মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৭

৩৪ বছরে কিন্তু কোনও মনীষী’র মূর্তিতে হাত দেওয়ার হিম্মত হয়নি কারওর

সুশোভন

আমার বন্ধু মাস্টারমশাই। আমার বন্ধু সমাজ গড়ে। রোজ সকালে দিঘিঘেরা গ্রামের স্কুলে বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলোকে বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণ পরিচয়’ থেকে অ, আ, ই, ঈ শেখায়। ফি-বছরে ২৬শে সেপ্টেম্বর বিদ্যাসাগরের জন্মদিনে প্রভাতফেরি করে। ছবিতে মালা দিয়ে লম্বা চওড়া ভাষণ সাজায়। বিধবা বিবাহ ও স্ত্রীশিক্ষার প্রচলনে বিদ্যাসাগরের অক্লান্ত সংগ্রাম কে স্যালুট জানায়। সন্ধেবেলা বন্ধু আমার  প্রগতিশীল। গড়গড় করে সাক্ষরতা প্রসারে মেদিনীপুরের বীরসিংহ গ্রামে বিদ্যাসাগর মেলা প্রচলনের ইতিহাস বলে। বহুবিবাহ ও বাল্য বিবাহের মতো সামাজিক অভিশাপ দূরীকরণ নিয়ে চায়ের কাপে ঝড় তোলে। নবজাগরণের পথিকৃৎ সর্বজনশ্রদ্ধেয় বিদ্যাসাগরের নামে সামাজিক কর্মসূচির পরিকল্পনা করে। আজ অবশ্য বিদ্যাসাগরের প্রতিষ্ঠিত টাউন কলেজেই বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙ্গা নিয়ে আমার বন্ধু স্পিকটি নট। মাস্টারমশাই আজ কিচ্ছু দেখেননি। মাস্টারমশাই আজ কিচ্ছু শোনেননি। মাস্টারমশাই আজ কিচ্ছু বলেননি। সিম্পল। কদিন আগেই যে প্রখর রৌদ্রে মোদীর উপচে পড়া জনসভার ভিড়ে আবেগে ভেসেছেন মাস্টারমশাই। কদিন আগেই যে হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি তে ডিমানিটাইজেশনের উপকারিতা নিয়ে ক্লাস নিয়েছেন মাস্টারমশাই। কদিন আগেই যে গেরুয়া পতাকা হাতে মাথায় ফেট্টি বেঁধে লেজ ছাড়াই মিছিলে হনুমান সেজেছেন মাস্টারমশাই।

আমার বন্ধু ইঞ্জিনিয়ার। আমার বন্ধু এনআরআই। রোজ সকালে ইস্ত্রি করা শার্ট প্যান্টের উপর টাই চাপিয়ে টেক্সাসের কেতাদুরস্ত ক্যাম্পাসের বায়োমেট্রিকে আঙুল ছুঁইয়ে কিউবিক্যালে বসে। জাভা-পাইথন গাঁতিয়ে গ্লোবাল ক্লায়েন্ট’দের প্রোজেক্ট ম্যানেজ করে। করিডোরে কফি মগ হাতে টেকনোলজি নিয়ে কলিগ বন্ধুদের সাথে কোয়ালিটি ডিসকাশন করে। সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে বোলপুরে বাপ-মায়ের সাথে ভিডিও কলে হাই-হ্যালো। বন্ধুর ৩ বছরের ছেলে তখন আলেক্সার কাছে নার্সারি রাইম শোনে। রাতে বন্ধু আমার সুইগির কন্টিনেন্টাল ডিস আর রেড ওয়াইনে রুফ টপে স্ত্রীর সঙ্গে রোমান্টিক ক্যান্ডেল লাইট ডিনারে সারে। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী যখন মেঘের কোলে রেডারের ফান্ডা শোনান; প্রধানমন্ত্রী যখন ১৯৮৮ সালেই ডিজিটাল ক্যামেরা আর ইমেল ব্যবহারের ঢপবাজি করেন, ইঞ্জিনিয়ার বাবু তখন বৌ কে জড়িয়ে ধরে শারুখ খান স্টাইলে বলেন, ‘বড়ে বড়ে দেশো মে অ্যাইসি ছোটি ছোটি বাঁতে হতি রহতি হ্যা স্যানোরিটা। কদিন আগেই যে মহাভারতের যুগে পেন ড্রাইভ খুঁজে পেয়েছেন ইঞ্জিনিয়ার বাবু। কদিন আগেই যে ফেসবুকে পতঞ্জলির প্রোডাক্টের পুষ্টি গুণ নিয়ে পোষ্ট শেয়ার করেছেন ইঞ্জিনিয়ার বাবু। কদিন আগেই যে মহরমে অস্ত্র মিছিল হলে রামনবমী হবে না কেন, প্রশ্ন তুলেছেন ইঞ্জিনিয়ার বাবু।

আমার বন্ধু ডাক্তার। আমার বন্ধু জীবন বাঁচায়। রোজ সকালে চেম্বারে বসে স্টেথোস্কোপ লাগিয়ে রুগী দেখে। পার্কার পেন দিয়ে স্যাটাস্যাট আঁচড় কেটে প্রেসক্রিপশন লেখে। তাবড় মেডিকেল রিসার্চ জার্নালে মুখ গুঁজে বসে থাকে। উন্নত দেশের মতো স্বাস্থ্য পরিষেবা দেশের প্রতিটি কোণে পৌঁছে দেওয়ার রঙিন স্বপ্ন দেখে। ইনফ্যান্ট মর্টালিটি, ম্যাটার্নাল মর্টালিটির সূক্ষ্ম আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে গবেষণা করে। চিকিৎসা সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য ও সস্তা করার কথা বলে। অবশ্য গোরখপুরে যখন ৬৩টা নিষ্পাপ শিশু স্রেফ হাসপাতালের গাফিলতিতে অক্সিজেনের অভাবে মারা গেলো, যখন ভোপালের বিজেপি প্রার্থী সাধ্বী প্রজ্ঞা অন ক্যামেরা গোমূত্রে ক্যান্সার সারে বলে বাইট দিল; ডাক্তার বাবুর তখন সাত চড়েও রা কাটেন না। কদিন আগেই যে জয় শ্রী রামের শপথ নিয়েছেন ডাক্তারবাবু। কদিন আগেই যে ‘বাঞ্চ অফ থটস’  কপচে মুসলিম মুক্ত ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন ডাক্তারবাবু। কদিন আগেই যে ‘হিন্দুত্ব’র নমক আর লজ্জার মাথা দুটো খেয়েই নিজের মানবিক আর পেশাগত সত্তার সঙ্গে আপোষ করেছেন ডাক্তারবাবু।

আমার বন্ধু তৃণমূল। আমার বন্ধু সিভিক পুলিশ পোষে। রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জিন্দাবাদ’ বলে জলগ্রহণ করে। চোখে ঝিনচ্যাক সানগ্লাস চাপিয়ে, তোলাবাজির পয়সায় কেনা রয়েল এনফিল্ডে পাড়া পরিক্রমা করে। সারাদিন নারদা-সারদার ঘুষখোর প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচার সারে। সন্ধেবেলা পার্টি অফিসে মদ-মাংস সহযোগে বুথ দখলের ব্লু-প্রিন্ট লেখে। আজ আমার বন্ধু ভীষণ খেপেছে। বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙাতে ভীষণ কষ্ট পেয়েছে। ‘বাংলার সম্মান’, ‘বাঙালির সংস্কৃতি’ নিয়ে পথ সভায় হুলিয়ে বক্তৃতা করেছে। ‘বিজেপি সাম্প্রদায়িক’, ‘আরএসএস বর্বর’ বলে পাড়া মাথায় তুলেছে। আসলে তৃণমূল বন্ধু আমার আজ গজনী সিনেমার আমির খান সেজেছে। শর্ট টার্ম মেমরি লস হয়েছে। তাই সে মনে করতে পারে না, এই তৃণমূলই একদিন বড়শিমুলিয়া–তে ক্ষুদিরামের মূর্তি ভেঙেছিল একই ভাবে, এই তৃণমূলই একদিন প্রেসিডেন্সি কলেজে ভাঙচুর করেছিল একই ভাবে, এই তৃণমূলই একদিন যাদবপুরে লেনিন মূর্তি ভাঙচুর করেছিল একই ভাবে। আমার বন্ধু আজ মনে করতে পারে না, ২০০৬-এ এই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে অশ্রাব্য গালিগালাজ দিয়ে বিধানসভা ভাঙচুর করেছিল একই ভাবে।

৩৪ বছর আপনি দেখেছেন। জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কে এই বাংলার মুখ্যমন্ত্রী আপনি দেখেছেন। দিদিমণির হাতি পোষা কমিশন মূষিক প্রসবে কিছু প্রমাণ করতে না পারলেও, বাধ্য মিডিয়ার গল্প শুনে সাঁইবাড়ি, নন্দীগ্রাম, মরিচঝাঁপির পাখি পড়া বুলি পাড়ার মোড়ে সুযোগ বুঝে আপনিও বার দুয়েক আওড়েছেন। ২০১১-র ১৩ মে আনন্দবাজারের ‘বাম বিদায়ের’ সিক্সটি পয়েন্টের হেডলাইনে আপনিও হয়ত ‘বদলা নয় বদল চাই’–র শ্লোগানের অর্গাজম উপভোগ করেছেন। কিন্তু ভেবে দেখেছেন কি, ৩৪ বছরে বিদ্যাসাগর-ক্ষুদিরামের মূর্তি তো দূর, একটা ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধীর মূর্তিতেও কেউ টাচ করতে হিম্মত করেনি। ‘হার্মাদ’–দের হাতে বিধানচন্দ্র রায়ের মূর্তি ভাঙার হেডলাইনে আপনার সকালের ঘুম ভাঙেনি। রাজনৈতিক মত পার্থক্য সত্ত্বেও বাংলায় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাস্তার নাম পরিবর্তন হয়নি। প্রফুল্ল সেনের নামের ফলক সরিয়ে জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর নাম লিখে ক্রেডিট নিতে হয়নি। রাজনীতির জন্য আপনার ষোল আনা বাঙালিয়ানা, আপনার সংস্কৃতিকে আপনার গর্বের মনীষীদের ভূলুণ্ঠিত হতে হয়নি। আপনার মানবিকতা, আপনার সৌজন্যবোধের সঙ্গে আপোষ করতে হয়নি। ঘুষখোর সাংসদ, তোলাবাজ কচিনেতা’দের মধ্যমণির কাছ থেকে সততার পাঠ নিতে হয়নি। ৩৪ বছর, আপনার বাংলায়, আপনার কলকাতায়, হিন্দি বলয়ের হিন্দিভাষী দাঙ্গাবাজ নেতাদের দালালি করার সুযোগ আপনার সরকার দেয়নি।

লেখক বামপন্থী ব্লগার

মতামত লেখকের সম্পূর্ণত নিজস্ব

 

 

Comments are closed.