শুক্রবার, ডিসেম্বর ১৩
TheWall
TheWall

বাংলার বেসরকারি রেডিও থেকে ক্রমশ উবে যাচ্ছে বাংলা ভাষা

সৌভিক গুহসরকার

যদিও আজও জেলা এবং মফস্বলের বহু তরুণ-তরুণীরা বেসরকারি এফ-এম রেডিও শোনেন, তবু, এই রেডিও মূলত শহরকে কেন্দ্র করে চলে থাকে। কী গান চালানো হবে, কী কথা বলা হবে—এসব কিছুই নির্ধারিত হয় নাগরিক রুচি, নাগরিক পছন্দকে মাথায় রেখে। বেসরকারি রেডিও মূলত একটি ‘আর্বান’ বস্তু। তার মূল অন্বেষণ, নাগরিক নবীন-নবীনারা কী চান, নাগরিক তরুণ-তরুণীরা কী চান? এবং একইসঙ্গে কীভাবে এই বয়সভিত্তিক সম্প্রদায়কে প্রভাবিত করা যায়।

আজ থেকে কয়েকবছর আগে পর্যন্ত (২০১৫-১৬) বাংলার বেসরকারি এফ-এম রেডিও চ্যানেলগুলোতে গান চলত হিন্দি ও বাংলা মিলিয়ে, কিন্তু উপস্থাপক বা রেডিও জকিরা কথা বলতেন বাংলা ভাষায়। তবে, বাংলার এফ-এম  রেডিওর মধ্যে বরাবরই একটা নাগরিক স্মার্টনেসের স্রোত প্রবহমান ছিল। জকিরা ছিলেন আদ্যন্ত শহুরে। অনেকেই কায়দা করে ‘একসেণ্টেড’ বাংলা বলেছেন। কোনও কোনও রেডিও স্টেশনে দেখা গিয়েছে যে বাঙালি জকির নাম শহুরে বা স্মার্ট করার প্রচেষ্টাও চলেছে। কোথাও দেবস্মিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ডেবি’ আবার কোথাও শ্রাবণী হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘স্যাবি’। কিন্তু এসবের মধ্যেও বাংলা ভাষার একটা অস্তিত্ব ছিল। আটটি এফ-এম  রেডিও স্টেশনের মধ্যে মাত্র একটিতে জকিরা হিংলিশ বা হিন্দি-মিশ্রিত-বাংলা বলতেন এবং আমরা জানতুম যে এই চ্যানেলটি মূলত হিন্দিভাষী মানুষদের জন্যে। বাংলা স্টেশনগুলোতে জকিরা যে বিশুদ্ধ বাংলায় কথা বলতেন তা নয়, সেই বাংলার মধ্যে মিশে থাকত কিছু ইংরিজি বাক্য। বা কিছু হিন্দি শব্দ। এটা খানিকটা সচেতনভাবেই করা হত, কারণ আমরা কেউই বাংলা বলার সময় সবকটা শব্দ বাংলাভাষার ভাণ্ডার থেকে ব্যাবহার করি না। আমাদের কথা বলার সময় আমরা ইংরিজি-বাংলা-হিন্দি মিশিয়ে একটা খিচুড়ি ভাষা বলি। যিনি উপস্থাপন করছেন, তিনিও যেহেতু নবীন এবং তরুণদের সঙ্গে ‘কানেক্ট’ করতে চাইছেন এবং তিনি তাদেরই একজন, তাই তার ভাষা বিশুদ্ধ না হওয়াই বাঞ্ছনীয়। ভাষা খুব পরিশীলিত হলে একটা দূরত্ব তৈরি হয় এবং সেটা স্টেশনের রেটিং-এ প্রভাব ফেলতে পারে। যেটা আবার ব্যাবসার দিক থেকে ক্ষতিকারক। তাই সাতপাঁচ ভেবে রেডিওর কর্তৃপক্ষরা জকিদের ‘কনটেম্পোরারি লিঙ্গো’ ব্যাবহার করতে বলতেন, যার ফলে জকিরা একটা পাঁচমিশেলি ভাষা বলতেন যেটা নবীন বা তরুণ প্রজন্ম বলে থাকেন, তবু সেই ভাষার ভিত্তি ছিল বাংলা।

কিন্তু আজ এই ২০১৯-এ দাঁড়িয়ে আমরা কলকাতার বুকে দেখছি একটা অদ্ভুত পরিবর্তন। একটি পর একটি স্টেশন বাংলাকে সরিয়ে হিন্দিভাষী হয়ে উঠছে। আগামী এক বছরের মধ্যে কলকাতার সাতটি স্টেশনের মধ্যে হয়ত তিনটি কী চারটি স্টেশন হিন্দিভাষী হয়ে উঠবে। এর মূল কারণ কি এই যে, যেসব বিজনেস গ্রুপ এইসব স্টেশনগুলোকে কিনছে তারা প্রত্যেকেই অবাঙালি, তাই স্টেশনগুলো হিন্দি হয়ে যাচ্ছে? হিন্দি কালচার তারা চাপিয়ে দিচ্ছে বাংলার নতুন প্রজন্মের ওপর? এর খানিকটা সত্য বটে। চাপানো হচ্ছে অবশ্যই। কিন্তু পুরোটা নয়।

গত দু–তিন বছরে কলকাতা তো বটেই, এমনকি মফস্বলের তরুণ-তরুণীদের মানসিকতায় এসেছে বিরাট পরিবর্তন। সারা পৃথিবী এখন তাদের হাতের মুঠোয়। তারা প্রত্যেকেই কমবেশি পরিচিত অন্য সংস্কৃতির সঙ্গে। দিশি, বিদেশি। বাংলার কোন জেলা বিশুদ্ধ আছে আজও? কোন মফস্বলী টাউন? কলকাতার কথা বাদই দিচ্ছি। জেলা ও মফস্বলের নবীন-নবীনা, তরুণ-তরুণীদের মধ্যে অনেকেই ইন্টারনেটের দৌলতে এখন ইংরিজি ও হিন্দি যথেষ্ট বুঝতে পারেন। সুতরাং যখন নানাস্তরে সমীক্ষা করা হয়েছে, তখন দেখা গেছে বাংলার নবীন-নবীনাদের হিন্দি শুনতে কোনও আপত্তি নেই। তারা হিন্দি গান শুনছে, তারা হিন্দি ছবি দেখছে, তাদের কথা বলার মধ্যে প্রচুর হিন্দি শব্দ ঢুকে যাচ্ছে, তাহলে রেডিও-স্টেশন হিন্দি হলে আপত্তি কী! রেডিও কি আর জকির কথার জন্যে শোনা হয়! রেডিও শোনা হয় গান শোনার জন্যে। সঙ্গে ভালো জকি থাকলে উপরি পাওনা, না হলে শুধু ভালো গান চালালেই চলবে।

এসবের মধ্যে থেকে একটা সত্য, অপ্রিয় হলেও উঠে আসছে। তা হল, কলকাতার নবপ্রজন্মের বাঙালির কাছে বাংলা ভাষাটা হয়ত আর খুব গুরুত্বপূর্ণ নয় (যাঁরা কাব্য বা সাহিত্য চর্চা করেন, তাঁদের কথা বলছি না)। কলকাতার নবপ্রজন্ম চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে যে শুধু বাংলা জানলে খেতে পাবে না, শুধু বাংলা জানলে চাকরি পাবে না, শুধু বাংলা জানলে ভারতের অন্যান্য জায়গায় চাকরি করতে যেতে পারবে না। তাহলে বাংলাটা তাদের কাছে কী? হয়ত একটা ভালোবাসা যেটা নিয়ে আবেগ প্রকাশ করা যায়, কিন্তু যেটা জীবনের উন্নতির ক্ষেত্রে সাহায্য করে না। কিন্তু হিন্দি জানলে, আজকের দিনে অনেকটা এগোনো যায়, ভারতের অন্যান্য জায়গায় কাজ করা যায় আর ইংরিজি জানলে তো কথাই নেই। সোনায়-সোহাগা। তাহলে রেডিও স্টেশন বাংলায় চলল না হিংলিশ-এ, তাতে তাদের হয়ত কিছুই যায় আসে না। এছাড়া আরও একটি সত্যের সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে বাংলা ভাষা, সেটি হল বাংলা ভাষার কোনো ‘অ্যাস্পিরেশনাল’ মূল্য নেই আর। যখন কেউ হিন্দি ছবির বৈভব দেখছে, হিন্দি তারকাদের মহামূল্য লাইফস্টাইল দেখছে, তখন সে ভাবছে যে, আরেব্বাস! এই ভাষা আমাদের স্বপ্নের দরজা খুলে দিচ্ছে। হিন্দি ভাষায় কাজ করলে অনেক টাকা করা যায়! তাহলে তো ওটাই ভালো করে জানলে হয়। বাংলাকে অত গুরুত্ব দেবার দরকারটা কি! আর এই সত্যগুলো, যারা লগ্নি করছে, তারা কোথাও গিয়ে বুঝতে পারছে এবং তাই দ্রুত ঘটে যাচ্ছে অঙ্ক-পরিবর্তন।

কিন্তু পাশাপাশি আমরা যখন টেলিভিশনের দিকে চোখ রাখছি, তখন দেখতে পাচ্ছি যে সেখানে জিইসি চ্যানেলগুলোয় হই-হই করে চলছে বাংলা। সিরিয়াল, সে যেমনই হোক না কেন, তা বাংলা ভাষাতেই হচ্ছে। অন্যান্য অনুষ্ঠানগুলোও বাংলা ভাষাতেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কেন? এটার মূল কারণ হল, টার্গেট অডিয়েন্স। বেসরকারি রেডিওতে পঁয়ত্রিশোর্ধ্ব মানুষদের শ্রোতা বলে মনে করা হয় না। তাঁরা রেডিও শুনতেই পারেন, কিন্তু প্রোডাক্টটি তৈরি করা হয় ১৮-৩৪ বছরের নাগরিক শ্রোতাদের জন্যে। কোনও কোনও রেডিও স্টেশন আবার ১৮-২৭ বছরের নাগরিক শ্রোতাদের জন্যে প্রোডাক্টটিকে তৈরি করে। এর নেপথ্যে রয়েছে একটি বিরাট ব্যবসায়িক অঙ্ক। অপরদিকে টেলিভিশনের ক্ষেত্রে প্রথমত, টার্গেট অডিয়েন্সের বয়সের কোনো ধরাবাঁধা ব্যাপার নেই। নবীন-নবীনারা দেখছেন, দেখছেন গৃহবধূরা, আবার দেখছেন বয়স্ক মানুষেরা – যাঁদের কাছে ওই সিরিয়ালই মনোরঞ্জনের জায়গা। দ্বিতীয়ত, বাংলার অন্যান্য জেলাগুলি কলকাতার মতো এখনও বাংলা-উদাসীন নয়। সেখানে এখনও নাগরিক চাকচিক্য এইভাবে প্রবেশ করেনি। সেখানে কমিউনিকেশনের মাধ্যম এখনও বাংলা। তাই রাজ্যের অন্যত্র বাংলা চালাতেই হবে কারণ সেখানে বাংলা না-চালালে ব্যাবসার ক্ষতি হবে।

কলকাতার বুকে আগামী কয়েক বছরে বেসরকারি এফ-এম রেডিওর ‘হিন্দিভাষায়ণ’-এর দিকে তাকিয়ে আমরা খানিকটা শঙ্কিত হব। শুনেছিলুম, চেন্নাইতে হিন্দি সংস্কৃতি বিস্তার করতে গিয়ে জনতার কোপের মুখে পড়তে হয়েছিল একটি রেডিও চ্যানেলকে। কলকাতা অবশ্য এখনও পর্যন্ত তেমন কিছু দেখেনি। কিন্তু ভবিষ্যতেও যে দেখবে না, তা কে বলতে পারে! একসময়ে এ ব্যাপারে হয়ত সরকারি হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হবে, না হলে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যেতেও পারে।

মতামত নিজস্ব

লেখক প্রাক্তন বেসরকারি রেডিও কর্মী

Comments are closed.