শুক্রবার, ডিসেম্বর ১৩
TheWall
TheWall

ধার করে ঘি নয়, ঘরের ছেলের জন্য দুধ–ভাত জোগাড়ই চ্যালেঞ্জ

সুপর্ণ পাঠক

এবার চ্যালেঞ্জ অর্থনৈতিক। নির্বাচন শেষ। মন্ত্রিসভাও গঠন হয়ে যাবে কয়েক দিনের মধ্যেই। সবাই তাকিয়ে আছে বাজারের ছন্দে ফেরার। কিন্তু কী হবে সেই ছন্দের চরিত্র? ঘরের ছেলে চাকরি পাবে? না কি চপ ভাজবে?

এই প্রশ্নের উত্তর কিন্তু লুকিয়ে আছে ভারতের আর্থিক বৃদ্ধি আর সেই বৃদ্ধির চরিত্র নিয়ে। আমরা নানান রাজনৈতিক আকচাআকচি, কাদা ছোড়াছুড়ির মধ্যে দিয়ে হেঁটে কিছু শব্দ ব্যাগে ভরে ফেলেছি। যেমন ওই বৃদ্ধির হার। কিন্তু যদি বৃদ্ধির হার খুব চকচকে হয় তাহলেই কি চাকরি হবে? না কি বিত্তবানের বিত্ত বাড়বে, সাধারণ থাকবে সেই তিমিরেই। আসল সমস্যা এইখানেই। সরকারের কাছে চাপ এই বৃদ্ধিকে সর্বজনীন করে তোলা।

একটি অঙ্কের দিকে চোখ রাখা যাক। পণ্যপরিষেবা কর বা জিএসটি আদায়ের অঙ্কের ওঠা নামা বাজারের চল সম্পর্কে একটা ধারণা দেয়। বাজারের লেনদেন বাড়লে এই কর আদায় বাড়ে। তাই কর আদায় কমলে বলাই যায় যে বাজারে লেনদেন কমেছে। ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষে সরকারি হিসাব অনুযায়ী এই খাতে আদায় কমেছে আনুমানিক ৪০ হাজার কোটি টাকা। আনুমানিক, কারণ এই হিসাব এপ্রিলের। আদায়ের নির্দিষ্ট অঙ্ক পাওয়া যায় বছর শেষ হওয়ার কয়েক মাস পরেই। তবে এই হিসাব যে ভাবে করা হয় তাতে মূল হিসাবের সঙ্গে কিছুটা ফারাক হয়, কিন্তু তাতে মোদ্দা চরিত্রটা বদলায় না। আদায়ের হার কমা মানে তো সোজা হিসাবেই ব্যবসা কমা। আর ব্যবসা কমা মানে চাকরির বাজারে মন্দা।

কাজের বাজারের কী অবস্থা তার অবশ্য আন্দাজ যে সূচক থেকে পাওয়া যায় সেই এনএসএসও-র তথ্য সরকার প্রকাশ করেনি। আমরা সবাই জানি সংবাদ মাধ্যমে এই নিয়ে কীরকম জল্পনা চলেছে। তাতে নাকি বলা হয়েছে ২০১৮-১৯ সালে বেকারির হার গত ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এই তথ্য যেমন অস্বীকার করা হয়েছে, তেমনই জানান হয়নি এনএসএসও-র সমীক্ষায় কী উঠে এসেছে।

তবে পণ্য পরিষেবা করের হিসাব মেনে তো দেখাই যাচ্ছে যে গত বছর ব্যবসার হাল বেশ খারাপই ছিল। আর ব্যবসার হাল খারাপ হলে কাজের বাজার কী করে ভাল হয়!  সাধারণ ঘরের হিসাবে সেই আড্ডার ইয়ার্কির চপ ভাজার ভবিতব্যই কিন্তু মানতে হয় এই অঙ্কে।

এবার প্রশ্ন কেন্দ্রীয় সরকারের সামনে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জের। সোজা করে বললে অর্থনীতির সবথেকে বড় খদ্দের কিন্তু সরকারই। তাই সরকার হাঁচলে বাজারেরও সর্দি লাগে। কিন্তু সেই বড় খদ্দেরটির পকেট যদি ঠন ঠন করে, তাহলে? গত বছর এলপিজি আর কেরোসিনের ভর্তুকি বাবদ তেল কোম্পানিগুলোকে ৩০ হাজার কোটি টাকা চোকাতে পারেনি কেন্দ্রীয় সরকার। এটা কোনও কঠিন বিজ্ঞান নয়। সাধারণ ঘরে যখন পকেটে টান পড়ে তখন আমরা আগে হিসাব করি কার পাওনা পরে মেটালেও চলে। তেল কম্পানিগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত্ব সংস্থা। তাদের মালিক সরকার। তাই সরকার তাদের প্রাপ্যটাই পিছিয়ে দিয়ে চলতি বছরে মেটানোর কথা বলেছে।

এর মানে সরকারের পকেটে টান। আর তাই যদি হয় তাহলে বাজারের বিপদ। সরকারের ঋণ করার উপরে আইন করে সীমা টানা আছে। একটা হিসাব বলছে গত আর্থিক বছরে যে ঋণ করে সরকারকে প্রতিশ্রুত খরচ সামলাতে হয়েছে তাতে সেই সীমা অতিক্রম করতে বাধ্য হবে কেন্দ্রীয় সরকার। সরকার ঋণ করে খরচ করে। এবং তা খারাপ নয় বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ সরকার খরচ করলে বাজারে চাহিদা তৈরি হয়। আর তাতে আর্থিক বৃদ্ধি হয়। কিন্তু সরকার যদি সেই টাকাতে পরিকাঠামোর মত সম্পদ তৈরি না করে এমন খাতে খরচ করে যা ওই আলু পটলে খরচ করার সামিল তাহলে কিন্তু অর্থনীতির কোনও লাভ হয় না, উল্টে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। সমালোচকরা পাছে ভুল বোঝেন তাই এই প্রসঙ্গের উথ্থাপন। আমাদের আলোচনার খাত কিন্তু অন্যদিকে।

আর বি আই গভর্নর শক্তিকান্ত দাসও সরকারের ক্রমবর্ধমান ঋণ করে খরচ মেটানোর প্রবণতা নিয়ে তাঁর দুশ্চিন্তা আড়াল করেননি। ঋণ করে খরচ করলে যদি বাজারে প্রাণ সঞ্চার হয় তাহলে তা নিয়ে এত দুশ্চিন্তা কেন? এর কারণ একটাই। সরলীকরণের দায় নিয়েই বলি, বাজারে সরকারের ঋণের চাহিদা বাড়লে চাহিদা যোগানের সরল নিয়ম মেনেই ঋণের খরচ বাড়তে থাকে। বাজারের উন্নতি হয় নিত্য নতুন বিনিয়োগের কারণেই। কিন্তু ঋণ করার খরচ বাড়লে বিনিয়োগের খরচও বাড়ে। আর তাতেই হাত গুটিয়ে নেন বিনিয়োগকারীরা। ভাবেন এখন যা আছে তা দিয়েই চলুক। বাজার ভালো হলে নতুন করে ভাবা যাবে। আর এই ভাবনাটা যদি অনেককেই আচ্ছন্ন করে তাহলে বাজারে ভাটা আসবেই।

এই কারণেই সরকারি ঋণ নিয়ে সবার এত চিন্তা। গত বছর ব্যবসার হাল যে ভাল ছিল না তা পণ্য পরিষেবা করের আদায় থেকেই পরিষ্কার। আয়কর আদায়ও আশাহত করেছে। ব্যবসার হাল খারাপ হলে চাকরির বাজারও খারাপ হবে এটা বুঝতে খুব একটা জ্ঞানের প্রয়োজন হয় না। এ দিকে সরকার বিভিন্ন শ্রেণির স্বার্থে নানান খরচের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছে যাকে আমরা জনকল্যাণ খাতে খরচ বলে থাকি। এটা অনস্বীকার্য যে ভারতে জনকল্যাণকর সরকারি প্রকল্পের প্রয়োজন। কিন্তু কোষাগারের হাল যদি খারাপ হয়, তখন?

এই সরকারের কাছে চলতি আর্থিক বছরে অন্যতম চ্যালেঞ্জ তাই কোষাগার পরিচালনা কৌশল। জনকল্যাণ প্রকল্পকে জনমোহিনী প্রকল্প না করে তোলা একই সঙ্গে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়িয়ে বাজারে চাকরির সুযোগ তৈরি করা। এমন ভাবে যাতে বৃদ্ধির ফল কতিপয় নয়, অনেকেই খেয়ে বলতে পারে, ”সাধু”।  চ্যালেঞ্জ, ঋণ করে ঘি খেয়ে পা পিছলে না পড়ে ঘরের ছেলের জন্য দুধ ভাতের সংস্থানের। সরকার কি পারবে এই চ্যালেঞ্জ নিতে?

লেখক প্রাক্তন সাংবাদিক ও বর্তমানে তথ্য প্রযুক্তি উদ্যোগপতি

Comments are closed.