শনিবার, নভেম্বর ১৬

গান্ধীজির সার্ধশতবর্ষে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দেশকে রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় সংকল্প

সীতারাম ইয়েচুরি

২০১৯ সাল মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর সার্ধশতবর্ষ। গান্ধীজি ছিলেন ভারতের সাধারণ মানুষদের এক অতুলনীয় জননেতা। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার লড়াইয়ে তিনি সমগ্র‌ দেশের সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে সফল হয়েছিলেন
যেহেতু আমাদের প্র‌জন্ম বেড়ে উঠেছে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে তাই একটি প্র‌শ্ন এখানে রয়েছে যার উত্তর পাওয়া জরুরি। গান্ধীজির মতো এক অবিসংবাদী জননেতাকে অনেক সময়েই দেশের এক বড় পুঁজিপতির বাড়িতে থাকতে দেখা যেত যাঁর নাম ঘনশ্যাম দাস বিড়লা। তাঁর নয়াদিল্লির বাড়িতেই ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি এক ধর্মোন্মাদের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন গান্ধীজি। দেশের অগণিত দরিদ্র মানুষ গান্ধীজির বন্দনা করছে, আবার তাদের যারা শোষণ করছে তেমন পুঁজিপতি ও ভূস্বামীদের কাছেও তিনি বন্দিত ছিলেন— এটা কি পরস্পরবিরোধী ঘটনা নয়? সে প্র‌শ্নে আমরা একটু পরে আসছি
এই সময়ের প্রে‌ক্ষিতে বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গান্ধীজি যেভাবে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্র‌ামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তা আজ অসম্মানের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। সাম্র‌াজ্যবাদের বিরুদ্ধে গান্ধীজির অবিচল অবস্থান, ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে তুলে ধরা, অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে সামাজিক ন্যায়ের জন্য তাঁর লড়াই এবং খাদি ও হাতে বোনা কাপড় ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা আনার জন্য তাঁর উদ্যোগ— এই সমস্ত কিছুই পরবর্তকালে ভারতীয় সংবিধানের ভিত তৈরি করেছিল। আজকের দিনে এইসবই ধবংস করার চেষ্টা চলছে।
যদিও স্বাধীনতা সংগ্র‌ামের বিভিন্ন পর্যায়ে মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য ছিল। তবু তাঁর নীতিকে স্বীকৃতি ও সম্মান জানাতেই হবে।
২০১৯-এর নির্বাচনের পর
২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল রাজনৈতিক অধিকারের জায়গাটিকে সংকুচিত করে দিয়েছে। এক নিরঙ্কুশ জয় এবং সেভাবে সেই জয় এসেছে তাতে এটা পরিষ্কার যে আমাদের ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দেশ ও দেশের মানুষ এক বিপজ্জনক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে পড়েছে
কর্পোরেটের সঙ্গে সাম্প্রদায়িক শক্তির আঁতাত আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছে। ‘দেশ’ ও দেশের মানুষের স্বার্থকে সরিয়ে রেখে উগ্র‌ জাতীয়বাদের বিপুল প্র‌চার চলছে। দেশের দোহাই দিয়ে সাধারণ মানুষের অধিকারকে চুলোয় পাঠিয়ে তাদের কাছ থেকে দেশের জন্য ত্যাগ দাবি করা হচ্ছে। বর্তমান সরকারের নেতারা প্র‌ায়ই বলে চলেছেন, ‘‘কথা বলার অধিকার কখনই দেশের চেয়ে বড় নয়।’’ সম্প্রতি যখন লোকসভায় জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ) আইন সংশোধনের প্র‌স্তাব উঠেছিল তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গর্জে উঠে বললেন, ‘‘ যাঁরা এই সংশোধনের বিরুদ্ধে তাঁরা সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গীদের সমর্থন করছেন।’’ যে সংশোধনের কথা বলা হচ্ছে তাতে দেশের সমস্ত নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর প্র‌বল আঘাত নেমে আসবে। বিজেপি সরকারের যে কোনও নীতির সঙ্গে কেউ ভিন্নমত পোষণ করলেই দেশবেরোধী তকমা দিয়ে তাকে গ্রে‌ফতার করা যাবে, জেলে পাঠানো যাবে। ‘পুলিশ স্টেট’ বলতে যা বোঝায়, এ তো তাকেই আইনি বৈধতা দেওয়ার মতলব।
গান্ধীজি যে ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, সাংবিধানিক অধিকারের পক্ষে ছিলেন তার অস্তিত্বই এখন বিপন্ন হয়ে পড়েছে। মনে রাখতে হবে, ‘ভারত চেতনা’-র মধ্যেই কিন্তু আধুনিক ভারতের অস্তিত্ব নির্ভর করে।
মহাত্মা গান্ধী তাঁর কোনও লেখাতেই এই ‘ভারত চেতনা’-র কথা উল্লেখ করেননি। কিন্তু যে সমস্ত আদর্শের কথা তিনি বলেছিলেন, প্র‌কৃতপক্ষে সেইসব আদর্শই ওই ধারণার ভিত্তি। নিজে ধার্মিক হওয়া সত্ত্বেও ধর্মকে তিনি যে কোনও মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় বলেই মনে করতেন এবং রাজনৈতিক সংস্র‌ব অথবা রাষ্ট্রনীতি থেকে তাকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য গভীরভাবে সচেষ্ট ছিলেন। গান্ধীজির খাদি ও চরকা-কে অনেকেই ‘আধুনিকতার বিরোধী’ বলে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। কিন্তু এহ বাহ্য। এখানে দেখার বিষয় হল, এই নয়া-উদারনীতির যুগে আমাদের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা যাবে কীভাবে। মোদী সরকার যে আগ্র‌াসী ভাব দেখিয়ে তা হাসিল করতে চাইছে সেদিকেও খেয়াল রাখা দরকার। ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে যে লড়াই মহাত্মা গান্ধী করেছিলেন তা বর্তমান পরিস্থিতেও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের লড়াই চলছে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ এবং হিন্দু-জাতীয়তাবাদের মধ্যে। তাই গান্ধীজির সার্ধশতবর্ষে তাঁর আদর্শ ও সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করাই আমাদের সংকল্প হওয়া উচিত।
ভারত চেতনা
সামন্ততন্ত্র যেভাবে দীর্ঘসময় ধরে পুঁজিবাদে পরিণত হয়েছে তার ভেতর থেকেই উদ্ভব হয়েছে জাতি-রাষ্ট্রের। সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি ইউরোপে যে ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তি হয়েছিল তাতে শেষপর্যন্ত সামন্ততন্ত্রের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরি হয়। ‘রাজা’ এবং ‘প্র‌জা— এই দুটি ধারণার বদলে জায়গা করে নেয় ‘রাষ্ট্র’ এবং ‘নাগরিক।’ এর ফলে ‘জাতীয়তাবাদ’-এর যে ধারণা উঠে আসে তা আসলে সংখ্যাগুরুর আধিপত্যবাদের কথাই বলে। এই ধারণা হল, ‘দেশের ভেতরেই’ কোনও ‘বাইরের শত্রু’-কে দাগিয়ে দেওয়া যাদের কিনা বহিরাগত বলা যায়। এখান থেকে উদ্ভব হয় ‘সংখ্যালঘু’-র ধারণা এবং জাতীয়তাবাদকে ‘সংখ্যাগুরুর আধিপত্যবাদ’-এর সঙ্গে মিলিয়ে মাপা হয়।
আরএসএস-বিজেপি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক আধুনিক ভারতের বদলে যে ফ্যাসিস্ত ‘হিন্দু রাষ্ট্র’-র ভাবনাকে প্র‌য়োগ করতে চাইছে তাতে মনে হচ্ছে এরা সেই ওয়েস্টফেলিয়ার ধারণাকেই ফিরিয়ে আনতে চায়। যেখানে হিন্দু জাতীয়তাবাদ প্র‌সারে হিন্দুরা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের (প্র‌ধানত মুসলিম, যারা দেশের ভেতরের শত্রু  হিসেবে চিহ্নিত) ওপর আধিপত্য কায়েম করবে।
অথচ এর বিপরীতে ব্রিটিশ সাম্র‌াজ্যবাদের বিরুদ্ধে ভারতের মহান স্বাধীনতা সংগ্র‌ামকে যদি দেখি তা হলে বলতে হয় সেখান থেকেই উঠে এসেছে ‘ভারত চেতনা’-র ধারণা। প্র‌শ্ন হতে পারে, এই ‘ভারত চেতনা’ ঠিক কী? তার বহুমাত্রিক আলোচনায় না গিয়ে এককথায় বলা যায় এই ধারণা হল বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য, বিবিধের মাঝে মিলন মহান
এই ‘ভারত চেতনা’-র ভেতরেই রয়েছে ভারতীয় জাতীয় ঐক্যের ধারণা যা কিনা হিন্দু জাতীয়তাবাদের সম্পূর্ণ বিপরীত। সংক্ষেপে বলতে গেলে এই হচ্ছে সেই ধারণা যা গান্ধীজির নীতি ছিল এবং সারাজীবন তিনি এই আদর্শের পক্ষেই ছিলেন।
দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাত
মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে দেশের মানুষ স্বাধীনতার জন্য যে লড়াই করেছিল সেখান থেকেই ‘ভারত চেতনা’-র উদ্ভব। স্বাধীন ভারত কেমন হবে তা নিয়ে তিনটি দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে অবিরাম সংঘর্ষ ঘনীভূত হয়ে ওঠে ১৯২০ সালে। কংগ্রে‌সের লক্ষ্য ছিল স্বাধীন ভারত হবে একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র। বামপন্থীরা তার সমর্থক ছিল। উপরন্তু তারা ভেবেছিল, একমাত্র সমাজতন্ত্রের মাধ্যমেই প্র‌তিটি মানুষের জন্য আর্থ-সামাজিক স্বাধীনতা পাওয়া যেতে পারে যা দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা বলে গণ্য হবে।
এই দুটি মতবাদের বিরুদ্ধে যে মতবাদ ছিল তা হল, ধর্মের ওপর ভিত্তি করেই স্বাধীন ভারতের চরিত্র গড়ে ওঠা উচিত। এই দৃষ্টিভঙ্গির দুটো দিক ছিল। একদিকে মুসলিম লিগ ছিল ‘ইসলামিক রাষ্ট্র’-র সমর্থক এবং অন্যদিকে আরএসএস ছিল ‘হিন্দু রাষ্ট্র’-র প্র‌বক্তা। পরে দুর্ভাগ্যক্রমে ব্রিটিশ শাসকদের প্র‌রোচনায় ও মদতে দেশ ভাগ হয়ে গেল। সেই দুষ্ট ক্ষত আজও শুকোয়নি। তবে স্বাধীনতা যখন এল তখন অবশ্য আরএসএস তাদের অভীষ্ট লাভে ব্যর্থই হয়। তাই আজকের ভারতকে যাতে উন্মত্ত ও অসহনীয় ফ্যাসিস্ত ‘হিন্দু রাষ্ট্র’-এ পরিণত করা যায় সেই চেষ্টা তারা এখনও চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্র‌াম আরএসএসের লক্ষ্য ও পরিকল্পনা বানচাল করে দেওয়ায় তারা যে কতখানি হতাশ হয়েছিল তার প্র‌মাণ হল ‘হিন্দু ধর্মোন্মাদ’ একজনের হাতে মহাত্মা গান্ধীর হনন।
এটা একেবারেই স্পষ্ট যে, সেই সময়ে তিনটি দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ শুরু হয়েছিল তার জের বর্তমান ভারতে এখনও চলেছে। বলা বাহুল্য যে এই সংঘর্ষের সমাপ্তিই ‘ভারত চেতনা’-র দিক নির্দেশ করবে।
‘ভারত চেতনা’-র এই যে বিবর্তন, সেখানে এ দেশের বামপন্থীদের এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সে কারণেই স্বাধীনতা সংগ্র‌ামের প্র‌তি বামপন্থীদের দৃষ্টিভঙ্গির দায়বদ্ধতা ছিল। আর বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘ভারত চেতনা’ নিয়ে বামপন্থীদের অবস্থান খুব ঋজু ও স্পষ্ট।
আরএসএসের ফ্যাসিস্ত কর্মসূচি
ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক চরিত্রটিকে বদলে ফেলে তাকে একটি চূড়ান্ত অসহনীয় ফ্যাসিস্ত ‘হিন্দু রাষ্ট্র’-এ পরিণত করাই হচ্ছে আরএসএসের ফ্যাসিস্ত কর্মসূচি।
আরএসএস যে জাতীয়তাবাদের কথা বলে তার জন্য তারা একটি তত্ত্ব খাড়া করতে চায় যা ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ স্থাপনের উদ্দেশ্যেই তৈরি। হিন্দুত্বকে যদি ধর্ম বলে মনে করা হয় তা হলে তার সঙ্গে এই তত্ত্বের যোজন দূরত্ব রয়েছে। আসলে তাকে বলা যায় ‘হিন্দুত্ব রাষ্ট্র।’ একদা যিনি আরএসএসের প্র‌ধান ছিলেন তাঁর দাবি ছিল, ‘‘কোনও বিদেশি হানাদার এই ভূখণ্ডে আসার আগে আট কিংবা দশ হাজার বছর ধরে হিন্দুরাই ছিল এই ভূখণ্ডের একমাত্র অধিকারী। তখন থেকেই এর নাম ছিল হিন্দুস্তান, হিন্দুদের বাসভূমি।’’ (উই অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইনড এম. এস. গোলওয়ালকর, ১৯৩৯, পৃষ্ঠা ৬)। সিন্ধু নদের ওপারের অঞ্চল বোঝাতে আরবরা হিন্দুস্তান শব্দটি ব্যবহার করত। তাদের উচ্চারণে ‘স’ ছিল ‘হ’। কিন্তু এসব ঐতিহাসিক তথ্য নিয়ে আরএসএসের কিছুমাত্র মাথাব্যথা নেই। ফলে একটি অবৈজ্ঞানিক ও অনৈতিহাসিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে হিন্দু আধিপত্যবাদীরা এ কথাই প্র‌তিষ্ঠিত করতে চেয়েছে যে হিন্দু রাষ্ট্র ছিল এবং থাকবে। এখান থেকেই ওই হিন্দুত্ব রাষ্ট্র গঠনের জেদ।
‘‘প্র‌শ্নাতীতভাবেই আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারি যে… হিন্দুস্তান আছে ও প্র‌াচীন হিন্দু রাষ্ট্র ছিল এবং হিন্দু রাষ্ট্র ছাড়া আর কিছুই ছিল না। যারা তার স্বজাতি নয়, অর্থাৎ যারা হিন্দু জনগোষ্ঠী, ধর্ম, সংস্কৃতি ও ভাষার কেউ নয় তারা স্বাভাবিকভাবেই ‘জাতীয়’ জীবনের বাইরেই থাকবে।
‘‘অতএব বর্তমানের অচেতন অবস্থা থেকে হিন্দু রাষ্ট্রের পুনর্গঠন, পুনরুজ্জীবন, পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে যে আন্দোলন তাই হল প্র‌কৃত জাতীয়তা। তারাই একমাত্র জাতীয়তাবাদী দেশপ্রে‌মিক যাদের হৃদয়ে হিন্দু জাতি ও রাষ্ট্রের জন্য গর্ব রয়েছে এবং যারা সেই লক্ষ্য পূরণে ঝাঁপিয়ে পড়বে। বাকি সকলে হয় জাতীয় উদ্দেশ্যপূরণের ক্ষেত্রে বিশ্বাসঘাতক বা শত্রু, নয়তো খানিকটা করুণা করে বলা যায়, নিবোর্ধ।’’ (গোলওয়ালকর, ১৯৩৯, পৃষ্ঠা ৪৩-৪৪)
স্বাধীনতা সংগ্র‌ামের ফলে যে ‘ভারত চেতনা’ জাগ্র‌ত হয়েছিল, এই ধরনের বক্তব্য তার সম্পূর্ণ বিপরীত। জওহরলাল নেহেরু তাঁর ‘ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া’ লেখাটিতে বলছেন, ‘‘ভারত হল এক প্র‌াচীন ভূর্জপত্র যেখানে বারবার নানা স্তরে নানারকম ভাবনাচিন্তা লিখিত হয়েছে এবং সেখানে পরের কোনও স্তরই আগের কোনও স্তরকে চাপা দেয়নি বা মুছে দেয়নি।’’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও বলেছেন, ‘‘হেথায় আর্য, হেথা অনার্য, হেথায় দ্রাবিড় চীন— শক-হুন-দল পাঠান মোগল এক দেহে হল লীন।’’এই দেহই হল আমাদের ভারত।
জাতীয়তাবাদ হিসেবে যে ‘ভারত চেতনা’-র সপক্ষে গান্ধীজি ছিলেন সেই আদর্শকে সম্পূর্ণ উল্টো দিকে নিয়ে যেতে চায় আরএসএস। এখন যার বিপুল প্র‌চার চলছে তা হল সুনির্দিষ্টভাবে হিন্দুত্ব জাতীয়তাবাদ যা কিনা ফ্যাসিস্ত ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ গঠনের পাথেয়।
এ দেশে যাতে এই আগ্র‌াসী পরিকল্পনা সফল হয় সেজন্য নানা বিপজ্জনক পদ্ধতি প্র‌য়োগ করা হচ্ছে। তার মধ্যে একটা হল, আরএসএস-বিজেপি হিন্দু পুরাণ, দর্শন ও হিন্দু ধর্মতত্ত্ব এনে ইতিহাস বদলে ফেলতে চাইছে। যে ইতিহাস আমাদের ছাত্র-যুবাদের পড়ানো হয় সেই পাঠ্যসূচি খুব নিপুণ পরিকল্পনায় পাল্টে দেওয়ার চেষ্টা করছে এই বিজেপি সরকার। এজন্য উচ্চশিক্ষা প্র‌তিষ্ঠান, গবেষণাকেন্দ্র এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্র‌তিষ্ঠানের উঁচু পদে যাঁরা রয়েছেন তাঁদের জায়গায় হিন্দুত্ব ভাবধারার লোকজনদের বসানোর চেষ্টা চলছে।
স্বাধীনতা সংগ্র‌ামী নেতাদের উদ্দেশ্যেমূলক ব্যবহার করতে চাইছে আরএসএস
স্বাধীনতা সংগ্র‌ামে যাঁরা নেতৃত্বস্থানীয় ছিলেন তাঁদের এখন নিজেদের মতো করে ব্যবহার করতে চাইছে আরএসএস-বিজেপি। বিশেষ করে সর্দার প্যাটেলকে। ১৯৪৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি আরএসএসকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন সর্দার প্যাটেল। তিনি তখন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেছিলেন, ‘‘সঙ্ঘ নির্দ্বিধায় তাদের আপত্তিকর ও ক্ষতিকর কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে এবং তারা হিংসায় প্র‌রোচনা দেওয়ার ফলে বহুজনের প্র‌াণ গিয়েছে। শেষপর্যন্ত সবচেয়ে মূল্যবান যে প্র‌াণ গিয়েছে তা স্বয়ং গান্ধীজির।’’
এর পরেও ১৯৪৮ সালের ১৪ জানুয়ারি প্যাটেলের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক একটি প্রে‌স বিবৃতি জারি করে। আরএসএসের তৎকালীন প্র‌ধান গোলওয়ালকরের সঙ্গে যে বৈঠক হয়েছিল তার পরিপ্রে‌ক্ষিতেই এই বিবৃতি। গোলওয়ালকর চাতুরি করে বেশ কিছু সমঝোতা করেছিলেন। বিবৃতি থেকে জানা যায়, ‘‘আরএসএস নেতাদের যা কার্যকলাপ তা মোটেই তাঁদের অনুগামীদের কাজকর্মের সঙ্গে মেলে না।’’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক নিষেধাজ্ঞা প্র‌ত্যাহারে রাজি হয়নি। গোলওয়ালকর আবার আলোচনায় বসতে চেয়েছিলেন। সর্দার প্যাটেল তা নাকচ করেন এবং গোলওয়ালকরকে নাগপুরে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। ১৯৪৯ সালের ১১ জুলাই আরএসএস যখন সরকারের সমস্ত শর্ত বাধ্যত মেনে নেয় তখনই একমাত্র তাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। সেই সমস্ত শর্তের অন্যতম একটি ছিল, আরএসএস একটি ‘অরাজনৈতিক সংগঠন’ হিসেবে থাকবে এবং কোনও ‘গোপনীয়তা রাখবে না ও হিংসায় প্র‌রোচনা দেবে না’।
স্বাধীনতা সংগ্র‌ামে আরএসএসের ভূমিকা
স্বাধীনতা সংগ্র‌াম থেকে শতহস্ত দূরে থেকেও কমিউনিস্টদের নিন্দা করতে ছাড়েনি আরএসএস। ভারত ছাড়ো আন্দোলনে কমিউনিস্টদের ‘ভূমিকা’ সম্পর্কে এটুকু বললেই যথেষ্ট হবে যে, ভারত ছাড়ো অন্দোলনের পঞ্চাশতম বর্ষপূর্তির সময়ে ১৯৯২ সালের ৯ আগস্ট তৎকালীন রাষ্টর‌পতি শঙ্করদয়াল শর্মা সংসদের মধ্যরাত্রির অধিবেশনে বলেছিলেন, ‘‘কানপুর, জামশেদপুর এবং আমেদাবাদের কারখানায় যখন ব্যাপক ধর্মঘট হয়েছিল তখন, ১৯৪২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির বিষয়ে দিল্লি থেকে লন্ডনে একটি বার্তা পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়েছিল, পার্টির সদস্যদের কার্যকলাপে এটা স্পষ্ট যে সেখানে ব্রিটিশ-বিরোধী বিপ্লবীরা রয়েছেন।’
এরপর এই বিষয়ে আর কিছু বলার প্র‌য়োজন আছে কি? স্বাধীন ভারতের এক রাষ্ট্রপতি ভারতীয় সংসদের অধিবেশনে দাঁড়িয়ে স্বীকার করে নিচ্ছেন যে কমিউনিস্টরা ‘ব্রিটিশ-বিরোধী বিপ্লবী’ ছিলেন
এবার আরএসএসের ভূমিকা দেখা যাক। ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময়ে বোম্বের স্বরাষ্ট্র দপ্তর বলছে, ‘‘১৯৪২ সালের আগস্টে যে বিক্ষোভ তৈরি হয় সেখান থেকে নিজেদের দ্বিধাগ্র‌স্তের মতো বাঁচিয়ে সঙ্ঘ আইনশৃঙ্খলার আড়ালে ছিল এবং বিশেষ করে সেই বিক্ষোভে তারা কোনওভাবেই যোগ দেয়নি।’’ (অ্যান্ডারসন ডবলু. অ্যান্ড ড্যামেল, শ্রীধর ডি., দ্য ব্রাদারহুড ইন স্যাফর‌ন : দ্য রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ অ্যান্ড হিন্দু রিভাইভ্যালিজম, বিস্তার পাবলিকেশনস, নিউ দিল্লি ১৯৮৭)। এমনকি আরএসএসের এক পূর্বতন নেতা নানাজি দেশমুখও একবার প্র‌শ্ন তুলেছিলেন যে, ‘‘স্বাধীনতা সংগ্র‌ামে আরএসএস অংশগ্র‌হণ করেনি কেন?’’ (দেশমুখ, নানা, আর.এস.এস.: ভিকটিম অব স্ল্যান্ডার, ভিশন বুকস, নিউ দিল্লি ১৯৭৯)।
প্র‌কৃত সত্য হল, জাতীয় আন্দোলনের সমগ্র‌ পর্যায়ে প্র‌ায় সময়েই আরএসএস ব্রিটিশদের সহযোগী দেশীয় রাজাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছে এবং স্বাধীনতা সংগ্র‌ামের বিরোধিতা করেছে। তাদের বন্ধুদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন জম্মু-কাশ্মীরের রাজা হরি সিং যিনি প্র‌থমদিকে স্বাধীন ভারতে যোগ দিতে চাননি
অসঙ্গতি
গোড়ায় যে প্র‌শ্ন তোলা হয়েছিল এবার সেই প্র‌সঙ্গে ফিরে আসা যাক।
ইএসএস নাম্বুদিরিপাদ সেই অসঙ্গতির কথাই বলেছেন যা আমরা প্র‌থমে বলেছি। তাঁর কথায়, ‘‘এটা হয়তো স্ববিরোধিতা বলে মনে হবে যদি কেউ বলেন যে, গান্ধীজি তাঁর ‘প্র‌তিক্রিয়াশীল’ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এক ব্যাপক বৈপ্লবিক ঘটনা ঘটাতে চেয়েছিলেন— যেখানে গ্র‌ামীণ দরিদ্র জনসাধারণকে আধুনিক জাতীয়-গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সামিল করা যাবে। এই স্ববিরোধিতা আসলে আমাদের জাতির বাস্তব রাজনৈতিক সত্তার পরিচয়। এর ফলে এটাই প্র‌মাণিত হয় যে, সামন্ততন্ত্রের সঙ্গে যাদের যোগ ছিল সেই বুর্জোয়ারাই জাতীয়-গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।’
পুঁজিপতি এবং জমিদারদাররা যে গান্ধীজিকে তাঁদের নেতা হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন তার কারণ হল তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জনসাধারণকে সঙ্ঘবদ্ধ করা একমাত্র তাঁর পক্ষেই সম্ভব। একইসঙ্গে অহিংসাসত্যাগ্র‌হ দিয়ে সাধারণের হঠকারিতাকে সংহত রাখতে পারেন গান্ধীজিই।
গান্ধীজির এই ক্ষমতা বারবার প্র‌মাণিত হয়েছে। আমেদাবাদে এক ধর্মঘটের সময়ে কাপড়ের মিলের শ্রমিকরা যখন মিল মালিকদের বাড়িতে হামলা করতে যায় তখন তা থামাতে গান্ধীজি অনশনে বসেন। চৌরিচৌরায় যখন থানা আক্রমণ করা হয়েছিল তখন সেই ঘটনাকে ‘বিরাট ভুল’ আখ্যা দিয়ে গান্ধীজি তাঁর আইন অমান্য আন্দোলন প্র‌ত্যাহার করে নেন। কংগ্রে‌সের অনেক বড় নেতা এবং নেহেরুও জেল থেকে চিঠি লিখে গান্ধীজির এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন।
আইন অমান্য আন্দোলনের ডাকে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে আলোড়ন তৈরি হয়েছিল তা আগে কখনও হয়নি। এই আহ্বান প্র‌ত্যাহার করার ফলে কংগ্রে‌সের নেতৃত্বে যে আন্দোলন চলছিল তাতে কংগ্রে‌সের ভেতরেই নানা ভাঙন দেখা দেয়। হতাশা ও বিশ্বাসভঙ্গের ধারণা থেকেই তা ঘটেছিল।
ভগৎ সিং ও তাঁর সহযোগীরা ঘোষিত ভাবে বামপন্থা ও সমাজতন্ত্রের দিকে ছিলেন। ভগৎ সিংকে যে প্র‌াণদণ্ড দেওয়া হয়েছিল তার কোনও প্র‌তিবাদ গান্ধীজি করেননি। ভগৎ সিং অবশ্য বহু প্র‌জন্মের তরুণদের আদর্শে পরিণত হয়েছিলেন। পি. সুন্দরাইয়া, এএমএস নাম্বুদিরিপাদ, পি. রামমূর্তি, হরকিষেণ সিং সুরজিতের মতো আরও বহু কমিউনিস্ট নেতা সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের পক্ষে ছিলেন এবং পরবর্তীকালে তাঁরা দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিশিষ্ট নেতা হিসেবে স্থান করে নিয়েছিলেন।
গান্ধীজি তাঁর একডাকে সাধারণ মানুষকে জড়ো করে আন্দোলনে নামাতে পারতেন এবং একইসঙ্গে তাদের উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন। সেই উত্তেজনা যা তাদের শোষণকারীদের বিরুদ্ধেও যেতে পারত। এখান থেকেই বোঝা যায় যে,¬ স্বাধীন ভারতে শাসনক্ষমতা কাদের হাতে থাকবে তা তখন থেকেই চিহ্নিত হয়ে গিয়েছিল। যদিও স্বাধীন ভারতে তাদের সেই শ্রেণিশাসন কায়েম হওয়ার পরে গান্ধীজির মতাদর্শকে তারা প্র‌তিবন্ধকতা বলেই মনে করেছিল। জনগণের উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে তাদের আর গান্ধীজিকে দরকার ছিল না। তখন তাদের হাতে পুলিশ ও সেনাবাহিনী এসে গিয়েছে।
ইএমএস নাম্বুদিরিপাদ দেখিয়েছেন, শেষ দিকে গান্ধীজির ট্র্যাজেডি হল— গান্ধীজি তাঁর নীতিতে অবিচল থাকলেও নয়া শাসকরা হিন্দু-মুসলমান ঐক্য, ক্ষমতার লোভে দুর্নীতির কারণে কংগ্রে‌স ভেঙে দেওয়া নিয়ে গান্ধীজির প্র‌স্তাব প্র‌ভৃতি মতামত বাতিল করে দিল।
এটা খুবই দুর্ভাগ্য যে দেশের নবীন প্র‌জন্ম একটি ঘটনার তাৎপর্য লক্ষ করল না। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট যখন জওহরলাল নেহেরু এবং স্বাধীন ভারতের অন্য নেতারা লালকেল্লায় ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা উত্তোলন করছেন তখন গান্ধীজি সেখানে অনুপস্থিত। কোথায় ছিলেন তিনি? কলকাতায় যখন ভয়ংকর দাঙ্গা লেগেছিল তখন সেখানে তিনি আমরণ অনশনে বসেছিলেন।
এই ‘বিশ্লেষণ’-এর উদ্দেশ্য
এই লেখার প্র‌থম দিকে গান্ধীজির যে চারটি আদর্শের কথা বলা হয়েছে তা আমাদের সংবিধানের ভিত্তিস্তম্ভ। কিন্তু সেগুলোর ওপরেই চূড়ান্ত আক্রমণ হয়েছে। ভারতীয় জাতীয়তাবাদ যেভাবে হিন্দুত্ব জাতীয়তাবাদের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে তাকে পরাজিত করতে গান্ধীজি ও তাঁর মতাদর্শকে মনে রাখা খুবই জরুরি।
গান্ধীজির সার্ধশতবর্ষে ফ্যাসিস্ত আরএসএস-বিজেপির হাত থেকে আমাদের ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্রকে  বাঁচানোই আমাদের সংকল্প হওয়া উচিত।

লেখক সিপিআই (এম) সাধারণ সম্পাদক

‘দ্য ওয়াল’–এ প্রকাশিত এই পর্বের সব লেখা পড়ার জন্য ক্লিক করুন নীচের লাইনে

সার্ধশত বছরে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী

Comments are closed.