একটি যুদ্ধ সংক্রান্ত বিবরণী

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    হিন্দোল ভট্টাচার্য

    আমাদের এলাকাতে প্রায়শই বোমা পড়ে। দুই পাড়ায়, দুই গোষ্ঠীতে, দুই গ্যাং-এ, দুই পার্টিতে লড়াই লেগে থাকে। চোরাগোপ্তা খুন হয়। প্রকাশ্যেও হয়। তবে আগে এসব অনেক বেশি ছিল। দেখতাম, কালিন্দী থেকে জপুরের দিকে কিছু লোক ছুটে ছুটে যাচ্ছে। হাতে লম্বা লম্বা পিস্তল। সেগুলো নাকি ছিল ওয়ান শটার। আর ছিল বোমা। একটা বোমার নাম শুনেছিলাম – খৈনিবোমা। সেই খৈনিবোমায় আমাদের যশোর রোডে সকাল দশটার সময় একজন ডাকসাইটে গুন্ডা খুন হয়েছিল। তবে সে সব গুন্ডারা তাদের পরিশ্রমের জোরে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হয়ে যাওয়ায় আর গুন্ডামি করে না। গুন্ডামির নতুন রিক্রুট যারা, তারা ঠিক এখন কোথায় ও কীভাবে গুন্ডামি করছেন, এ খবর আমার জানা নেই। কিন্তু ধান ভানতে শিবের গীত না গেয়ে বলি, এই সব বোমাবাজির দিনগুলিতে আমাদের পাড়ায় সীমান্তবর্তী ফ্ল্যাটগুলি এবং বাড়িগুলিতে সন্ধে হলেই জমা হত প্রবল দুশ্চিন্তা। একটু রাত হলেই বাড়ির লোকজন যেন নিরাপদে বাড়ি আসে, আর তাড়াতাড়ি চলে আসে তার জন্য চলত ভাবনা এবং বারবার ফোন করে খবর নেওয়া। বা, এলাকাতে বোম পড়লেই জানিয়ে দেওয়া আজ দমদমের দিকে বোমা পড়েছে। বা, বাজারের দিকটা এড়িয়ে যাস। বা, সাবধানে আসিস, পুলিশের ভ্যান ঘুরছে।

    এখন অবশ্য মাঝেমাঝে বোমা পড়ে। তবে সেগুলি খুব একটা পেশাদারী ব্যাপারস্যাপার নয় বুঝতে পারি। মানে, বোমা পড়ল। তার পর উত্তরে আর বোমা পড়ল না। আবার একটা বোমা পড়ল বেশ কিছুক্ষণ পর। ব্যাস তারপর চুপ। আগে কী হত, বন্দুক ইত্যাদি তো তেমন ভাবে দেখতে পেতাম না। ওই মর্চে ধরা রঙের ওয়ানশটারগুলো বেশ ভয়ের ছিল। তখন জানতাম না ওগুলো ওয়ানশটার। সেসব পরে শুনেছি। তখন ওই বন্দুকগুলিই ছিল আমাদের কাছে রোমাঞ্চকর। পরে তো সব বদলে গেল। ঘরে ঘরে ঢুকে এলো আরডিএক্স আর এ কে ফর্টি সেভেন চর্চা। জীবনে খৈনিবোমা থেকে যে কতরকমের বোমা ঢুকে পড়ল, তার কোনও হিসেব নেই। সে যাই হোক, পাড়ায় পাড়ায়, পার্টিতে পার্টিতে যুদ্ধ যখন গ্লোবাল হয়ে যায়নি, সেই সব দিনগুলিতে ভেবে কূল পেতাম না ঠিক কী কারণে এই সব যুদ্ধ হচ্ছে, এই সব বোমাবাজি হচ্ছে। তো,পরে যেটা বুঝতে পারতাম তা হল এলাকার এই সব রাজাগজার এলাকা দখল নিয়ে, যার নেপথ্যের কারণ হল প্রোমোটারি। অর্থাৎ এতে বাজারে যাঁরা তরকারি বিক্রি করেন, চায়ের দোকান যাঁদের, রিক্সা যাঁরা চালান, মিউনিসিপ্যালিটির জমাদার, শিক্ষক, ছাত্র, কেরানি, বেশ্যা, পুরোহিত – এই সব মানুষের জীবনের সঙ্গে এই বোমাবাজির কোনও সম্পর্ক নেই। তাহলে যদি সাধারণ মানুষ এই সব বোমাবাজির অংশ না হন, তাহলে এত বোমা নিয়ে বাজি ফাটাচ্ছেন কারা? ওই যে বললাম, কিছু অশিক্ষিত গুন্ডা, যাঁদের এলাকার গব্বর- মোগাম্বো বানিয়ে দিয়েছে কিছু রাজনৈতিক নেতা। তো এই সব লোকেদের ভবিষ্যৎ কী? অকালে বোমা বা গুলিতে প্রাণ হারানো অথবা কাজ ফুরিয়ে গেলে এদের খাল্লাস করবে যাঁরা বানিয়েছেন তাঁরাই।

    এদিকে পুলিশের ভ্যান ঘুরছে।

    কিন্তু আমরা কী করতাম? এখানে বিষয়টি খুব চ্যালেঞ্জিং হয়ে যায়। আমরা ভয়ে ভয়ে সন্ধের মধ্যে বাড়ি ফিরে, বোমা পড়লে উত্তেজনায় আমাদের গ্রিলের বারান্দা দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম। ওই যে বোমা মেরে বেরিয়ে গেল। ওই দ্যাখো হাতে ছুরি নিয়ে ওপেনলি ঘুরছে। ওই দ্যাখো পাঁইপাঁই করে ছুটে গেল পাইপগান নিয়ে। যেন আমরা গ্যালারিতে আর বাইরে চলছে ‘দুর্ধর্ষ দুশমন’!

    তার পর ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম। উত্তেজনায়, সাসপেন্সে, লাইভ অ্যাকশন থ্রিলার দেখার রোমাঞ্চে।

    কারা যুদ্ধ করে এবং কেন যুদ্ধ করে, এ প্রশ্নের উত্তর যাঁরা যুদ্ধ করেন তাঁরা সম্ভবত নিজেরাও জানেন না। কিন্তু যাঁরা যুদ্ধ করান তাঁরা অবশ্যই জানেন। যাঁরা যুদ্ধ করেন, তাঁরা প্রত্যেকেই মনে করেন ধর্মপ্রতিষ্ঠার জন্য তাঁরাই হলেন যথার্থ পান্ডবপক্ষ। বাকি সব কৌরবপক্ষ। কিন্তু মহাভারতের যুগেও আমরা সাধারণ সৈন্য বা ভারতবাসীর খবর পেয়েছি কি? না কি ধরে নিতে হবে, যে, রাজারাই প্রকৃত আলোচ্য জাতি? কথা হল, ইতিহাস যেমন সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে লেখা হয় না, তেমন যুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রাণহানি হলেও, তাঁদের জীবনের কোনওপ্রকার উন্নতিই হয় না। এই ধরুন, প্রতিদিন ভারতের ৫০০০ জন নারী ও শিশু উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে মারা যায়। বেকারের সংখ্যা বাড়ছে ক্রমশ। বাড়ছে ধর্মীয় সংকীর্ণতা। বিদেশি পুঁজির হাতে দেশকে অকাতরে বেচে দেওয়া। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জিনিসপত্রের দাম…কিছুই পালটায় না। এই তো আমাদের মহামান্য আইন বলে দিল জঙ্গলে থাকার অধিকার আদিবাসীদেরও নেই। অর্থাৎ তাদেরকেও ছিন্নমূল করা হবে। তাদের কাছে তো দেশ মানে জঙ্গল। তবে যদি তারা বিদ্রোহ করে, তারা হয়ে যাবে দেশদ্রোহী?

    তবে, থাক এসব কথা। ওই যে বললাম পাড়ায় পাড়ায় পার্টিতে পার্টিতে গুন্ডায় গুন্ডায় যুদ্ধ হয়, কিন্তু তার কারণ তাদের ব্যক্তিগত লাভ লোকসানের গল্প। তার সঙ্গে পাড়ার মানুষদের সম্পর্ক নেই। কথা হল, যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা আমাদের খুব প্রিয়। আগে ভিডিও গেমস-এ, এখন গেমস-এর অ্যাপে দেখা যায় এই ওয়ার ফিল্মের মতোই বিষয়। যারা উরি বলে একটি সিনেমা বানাতে পারে, তারা পিওকে পেরিয়ে বারোটি বিমানের বোমাবাজির একটা স্ক্রিপ্ট তৈরি করতে পারে না? যদিও চ্যানেলগুলো লিখেই দিচ্ছে, এই সব ভিডিওর সত্যতা যাচাই করা হয়নি। আরে, তবে আপনারা দেখিয়ে লোক ক্ষেপাচ্ছেন কেন? কথা হল, আসল যুদ্ধ না হলেও, শাসকশ্রেণিকে এই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা দেখাতে হবে। ভারত -১২, পাকিস্তান-১। তার পর হল কী, একজন ধরা পড়ল। আর পাকিস্তান ‘জাজমেন্ট’ দিল অসামান্য। তার কারণ কী, এসবে যাচ্ছি না। তবে বীরের অসহায়তা আর দেখতে না পেলে যুদ্ধকেই বন্ধ করার জন্য কথা বলতে শুরু করে দিয়েছিল। কী আশা ছিল কে জানে, যুদ্ধ হবে কিন্তু বন্দি হবে না কেউ? আবার একজন বললেন একে যুদ্ধ বলে না। বলে ঘর থেকে শত্রু ঝেটিয়ে বিদায় করা। আচ্ছা বেশ। কিন্তু তার জন্য এত নাটক? এমন সাফ করে এলেন ভাই, কিছু চিহ্নমাত্র রইল না? স্বচ্ছ ভারত অভিযান?

    যুদ্ধ বিষয়টি ভীষণ জটিল। কিন্তু তার চেয়েও বেশি জটিল যুদ্ধনির্মাণের চিত্রনাট্য। কারণ সম্ভবত নিরাপদ দূরত্বে থাকা মানুষের সেরা বিনোদন যুদ্ধ। সব কিছু আছে। ট্র্যাজেডি, বীররস, কূটনীতি, বন্দুক, বোমা, বোমারু বিমান! কী টেনশন বলুন তো! আহা, চা আর চানাচুর নিয়ে বসে পড়ুন টিভির সামনে। দেশ বলে কথা! কামানের গোলাগুলো কী আতশবাজির মতো ছুটে যাচ্ছে দেখতে পাচ্ছেন? আহা! মার। মার। পড়ে পড়ে শুধু আমরাই মার খাব?

    যুদ্ধ কখনও সমস্যার সমাধান হতে পারে না বন্ধুরা, কারণ যুদ্ধই সমস্যা। এ কথা জোর গলায় বলুন। যুদ্ধের জন্য যাঁরা ভোট দিচ্ছেন, সওয়াল-জবাব করছেন, তাঁদের বলুন- চুপ! দু’দুটো বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপের কোন দেশের সাধারণ মানুষের ভালো হয়েছে? প্রশ্ন করুন।

    আমাদের পাড়ায় বোমা পড়ে। কিন্তু অল্প। যারা বোমা বানাতো, তারা আজ বাড়ি বানায়, পুকুর বুজিয়ে। আপনার আমার না আছে বোমা না আছে বাড়ি। মাথার উপর কোনও বোমারু বিমান নেই। এ হেন অবস্থায় যুদ্ধকে সমর্থন করা আর ঘরে বসে যুদ্ধ নামক ইভেন্টের লাইভ প্রদর্শন দেখা – একই ব্যাপার। তবে আইপিএল, ওয়ার্ল্ড কাপ আসছে। তার পর ভোট। ফলে মনে হয় না এই  ইভেন্ট বেশি স্পনসর পাবে। আর স্পনসর না পেলে তো ভগবানও আসে না এখানে। যুদ্ধ কি এমনি এমনি হয়?

    ভাবছি মোদী বিজ্ঞাপন এবং বিনোদন যেভাবে বোঝেন, তাঁর তুলনায় পীযূশ পান্ডে কিছুই নয়!

    মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

    হিন্দোল ভট্টাচার্য। নব্বই দশকের কবি। তুমি, অরক্ষিত, তারামণির হার, জগৎগৌরী কাব্য, মেডুসার চোখ, তালপাতার পুথি, যে গান রাতের, তৃতীয় নয়নে জাগো প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থের প্রণেতা। পেশায় বিজ্ঞাপনের কপিরাইটার এই কবি পেয়েছেন জগৎগৌরী কাব্যের জন্য বীরেন্দ্র পুরস্কার। ২০১৯ সালে  “যে গান রাতের” কাব্যগ্রন্থের জন্য পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি অনিতা-সুনীলকুমার বসু স্মারক পুরস্কার প্রাপ্ত। 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More