বেঙ্গল কেমিক্যালস: বেচে দেওয়া কি সত্যিই প্রয়োজন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    সুপর্ণ পাঠক

    আজকাল আর সেই চায়ের দোকান নেই। নেই সেই কাপে ওঠা তুফানও। গোটা বিশ্বই কেমন করে যেন হারিয়ে যাচ্ছে মুঠোয় পাকড়ানো ওই ছোট্ট স্ক্রিনটাতেই। আর তারই সঙ্গে সম্ভবত হারিয়ে যেতে বসেছে, আপাতদৃষ্টিতে, আমাদের সামাজিক ভবিষ্যৎও। না হলে বেঙ্গল কেমিক্যালস ঘুরে দাঁড়ানোর পরেও বেচে দেওয়ার সিদ্ধান্তে রাজ্যে সেই অর্থে কোনও হেলদোল নেই কেন? কেনই বা চায়ের দোকানে দেখছি না সেই তর্কের তুফান! পরিষ্কার হচ্ছে না কেন, আমরা কী চাইছি!

    না, আমি মনে করি না বাজার-অর্থনীতি নির্ভর সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকারের কাজ ব্যবসা করা। কিন্তু সরকার যদি এমন রাস্তায় হাঁটায় যে তাতে কিছু লোকের উপকার হলেও বাকিদের রান্নাঘরের আঁচই নিভে গেল, তা হলেও তা বাজারের দোহাই দিয়ে মানতেই হবে, তা কিন্তু কোনও নীতিই সমর্থন করে না। সরকারের ব্যবসা করা উচিত নয় তা যেমন নীতির প্রশ্ন, তেমনই তাতে যদি দশের অপকার হয় তাহলে সেই নীতি মাথায় রেখেই সাপও মরে অথচ লাঠিও না ভাঙে সেই রাস্তা খুঁজতে হবে বই কি।

    একটু প্রসঙ্গতই প্রসঙ্গান্তরে হাঁটা যাক। ভোটের আগে দেশের বৃদ্ধির হার নিয়ে খুব একটা আকচা আকচি হয়েছিল। সেটা এখনও চলছে। আর আমাদের মধ্যেও বেশ একটা হামবড়া ভাব এসেছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির নাগরিক হিসাবে। এটাই স্বাভাবিক, কারণ প্রায় সব সরকারি প্রচারের মুখবন্ধতেই আমাদের আর্থিক বাহুবল কেমন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, তার উল্লেখ থাকছে। যদিও শুরু হয়েছে সেই তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও বিতর্ক। কিন্তু তা চলছে এমন একটা স্তরে যার রেশ সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছচ্ছে না।

    কিন্তু যে তথ্যটা অনুল্লেখিত থেকে যাচ্ছে তা হলো দেশ যতই বড়লোক হোক না কেন, তার নাগরিক কিন্তু এখনও বিশ্বদরবারে নিম্নমধ্যবিত্তের তকমা নিয়েই ঘুরছে। সাম্প্রতিক বিশ্বব্যাঙ্কের হিসাবেও আমাদের দেশ, বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের সঙ্গে নিম্নমধ্যবিত্ত তকমা নিয়েই বিরাজমান। এবং পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হলেও এই তকমা আমাদের সঙ্গ ছাড়বে না। পাশাপাশি, শ্রীলঙ্কা কিন্তু থাইল্যান্ডের মতো দেশের সঙ্গে উচ্চ মধ্যবিত্তের দেশ হিসাবে সগৌরবে বিশ্ব দরবারে উপস্থিত।

    এই তথ্য কী বলছে? ভারত দেশ হিসাবে বড়লোক হচ্ছে, তার নাগরিকরা কিন্তু উচ্চ মধ্যবিত্ত হওয়া দুরে থাকুক, মধ্যবিত্তও হয়ে উঠতে পারছে না। পরিবারের সম্পদ বাড়ছে, অথচ সদস্যদের গ্যাঁট ফাঁকা? এই অঙ্ক তখনই মেলে যখন দেখা যায় পরিবারের রোজগারের সিংহভাগ কয়েক জন ভাই বোনে ভাগ করে নিয়ে বাকিদের বলছে তফাত যাও! এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে পরিচিত নন এমন মানুষ এ দেশে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

    এ বার পরিবারকে যদি দেশ হিসাবে ভাবি আর যদি দেখি দেশ বড়লোক হচ্ছে অথচ তার নাগরিক সেই তিমিরেই? পরিবারের যুক্তিকে যদি এগিয়ে নিয়ে দেখি, তাহলে যা দাঁড়ায় তা হল দেশের বৃদ্ধির মেওয়া ফলছে গুটিকয়েক মানুষের জন্যই। তথ্যও সে কথাই বলে। ভারতের ৫০ শতাংশ সম্পদ রয়েছে এক শতাংশ মানুষের হাতে। আর বাকি ৯৯ শতাংশ বাকি ৫০ শতাংশের মালিক। অর্থাৎ নিম্নমধ্যবিত্তের নিরবচ্ছিন্ন ভাবে ঘুরতে থাকা এক অমোঘ বৃত্ত।

    এর সঙ্গে বিলগ্নিকরণের কী সম্পর্ক? ভারতের বর্তমান পরিস্থিতির নিরিখে বলা যায়, পুরোটাই। সরকারের কাজ কী? উন্নয়ন। আর উন্নয়নের মানে হল এমন ভাবে দেশ চালানো যাতে সাধারণ নাগরিকদের ভাল হয়। তাদের উন্নতি হয়। আজ কিন্তু নরওয়ের মতো দেশে সাধারণ নাগরিকরা উচ্চ মধ্যবিত্ত। আর নর্ডিক মডেল বলে পরিচিত এই দেশগুলির নাগরিকরা শিক্ষিত। অসুস্থ হলে কত টাকা খরচ হবে তার চিন্তা করতে হয় না। তার কারণ একটাই। দেশের সম্পদ আমাদের দেশের মতো কয়েকজনের কুক্ষিগত নয়। আর মজার ব্যাপার হল এরা কিন্তু সবাই বাজারের নিয়ম মেনেই চলে! সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখা হলে এখানে একটা স্মাইলি দিতাম, কিন্তু এখানে তো তা সম্ভব নয় তাই এগিয়ে যাওয়া যাক।

    ফিরে যাই বেঙ্গল কেমিক্যালস বা বিলগ্নিকরণ প্রসঙ্গে ভারতের আর্থিক প্রেক্ষাপটে। বিলগ্নিকরণ কিন্তু শুরু হয়েছিল দেশের কোষাগার শূণ্য ছিল বলেই। সরকার সম্পদ বিক্রি করে কোষাগার সামলাতে চেয়েছিল। তখনই সিদ্ধান্ত হয়েছিল, বাজারে শেয়ার ছেড়ে টাকা তুললেও নাগরিকের টাকায় তৈরি সম্পদে রাষ্ট্রেরই অধিকার থাকবে। অর্থাৎ ৫০ শতাংশের উপর মালিকানা সরকারেরই থাকবে। সংস্থা লাভ করলে সেই টাকা কোষাগারে আসে। সেই টাকা দেশের উন্নয়নেই খরচ করা হবে। সেই সিদ্ধান্তের পর থেকে বিলগ্নিকরণ কিন্তু একই যুক্তি মেনে হয়েছে।

    দেশের কোষাগারে আবার টান পড়েছে। তাই আবারও চারিদিকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বেচার রব। এমনকী এমন সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে যে সরকারি সংস্থা পুরো বিক্রি করে কোষাগার ভরতে পারে। যদিও এখনও তার প্রত্যক্ষ দাবি সরকার পেশ করেনি নীতি হিসাবে। তবে আশঙ্কার জায়গা তৈরি হয়েছে। সরকার যদি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার মালিকানা ছেড়ে দেয়, তাহলে একটা সম্ভাবনা তৈরি হয় যেখানে যে এক শতাংশের হাতে ৫০ শতাংশের উপর সম্পদ, তাদের দেশের সম্পদের উপর আরও বেশি অধিকার বর্তাবে। পাশাপাশি নাগরিকের করের টাকায় তৈরি এই সংস্থার লাভ কোষাগারে ঢুকবে না দেশের আয় হিসাবে। কোষাগারের টাকাই তো খরচ হয় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাস্তার মতো পরিকাঠামো খাতে। এতে দেশের সার্বিক উন্নয়ন হয়। সম্পদ বন্টন হয় সাধারণের মধ্যে। বৈষম্য কমে।

    বর্তমান পরিচালন ব্যবস্থায় প্রতিটি সংস্থার মধ্যে পেশাদারিত্ব বাড়ছে। সরকারের উচিত পরিচালন ব্যবস্থায় মাথা না গলানোর। আর ওই সংস্থাগুলিকে পেশাদারি সংস্থার মতোই চলতে দেওয়া। কিন্তু নাগরিকের টাকায় তৈরি এই সংস্থাগুলিকে ভাল করে চালিয়ে তার লাভের টাকা দেশের কাজে ব্যবহার করাটা কিন্তু বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতির ভিত্তিতে কাম্য। বিশেষ করে সেই দেশে যেখানে নুন আনতে পান্তা ফুরাচ্ছে। সেই দেশে, যার অভ্যন্তরীণ মোট আয়ের ভিত্তিতে বিশ্বের অন্যতম আর্থিক শক্তি হিসাবে পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হলেও, সম্পদ বন্টনের অঙ্কে নিম্ন মধ্যবিত্তের তকমা আগামী দশকেও যাবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই গিয়েছে।

    গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের লক্ষ্য নাগরিকের স্বার্থরক্ষা এটা ধরে নিয়ে যদি আমরা বিলগ্নিকরণের গতি দেখি তাহলে কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বেচে কোষাগার চালানোর প্রবণতা নিয়ে ভাবার জায়গা এসে গিয়েছে। অন্তত ৫১ শতাংশ মালিকানা যাতে সরকারের হাতেই থাকে সেটাই কিন্তু নাগরিক চাহিদা হওয়া উচিত। সরকারের ব্যবসা করা কাজ নয়, কিন্তু এখন তো দেশের সম্পদ, দক্ষতা বাড়িয়ে ব্যবসায়িক স্বার্থে ওগুলো পরিচালিত হোক। লাভের টাকা কোষাগারে ঢুকুক উন্নয়নের স্বার্থে। শেয়ার বিক্রি হোক। কিন্তু তাতে রাষ্ট্রের অধিকার এখনই ক্ষুণ্ণ না হয়। কিন্তু আমরা কি ভাবছি সাধারণের হেঁসেলের কথা। তথ্য কিন্তু বলছে “না”।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More