মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৫

বাঙালির বর্ণদাতাকে টুকরো করেছে, হিংসার জবাব হবে শান্তিপূর্ণ পথেই

  • 555
  •  
  •  
    555
    Shares

সুখেন্দুশেখর রায়

গতকাল ধর্মতলা থেকে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহের নেতৃত্বে একটি রোড শো বা রাউডি শো শুরু হয়। তাতে দেখা যায় মাথায় গেরুয়া ফেট্টি বাঁধা বহিরাগত বেশ কিছু লোক ছিল। এবং ধর্মতলা থেকে বিধান সরণি পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় পাঁচ ফুট অন্তর অমিত শাহের বিরাট বিরাট কাট আউট ছিল, যা আদর্শ নির্বাচনী বিধির একেবারে বিরোধী। এই মিছিল যখন এগোতে থাকে,  তখন কিছু জায়গায় পুলিশ ওই কাট আউট খোলার কাজ করছিল কমিশনের নির্দেশে। উন্মত্ত বিজেপি সমর্থকরা প্রথমে পুলিশকে মারধর করে। লেনিন সরণির ওই ঘটনা খানিকক্ষণ পর থিতু হয়। তারপর এগোতে থাকে মিছিল।

গতকালের মিছিলটাকে বড় করে দেখানোর জন্য একটা অভিনব কায়দা নিয়েছিল বিজেপি। অমিত শাহের গাড়ির আগে এবং পরে বেশ কিছু ট্রেলার লরি রাখা ছিল। নাচ-গান করতে করতে সেগুলি এগোচ্ছিল। এটা পুরোটাই দেখানোর জন্য যে, কত বড় মিছিল! আর মেশিনের সাহায্যে ফুল ছোড়া হচ্ছিল। মিডিয়ার মাধ্যমে জনতাকে দেখানোর জন্য যে, দু’পাশের বাড়ি থেকে পুষ্প বৃষ্টি হচ্ছে। যেটা আসলে ঘটনা নয়। যৌন হেনস্থায় জেলে থাকা আসারাম বাপু যেমন হোলির দিন মেশিনের সাহায্যে রঙ খেলতেন, ওই ধরনের একটি মেশিন ব্যবহার করা হয় বিজেপি-র রাউডি শোয়ে। বাংলার মানুষ কখনও কোনও দিন কোনও খুনিকে পুষ্পবৃষ্টি করেনি এবং করবেও না। তাই এটা পুরোটাই তৈরি করা।

এরপর মিছিল আসে কলেজ স্ট্রিটে। সেখানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে এক দল ছাত্রছাত্রী শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক পথে  কালো পতাকা দেখাচ্ছিল এবং স্লোগান দিচ্ছিল। কিন্তু সেটা গেটের ভিতরে। তাঁরা মিছিলে কোনও বাধা সৃষ্টি করেনি। প্রত্যেকের প্রতিবাদ করার অধিকার আছে। কিন্তু মিছিলে থাকা উন্মত্ত গেরুয়া ঝাণ্ডাধারীরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট ভেঙে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করে। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, স্যার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, বিশিষ্ট বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু, সিভি রমন-সহ দিকপাল ব্যক্তিত্বদের নাম, সেখানে প্রথমে তাণ্ডব চালানোর চেষ্টা হয়। কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক সেটা সফল হয়নি।

এরপর মিছিল এগোতে থাকে। বিদ্যাসাগর কলেজের সামনে গিয়ে আর অপেক্ষা করেনি ভাড়াটে গুণ্ডারা। আমাদের হাতে ভিডিয়ো ফুটেজ রয়েছে, গেরুয়া ফেট্টি বাঁধা লোকজন গেট ভেঙে ঢুকে পড়ে কলেজে। এবং যাদের প্রায় কেউই বাংলাভাষী নয়। এই প্রতিষ্ঠানের একটা ঐতিহ্য আছে। আগে এটাই ছিল মেট্রপলিটন ইনস্টিটিউশন। পরে ১৯১৭ সালে বিদ্যাসাগর কলেজ হয়। এখানেই পড়াশোনা করেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। কিন্তু ওদের কাছে এই ঐতিহ্যের গুরুত্ব না থাকলেও আমাদের কাছে রয়েছে। আমরা গর্বিত বাঙালি হিসেবে। বিদ্যাসাগর কলেজের ভিতরে ঢুকে তাণ্ডব চালায় ওরা। ভেঙে দেওয়া হয় বিদ্যাসাগরের মূর্তি। লুঠ করা হয় এক অধ্যাপিকার ল্যাপটপ। যারা এটা করেছে তাদের প্রত্যেকের হাতে বাঁশ, লোহার রড, মাথায় গেরুয়া ফেট্টি আর গায়ে গেরুয়া বসন। বাইরে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। অনেক পরে পুলিশ এসে সেই আগুন নেভায়।

শেষ দফার নির্বাচনের আগে ওরা একটা কৌশল নিয়েছিল, যে দেখো তৃণমূল আমাদের আক্রমণ করেছে। কিন্তু সংবাদমাধ্যমে গোটাটা প্রকাশ হয়ে গিয়েছে। কার মূর্তি ভাঙল? যে বিদ্যাসাগর ব্রিটিশ সরকারকে বাধ্য করেছিলেন বাল্যবিবাহ রুখতে আর বিধবা বিবাহ চালু করতে। যে বিদ্যাসাগর আমাদের সঙ্গে বাংলা বর্ণের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। আমাদের বর্ণদাতা। তাঁর মূর্তি ভেঙেছে ওরা। এটা শুধু বাঙালির ব্যাপার না, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে থাকা শিক্ষিত এবং রুচিশীল ভারতীয়রা এই ঘটনার নিন্দা করছেন।

ওদের একটা দম্ভ ছিল ২৩টি আসন জিতবে। এখন বুঝতে পারছে দু’তিনটির বেশি আসন পাবে না, তাই এই বাতাবরণ তৈরি করে শেষ দফায় ফায়দা তোলার চেষ্টা করছে। গত তিন মাস ধরে কলকাতার বিভিন্ন হোটেল, লজ, ধর্মশালায় বহিরাগতদের জড়ো করে রেখেছিল। কিন্তু এই হিংসার জবাব হিংসা দিয়ে নয়। শান্তিপূর্ণ পথেই সারা রাজ্যে এর প্রতিবাদ হবে।

লেখক তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ

মতামত লেখকের নিজস্ব

Comments are closed.