পাঁচিলের উপর যাঁরা বসে আছেন, মুকুল-আবদুল্লাহদের সামনে রেখে তাঁদেরকেই বার্তা মোদী-শাহর

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

শঙ্খদীপ দাস 

দিলীপ ঘোষ, সুব্রত চট্টোপাধ্যায়রা রক্ষণশীল। তা হওয়ারই কথা। ছোটবেলা থেকে আরএসএসের শাখা করে বড় হয়েছেন দিলীপবাবুরা। সঙ্ঘের শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা ও শিষ্টাচার রপ্ত করেছেন। তাই বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারের ‘পিউরিটি’ নিয়ে তাঁদের স্পর্শকাতরতা স্বাভাবিক।

কিন্তু নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহরা যে ততটা রক্ষণশীল নন তার প্রমাণ তাঁরা আগেও বারবার দিয়েছেন। গুজরাতের এই যুগলবন্দী বর্তমান সময়ের রাজনীতিতে হাত পাকিয়েছেন। এবং মোদী-অমিত শাহরা হয়তো মনে করেন, যে সব রাজ্য বা এলাকায় বিজেপির চিরাচরিত ভাবে শক্তি বা উপস্থিতি নেই, সেখানে বড় হতে গেলে মঙ্গল গ্রহ থেকে নেতা আনা যাবে না। সেই সব রাজ্য বা এলাকায় অন্য দলে যে সফল রাজনীতিকরা রয়েছেন, প্রয়োজনে তাঁদের দলে টানতে হবে। বাংলা বা কেরলে বিজেপির পোড় খাওয়া বা মজবুত নেতা যখন নেই, তখন তৃণমূলের মুকুল রায় বা সিপিএমের আবদুল্লা কুট্টির মতো ভিন দল থেকে আসা নেতাদের উপরই ভরসা করতে হবে।


এ রাজনীতি সঠিক না বেঠিক, রাজনীতিতে মতাদর্শের আর কোনও গুরুত্ব রয়েছে কিনা সে আলোচনা এখানে করছি না। এই প্রতিবেদনে আলোচনার বিষয়বস্তু হল মোদী-অমিত শাহদের রাজনীতি। সেই সঙ্গে অবশ্যই সমকালীন রাজনীতির প্রসঙ্গও চলে আসবে এখানে।

অসমের কথাই ধরা যাক। সেখানে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনওয়াল এক সময়ে অল অসম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন ও পরে অসম গণ পরিষদের নেতা ছিলেন। পরে বিজেপিতে এসেছেন। অসমে তাঁকে মুখ্যমন্ত্রী পদে বেছে নিয়েছেন মোদী-শাহ। একই ভাবে অসমের বিজেপি সরকারের অর্থ ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা আগে ছিলেন কংগ্রেসে। তরুণ গগৈ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন তিনি। এ ব্যাপারে কোনও সংশয় নেই, হিমন্তের মতো পোড় খাওয়া নেতাকে দলে না টানলে অসমে ক্ষমতা দখল করা এখনও অধরাই থেকে যেত বিজেপির।
এও অস্বীকার করার উপায় নেই বাংলাতেও গত বিশ-ত্রিশ বছরে বিজেপিতে কোনও বড় মাপের নেতা তৈরি হননি। তপন শিকদারের পর এমনও কোনও নেতা তৈরি হননি যাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল বা রয়েছে। বিজেপি-র বর্তমান নেতৃত্বের সিংহ ভাগ নেতার যেমন দীর্ঘ সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা নেই, তেমনই ভোট রাজনীতি, বুথ ম্যানেজমেন্টের অভিজ্ঞতাও কম। যে টুকু অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাতে তৃণমূল বা সিপিএমের সঙ্গে মোকাবিলা করা বেশ কঠিন।

এ হেন পরিস্থিতিতে তৃণমূল থেকে আসা প্রবীণ মুকুল রায়ের উপর সঙ্গত কারণেই ভরসা করতে শুরু করেছিলেন মোদী-অমিত শাহ। সংগঠনে কোনও পদ এতদিন তাঁকে দেননি ঠিকই কিন্তু লোকসভা ভোটে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন মুকুলবাবুকে। পরে শহিদ মিনারের মঞ্চ থেকে অমিত শাহ পষ্টাপষ্টিই স্বীকার করেছিলেন, উনিশের ভোটে বাংলায় বিজেপির ১৮ টি আসন জেতার অন্যতম কারিগর ছিলেন মুকুল বাবু। শুধু মুকুলবাবু কেন, সব্যসাচী দত্ত, নিশীথ প্রামাণিক, অর্জুন সিং, সৌমিত্র খাঁ, খগেন মুর্মুর মতো তৃণমূল বা সিপিএম থেকে বিজেপিতে আসা নেতারাও তাঁদের কার্যকারিতার প্রমাণ দিয়েছেন। ধাপে ধাপে সেই কারণেই তাঁদের সংগঠনে স্বীকৃতিও দিলেন অমিত শাহ। সব্যসাচী, খগেন মুর্মু, সৌমিত্র, অর্জুন সিংরা রাজ্য সংগঠনে পদ বা দায়িত্ব পেয়েছেন। এ বার সর্বভারতীয় সংগঠনে সহ সভাপতি পদে বসিয়ে মুকুল রায়ের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক মর্যাদা বাড়াতে চাইলেন অমিত শাহ।

এর নেপথ্যে অন্য উদ্দেশ্যও নিশ্চয়ই রয়েছে নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহদের। তৃণমূল বা সিপিএম থেকে এখনও যে সংখ্যক নেতা বিজেপিতে এসেছেন, তা পর্যাপ্ত নয় বলেই সম্ভবত তাঁরা মনে করেন। হয়তো তাঁরা এও আশা করেন, তৃণমূল বা সিপিএম থেকে আরও অনেক বিধায়ক বা সাংসদ বিজেপি-তে যোগ দিতে আগ্রহী। কিন্তু ঝুঁকি নিতে সাহস পাচ্ছেন না। কিংবা দেখতে চাইছেন, মুকুল রায়দের কী পরিণতি হয়। কেরলের সিপিএম নেতা আবদুল্লাহ কুট্টি ও মুকুল রায়কে সর্বভারতীয় বিজেপির সহ সভাপতি করে হয়তো তাঁদেরই বার্তা দিতে চাইলেন মোদী শাহ।

এখানে একটা কথা মনে করিয়ে দেওয়া যেতে পারে—লোকসভা ভোটের সময় বাংলায় প্রচারে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী একবার বলেছিলেন, তৃণমূলের অন্তত চল্লিশ জন বিধায়ক তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।

বস্তুত নরেন্দ্র মোদী বা অমিত শাহ যে একেবারে নতুন ফর্মুলা আবিষ্কার করেছেন তা নয়। সর্বভারতীয় রাজনীতিতে এখন এই ধারাই চলছে। বাংলার কথাই ধরা যাক। ২০১৬ সালের ভোটে বাংলায় ২১১ টি আসনে জিতেছিল তৃণমূল। সেই বিপুল সাফল্যের মধ্যেও কাঁটা হয়ে বিঁধছিল মুর্শিদাবাদ, মালদহ, উত্তর দিনাজপুরের অপ্রাপ্তি। মালদহে একটিও আসনে সেবার জেতেনি তৃণমূল। তার পর থেকে মুর্শিদাবাদ, মালদহে এলোপাথাড়ি ভাবে কংগ্রেস ও সিপিএম ভাঙানোর চেষ্টায় নেমে পড়ে বাংলার শাসক দল। তা ছাড়া বিষ্ণুপুরের কংগ্রেস বিধায়ক তুষার ভট্টাচার্য, সবংয়ের কংগ্রেস বিধায়ক মানস ভুঁইঞাদেরও ভাঙাতে নেমে পড়েন তাঁরা। সে ক্ষেত্রেও কারণ ছিল পরিষ্কার। মুর্শিদাবাদ ও মালদহে তৃণমূলের সাংগঠনিক তাকত কস্মিনকালেও ছিল না। সেই পরিস্থিতিতে মঙ্গলগ্রহ থেকে নেতা আনা সম্ভবও ছিল না তৃণমূলের। তাই কংগ্রেস বা সিপিএম থেকেই নেতা আনা হয়েছে। কাউকে সাংগঠনিক পদ দেওয়া হয়েছে তো কাউকে রাজ্যসভার সাংসদ করা হয়েছে। কাউকে আবার বিভিন্ন বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে।

অমিত শাহদের রাজনীতি তার থেকে ভিন্ন কিছু নয়। বরং পাঁচিলের উপর যাঁরা বসে আছেন, ঝাঁপ দেবেন কি দেবেন না ইতস্তত করছেন, তাঁদের হয়তো খোলাখুলি বার্তা দিতে চাইছেন তিনি। বলতে চাইছেন, ভয় নেই, জলে পড়বেন না, চলে আসুন। যোগ্যতা থাকলে ঠিকঠাক পুনর্বাসন পাওয়া যাবে।
অমিত শাহদের এই পদক্ষেপে দিলীপ ঘোষদের উদ্দেশেও বার্তা রয়েছে। যে মুকুল রায়ের উদ্দেশে নানা সময়ে ঘরে বাইরে দিলীপ ঘোষ ও তাঁর অনুগামীরা কটাক্ষ করেছেন, তাঁদের বোঝানো হয়েছে—অন্য দল থেকে যাঁরা এসেছেন তাঁদেরও মর্যাদা দিতে হবে। কারণ, দুর্নীতির অভিযোগ পাশে সরিয়ে রাখলে (এই কারণেই পাশে সরিয়ে রাখতে চাইলাম যে, সে প্রসঙ্গ ছানবিন শুরু করলে ডান দিক, বাম দিক তাকালে অনেকের কথাই বলতে হয়। অভিযোগ, কার বিরুদ্ধে নেই সেটা খোঁজাই মুশকিল) মুকুলবাবুদের রাজনৈতিক যোগ্যতা রাজ্যের আজন্ম এবং খাঁটি বিজেপি নেতাদের অনেকের থেকে বহুগুণে বেশি। বাংলায় বাম দুর্গের পতন ঘটাতে যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবিসংবাদিত ভূমিকা থাকে, তা হলে সেই কর্মকাণ্ডে দিদিকে উদয়াস্ত সঙ্গত করা, জমিতে ঘুঁটি সাজানো, নির্বাচন কমিশনে ছোটাছুটি করা মায় মুকুলবাবুর পরিশ্রম ও উদ্যোগ কম ছিল না। কেন্দ্রে রেলমন্ত্রী ছিলেন তিনি। ভুলে গেলে চলবে না, তখন সিপিএমকে হারিয়ে বাংলায় একটা বিধানসভা আসনে জেতার ক্ষমতাও তখন ছিল না বিজেপির।
তবে হ্যাঁ দল ভাঙানোর রাজনীতি সঠিক না বেঠিক, মতাদর্শের প্রতি নিষ্ঠা উচিত না শিকেয় তুলে রাখা হবে—সে প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে। তা নিয়ে না হয় অন্য একদিন আলোচনা হবে। ‘

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More