মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৭

বাজেট হবে কার, প্রশ্ন সেটাই

সুপর্ণ পাঠক

রাত পোহালেই বাজেট। আমার আপনার চাহিদার খাতায় তো সেই একটাই। আয়করে ছাড়। কিন্তু লোকসভায় এখন থিকথিক করছে সরকার পক্ষের সাংসদ। ভোটের পর প্রথম বাজেট। তাই আরও গভীর কোনও পরিবর্তন হতে পারে কি? কাল সকালে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন তাঁর প্রথম বাজেট পেশ করতে ওঠা পর্যন্ত কিন্তু এই প্রশ্নটা অনেককেই কুরেকুরে খেতে থাকবে।

বেশ কিছু দিন আগেও অবশ্য বাজেট নিয়ে আমাদের মাথাব্যথার জায়গা ছিল দুটো – জিনিসের দাম কমলো কি না অথবা করের গুঁতোয় ট্যাঁকে টান পড়ল কিনা, আর অবশ্যই আয়করের ছাড়। জিএসটি আসার পরে তাই আমার আপনার এই নিয়ে কোনও উৎসাহ আর নেই। আমরা তাই শুধু হয়তো মাথা ঘামাব আয়কর নিয়েই।

কিন্তু আমাদের মধ্যেও অনেকেই সংখ্যায় কম হলেও কিন্তু সংশয়ে আছেন। কারণ, সরকারপক্ষ লোকসভায় দলে ভয়ানক ভাবে ভারী। তাই তাঁদের পক্ষে অনেক কিছুই করিয়ে নেওয়া সম্ভব। আমরা নিজেদের দৈনন্দিন জীবন দিয়ে জানি বাজারের হাল ভাল নয়। সরকারি তথ্যও যে অন্য কথা বলছে তাও নয়। জিএসটি-র আদায় লক্ষ্য থেকে অনেক তলায়। রাজকোষের ঘাটতিও লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে। এ বছরের বৃষ্টির হাল খারাপ। কৃষির অবস্থাও তাই তথৈবচ। তাই এ বছর বাজারের হাল খুব ভালো যাবে বলে কেউ মনে করছেন না।

এই খারাপ অবস্থার উপর যদি বাজারের চাকা কাদায় আরও গেঁথে যায় তা হলে ‘আমআদমির’ হাল কী হবে তা বুঝতে বিরাট কিছু বোদ্ধা হওয়ার দরকার পরে না। তাই সরকারের লোকসভায় যতই সংখ্যাধিক্য হোক না কেন, বাজারের চাকাকে চাগিয়ে তোলার চেষ্টা করতেই হবে। আর সেই চিন্তা থেকেই কিন্তু ভ্রুকুঞ্চনের শুরু। বাজার চাগাতে গেলে চাহিদা তৈরি করতে হবে।  বাজেট পরিচালনার একটা কৌশল হল ধার করে হলেও সরকার যদি খরচ করে তাহলে বাজারে চাহিদা তৈরি হয়। আর সেই চাহিদা মেটাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে বিক্রেতারা, তৈরি হয় নতুন উৎপাদনের সুযোগ আর তাতেই আবার গড়াতে শুরু করে বাজারের চাকা।

এটা বলা সোজা কিন্তু করা? সরকার ইতিমধ্যেই নাকি যা ধার করে ফেলেছে তাতে আর বেশি ধার করতে গেলে উল্টো সমস্যা। কারণ, ধার শোধ করতে গেলে তো টাকা লাগে। না হলে আবার ধার করতে হয় ধার মেটাতেই। সেই শিবরামের হর্ষবর্ধন–গোধর্ধনের গল্পের মতো। তা হলে উপায়?

আমার আপনার আর সুদের টাকায় বাঁচা অবসরপ্রাপ্তদের জন্য তো একটা দুঃখের জায়গা তৈরি হয়েই গিয়েছে আর তা হল সুদের হার কমা।  আমাদের দেশে এখনও সামাজিক নিরাপত্তার যথাযথ ব্যবস্থা তৈরি হয়নি। যাঁরা অবসর ভাতা পান না, তাঁদের বাঁচতে হয় জীবনের সঞ্চয় ব্যাঙ্কে রেখে সুদের টাকায়। সুদ কমা মানে তো আয় কমে যাওয়া। জিনিসের দাম তো নীচের দিকে যায় না। তাই পকেটে টান পড়ে। সরকার বলবে, সুদ কমলে বিনিয়োগের খরচ কমবে তাতে দেশে ব্যবসা বাড়বে। লোকের ভালো হবে। যুক্তি অকাট্য কিন্তু আপনার মাথা চাপড়ানো ছাড়া কোনও উপায় থাকছে না।

এটা তো গেল হয়ে যাওয়া দিক। নতুন সরকার আসার পরপরই। অন্য দিকটা হলে দায় মেটানোর। গত বছরের শেষে দায়ের বোঝা ৮২ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল। এই সরকার যে দায় নিয়ে শুরু করেছিল তার থেকে বোঝা বেড়েছে ৫০ শতাংশের বেশি। ধার কমাতে হলে উপায় হল সরকারি মালিকানাধীন সংস্থার শেয়ার বেচে কোষাগারে টাকা আনা। কারণ বাজারের অবস্থা খারাপ হলে কর আদায়ও কম হয়। আয় আনতে তাই উপায় সম্পদ বেচা। কিন্তু এখানেও সমস্যা। আইন অনুযায়ী সরকারকে এই সংস্থায় ৫০ শতাংশের উপর মালিকানা রাখতেই হবে।

কমলে সমস্যা কী? এমনিতে সরকারের সংস্থা চালানোর কোনও দায় থাকা উচিত নয়। কিন্তু আমাদের দেশে মাত্র এক শতাংশ মানুষ দেশের ৫০ শতাংশের বেশি সম্পদের মালিক। এই অবস্থায় সরকারের মালিকানা কমলে কিন্তু তাবড় এই বৃহৎ সংস্থাদের মালিকানাও এই এক শতাংশের হাতে গিয়েই উঠবে অনেকটাই। এর সমাধান কী তা বিতর্ক সাপেক্ষ। কিন্তু সেই বিতর্কে ঢোকার সময় বা ইচ্ছা সরকারের আছে কি না সেটা একটা বড় প্রশ্ন।

আমাদের অবশ্যই এই কচকচির বাইরে গিয়ে আয়করে কী হয় তা দেখার আগ্রহ থাকবেই। হার কমানোর আর বিভাজন কমানোর দাবি বহুদিন ধরেই আছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে আরও সরলীকরণের দাবি। নির্মলা সীতারমন কি আয়করে তুষ্ট করে সেই সংস্কারের পথে হাঁটবেন, যা অনেকেরই মনে নাও ধরতে পারে? প্রশ্ন সেটাই।

লেখক প্রাক্তন সাংবাদিক ও বর্তমানে তথ্য প্রযুক্তি উদ্যোগপতি

Comments are closed.