শুক্রবার, ডিসেম্বর ১৪

উনিশের ভোটের ইস্যু কী?

দেবেশ রায়

এক অতিতরুণ গল্পকার, এতই কম লেখে যে তার গল্প অপছন্দ করার ফাঁক মেলে না। আমাকে এই প্রশ্নটা পাঠিয়েছে। সঙ্গে এইটুকু মন্তব্য ছুঁড়ে যে সেই তো বোফর্সের বদলে রাফায়েল, এখানকার দাঙ্গা, কাশ্মীর আর পাকিস্তান।

উত্তরটা আমার জিভের ডগায় ছিল। দেড় বছরের ওপর কাগজে-টিভিতে সেই এক কথা বলে আসছি। ২০১৯-এর ভোটের সঙ্গে একমাত্র তুলনীয় ১৯৩২-এর জার্মানির ভোট। ১৯৩২-এ যদি হিটলার বিরোধী সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ও কমিউনিস্ট পার্টি এক জোট হত – তা হলে হিটলার কিছুতেই জিততে পারত না।

তার অর্থ: নাৎসিরা ক্ষমতায় আসতে পারত না। তার অর্থ: কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে কমিউনিস্টদের ও ইহুদিদের মরতে হতো না। তার অর্থ: বিশ্বব্যাপী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হতো না। তার অর্থ: অণু-পরমাণু নিয়ে গবেষণা সামরিক অস্ত্র তৈরির দিকে ঝুঁকে পড়ত না। তার অর্থ: হিরোশিমা নাগাসাকিতে প্রথম আণবিক বোমা পড়ত না ও মানবসভ্যতাকে এই মারণাস্ত্রের মারণক্ষমতা ও বংশানুক্রমিক ধ্বংসক্ষমতা দেখে যেতে হতো না। তার অর্থ: দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হওয়ার ৭০ বছর পরও, শুধু সন্দেহের বশে, ইরাক বিধ্বস্ত হতো না, সেই ভুল সন্দেহের জন্য কেউ বা কোনও দেশ অভিযুক্ত হতো না ও ২০১৮-তে উত্তর কোরিয়ার নতুন মারাত্মক বোমার তিরস্কারকে নীরবে সহ্য করতে হত না। তার অর্থ: আমাদের এখনও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ধ্বংস প্রক্রিয়ার মধ্যেই বসবার করতে হতো না।

হিটলারের কাছেও তার জায়গা নিশ্চিত ছিল না।

ভোটে জেতার পর ১৫ দিনও পার হয়নি! নাৎসিরা রাইখস্ট্যাগে (জার্মানির পার্লামেন্ট) আগুন লাগিয়ে দিল। সে আগুন ভালো করে লাগার আগেই, হিটলার ঘোষণা করে দিলেন, ‘কমিউনিস্টরা আগুন লাগিয়েছে। অলিতে-গলিতে যেখানে যে কমিউনিস্ট পাবেন, তাকে হাতের কাছের গাছের ডালে বা রাস্তার আলোয় লটকে দিন।’

ভোটে জেতার মাত্র পনেরো দিনও সেদিন পার হয়নি। আজ আমরা পৃথিবীর মানুষ সেই ধ্বংসের মধ্যে বাস করছি ৮৬ বছর ধরে!

আমার সেই তরুণ সাহিত্যিক বন্ধুকে উত্তর দিইনি। কারণ, এটা তো হল তার বাবারও জন্মকালের আগের কথা। সে আজকে বিশ্বাস করত না। ভারতে আর এক উপমা। আর তারই লেখা একটা গল্প আমি পড়েছি – যেখানে সে জার্মান অধিকৃত পোলান্ডের কথা লিখেছে। হয়তো সে পোল্যান্ডে গিয়ে থাকবে। হয়তো সে পোল্যান্ডের নাৎসি অধিকারের সময়কার অদ্ভুত সব প্রতিরোধ ও অবধারিত সব মৃত্যুর কাহিনী পড়ে থাকবে।

অন্য দেশের কাহিনী পড়ে বা সেখানে গেলে বোঝা সহজতর হয়। কারণে সেখানে বোফর্স বা র‍্যাফায়েলের তুলনা, বা ইহুদিদের ঘেটোতে খ্রিস্টান সন্ত্রাসবাদীদের আক্রমণ চোখের সামনে থাকে না।

কিন্তু প্রধানত জার্মানি ও ইংলিশ চ্যানেল পর্যন্ত বিস্তারিত মধ্য ইউরোপের কাছে ফ্যাসিবাদের সত্য ফ্যাসিবাদেরই সত্য। বোধ হয় বছর তিন আগে জার্মানির নিও-ফ্যাসিস্টরা হিটলারের ছবি নিয়ে একটা মিছিল বের করেছিল। ছোট্ট একটা মিছিল, ছোট্ট একটা রাস্তা ধরে। বিকেল না পেরোতেই জার্মানির প্রথম মহিলা চ্যান্সেলর-এর নেতৃত্বে বিশাল এক মশাল মিছিল বেরোল বার্লিনের সমস্ত বড় রাস্তা জুড়ে, রাস্তার পর রাস্তা জুড়ে।

না ফ্যাসিবাদকে অঙ্কুরও তুলতে দেওয়া হবে না। ইউরোপ জানে ফ্যাসিবাদ কী?

আমেরিকা জানে না তাই সেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্প জেতে।

এ সব কোনও কথা আমি সেই লেখক যুবককে বলিনি, তাঁর প্রশ্নের উত্তরে। বলিনি – কারণ, সেই যুবক এ সবই জানেন। শুধু জানেন না – নিজের দেশে সেই বাস্তবতার ইতিহাস। কারণ তখন তো তাঁর বাবাই বালক। প্রশ্নটাইতে পাশ কাটাতে বলেছি। প্রশ্নটাকে পাশ কাটাতে বলেছি – ‘আরে, এই কয়েকটা বিধানসভা নির্বাচন হতে দিন, তার ফলাফলের ওপরেই তো ইস্যু তৈরি হবে। আমাদের দেশে গণতন্ত্র সত্যি করেই এত পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়ে গেছে যে মোটামুটি বিশ লাখ মতো লোকের (অর্থাৎ গোটা তিনেক লোকসভা আসনের ভোটার) একটি সন্নিহিত এলাকার কোনও নেতাও নতুন পার্টি তৈরি করতে দর কষাকষিতে নামতে পারেন। ছত্তীসগড়ে অজিত যোগী তাই করলেন না? হরিয়ানায় ওম প্রকাশ চৌতালার বড় ছেলে অজয় সিং লোকদল ভেঙে নিজের আলাদা দল গড়ছেন না? তারপর, ভোটের মুখের অন্য রকম খেলাও শুরু হয়েছে। দ্বিতীয় দফার ভোটের প্রচার বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছত্তীসগড়ের সরগুজা অঞ্চলে বিজেপির বাইকবাহিনী সব রাস্তায় ছুটতে ছুটতে রটিয়ে দিল অজিত যোগী বিজেপিকে সমর্থন করবে বলেছে। সরগুজার ১৪টি আসন বিজেপি ও কংগ্রেস গত ভোটে ৭-৭ করে পেয়েছিল। একটা সিট ছিনতাই করতে পারলেও লাভ।

বিজেপি যে এরকম সব কলকাঠি নাড়াতে পারে সে আন্দাজ বোধহয় অজিত যোগীর ছিল। তিনি তো প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। ভোট বোঝেন – তিনি তার সঙ্গে সঙ্গেই পাল্টা রটিয়ে দিলেন – অজিত যোগী বলেছেন বিজেপিকে সমর্থন করলে অজিত যোগী সকলের সামনে গলায় দড়ি দেবেন। কথাটা যাতে রটে সে ব্যবস্থা তাঁর ছিল।

অমিত শাহ কৌশলের ওপর একটু বেশি বিশ্বাস রাখেন। আর শেষ মুহূর্তের কৌশল ফেঁসে গেলে, মেরামতির সময় পাওয়া যায় না। ছত্তীসগড়ে সেটাই বিজেপির কাল হবে। হয়তো। তা থেকেই তো ইস্যু তৈরি হবে।

আবার বিহারে রাষ্ট্রীয় লোক সমতা পার্টির নেতা কুশওয়ারা, বিজেপিকে নোটিস দিয়েছেন ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বিজেপি যদি তাদের কত আসন দিতে পারবে তা না জানায় তা হলে তারা অন্য কথা ভাববে।

ইস্যু তো সবে শুরু হচ্ছে।

রাজস্থানে, মধ্যপ্রদেশেও।

মধ্যপ্রদেশে বিজেপি যেন হার মেনেই নিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী তাঁর নির্বাচনী প্রচারের কর্মসূচি শেষ না করেই ফিরে এলেন। আর ভোটের ব্যবহারবিধি লাগু হওয়ার এক দিন আগে ঘোষণা করলেন ‘ভাবান্তর’ কর্মসূচিঃ  সয়াবিন আর মেইজ কেনার জন্য কুইন্টাল পিছু ৫০০ টাকা বোনাস দেওয়ার যে ঘোষণা, ৫ অক্টোবর তা কার্যকর করা হবে ৫ অক্টোবর, ২০১৯ থেকে। অর্থাৎ শিবরাজ চৌহান যদি জেতেন একমাত্র তা হলেই।

চৌহান বুঝে গিয়েছেন ৫০০ টাকা বোনাসের ঘোষণা, তাঁর জয় নিশ্চিত করছে না। তাই কৃষকদের তাঁর ‘ভাবান্তর’ জানালেন, আগে জেতাও তবে বোনাস। এতটা নির্লজ্জতা তো হারের নিশ্চয়তারই পূর্বলক্ষণ।

রাজস্থানে কংগ্রেস বর্তমান সাংসদ (আজমির) রঘু শর্মাকে আজমির জেলারই কেকরি থেকে মনোনয়ন দিয়েছে। প্রাক্তন সাংসদ সি পি জোশী ও গিরিজা ব্যাস বিধানসভাতেই দাঁড়িয়েছেন। শচীন পাইলট ও অশোক গেহলটই রাজস্থানের একমাত্র নেতা নন। প্রার্থী মনোনয়নের পরিষ্কার ইঙ্গিত – প্রতিষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে। বিজেপি এর পালটা এমন প্রার্থী তালিকা বের করতে পারেনি যাতে তারা দখলদারি পার্টি সম্পর্কে আপত্তি ঘোচাতে পারে।

এই বিধানসভা জোটগুলি থেকে ইস্যু বেরিয়ে আসবে। সেই ইস্যু কি জাতীয় ক্ষেত্রে বিজেপি-বিরোধী দলগুলি একজোট হয়ে ২০১৯ এর ভোটটাকে বিজেপি বিরোধী, নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহ-বিরোধী, ফ্যাসিবাদ-বিরোধী ভোটে বদলে নিতে পারবে? অথবা, লোকসভা ভোটও বিধানসভা ভোটের মতো একটা সরকার বদলের ভোটমাত্র হবে।

এই হিসেবের মধ্যে ইতিমধ্যেই বিজেপি-বিরোধী রাজ্য সরকারগুলিকে ধরতে হবে। তা হলে তো বিজেপির দাঁড়াবার জায়গা খুঁজে পাওয়া যায় না।

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত 

লেখক বাংলা ভাষার অন্যতম উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিক

Shares

Comments are closed.