বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৮

“যুদ্ধটাকেই চিতায় তোলো, যুদ্ধটাকেই কবর দাও”

 হিন্দোল ভট্টাচার্য

দেশপ্রেমিক হতে গেলে কেন যে যুদ্ধপ্রেমিক হতে হবে, তা প্রশ্ন করলেও এখন দেশদ্রোহী হয়ে যেতে হবে। বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ তো বলেই দিয়েছেন যুদ্ধের সেন্টিমেন্টের বিরুদ্ধে কথা বললে যাঁরা কথা বলছেন তাঁদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদের। স্কুল শিক্ষক চিত্রদীপ সোমকে বরখাস্ত করা হল চাকরি থেকে।

কাশ্মীরি যে সমস্ত মানুষ সারা দেশে ছড়িয়ে, তাঁরা ভয়ে কাঁপছেন। কারণ তাঁদের প্রাণে মারার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। যে সমস্ত অন্য ধর্মের মানুষ যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলছেন, তাঁদের দেশদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। যুদ্ধের বিরুদ্ধে এখন যে, সে-ই দেশদ্রোহী।

পরিস্থিতিটা পরিষ্কার নির্মিত, ঠিক যেমন চেয়েছিলেন বিজেপি নেতারা, ঠিক তেমন। কারণ ফ্যাসিবাদী শক্তির একটা বিরাট বড় অস্ত্র হল উগ্র জাতীয়তাবাদ, যেমন ধর্মীয় ফ্যাসিজমের ক্ষেত্রে, তা দাঙ্গা।

মারা গেছেন নিরাপত্তাবাহিনীর কয়েকজন। অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। কিন্তু তাঁদের এই অবস্থার ফল ভোগ করছে ভারতীয় রাষ্ট্র। দেশ কিন্তু নয়। আমাদের দেশে তো বহুদিন ধরেই যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি।  নতুন করে আর কী তৈরি করবে এই দেশের সরকার?

দেশ মানে কী? উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিমে কিছু কাঁটাতার? সীমানা? ভূগোল? না কি দেশ মানে দেশের জনগণ? কেমন আছে দেশের জনগণ থুড়ি দেশ? এক বছরে সাতাশ হাজার-এর বেশি কৃষক আত্মহত্যা করেছে। মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাত এমনকী পঞ্জাবেও। তাদের অবস্থা খারাপ থেকে আরও খারাপ হয়েছে। দেশে বেকার সমস্যা বেড়েছে। কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। স্বাস্থ্যখাতে এ দেশে ব্যয় হয় মোট আয়ের মাত্র ১ শতাংশ। দেশে শিশুমৃত্যুর হার প্রচুর। মহিলাদের নিরাপত্তার অবস্থা তলানিতে। গোরু নিয়ে, গোরক্ষার নামে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয় মানুষকেই। কে কী খাবে, তা নিয়ে ফতোয়া দেয় শাসক দল। প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে মিছিল করে তারা। বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশ্যেই চলে দাঙ্গা। দেশের অর্থনীতি আমাদের মহান প্রধানমন্ত্রী বিকিয়ে দিচ্ছেন বহুজাতিকদের হাতে, আম্বানীদের হাতে এবং কতিপয় পুঁজিপতিদের হাতে। টাকার দাম কমতে কমতে তলানিতে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া।

এ দেশের জনগণ কি ভালো আছে? ভালো আছে এ দেশ? নাকি ভালো আছে ভারত নামে রাষ্ট্র আর তার শাসকশ্রেণি। নোটবন্দী থেকে শুরু করে আরও যে সব তুঘলকি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এ দেশের সবজান্তা প্রধানমন্ত্রী, তার ফলে অর্থনীতির অবস্থা যেমন ভগ্নপ্রায়, আজ যদি যুদ্ধ লাগে, সেই অর্থনীতি সে চাপ নিতে পারবে তো? ভারতীয় উপমহাদেশের অবস্থা হবে না তো মিশর-প্যালেস্তাইন-ইজরায়েল-সিরিয়া বা আফ্রিকান দেশগুলির মতো? তখন এই দেশের যারা উগ্র জাতীয়তাবাদের পুতুলনাচের সঙ্গী হয়েছেন, তাঁরা কী করবেন? কী করেছিলেন জার্মানি-ইতালির সেই সব উগ্র জাতীয়তাবাদের স্কচ খাওয়া মানুষ, যারা ইহুদি নিধনে মেতে উঠেছিলেন? ইতিহাসে পড়েননি প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সেই সময়ের ইউরোপের অর্থনীতির কথা? মিল কিছু পান না?

আসলে যুদ্ধকে আশ্রয় করে সারা দেশে গৃহযুদ্ধ বাঁধাতে চাইছে ভারতের একাংশ। যারা যুদ্ধকে সমর্থন করবে না তারা সকলে দেশদ্রোহী। যারা কাশ্মীরের জনগণের উপর অত্যাচার নিয়ে কথা বলবে, তারা সকলে দেশদ্রোহী। আরে বলুন রাষ্ট্রদ্রোহী। কারণ রাষ্ট্র এবং দেশ আলাদা। রাষ্ট্র মানে কতিপয় শাসকশ্রেণির মানুষের ক্ষমতাতন্ত্র এবং তাদের কায়েমী স্বার্থ। এর সঙ্গে দেশের সম্পর্ক নেই। কারণ দেশ মানে সীমান্ত নয়, দেশের নাগরিক মানে শুধু নয় সেনাবাহিনী। তাহলে নোটবন্দীর ফলে যে সব মানুষ মারা গেছিলেন তারা সবাই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ফসল। শাসকশ্রেণির দ্বারা পুষ্ট দাঙ্গার ফলে এ দেশের বিভিন্ন জায়গায় মারা যাওয়া প্রত্যেক নাগরিক তো ভারতের লোক। তখন দেশপ্রেম যায় কোথায়? দেশপ্রেম যায় কোথায় যখন ২৭০০০ কৃষক আত্মহত্যা করেন? দেশপ্রেম যায় কোথায় যখন চিকিৎসার অভাবে মারা যায় শিশু  নারী সাধারণ মানুষ? তবে কি সমস্ত দেশপ্রেম ক্রিকেটে এবং সীমান্তে? দুটিই কি খেলা?

প্রাণ নিয়ে খেলছেন আপনারা সাধারণ যুবকদের যাঁরা সৈন্যবাহিনীর হয়ে আপনাদের কথায় সীমান্তে যান। তাঁরা আনন্দের সঙ্গে বর্ডার বা এলওসির মতো গান গাইতে গাইতে যান তা তো নয়। মনে পড়ে সেই কবে বার্নার্ড শ-এর ব্লান্টশ্লির কথা- কোনও সৈন্যই যুদ্ধে যেতে চায় না। আর প্রতিটি সৈন্যই চায় বেঁচে থাকতে। মনে পড়ে গ্যালিলিও নাটকের সেই বিখ্যাত সংলাপ- দুর্ভাগা সেই দেশ, যে দেশে শুধুই বীরের প্রয়োজন হয়। কিন্তু আপনারা এই প্রাণ নিয়ে খেলার রাজনীতিকে উগ্র জাতীয়তাবাদের ঘুঁটি সাজিয়ে খেলতে শুরু করেন। আপনারা খুব ভালো করে জানেন, যে ভারতের সাধারণ মানুষ আর পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের আলাদা কোনও দেশ নেই। ঠিক তেমনই, ভারতীয় রাষ্ট্র, পাকিস্তানের রাষ্ট্র—এরা সবাই এক রাষ্ট্রের লোক। রাষ্ট্রের কোনও দেশ নেই। রাষ্ট্রের আছে ক্ষমতা। সাধারণ মানুষ সেই দেশহীন রাষ্ট্রের হাতে শাসিত মাত্র। আর আপনারা উগ্র জাতীয়তাবাদের স্কচ খাইয়ে দেশের মধ্যে অসহিষ্ণুতার বাতাবরণকে আরও জ্বালিয়ে দিতে চান। উদ্দেশ্য সম্ভবত যুদ্ধ এবং দাঙ্গা – এই দুটি একসঙ্গে চালনার, যাতে আপনাদের স্বার্থ রক্ষিত থাকে। কারণ যুদ্ধ করে সমস্যার সমাধান হয়নি। আর সমস্যাটি আর কোথাও কারো মধ্যে নেই। সমস্যাটি আপনাদেরই আছে।

উগ্র জাতীয়তাবাদ কোনওদিন দেশপ্রেম হতে পারে না, রাষ্ট্রপ্রেম হতে পারে। দেশদ্রোহী তারাই, যারা উগ্র জাতীয়তাবাদকে অন্ধের মতো অনুসরণ করে। কারণ এই বিষ একবার ঢুকলে, সারা দেশেই যে আগুন জ্বলবে, তাতে পুড়ে খাক হবেন আপনিও। তখন শত্রুর ভূত দেখবেন আপনারা। মনে হবে আপনি যথেষ্ট নিরাপদ নন, যতক্ষণ না, শাসকশ্রেণির চিহ্নিত শত্রুদের নিজে হাতে নিকেশ না করতে পারছেন। এই হিংসাকে আপনি প্রশ্রয় দেবেন কি?

কিন্তু হুমকি তো এসেই গেছে। শুধু খেয়াল করে ইতিহাসের দিকে তাকান। শাসকশ্রেণির আহ্বানে উগ্র জাতীয়তাবাদী হলে প্রকৃত দেশের কী অবস্থা হয়, তার প্রমাণ ১৯১৯ থেকে ১৯৪৫ এর ইউরোপ। দেশ মানে সীমান্ত নয় বন্ধু। দেশ মানে দেশের মানুষ, মানুষের ভালো থাকা, দেশ মানে দেশের সংস্কৃতি, ইতিহাস, সঙ্গীত, কাব্য, প্রকৃতি, শস্য, শিল্প, সহিষ্ণুতা, ভ্রাতৃত্ববোধ। দেশ মানে রাষ্ট্র আর রাষ্ট্রের ফ্যাসিস্ট শক্তির সংকীর্ণ স্বার্থ চরিতার্থ করা নয়।

কিন্তু হ্যামলিনের বাঁশি যখন বাজে, তখন তা নিশির ডাকের মতো। সাড়া না দিয়ে থাকতে পারবেন না, আবার সাড়া দিলেও মরবেন। এতদিনে আপনাদের নানা ভাবে মেরেও যারা তৃপ্ত হয়নি, এবার কি তারা শেষ তুরুপের তাস বের করেছে, যাতে আপনারা সম্পূর্ণ মারা যান?

কে দেশপ্রেমী তবে? আর কেই বা দেশদ্রোহী?

(শিরোনামের জন্য কৃতজ্ঞতা- কবীর সুমন)

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

হিন্দোল ভট্টাচার্য। নব্বই দশকের কবি। তুমি, অরক্ষিত, তারামণির হার, জগৎগৌরী কাব্য, মেডুসার চোখ, তালপাতার পুথি, যে গান রাতের, তৃতীয় নয়নে জাগো প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থের প্রণেতা। পেশায় বিজ্ঞাপনের কপিরাইটার এই কবি পেয়েছেন জগৎগৌরী কাব্যের জন্য বীরেন্দ্র পুরস্কার। ২০১৯ সালে  “যে গান রাতের” কাব্যগ্রন্থের জন্য পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি অনিতা-সুনীলকুমার বসু স্মারক পুরস্কার প্রাপ্ত। 

Comments are closed.