সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৬

মহরমের গুরুত্ব কেবল কারবালার যুদ্ধ প্রান্তরেই নয়

সৈয়দ হিমেল ইব্রাহিম

দিন কয়েক ধরেই পাড়ার খুদেরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে টাকা, চাল, ডাল, আলু সংগ্রহ করছে। যার যেমন সাধ্য তিনি সেই অনুযায়ী তাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন। ছেলেমেয়েরা তাই দিয়েই লেগে পড়ছে খিঁচুড়ি রাঁধতে। নিজেরা পাত পেড়ে ভাগাভাগি করে খাচ্ছে। বাড়ি বাড়ি পৌঁছেও দিচ্ছে। তখন আমিও খুব ছোট। বাড়ির শাসনে সব সময় না হলেও আমিও জুটে যেতাম ওদের সঙ্গে কখনও সখনও। ছোটবেলায় এই ছিল আমার মহরম। এখন মহরম এলেই সেই ছোট ছোট মুখগুলো খুব মনে পড়ে। আজ এত রক্তারক্তির মাঝে ওই নিষ্পাপ মুখ আর ওদের স্মৃতিগুলোই খানিক যা স্বস্তির।

ইসলামিক বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস হল ‘মহরম’। কোরানে উচ্চারিত চারটি পবিত্রতম মাসের মধ্যে অন্যতম এই মহরম মাস। বাংলা ‘মহরম’ উচ্চারণ এসেছে আরবি শব্দ ‘মুহররম’ থেকে।  যার অর্থ ‘পবিত্র’, ‘সম্মানিত’, ‘গুরুত্বপূর্ণ’। এই মাসেই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ, পবিত্র কাজ হয়েছিল, তাই এই মাসের এমন নাম। ইসলামিক শাস্ত্র অনুযায়ী, এ মাসে রয়েছে অনেক বিজয় আর গৌরবমাখা ঐতিহ্যের স্মৃতি। এ মাসেই বহু নবি-রসুল ইমানের কঠিন পরীক্ষার মাধ্যমে মুক্তি ও নিষ্কৃতি পেয়েছিলেন। আসমান-জমিন সৃষ্টি করা হয়েছে এই মহরম মাসেই। চাঁদ-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র, পাহাড়-পর্বত, সাগর-মহাসাগর সৃষ্টি করা হয় এই মহররম মাসেই। আবার মহরমের ১০ তারিখ বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন দিন। যাকে ‘আশুরা’ বলে। আরবি ‘আশারা’ শব্দ (যার অর্থ দশ) থেকে ‘আশুরা’–র উৎপত্তি। ইসলামিক ঐতিহ্যে সৃষ্টির শুরু থেকেই ১০ই মহরম তথা আশুরার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। আদি জীব আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে ১০ই মহরম। ১০ই মহরমই আদমকে বেহেশতে (স্বর্গ) প্রবেশ করানো হয়েছে। আশুরাতেই আদমকে বেহেশত থেকে দুনিয়ায় প্রেরণ করা হয়েছিল। হাওয়া-র সঙ্গে আদম পুনরায় সাক্ষাত হয় এই ১০ই মহরমেই। এর পাশাপাশি কিছু ইসলামিক ঐতিহ্যের ঘটনাও (যেমন ইব্রাহিম নবির জন্ম, হজরত মুসা নবির অত্যাচারী ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি, হজরত মুসা নবি এবং আল্লাহর মধ্যে কথোপকথন ইত্যাদি) প্রতিটি মুসলমানের জীবনে আশুরার দিনের তাৎপর্য বাড়িয়েছে। মুসলমানরা দিনটিকে ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্যের মধ্যদিয়ে পালন করে থাকেন। আশুরা এবং তার আগের বা পরের দিনের সঙ্গে মিলিয়ে দু’দিন রোজা রাখা মুসলমানদের জন্য একটি পবিত্র পালনীয় কর্তব্য।

এ সব কিছু ছাড়িয়ে বর্তমানে মহরম মাসকে ঘিরে যে ঘটনাটি সব থেকে বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে, তা হল ১০ মহরম (অর্থাৎ আশুরার দিন) কারবালা প্রান্তরে হজরত ইমাম হোসেনের শহিদ হওয়া। ঠিক কী ঘটেছিল সেখানে? ঐতিহাসিক কারবালা প্রান্তর ইরাকের ইউফ্রেটিস নদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত। ১৪০০ বছর আগে এই কারবালা প্রান্তরেই হজরত মহম্মদের নাতি ইমাম হোসেনকে এক অসম লড়াইয়ের সম্মুখীন হতে হয়। কারবালার প্রান্তরে এই সংঘাত কোনও সংগঠিত বা ঘোষিত যুদ্ধ ছিল না। ছিল নবির বংশ তথা ‘আহলে বায়ত’কে হত্যা করার এক ঘৃণ্য চক্রান্ত। আরবের মক্কা হতে ইরাকের কুফা যাওয়ার পথে ইমাম হোসেনের পরিবারকে কারবালা প্রান্তরে ইয়াজিদের তিরিশ হাজার সৈন্য পথ অবরোধ করে। প্রচণ্ড সূর্য তাপে উত্তপ্ত মরুপ্রান্তরে পিপাসার্ত পরিবারকে দীর্ঘ আট দিন কোনও জল স্পর্শ করতে দেওয়া হয়নি। পরিবারের কনিষ্ঠতম শিশুকেও জলের পরিবর্তে তিরবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়। শিশু ও মহিলাসহ সপরিবারে সপার্ষদে তিনি প্রাণ হারান। হত্যাকারীর সকলেই ছিল নামধারী মুসলমান। কারবালার হত্যালীলা ইয়াজিদের কোনও পার্থিব লাভের জন্য বা রাজ্য জয়ের জন্য হয়নি। ছিল কেবল সত্যকে সহ্য করতে না পারার ঔদ্ধত্য ও অহংকার। ইসলামিক ঐতিহ্যে তাই কারবালা কেবল যুদ্ধক্ষেত্র নয়, তা সত্য মিথ্যা চিহ্নিত করার পবিত্র ভূমি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই মহরম মাস এবং আশুরার দিনকে ঘিরে শিয়া ও সুন্নি মতাবলম্বীদের তর্ক বহু কালের। তার বিস্তারে যাচ্ছি না। কিন্তু দিনের শেষে ফল দাঁড়িয়েছে, এত কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী এই মহরম মাস। অথচ বর্তমান মুসলমান জগতে সেই সমস্ত কিছুর স্মৃতি ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে পড়ছে। এখন মহরম মাস এলেই সকলের কেবল কারবালার যুদ্ধের কথা মনে পড়ে। সেই সঙ্গে রাস্তায় রাস্তায় মানুষ ‘হায় হাসান, হায় হোসেন’ ধ্বনিতে অস্ত্র খেলায় মেতে ওঠেন। শিশু থেকে বৃদ্ধ— তাদের শরীর জুড়ে রক্ত ঝরে পড়ার অস্বস্তিকর দৃশ্য ভুলিয়ে দেয় আশুরার  সমস্ত তাৎপর্য। অথচ অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান, যেমন ইদ-উল-ফিতর (ইদ) ও ইদুজ্জোহার (কুরবানি) মতো ‘মহরম’ কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। নতুন কাপড় পড়া, খাওয়া-দাওয়া মধ্যে দিয়ে এর সমাপ্তি হয় না। আল কোরানের বিধান অনুযায়ী, পবিত্র মাসে যুদ্ধবিগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এ ছাড়াও পবিত্র মাসে কোনও ধরনের বিশৃঙ্খলা, পাপাচার থেকেও দূরে থাকতে বলা হয়েছে। এ কারণে ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের কাছে এই মাসটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের অধিকাংশই বরং এই দিন রোজা, নমাজ পাঠ, কোরান পাঠ, দরিদ্র অসহায়দের দান-দক্ষিণার মধ্যে দিয়ে নীরব শ্রদ্ধা পালন করে থাকেন। আবার অনেকে তাজিয়া বানিয়ে পাশাপাশি ধর্মীয় গান (জারি গান বা মর্শিয়া) করতে করতে নিজেদের শোকজ্ঞাপন করেন। প্রতি বছর তার নতুন নতুন রূপে, নতুন আঙ্গিকে, নানা বৈচিত্রে তাঁরা গেয়ে চলেন জারি লোকগাথা (মর্শিয়া)। এই জারি গান বহু যুগ ধরে তার করুণ ও বেদনার সুরে মধ্যপ্রাচ্য-বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গকে এক সুতোয় বাঁধতে সক্ষম হয়েছে। মহরমের কয়েক দিন আগে থেকেই মহরমের স্থানে জারি গান গাওয়া হয়। বিশেষত মহরম পরবের শেষ দিনের আগের রাত সারারাত জেগে ধর্মপ্রাণ মুসলমান জারি গান শোনেন। এই গান অনেকটা চৈত্রের গাজনে জাগরণের রাতে বোলান গান শোনার মতো। মহরমের মিছিলের সঙ্গে অথবা পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে এই গান পরিবেশিত হয়। হাসান হোসেনের অনুগামীরা কীভাবে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন, পিপাসায় জলের পরিবর্তে তিরের আঘাতে নিহত হয়েছিল দুগ্ধ পোষ্য শিশু, নববিবাহিত কাশেম নববধূ সখিনার সঙ্গে দাম্পত্যের একটি মধুর রজনীও উপভোগ না করে রণে গিয়ে বীরের মৃত্যুবরণ করেন— জারিগানে এ সমস্ত কিছুই মহাকাব্যিক বিশাল পটভূমিতে রচিত হয় গ্রামীণ শিল্পীদের দ্বারা। অথচ দুর্ভাগ্যের বিষয়, আজ মহরম বলতেই যে কারও মনে কেবল লাঠি, তলোয়ার, বল্লম ও তীব্র গান-বাজনার তালে (ইদানিং ডিজে-বক্সের আমদানিও হয়েছে) কিছু মানুষের যুদ্ধের মহড়ার ছবিই ভেসে ওঠে। যে ছবি এ দেশে কেবল ইসলামের একটি একমাত্রিক ছবিই তৈরি করছে না, সঙ্গে তুলে দিচ্ছে হিন্দুত্ববাদীদের হাতে অস্ত্রও। মহরম বনাম রামনবমীর এই নয়া ‘রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব’ সুস্থ হিন্দু-মুসলমানের গড়ে তোলা এই যৌথ বাংলায় আরও বেশি করে বিষ ঢোকাচ্ছে।

আশার বিষয় হল, সংখ্যায় অল্প হলেও মুসলমানদের অন্দরমহলেই গত কয়েক বছর থেকে মহরম সম্পর্কে ধারণা পাল্টাচ্ছে। মহরম এবং আশুরার প্রকৃত তাৎপর্য সম্বন্ধে তাঁরা অবগত হচ্ছেন। আনন্দ উল্লাসে না মেতে, উৎসব হিসাবে সাড়ম্বরে উদযাপন না করে সংযম, আত্মশুদ্ধি, দান খয়রাত এবং ধর্মীয় আলোচনা দ্বারা তাঁরা এই দিনটিকে প্রকৃত অর্থে জানার চেষ্টায় সক্রিয় হয়েছেন। কেউ কেউ ‘হায় হাসান, হায় হোসেন’ ধ্বনিতে রক্ত না ঝরিয়ে এই দিনটিতে রক্তদান শিবিরের ডাক দিচ্ছেন। কেউ কেউ ইতিমধ্যেই সেই আয়োজনও করে ফেলেছেন। আসুন, আজ এই পবিত্র আশুরার দিন থেকেই সত্য ইতিহাস প্রচারের মাধ্যমে মহরম সম্পর্কে (অন্দরে-বাইরে) মানুষের মনে যে একমাত্রিক ধারণা তৈরি হয়েছে, তা আমরা সমূলে উৎপাটন করি। মানুষ হিসাবে এই দুনিয়ায় আমাদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করি। বেঁধে দেওয়া চিহ্নের গণ্ডি ছাড়িয়ে আল্লাহ-ঈশ্বরের সৃষ্টির ভিন্নতা ও বহুস্বরের বৈচিত্রের প্রকৃত গুরুত্ব উপলব্ধি করি।

লেখক তরুণ আইনজীবী

Comments are closed.