সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৬

মধ্যাহ্নে সূর্যাস্ত

সুখেন্দুশেখর রায়

অরুণ যখন মধ্যগগনে তখনই নেমে এল আঁধার। রবি রশ্মির লেশটুকু আর রইল না। বিদ্যার্থী পরিষদের নেতাকে জয়প্রকাশ নারায়ণ ছাত্র সংঘর্ষ সমিতির দায়িত্ব দিলেন। অল্পদিনের মধ্যে হলেন জেলবন্দি। দেশে তখন জরুরি অবস্থা। তার পর ক্রমান্বয়ে ওকালতি, বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংয়ের আমলে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল, বাজপেয়ীজির মন্ত্রিসভায় আইনমন্ত্রী- অরুণোদয়ের পথে আর নেই মেঘের আস্তরণ। এই অরুণ জেটলিকে আমি দেখিনি।

অনেক পরে যখন তাঁকে দেখলাম, তিনি তখন স্বমহিমায় রাজ্যসভায় বিরোধী দলের নেতা। একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে সরকারের বিরুদ্ধে। আর জেটলির তীক্ষ্ণ প্রশ্নবাণে প্রতিদিন ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে সরকার পক্ষ। মাত্র মাস কয়েক হল রাজ্যসভায় এসেছি। জেটলির বক্তৃতা শোনার জন্য সারাক্ষণ সভায় বসে থাকতাম। কী অপূর্ব বাচনভঙ্গি! বক্তব্যের উচ্চতা অনেক সময় বোঝা দুষ্কর হয়ে পড়ত। আমার সময়ের শ্রেষ্ঠ বক্তা বলে ততদিনে মেনে নিয়েছি। সুযোগ পেলেই তাঁর কাছ থেকে পরিষদীয় রীতিনীতির পাঠ নিতাম। আমার চেয়ে উনি চার বছরের ছোট ছিলেন। হয়তো তাই আমাকে ‘দাদা’ বলে ডাকতেন। কিন্তু তিনি আইনজীবী তো বটেই, সাংসদ হিসেবেও যে আমাদের সবার বড়দা সে কথা তাঁকে জানাতে কখনও দ্বিধা করিনি।

অণ্ণা হজারের নেতৃত্বে তখন দিল্লিতে অনশন সত্যাগ্রহ চলছে। সরকার বিরোধী ওই আন্দোলনে রাজধানী উত্তাল হয়ে উঠেছে। দুর্নীতি হটানোর দাবিতে কেজরিওয়াল- প্রশান্ত ভূষণেরা ধর্না মঞ্চে বসে তৈরি করলেন ‘লোকপাল বিল’। ওই সময় ওঁদের সঙ্গে হাজির ছিলেন সিপিএম নেতা সীতারাম ইয়েচুরি আর বিরোধী দলনেতা অরুণ জেটলি। চাপে পড়ে সরকারও মেনে নিল ওঁদের তৈরি লোকপাল বিল। সামান্য রদবদল করে রাজ্যসভায় পেশ করা হল। আলোচনায় অংশ নিয়ে আমি ওই বিলের তীব্র বিরোধিতা করে বলি, “ রামলীলা ময়দানে বিল তৈরি করে সংসদকে বলা হচ্ছে তা পাশ করতে হবে। এর পর হয়তো কোনও দিন দেখা যাবে, আরেক দল ইন্ডিয়া গেটে ধর্নায় বসে সংবিধানকে বাতিল ঘোষণা করবে আর সংসদে তা মেনে নেওয়ার দাবি উঠবে। এমন হলে তো গণতন্ত্র ‘মবোক্র্যাসি’-তে পরিণত হবে।

সিপিএম বা বিজেপির নাম উল্লেখ না করে বললাম, “দেশের গণতন্ত্র খতম করার এই অভিযানে দেখা যাচ্ছে বামপন্থী আর রামপন্থীরাও হাত মিলিয়েছে।” বিকেলে সেন্ট্রাল হলে জেটলির সঙ্গে দেখা হল। একটা সিঙাড়া এগিয়ে দিয়ে বললেন, খুব ভাল বলেছো। শুনে মনে হচ্ছিল কোনও নবাগত নয়, প্রাজ্ঞ সাংসদ আজ ঝড় তুলেছে। পরের দিন দিল্লির ইংরাজি কাগজে আমার বক্তৃতার ওই অংশটি ছেপেছিল। পরে এক সাংবাদিক বন্ধুর কাছে জেনেছিলাম, আগের দিন সান্ধ্য বৈঠকে অরুণজিই আমার বক্তৃতার ওই অংশটি সাংবাদিকের ছাপতে বলেছিলেন। শুধু তাই নয়। আমাদের দলের কোনও কোনও নেতার কাছে বিভিন্ন সময়ে আমার নাকি প্রশংসাও করতেন। এমন উদার, বড় মাপের নেতা খুব একটা চোখে পড়ে না।

কলেজিয়াম ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংসদে বিল পাশ হল। জজেরাই জজ নিয়োগ করতেন। এই প্রথা বাতিল হল। কিন্তু অনতিবিলম্বে সুপ্রিম কোর্ট তা খারিজ করে দিয়ে পুরনো প্রথাই বহাল রাখল। অরুণজি তখন অর্থ মন্ত্রী ।  ফেসবুকে ওই রায়ের তীব্র সমালোচনা করে লিখলেন, ” ভারত গণতান্ত্রিক দেশ। অনির্বাচিতদের স্বৈরতন্ত্র (Tyranny of the unelected) মেনে নেওয়া যাবে না।” সে দিনই বিদেশি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাংসদদের বৈঠকের পরে আমাকে তাঁর চেম্বারে আসতে বললেন। সেখানে কথা প্রসঙ্গে বললাম, বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে তোমার ফেসবুক প্রতিক্রিয়া বেশ কড়া মনে হল। তুমি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। দলের কোনও মুখপাত্র বললেই হত। জেটলি বললেন, “আমি ইচ্ছে করেই বলেছি। আমি সারা দেশে একটা মেসেজ দিলাম যে কী ভাবে স্বার্থান্বেষী মহল সংসদের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ করতে চাইছে।” এরপর প্রায় এক ঘণ্টা ধরে সংসদীয় গণতন্ত্রের অভ্যুদয়ের ইতিহাস, সংবিধান সভায় এ বিষয়ে বিভিন্ন সদস্যের বক্তব্যের বিস্তারিত বিবরণ শোনালেন। অপূর্ব সেই বিশ্লেষণ।। সে দিন মনে মনে তাঁকে প্রণাম জানিয়েছিলাম। এমন জ্ঞানী শিক্ষাগুরুর সঙ্গে যদি দশ বছর আগেও যোগাযোগ হত, তাহলে আমার জীবনটা হয়তো অন্য খাতে বইত। এই আফশোসটা কোনও দিন ঘুচবে না।

প্রায় এক বছর তাঁকে দেখিনি। মাঝে একদিন ফোন করে আরোগ্য কামনা করি। উনি এমন ভাবে কথা বললেন যেন তাঁর কিছুই হয়নি। বরং হাল্কা সুরে কিছু রসিকতা করলেন নিজেকে নিয়ে। একজন মৃত্যুপথ যাত্রীর এমন জীবনী শক্তি কী ভাবে হয় তা ঈশ্বর জানেন। আজ ঈশ্বরের কাছে গিয়ে হাসতে হাসতে বলবেন, তোমার ডাকে সাড়া দিয়ে চলে এলাম। আর তাঁর আত্মীয়, পরিজন, গুণমুগ্ধেরা বিষাদে নিমজ্জিত হয়ে নীরবে অশ্রুপাত করে তাঁর আত্মার চিরশান্তি কামনা করবেন। ওঁ শান্তি ।।

লেখক তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ

মতামত লেখকের নিজস্ব

Comments are closed.