বুধবার, নভেম্বর ২০
TheWall
TheWall

আজ যা হল, সাত দিন আগেও হতে পারত, এত জেদাজেদির দরকার ছিল কি!

শঙ্খদীপ দাস

মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, তোমরা তো আমার লক্ষ্মী ছেলে। কাল থেকে কাজে যোগ দাও। মুখোমুখি বসে আন্দোলনকারীদের তেজও তখন উবে গেছে। বলছেন, ম্যাডাম আপনার উপরেই আমাদের সব ভরসা!

সোমবারের সেরা ‘ফ্রেম’ এটাই। গণতান্ত্রিক দেশে যেটা হওয়া উচিত। তাই-ই হল। আলোচনার মাধ্যমে দরজা খুলল মীমাংসার।

অথচ সেই সহজ রাস্তায় হাঁটতে দু’পক্ষ সময় নিল সাত দিন। যে জেদ-এর বলি হল, শহর থেকে গ্রাম হাজার হাজার (হয়তো বা লক্ষ লক্ষ) রোগী ও তাঁদের পরিজন।

এনআরএস মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসক নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছিল সোমবার রাতে। পর দিন হাসপাতালে স্বাস্থ্য দফতরের প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে পাঠিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী তিনি ব্যস্ত ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি উন্মোচনে। কিন্তু আন্দোলনকারী ডাক্তাররা স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। তাঁদের দাবি ছিল, মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গেই কথা বলবেন।

অনেকের মতে, সেই দাবি অমূলক ছিল না। কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদী সরকারের মন্ত্রিসভার বহু মন্ত্রীর যেমন ওজন ও গুরুত্ব নেই, তেমনই বাংলায় মমতা মন্ত্রিসভার ক্ষেত্রেও তাই। প্রায় একই ধরনের মডেল।

সে যাক। পরে মুখ্যমন্ত্রী পুলিশ কমিশনার অনুজ শর্মাকেও পাঠিয়েছিলেন এনআরএস হাসপাতালে। কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি। অথচ এই মুখ্যমন্ত্রীই কিন্তু ভোটের আগে স্কুল সার্ভিসের চাকরি প্রার্থীদের অনশন ভাঙাতে প্রেস ক্লাব চত্বরে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ প্রত্যাশা বাড়িয়ে রেখেছিলেন তিনি নিজেই।

এ সব করতে গিয়েই কেটে যায় ৪৮ ঘন্টা। কলকাতা ও গোটা রাজ্য থেকে তখন রোগীদের অসহায় অবস্থার খবর আছড়ে পড়তে শুরু করেছে সংবাদমাধ্যমের পাতায় পাতায়। কিন্তু দুই শিবিরের জেদ তখনও অটুট।

পরিস্থিতি যখন এমনই, তখন বৃহস্পতিবার এসএসকেএম হাসপাতালে যান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁকে ঘিরে আন্দোলনকারী ডাক্তাররা স্লোগান তোলায় দৃশ্যতই চটে যান তিনি। এর পরে ডাক্তারদের দাবিদাওয়া আর শুনতেই চাননি তিনি। স্পষ্ট রায় দিয়ে দেন। বলেন, চার ঘন্টার মধ্যে জুনিয়র ডাক্তাররা কাজে যোগ না দিলে হস্টেল ছাড়তে হবে।

মুখ্যমন্ত্রীর সেই হুঁশিয়ারিকে পরোয়া না করে পাল্টা দাবি জানান ডাক্তাররা। বলেন, ওঁকে এ ধরনের অসংবেদনশীল কথা প্রত্যাহার করে নিতে হবে। ক্ষমা চাইতে হবে। বিষ মদ কাণ্ডে মৃত্যু হলে মুখ্যমন্ত্রী ঘটনাস্থলে যেতে পারেন, কলকাতার পুলিশ কমিশনারের বাড়িতে সিবিআই হানা দিলে উনি ধর্নায় বসতে পারেন, ডাক্তারদের মার খাওয়ার খবর পেয়ে কেন তিনি হাসপাতালে আসবেন না?

ও দিকে গোটা রাজ্যে স্বাস্থ্য পরিষেবার তখন একেবারেই বেহাল অবস্থা। একের পর এক মৃত্যুর খবরও আসছে।

কিন্তু এর পরেও জেদ অটুট রাখে নবান্ন। মুখ্যমন্ত্রী আগের তুলনায় নরম হন। তাঁর চার ঘন্টার আল্টিমেটাম হাওয়ায় উবে যায়। তবে জানান, আন্দোলনকারীরা নবান্নে এলে তিনি বৈঠক করতে পারেন।

কিন্তু এর পরেও ডাক্তারদের সেই এক জেদ। তাঁরা নবান্নে যাবেন না। চার দিক নানা সমালোচনার পর চাপের মুখে অবশ্য সাত দিনের মাথায় নবান্নে গেলেন। জেদ ছেড়ে তাঁদের সমস্যার কথা বললেন। আর মুখ্যমন্ত্রীও তাঁদের সব দাবি মেনে নিলেন। সব।

সোমবার সন্ধ্যায় সেই আলোচনাতেই দেখা গেল, সরকারের জেদ যেমন ছিল অমূলক, তেমনই আন্দোলনকারীরা গত ৪৮ ঘন্টা ধরে যে জেদ দেখিয়েছেন, তারও বিশেষ দরকার ছিল না। এত দিন যে মুখ্যমন্ত্রী বাংলায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ‘সব ভাল’- সব ভাল বলে দাবি করতেন, দেখা গেল তিনি মেনে নিচ্ছেন স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় খামতি রয়েছে।

ডাক্তারদের নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। এমনকী রোগী কল্যাণ সমিতি গড়ে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে তৃণমূলের স্থানীয় নেতাদের কর্তৃত্ব স্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়েছে, সেই সব সমিতির অধিকাংশ অকেজো বা কাজের কাজ করে না।

যার অর্থ একটাই, গোড়াতেই ডাক্তারদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী আলোচনায় বসলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ হত না। আর হ্যাঁ, সর্বভারতীয় স্তরে বাংলার ভাবমূর্তিতেও আঁচ লাগত না।

Comments are closed.