হলোকস্টের প্রস্তুতি

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

    এই প্রায়-স্তব্ধতা মেনে নিতে পারছি না। এনআরসি নামক ভয় আমাদের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমরা চুপচাপ দেখছি। এখনও সেই গা বাঁচানো খেলা। প্রতিবেশি রাজ্যের একদল প্রায়-উন্মাদ জাতীয়তাবাদী নেতারা ঠিক করলেন বাঙালি খেদাবেন, শুরু হয়ে গেল সেই খেলা। আমার মনে পড়ছে নব্বই দশকে শিলিগুড়িতে কাটাবার সময়, যখন আসামে বাঙালিদের উপর অত্যাচার বাড়লে উত্তরবঙ্গে জমিবাড়ির দাম বেড়ে যেত। মনে পড়ছে গুয়াহাটির পল্টনবাজারে ভাতের হোটেল চালানো বাঙালি মালিকের মুখ। ফিরে এসেছিলেন শিলিগুড়ি। মুখে আতঙ্ক নিয়ে বলেছিলেন আমরা যদি তিনদিনের জন্য হাইওয়ে বন্ধ করে দিই তাহলে আসাম শুকিয়ে যাবে। কিশোর আমার মনে হয়েছিল এটা ঠিক পথ নয়। এখন আর ঠিকবেঠিক বুঝতে পারি না। শুধু বুঝি, বাংলাভাষায় কথা বলার জন্য আমাকে ভারতীয় হবার প্রমাণ দিতে হবে। একদল শাসক ঠিক করে দিয়েছে তার মাপকাঠি। আমাকে তাতে সায় দিতে হবে।

    জুজু, জুজু, আমাকে থাবা দিউনি বলে ঘরে ঢুকে পড়ার দিন আর নেই। ঘরে ঘরে ঢুকে রাষ্ট্রযন্ত্র প্রমাণ নেবে আমার কাগজপত্রের। কারণ আমি বাংলাভাষায় কথা বলি। আসামের কথা ছেড়েই দিলাম। পশ্চিমবাংলায় যদি এনআরসি হয় তাহলে তো এটাই হবে। পড়াশুনো বা কবিতা লেখার সূত্রে নানা দেশে যাবার সুযোগ হয়েছে। পাসপোর্টে ভারতীয় রাষ্ট্র আমাকে তার নাগরিক হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এখন সেই নাগরিকত্বকেই চ্যালেঞ্জ জানানোর দিন আসন্ন। যদি পাসপোর্টদাতা রাষ্ট্রই তার দেওয়া পরিচয়কে গ্রহণ না করে তাহলে অন্য রাষ্ট্রের সামনে তার চেয়ে হাস্যকর কিছু হতে পারে না।

    আমি ধরে নিলাম পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি হবে না। কিন্তু প্রশ্নটা তো উঠেছে। এখনও অবধি বোধহয় ৭ জন মানুষ মারা গেছেন (এঁদের মধ্যে কেউ আত্মহত্যাও করেছেন)। আর এখানেই উঠে আসে আরও বড় প্রশ্ন। আমাদের নিজেদের প্রায়-স্তব্ধতা। হিটলারের জার্মানিতে কোনও ইহুদিকে নাৎসি পক্ষ নিতে দেখা যায়নি। কিন্তু আমাদের বাংলায় বিজেপির বাঙালি সদস্য আছে। হিঁদুয়ানির গর্বে সে বাঙালির দল উৎফুল্ল। তারা ঘরে ঢুকে খুঁজে বের করবে “বাংলাদেশি”। রাষ্ট্রযন্ত্র যখন কাগজ চাইবে তারা চাইবে ধর্মের হিসেব।

    এখানেই একটু পিছনে ফিরে দেখা দরকার। আমাদের বাংলা মাধ্যম স্কুলের রচনা বইতে লেখা থাকত বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো। আমাদের ভেবে দেখা উচিত যে জাতির অন্ততঃ ৬০ ভাগ মানুষ মুসলমান সে জাতির শ্রেষ্ঠ উৎসব কী করে দুর্গাপুজো হতে পারে। হয়ত এভাবেই আমাদের মধ্যে ছোটবেলা থেকে ঢুকে গেছে হিঁদুয়ানির বীজ। আর সে বীজ আজ বিষবৃক্ষে পরিণত হয়েছে। স্বজাতির মানুষকে কনসেন্ট্রেশান ক্যাম্পে পাঠানোর ব্যবস্থা চলছে আর আমরা দুহাত তুলে বিজেপিকে ডেকে আনছি যারা সেই ব্যবস্থাকে স্থায়ী রূপ দিয়েছে। হ্যাঁ বিজেপি বাঙালি বিরোধী কারণ তারা বাংলা ভাষায় কথা বলার কারণে বিদেশি বলে চিহ্নিত করা শুরু করেছে।

    আর এই বিদেশি জুজু দেখানো ফ্যাসিবাদীদের দীর্ঘদিনের কায়দা। আমরা জানি তাদের আদি ইতিহাস। আমরা জানি তাদের নতুন ইতিহাস। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে মার্কিন কাগজ খিল্লি করতে পারে আমরা পারি না। মার্কিন দেশে মেক্সিকান জুজু, ১৯৩০–এর ইহুদি জুজু, কিছুদিন আগেকার মিয়ানমারের রোহিংগা জুজু আর এখন এই বাংলাদেশি জুজু একই জিনিস। ট্রাম্পের আমেরিকায় সে দেশের দ্বিতীয় ভাষা স্প্যানিশ বলতে অনেক জায়গাতেই লোকে ভয় পাচ্ছে। যেমনটা বা হতে চলেছে আমাদের দেশে বাংলা (পাকেচক্রে বাংলাও ভারতের দ্বিতীয় ভাষা) ভাষা নিয়ে।

    এই নারকীয় এনআরসি কে বন্ধ করা দরকার। না হলে বাঙালির কপাল রোহিঙ্গাদের মত হতে পারে। এ এক হলোকস্ট-এর দাওয়াত। আমরা সাধারণ মানুষেরাই একে প্রতিরোধ করতে পারি। বাংলার দুই প্রধান রাজনৈতিক দল, তৃণমূল ও সিপিএম যেন একটু বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে এই অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে।

    মতামত লেখকের নিজস্ব

    লেখক কবি ও অধ্যাপক

     

    পড়ুন, দ্য ওয়ালের পুজোসংখ্যার বিশেষ লেখা…

    তাহু ফল, ঐশ-রোষ ও পিগমি সমাজ

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More