কোনও বড় মাথাকে আড়াল করার চেষ্টা হচ্ছে না তো?

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রঞ্জিত শূর

শুক্রবার সকালেই খবর এল, হায়দরাবাদে পশুচিকিৎসক মেয়েটির চার ধর্ষক ও খুনি মারা পড়েছে পুলিশের গুলিতে। হায়দরাবাদের পুলিশ কমিশনার ভি সি সাজ্জানার সাংবাদিক বৈঠক করে বলেছেন, এদিন শেষরাতে পুলিশ অভিযুক্তদের ঘটনাস্থলে নিয়ে যাচ্ছিল। উদ্দেশ্য ছিল ঘটনার রিকনস্ট্রাক্ট করা। আচমকাই চার অপরাধী পালাতে চেষ্টা করে। পুলিশের বন্দুক কেড়ে নিতে চেষ্টা করেছিল। গুলি না চালিয়ে উপায় ছিল না।
আমরা, মানবাধিকার কর্মীরা মনে করি, এ হল ঠান্ডা মাথার খুন। খুব পরিকল্পনা করে চারজনকে মারা হয়েছে। প্রশাসনের সর্বোচ্চ মহল থেকে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় তদন্ত ছিল প্রাথমিক পর্যায়ে। আমরা ওই তরুণীর মৃত্যু সম্পর্কে যা কিছু শুনেছি সবই পুলিশের মুখে। যেভাবে চারজনকে মেরে ফেলা হল, তাতে সন্দেহ জাগে, কাউকে আড়াল করার চেষ্টা হচ্ছে না তো? কোনও বড় রাজনীতিক বা পুলিশের কর্তাব্যক্তির নাম যাতে ফাঁস না হয়, সেজন্যই কি চারজনকে তড়িঘড়ি মেরে ফেলা হল?
পুলিশ যা বলছে বিশ্বাস করার কোনও কারণ নেই। প্রথমে তারা মেয়েটির নিখোঁজ হওয়ার খবর শুনে গা করেনি। এমনকি তাঁর সম্পর্কে অশালীন মন্তব্য করেছে। এখন পুলিশ বলছে, চারজনকে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। আমাদের প্রশ্ন, রাতের বেলায় কেন? দিনের বেলায় নিয়ে গেলে কী ক্ষতি হত?
এই সব পুনর্নির্মাণের ক্ষেত্রে ভিডিওগ্রাফি করা হয়। প্রশ্ন হল, এদিন আদৌ কি ভিডিও ছবি তোলা হয়েছিল? যদি হয়ে থাকে, সেই ভিডিও পুলিশ কাউকে দেখাচ্ছে না কেন?
অভিযুক্তরা যদি সত্যিই পুলিশকে মেরে পালানোর চেষ্টা করে থাকে, পুলিশের তরফেও কারও না কারও আহত হওয়ার কথা। কই তাদের কেউ আহত হয়েছে বলে তো শোনা যাচ্ছে না।
সবচেয়ে বড় কথা, চারজন নিম্নবর্গের মানুষ, যাদের ঘিরে আছে সশস্ত্র পুলিশ, তারা পালানোর চেষ্টা করেছিল, এমনটা হওয়া সম্ভব নয়। পুরো ব্যাপারটা মনে হচ্ছে সাজানো চিত্রনাট্য মাফিক ঘটানো হয়েছিল। পুলিশ যে গল্পটা বলছে, সেরকম সস্তা হিন্দি ছবিতে দেখা যায়। গত বছর ‘সিম্বা’ নামে একটি ছবি মুক্তি পেয়েছিল। তাতে দেখিয়েছিল, বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতায় বিরক্ত হয়ে শেষকালে অপরাধীকে গুলি করে মারল। সেই দেখে হল ফাটিয়ে হাততালি দিয়েছিল দর্শক। এবার রাষ্ট্রও মানুষকে একটা ওইরকম গল্প বলে ভুলিয়ে রাখতে চাইছে।
২০১২ সালে নির্ভয়া হত্যাকাণ্ডের সময় আমরা দেখেছিলাম, মানুষ অপরাধীদের দ্রুত শাস্তি চেয়ে আন্দোলনে নেমেছিল। দাবি করেছিল, পুলিশ-প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। হায়দরাবাদের ঘটনাতেও একই দাবি উঠছিল। বোঝা যাচ্ছিল, যেভাবে বছরের পর বছর ধরে বিচার চলে, তাতে মানুষ বিরক্ত হয়ে উঠেছেন।
বিচার শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগার কারণ আছে। কলকাতা হাইকোর্টেই ৩২ জন বিচারপতির পদ শূন্য। নিম্ন আদালতেও বহু বিচারক ও অন্যান্য কর্মীর পদ ফাঁকা পড়ে আছে। বিচারব্যবস্থায় গতি আনতে গেলে দ্রুত শূন্য পদগুলি পূরণ করার উদ্যোগ নিতে হত। রাষ্ট্র সে পথে যাচ্ছে না। মানুষকে আন্দোলন ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য সহজ পথ বেছে নিয়েছে। এ হল এক ধরনের মনোরঞ্জক রাজনীতি।
সুপ্রিম কোর্ট একসময় বলেছিল, প্রজাতন্ত্র নিজের সন্তানদের হত্যা করতে পারে না। কিন্তু ভারতের প্রজাতন্ত্র সেই কাজটিই করছে। বিচারব্যবস্থা, সংবিধান ইত্যাদির মাধ্যমে দেশের যতটুকু অগ্রগতি হয়েছিল, সব নাকচ করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। দেশ জুড়ে ঘটছে মব লিঞ্চিং। মানুষকে বিনা বিচারে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে। তেলঙ্গনার পুলিশ যা করেছে, তাকেও এক ধরনের মব লিঞ্চিং বলা যায়। এ হল রাষ্ট্র দ্বারা সংগঠিত মব লিঞ্চিং। রাষ্ট্রীয় হত্যা।
আমাদের দাবি, অবিলম্বে তেলঙ্গনার মুখ্যমন্ত্রী ও পুলিশ প্রধানকে অপসারণ করা হোক। তাঁদের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগে বিচার শুরু হোক। হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টের কর্মরত কোনও বিচারপতি তথাকথিত এনকাউন্টারের ঘটনায় তদন্ত করুন।

মতামত লেখকের নিজস্ব
লেখক এপিডিআরের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More