মীয়। তাঁর কণ্ঠরোধ করার জন্য উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা যতই উঠে পড়ে লাগুক, শান্ত সহিষ্ণু পথেই সেই স্বৈরতন্ত্রের মোকাবিলা করতে হবে। কারণ এরা আমাদের এই ভারতবর্ষ শুধু না, এই বিশ্বের শরীরে পচা আলসারের মতো। এরা অসুখ। আসুন এদের হাত থেকে আমাদের দেশটাকে সারিয়ে তুলি। এই সব ক্ষতস্থানগুলিকে বিষমুক্ত করি। রোগকে তাড়াই। রোগীর উপর রাগ না করে। কিন্তু মৌলবাদীরা সাবধান। এবার কিন্তু আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর পালা। কারণ, ইতিহাস কখনওই ফ্যাসিজমকে ক্ষমা করেনি। মানুষ সহ্য করেছে আপনাদের, আবার মানুষ-ই আপনাদের সরিয়ে দিয়েছে আবর্জনা পরিষ্কার করার মতো। আমাদের সহিষ্ণুতাকে আমাদের দুর্বলতা বলে ভাববেন না।

    মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

    হিন্দোল ভট্টাচার্য। নব্বই দশকের কবি। তুমি, অরক্ষিত, তারামণির হার, জগৎগৌরী কাব্য, মেডুসার চোখ, তালপাতার পুথি, যে গান রাতের, তৃতীয় নয়নে জাগো প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থের প্রণেতা। পেশায় বিজ্ঞাপনের কপিরাইটার এই কবি পেয়েছেন জগৎগৌরী কাব্যের জন্য বীরেন্দ্র পুরস্কার। ২০১৯ সালে  “যে গান রাতের” কাব্যগ্রন্থের জন্য পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি অনিতা-সুনীলকুমার বসু স্মারক পুরস্কার প্রাপ্ত। 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More