বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ২৩
TheWall
TheWall

যশোর রোড: লুণ্ঠনের চোখে না দেখে ভালবাসার চোখে দেখলে কত ভাল হয়!

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

 বিভাস রায়চৌধুরী

উপরে গাছের আলিঙ্গনে থাকা রাস্তা (সবুজ) দেখে কি মনে পড়ে যাচ্ছে না ‘যশোর রোডের গাছ’-এর কথা? যশোর রোডের কয়েক হাজার বৃক্ষহত্যার ফতোয়ার বিরুদ্ধে ছাত্রছাত্রীদের বিক্ষোভ, এপিডিআর-এর মামলা (পরে ছাত্রছাত্রীদের পক্ষেও একটি মামলা দায়ের করা হয়), রাহুল ও তাঁর সহযোদ্ধাদের ব্যথিত চিত্তে জনমনে প্রভাব বিস্তারকারী দীর্ঘ পদযাত্রা– এসব সবাই জানেন। আজকের খবর– সুপ্রিম কোর্ট গাছ কাটায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, বিকল্প উপায়ে সরকারি প্রকল্পসাধন করতে বলেছে। ভাল খবর। সেদিনও প্রতিবাদকারীদের ‘দেশদ্রোহী’, ‘উন্নয়নবিরোধী’ বলে গাল পাড়ছিল স্বার্থান্বেষীরা। আজ অনেক খুশির দিন।

আমার দেশ কল্যাণমুখী রাষ্ট্র, তার আইন রক্ষা করে গাছ, অন্য প্রাণী, পরিবেশকে। লোভী, চেতনাহীন মানুষের সংখ্যা বেশি। তারা বোঝেই না সৃষ্টির নিয়মে উদ্ভিদ প্রথম প্রাণ, তার‌ই পথ ধরে এসেছে মানুষ। গাছের সঙ্গে আমাদের শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সম্পর্ক। একেবারে সহজ কথা– গাছ অক্সিজেন দেয়, যা আমাদের প্রাণরক্ষা করে। একজন আক্রমণকারীকে আমার প্রিয় ভাই ডাক্তার রাহুলদেব বিশ্বাস বলেছিল, ‘খারাপ ব্যবহার করার আগে নাক টিপে দম বন্ধ করে দু’মিনিট দাঁড়িয়ে থাকুন… বুঝে যাবেন গাছের মূল্য।’

ব্রাজিলের পোর্তো আলেগ্রে (Porto Alegre) শহরের ছবি।

আজকের সমাজ ভারতবর্ষকে ভোটের আর লুঠের চোখে চেনে। প্রাচীন ভারতবর্ষে মুনি-ঋষিরা অরণ্যে তপস্যা, আরাধনা করতেন। তাঁদের চিন্তায় গাছ ছিল অত্যন্ত উচ্চস্থানে। তৈত্তরীয় ব্রাহ্মণে ‘ব্রহ্ম কী’ এই আলোচনায় বলা হয়েছে, ‘ব্রহ্ম‌ই হচ্ছেন বন, ব্রহ্ম‌ই হচ্ছেন বৃক্ষ। এই বন এবং বৃক্ষ থেকেই জগৎ নির্মিত হয়েছে।’ (ব্রহ্ম বনং ব্রহ্ম স বৃক্ষ আসীদ যতো দ্যাবাপৃথিবী…) এসব দর্শনের কথা চর্চা ছাড়া সবাই বুঝতে পারে না, কিন্তু অন্য ক্ষেত্রে ভক্তি তো দেখায়। বৃক্ষভক্তি আদি মানুষদের সমাজে কিন্তু আজও প্রচলিত। আধুনিক নাগরিক চেতনার মানুষ বৃক্ষকে দেখে কাঁচা টাকা হিসেবে!

যাই হোক, সবুজ ছবিটির প্রসঙ্গে আসি। ব্রাজিলের পোর্তো আলেগ্রে (Porto Alegre) শহরের ছবি। একশোটির বেশি রোজ‌উড গাছ পোঁতা হয়েছিল ১৯৩০ সালে। উন্নয়নের অজুহাতে এইসব বৃক্ষ ওখানেও কাটতে চেয়েছিল কিছু প্রভাবশালী। প্রতিরোধ গড়ে তোলে সাধারণ মানুষ। বৃক্ষগুলি বেঁচে যায়। শহরের প্রাণ ও শীতল বাতাস দানকারী এই বৃক্ষদেবতাদের দেখতে আসে ভালমানুষের দল। ২০০৬-এ ঘোষিত হয়েছে রোজ‌উড বৃক্ষগুলি দেশের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, বাস্তুসংস্থানগত ও পরিবেশগত ঐতিহ্য। বৃক্ষ ও মানুষের সম্পর্ক জিতে গিয়েছে এভাবেই।

যশোর রোডের সেদিন

যশোর রোডের দু’পাশের শিরীষ, মেহগনিরা আরও প্রাচীন, আরও ঐতিহ্যবাহী। দেশভাগ-পরবর্তী ইতিহাসের, একাত্তরের যুদ্ধের ইতিহাসের (বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্যকারী ভারতীয় সৈন্য এই পথ দিয়েই যায়) সাক্ষী। যশোর রোডের শুরুর অংশটুকু বাংলাদেশে, সেখানেও উন্নয়নের নামে গাছ কাটার চেষ্টা চলছে, প্রতিরোধেও নেমেছেন মানুষ। কোন এক মাফিয়া-সমাজে আমরা আছি? লুণ্ঠনের চোখে না দেখে ভালবাসার চোখে দেখলে কত ভাল হয়! দুই দেশে থাকা ‘যশোর রোড’ অনায়াসেই হতে পারে উত্তর আয়ারল্যান্ড, ফ্রান্স, জাপান, জার্মানি সহ বিশ্বের নানা দেশের ‘প্রাচীন বৃক্ষঘেরা সড়ক’-এর তালিকায় সবচেয়ে আকর্ষণীয় নাম।

বিভাস রায়চৌধুরী কবি। এবং গল্পকার, ঔপন্যাসিক, নাটককার ও প্রাবন্ধিক। একটি প্রকাশনা সংস্থার কর্মী। যশোর রোডের গাছ বাঁচাতে চাওয়া ছোটদের আন্দোলনের সমর্থনে গান, নাটক নিয়ে পথে নেমেছিলেন। বৃক্ষপ্রেমে রচনা করেছেন ‘যশোর রোডের গাছ’ (ছবি এঁকেছেন শিল্পী বিপ্লব মণ্ডল) নামে একটি কাব্যগ্রন্থও।

মতামত লেখকের নিজস্ব

Share.

Comments are closed.