এ বাজেট বোধহয় আমাদের নয়

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    সুপর্ণ পাঠক

    এ বাজেট আর যাই হোক আমার বা আপনার নয়। অন্তত আপাত দৃষ্টিতে। তবে এটা ধরেই নেওয়া যেতে পারে বাজেটের ভিতরে অঙ্কের গভীরে আমার বা আপনার জন্য এমন কিছু নেই যা নিয়ে আমরা উদ্বাহু হতে পারি। কারণ অর্থমন্ত্রী সব কিছুর শেষে রাজনীতিক। আর ভোট জেতান যাঁরা তাঁদের জন্য কিছু করবেন অথচ তা আয়-ব্যয়ের হিসাবে লুকিয়ে রাখবেন সেটা ভাবা একটু কষ্টকরই। তবে হ্যাঁ, বাড়ি কিনতে চাইলে ঋণের উপর ছাড় অনেকটাই বেড়েছে। আর বাড়ছে ভ্রমণের খরচ। কারণ, পেট্রল আর ডিজেলের উপর আরও এক টাকা সেস বসিয়েছেন তিনি।

    সাধারণ ভাবে আমরা বাজেটকে এই ভাবেই দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু এবারের বাজেট প্রস্তাবনা সম্পূর্ণ অন্য গতে পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন। তাঁর বক্তৃতায় এবার অঙ্কের উপর জোর না দিয়ে তিনি বেছে নিয়েছেন কৌশলের উপর। ভোটের আগে এই সরকার মানতে চায়নি দেশের কাজের বাজারের দুরাবস্থার কথা। কিন্তু ক্ষমতায় ফিরেই তাঁদের মানতে হয়েছে যে আর্থিক অবস্থাটা একটু নড়বড়েই। এবারের বাজেটে আর্থিক পরিচালনার কৌশল যে ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন সীতারমন তাতে পরিষ্কার যে ভোটের আগের আশঙ্কাগুলি সবই ঠিকই ছিল।

    এবারের বাজেটে আপাতদৃষ্টিতে নতুন কোনও বড় করের বোঝা দেখা যাচ্ছে না। উল্টে ব্যবসায়ীদের কাজের সুবিধার জন্য কর ব্যবস্থাকে বিশেষ করে জিএসটি-র ক্ষেত্রে ছোট ও মাঝারি আয়ের ব্যবসায়ীদের জন্য সহজতর করে তোলার কথা বলেছেন তিনি। কেন? ভারত এখন তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি বলে বিশ্বে পরিগণিত ক্রয়ক্ষমতার অঙ্কে। আর জাতীয় আয়ের অঙ্কে রয়েছে ষষ্ঠ স্থানে। কিন্তু এই জায়গা ধরে রাখতে গেলে দেশের দরকার বছরে অন্তত ২০ লক্ষ কোটি টাকার। বাজার যখন ধুঁকছে তখন সেই টাকা আসবে কোথা থেকে?

    কিন্তু বিনিয়োগ না এলে নতুন কলকারখানা হবে না, হবে না কর্মসংস্থানও। সীতারমনের তাই জোর মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পের উপর। শহর ও গ্রামে নতুন ছোট উদ্যোগে উৎসাহ দেওয়ার উপর জোর দিয়েছেন তিনি। শুধু তাই নয়, এই ক্ষেত্রে তিনি জোর দিয়েছেন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মেয়েদের উপর এবং সেই সব অসরকারি সংস্থার উপর যারা তাঁদের নিয়ে কাজ করে। মুদ্রা প্রকল্প থেকে এমনকী এক কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণও পাবেন তাঁরা।  ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পদ্যোগীদের একটা বড় সমস্যা টাকা আদায়ের। তার জন্যও তিনি কেন্দ্রীয় বৈদ্যুতিন ইনভয়েসের ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এতে টাকার দাবি ওঠার পরে তা মেটানো হল কিনা তার উপর নজরদারি করা যাবে। একই সঙ্গে রোখা যাবে কর ফাঁকির প্রবণতা। মজার ব্যাপার হল যে সরকার প্রথম ক্ষমতায় এসে জেহাদ ঘোষণা করেছিল অসরকারি সংস্থা বা এনজিও-দের উপর এখন তাদের উপরই ভরসা করতে হচ্ছে আর্থিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি মেটানোর জন্য। তাই তাদের জন্যও রযেছে সুবিধা।

    কিন্তু পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হতে গেলে যখন বছরে অন্তত ২০ লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগ দরকার তখন তো শুধু ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উপর নির্ভর করে বসে থাকা যায় না। প্রয়োজন আরও বড় টাকার বিনিয়োগ। মরা বাজারে মজা কোষাগার নিয়ে এই দৌড়ে জেতা যাবে না। তাই শুখার কারণে জল নিয়ে হাহাকারের বাজারে দেশের প্রতিটি ঘরে জল পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি হাততালি কুড়োলেও বাজারের চিড়ে তাতে ভিজবে না। তাই বিদেশে যাদের হাতে টাকে আছে তাদেরও, এতদিনের জড়তা কাটিয়ে, দেশের বাজারে অভ্যর্থনা জানাতে বিনিয়োগের আইন শিথিল করছেন তিনি। দেশের বাজারেও ঋণপত্রের বাজারকেও তিনি আরও উদার করতে চাইছেন, যাতে আপনার আমার টাকাও ঋণপত্রে সহজে খাটতে পারে। এক কথায় তাঁর জোর বিভিন্ন সূত্র থেকে সঞ্চয়ের টাকাকে বিনিয়োগমুখী করে তোলা।

    সবাই জানে নির্মাণ শিল্প কর্মসংস্থানের অন্যতম অস্ত্র। কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে অন্য অনেক শিল্পের মতো ধুঁকছে এই শিল্পও, বেশ কিছুদিন ধরেই। রয়েছে সাধারণ মানুষের মাথার উপরে ছাদ তৈরির জন্য ঋণের উপর আরও ছাড়। বৃদ্ধির বাজি সেই সাধারণের চাহিদার উপরই কিন্তু সম্পদ বন্টনে সেই এক শতাংশ মানুষেরই জিত হবে না তো?  এই প্রশ্নটা উঠত না যদি না রাষ্ট্রায়ত্ত্ব শিল্পে, অনুমান মেনেই, নতুন দমে বিলগ্নীকরণের কথা অর্থমন্ত্রী না বলতেন। কোষাগার ভরতে নতুন করের জায়গা তাঁর কাছে মজা বাজারে খুব বেশি নেই। তাই সেই ঘর বেচে ভাঁড় ভরা ছাড়া তাঁর উপায়ও নেই। কিন্তু এটা বলতে গিয়ে তিনি  বলেছেন এই সব সংস্থায় বেসরকারি পরিচালনার হাত ধরার কথা। সরকার ৫০ শতাংশের নীচে মালিকানা না-কমানোয় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু বেসরকারি পরিচালনার হাত ধরা? যদি মনে রাখি দেশের এক শতাংশের হাতে ৫০ শতাংশ সম্পদ রয়েছে, তা হলে শঙ্কার একটা জায়গা থেকে যায় না কি?  ও এন জি সি বা ইন্ডিয়ান অয়েলের মতো বড় সংস্থার সম্পদও যদি বেসরকারি পরিচালনায় যায়, তা হলে সম্পদ বণ্টনের অঙ্কটা আরও বেশি করে এই এক শতাংশের কুক্ষিগত হবে না তো?

    আর দু’টো প্রশ্ন। আয়ুষ্মান ভারত বা অন্য সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলির কী অবস্থা জানা গেল না। সরকার সুদ নির্ভর, অসহায় অবসরপ্রাপ্ত বয়স্কদেরই বা কী হবে জানলাম না। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে যাই বলা হোক না কেন, আধার কার্ডের ব্যবহার বিস্তৃত হল। যে সরকার বৈদ্যুতিন ব্যবস্থায় গোটা দেশকে বাঁধতে চাইছে সেই সরকারই কিন্তু আমার আপনার আধারের মতো ব্যক্তিগত তথ্য অন্যায় ব্যবহার রোখার ব্যবস্থার কথাও শোনা গেল না। মৌলিক গবেষণার উপর জোর দিল যে বাজেট নতুন ভারত গড়ার লক্ষ্যে, সেই ভারতের নাগরিকের নয়া প্রযুক্তির সুরক্ষার ব্যবস্থা তো সেই আঁধারে, সেখানে তো কোনও আলো পড়ল না। আলো পড়ল না এই বিশাল যজ্ঞের টাকার সংস্থান হবে কী করে তার উপরেও। রয়েছে সংস্কারের কথা, কিন্তু স্পষ্ট হল না আম জনতার লাভের কথাটা।

    লেখক প্রাক্তন সাংবাদিক ও বর্তমানে তথ্য প্রযুক্তি উদ্যোগপতি

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More