বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৭

সত্যানুসন্ধানীর দেড়শ বছর

রাজীব সাহা

গুজরাতের যে জায়গাটাকে আমরা পোরবন্দর বলে জানি, বহু যুগ আগে তার নাম ছিল পাও বন্দর। গুজরাতি ভাষায় পাও মানে রুটি। পোরবন্দরে রুটি তৈরির কারখানা ছিল। সেই রুটি রফতানি হত আরব দুনিয়ায়। এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, দীর্ঘকাল ধরে পোরবন্দরে বড় বড় ব্যবসায়ীর বসবাস ছিল। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীও পোরবন্দরের এক বেনিয়া পরিবারের সন্তান ছিলেন।

গান্ধীজি তাঁর আত্মজীবনী ‘মাই এক্সপেরিমেন্ট উইথ ট্রুথ’ বইয়ের শুরুতে বলেছেন, গুজরাতি ভাষায় গান্ধী শব্দের অর্থ মুদি। আমার পূর্বপুরুষ একসময় মুদির দোকান চালাতেন। যদিও গান্ধীজির আগে তিন পুরুষ ধরে তাঁদের পরিবারের কর্তারা ছিলেন নেটিভ স্টেটের দেওয়ান।

ঊনিশ শতকের গোড়ায় মারাঠাদের হাত থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গুজরাতের এক বৃহৎ অংশ কেড়ে নেয়। সেখানে ছোট ছোট অনেকগুলি করদ রাজ্য ছিল। গান্ধীজির পূর্বপুরুষরা এমনই এক স্টেটের কর্মচারী ছিলেন। তাঁরা নিষ্ঠাবান বৈষ্ণব। সেই হেতু গান্ধীজি শিশুকাল থেকেই অহিংসার আদর্শের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু বৈষ্ণব ধর্মের প্রভাবে তিনি অহিংসায় বিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলেন ভাবলে ভুল হবে।

তাহলে গান্ধীজি কেন অহিংসায় বিশ্বাসী হয়ে উঠলেন?

তিনি দেখেছিলেন, সশস্ত্র সংগ্রাম চালাতে গেলে গোপন সংগঠন গড়তে হয়। শত্রুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য অনেক সময় মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়। তার পরিণাম ভালো হয় না। সশস্ত্র সংগ্রামীরা যদি জয়ী হয়, তাহলেও তাদের মিথ্যাচারণের স্বভাব যায় না। তারা যদি কোনও দেশে ক্ষমতা লাভ করে, অনেক সময় মিথ্যা কথা বলে জনগণকে বোকা বানিয়ে রাখে।

সেইজন্য গান্ধীর সিদ্ধান্ত, প্রবল পরাক্রান্ত শত্রুর সঙ্গে মোকাবিলার সময়েও সত্যের পথে থাকতে হবে অবিচল। না হলে সংগ্রামের উদ্দেশ্যই হবে ব্যর্থ। অত্যাচারী শাসক হয়তো হেরে পালিয়ে যাবে কিন্তু নতুন যারা ক্ষমতায় আসবে, তারা হয়ে উঠবে আরও বেশি অত্যাচারী।

সত্যের পথে চলতে গেলে অহিংস হওয়া ছাড়া উপায় নেই। কারণ তাতে গোপনীয়তার আশ্রয় নিতে হয় না। গান্ধীজি নিজের জীবনে সত্য নিয়ে পরীক্ষা করতে করতে এই তত্ত্বে বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। জীবনের শুরুতে কিন্তু তাঁর অহিংসায় বিশ্বাস ছিল না।

মাই এক্সপেরিমেন্ট উইথ ট্রুথ বইতে সত্য নিয়ে মহাত্মার পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিবরণ আছে। সেজন্য বইটি খুব মূল্যবান।

বইয়ের শুরুতে গান্ধীজি ছোটবেলার কথা লিখেছেন। পড়তে পড়তে পাঠক টের পাবেন, মহাত্মা ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী। নিজের কৃতিত্বের কথা কমিয়ে বলেন অথবা একেবারেই বলেন না। কী কী দোষ ও দুর্বলতা আছে তাঁর চরিত্রে, তা নিয়েই আলোচনা করেন বেশি। প্রথমেই লিখছেন, আমার বুদ্ধি কম। স্মরণশক্তিও তেমন মজবুত নয়।

ছোটবেলার কথা বলতে গিয়ে লিখছেন, আমি কখনও স্কুলে দেরি করে যাইনি। ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে পৌঁছতাম। ছুটি হলেই দৌড়ে পালিয়ে আসতাম।

কেন পালিয়ে আসতেন? কারণ স্কুলে মোহনদাসের কোনও বন্ধু ছিল না। তিনি ছিলেন খুব লাজুক। গায়ের জোরও ছিল কম। তাঁর সবসময় ভয় করত, কেউ বুঝি তাঁকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাসা করবে।

নিচু ক্লাসে তিনি পড়াশোনায় তত ভালো ছিলেন না। কেবল মাস্টারমশায়দের বকুনির ভয়ে রোজ স্কুলে পড়া করে যেতেন। কিন্তু সত্যের প্রতি তাঁর অনুরাগ সেই শৈশবকাল থেকেই।

একবার তাদের স্কুলে এলেন শিক্ষা বিভাগের ইনসপেক্টর জাইলস সাহেব। ছাত্ররা কে কেমন ইংরেজি শিখছে জানার জন্য তিনি পাঁচটা বানান লিখতে দিয়েছিলেন। মোহনদাসের ‘কেটল’ বানানটা লিখতে ভুল হয়েছিল। মাস্টারমশায় ইঙ্গিত করছিলেন, যাতে সে পাশের ছেলের খাতা দেখে বানানটা শুদ্ধ করে লেখে। গান্ধীজি লিখছেন, আমি সেই ইঙ্গিত বুঝতেই পারিনি। ভেবেছিলাম, আমরা যাতে পস্পরের দেখে না লিখতে পারি, সেজন্য মাস্টারমশায় পাহারা দিচ্ছেন।

মোহনদাসের ১৩ বছর বয়স যখন, তার বিয়ে হয়ে গেল। বয়সে কিশোর হলে কী হবে, স্বামী হিসাবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কড়া ও সন্দেহপ্রবণ।

হাইস্কুলের উঁচু ক্লাসে তাঁর রেজাল্ট ভালো হতে লাগল। মেধাবী ছাত্র বলে শিক্ষকরা তাকে ভালোবাসতেন। কিন্তু গান্ধীজি আত্মজীবনীতে সেকথা উল্লেখ করেছেন খুব কুণ্ঠার সঙ্গে। আগেই বলেছি, তিনি নিজের কৃতিত্বের কথা কমিয়ে বলেন। কিন্তু দুর্বলতার বিষয়গুলি আলোচনা করেন নির্মমভাবে।

তিনি লিখেছেন, ব্যায়াম ছিল তাঁর অপছন্দের বিষয়। একসময় জ্যামিতি নিয়ে খুব সমস্যায় পড়েছিলেন। ইউক্লিডের ১৩ নম্বর উপপাদ্য অবধি পড়ার পরে জ্যামিতির রস পেতে থাকেন। সংস্কৃত বরাবরই শক্ত লাগত। একটা ব্যাপারে স্কুলজীবনে খুব অবহেলা করেছিলেন, তা হল হাতের লেখা। তাঁর হাতের লেখা কখনই খুব ভালো ছিল না। ভালো করার চেষ্টাও করেননি। অনেক পরে দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্যারিস্টারি করতে গিয়ে তাঁর বোধ জন্মায়, খারাপ হস্তাক্ষর অশিক্ষার লক্ষণ। কিন্তু সেই বয়সে হাজার চেষ্টা করেও মুক্তোর মতো হাতের লেখা করতে পারেননি।

হাইস্কুলে এক বখাটে বন্ধুর পাল্লায় পড়েছিলেন। তাঁর মা, বড় দাদা ও স্ত্রী, তিনজনেই ছেলেটাকে দু’চক্ষে দেখতে পারতেন না। কিন্তু মোহনদাস তাকে পছন্দ করতেন। কেন করতেন? পরিণত বয়সে গান্ধীজি লিখছেন, আমি ছেলেবেলায় দুর্বল ও ভীতু ছিলাম। কিন্তু বন্ধুটি ছিল আমার বিপরীত। সে ছিল সাহসী ও শক্তিমান। লংজাম্প আর হাইজাম্প, দু’টোই ভালো পারত। মার খেয়ে সহজে কাবু হত না। মানুষ তার নিজের মধ্যে যে গুণ নেই, পরের মধ্যে যদি সেই গুণ দেখে, তার দিকে আকৃষ্ট হয়। আমিও সেইজন্য ছেলেটির প্রতি আকর্ষণ বোধ করতাম।

সেই বন্ধুর পাল্লায় পড়েই গান্ধীজির প্রথম মাংস খেতে শেখা। কিন্তু তাঁর পরিবার পরম বৈষ্ণব। ছেলে মাংস খেয়েছে শুনলে বাবা-মা মনে হয়তো শোকে মারাই যাবেন। কিন্তু বন্ধু তাঁকে বুঝিয়েছে, মাংস না খেলে ভারতবাসীরা শক্তিশালী হয়ে উঠবে না। ব্রিটিশকে পরাজিত করতে পারবে না।

তিনি মোট পাঁচ-ছ’বার মাংস খেয়েছিলেন। তারপর দেখলেন, বাবা-মাকে লুকিয়ে নিষিদ্ধ খাদ্য গ্রহণ করা ঠিক হচ্ছে না। গোপনীয়তা মানে একপ্রকার মিথ্যাচার। তাই স্থির করলেন, বাবা-মা জীবিত থাকতে আর মাংসাহার নয়। কিন্তু তাঁরা প্রয়াত হলে নিজে তো মাংস খাবেনই, অন্যরাও যাতে খায়, তার জন্য প্রচার করবেন রীতিমতো।

কিশোর বয়সে তিনি ধূমপান করেছিলেন। পয়সা চুরি করেছিলেন। আত্মহত্যাও করতে গিয়েছিলেন একবার। শেষে বাবাকে চিঠি দিয়ে চুরি করার অপরাধও স্বীকার করেছিলেন। গান্ধীজি পরিণত বয়সে সব লিখেছেন।

তাঁর বাল্য ও কৈশোরকালের কাহিনী পড়লে বোঝা যায়, ওই বয়সেই পাপ-পুণ্য নিয়ে খুব মাথা ঘামাতেন। পাপকার্য করেছেন ভাবলে প্রায়শ্চিত্তের চেষ্টাও করতেন। কিন্তু সত্য নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা শুরু হয়েছিল প্রথম যৌবনে। তখন তিনি প্রবাসে।

মায়ের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, বিলেত গিয়ে মাংস খাবেন না, মদ ছোঁবেন না। কিন্তু সমুদ্রযাত্রার সময় পড়লেন বিপদে। জাহাজে কে তাঁর জন্য নিরামিষ তরকারি রান্না করে দেবে? নিজের কেবিনে বসে বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া খাবার খেতেন। পরে জাহাজের ডেকে পায়চারি করতে গিয়ে এক সাহেবের সঙ্গে আলাপ হল। তিনি বললেন, ইংল্যান্ডে এমনই শীত যে মাংস না খেয়ে জীবনধারণ করা অসম্ভব।

বিলেতে গিয়ে আরও বিপদ হল। নিরামিষ খাবার সহজে পাওয়া যায় না। বন্ধুবান্ধবরা বার বার মাংস খেতে বলছেন। এদিকে গান্ধীজিও অনড়। কোনওদিন নিরামিষ খাবার না জুটলে খেতেন, না জুটলে অনাহার। ক্রমে লন্ডন শহরে একটু চেনাজানা হতে ঠিক খুঁজে বার করলেন নিরামিষ খাবারের রেস্তোরাঁ। জ্ঞানী-গুণী ও চিকিৎসকদের অনেকে নিরামিষ আহারের কী সুফল আছে বলেছেন, সব পড়ে ফেললেন। এমনকী সাহেবদের নিয়ে একটা ভেজিটেরিয়ান ক্লাব বানিয়ে ফেললেন পর্যন্ত।

যেমন তাঁর প্রতিজ্ঞার জোর, তেমনই সাংগঠনিক শক্তি। যদিও বার বার লিখছেন, জগদীশ্বর তাঁর সহায় ছিলেন বলেই বিদেশে গিয়ে প্রতিজ্ঞা পালন করা সম্ভব হয়েছিল।

নিরামিষ আহার দিয়ে তাঁর জীবনে এক্সপেরিমেন্ট শুরু। তারপর শিক্ষা, ব্রহ্মচর্য, চিকিৎসা, চাষবাস, চরকা, কুটিরশিল্প, ধর্ম, রাজনীতি ও গণ আন্দোলন, সব কিছু নিয়েই গবেষণা করেছেন। এদিক থেকে তিনি বৈজ্ঞানিকের মতোই সত্যানুসন্ধানী। বৈজ্ঞানিকদের মতো তিনি নিজের জীবনের পরীক্ষাগুলি সম্পর্কে নিরপেক্ষ ও অবজেকটিভ। পরীক্ষার ফলাফল যদি মনঃপূত নাও হয়, তাও সত্যের খাতিরে মেনে নেবেন।

প্রাচীনকালে চিনদেশের দার্শনিক কনফুসিয়াস বলেছিলেন, প্রত্যেক মানুষেরই উচিত সর্বদা নিজেকে প্রশ্ন করা, আমি কি সত্য পথে চলছি? যে নিজেকে প্রশ্ন করতে শেখেনি সে মানুষ নামেরই যোগ্য নয়।

আমি যা জানি তা সত্য কিনা এমন প্রশ্ন মনে উঠলেই মানুষ গবেষণা করতে আগ্রহী হয়। গান্ধীজির মনে সদাই এই প্রশ্ন জাগরুক ছিল। তাই তিনি জীবনভর নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গিয়েছেন।

জীবনের পথে সত্য নিয়ে তাঁর ভাবনায় একটি মৌলিক পরিবর্তন এসেছিল। ১৯৩১ সালে তিনি বিলেত গিয়েছিলেন লর্ড আরউইনের সঙ্গে চুক্তি করার জন্য। ফেরার পথে জনৈক ফরাসী সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, আমি একসময় ভাবতাম ভগবানই সত্য। কিন্তু এখন আমি জানি যে, সত্যই ভগবান। অর্থাৎ তিনি বলতে চাইছেন সত্যের চেয়ে বড় কিছু নেই।

একটা পরাধীন দেশে সত্যকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা খুব কম মানুষেরই থাকে। ছোট থেকেই তারা ভীতির পরিবেশে বেড়ে ওঠে। ভয় পেতে পেতে মন দুর্বল হয়ে যায়। দুর্বল মানসিকতার লোক সবসময় ক্ষমতার দিকে ভিড়ে থাকে। ক্ষমতাবান রাজনীতিক, ধনী ব্যক্তি এমনকী দুষ্কৃতীদের কথাও বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নেয়। গান্ধীজি শিখিয়েছেন, ক্ষমতার মুখের ওপরে বলতে হবে, আমি তোমার কথা মানি না। তারপর খুঁজতে হবে, কোনটা সত্য।

মহাত্মার শিক্ষা, প্রত্যেকেই নিজের জীবনে সত্যকে অনুসন্ধান করবে। একজন মানুষ সত্য বলতে যা উপলব্ধি করবে তা অপরজনের সঙ্গে নাও মিলতে পারে।

মাই এক্সপেরিমেন্ট উইথ ট্রুথ বইয়ের ভূমিকাতেই তিনি বলেছেন, আমি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যা পেয়েছি, তা অভ্রান্ত বলে দাবি করছি না। বৈজ্ঞানিক যেমন কখনও ভাবে না সে এক্সপেরিমেন্ট করে যা পেয়েছে, তাই চরম, আমি নিজের জীবনের পরীক্ষাগুলি সম্পর্কেও তাই মনে করি।

অর্থাৎ তিনি সহিষ্ণু হতে বলছেন।

ধর্ম নিয়ে গান্ধীজির কী মত?

এখানেও তিনি সত্যের সন্ধানী। জীবনে চলার পথে কখনও যদি তাঁর মনে হয়, ঈশ্বর নেই, জোর করে ধর্মকে আঁকড়ে থাকবেন না। গান্ধীজি একথা বলেছিলেন গোপরাজু রামচন্দ্র রাওয়ের কাছে।

গোপরাজু রামচন্দ্র রাও ছিলেন বিজ্ঞানের অধ্যাপক। ঘোর নাস্তিক। ধর্মের বিরুদ্ধে প্রচার করার জন্য তাঁকে কলেজের চাকরি ছাড়তে হয়েছিল। তিনি ছিলেন মহাত্মার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। দলিত-নিপীড়িত মানুষের সেবা করতেন। গান্ধীজির ডাকে সাড়া দিয়ে আন্দোলনে নেমেছেন। জেলও খেটেছেন। ১৯৩০ সালে গান্ধীজির ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। তিনি একটি বই লিখে গিয়েছেন, অ্যান এথেইস্ট উইথ গান্ধী। তাতে ধর্ম ও নাস্তিকতা নিয়ে গান্ধীজির সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের বর্ণনা আছে।

একদিন গান্ধীজি রামচন্দ্র রাওকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, বল দেখি কেন তুমি নাস্তিক?

রামচন্দ্র রাও বললেন, বাপুজি, আমি ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময় কলকাতায় ছিলাম। রাস্তায়, ফুটপাথে বহু লোককে মরে পড়ে থাকতে দেখেছি। খাবারের দোকানের সামনেও অনেকে মরে পড়ে ছিল। দোকানে খাবার ভর্তি থাকা সত্ত্বেও কেউ কেড়ে খেতে চেষ্টা করেনি? কেন করেনি? কারণ তারা ভেবেছে, ভগবানের অভিশাপে তাদের না খেয়ে মরতে হচ্ছে। জোর করে খাবার কেড়ে খেতে গেলে পাপ হবে। তাদের আত্মশক্তিতে বিশ্বাস নেই। সব ভগবানের ওপরে ছেড়ে দিয়ে বসে আছে। সেজন্যই আমি মনে করি, দেশে নাস্তিকতার প্রচার হওয়া উচিত।

গান্ধীজি মন দিয়ে রামচন্দ্র রাওয়ের কথা শুনলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, তোমার বক্তব্যে কিছু যুক্তি আছে। আমি বলতে পারি না তোমার নাস্তিকতা ভুল বা আমার আস্তিকতা ঠিক। যদি আমার ভুল ধরা পড়ে, মত বদলে ফেলব। তুমিও যদি কখনও দেখ, ভুল হয়েছে, দৃষ্টিভঙ্গি বদলে ফেলো। কখনও গোঁড়ামি যেন না আসে।

গান্ধীবাদ এক আশ্চর্য উদার মতাদর্শ। বিশ্বে এর তুলনা নেই বললেই চলে।

কেউ গান্ধীজির অহিংসার আদর্শে বিশ্বাসী নাও হতে পারেন। তাঁর মতো ঈশ্বরবিশ্বাসী হওয়ারও দরকার নেই। কিন্তু তিনিও গান্ধীবাদী হতে পারেন। তাঁকে কেবল মহাত্মার মূল তত্ত্বটি মানতে হবে। জীবনে যদি এগোতে হয়, অবিরত এক্সপেরিমেন্ট করা দরকার। সদাই নিজেকে প্রশ্ন করে ব্যতিব্যস্ত করতে হবে, আমি ঠিক পথে চলছি তো? কখনও যেন এমন চিন্তা না আসে, আমিই ঠিক আর সকলে ভুল।

কেবল ব্যক্তির ক্ষেত্রে নয়, জাতির জীবনেও এই কথাটি সত্য। যে দেশ সত্যের অনুসন্ধান করে সেই দেশই জ্ঞানবিজ্ঞানে, সম্পদে অগ্রসর হয়। যে ভাবে চরম সত্যকে জেনে গিয়েছে, তার পতন অনিবার্য।

গান্ধীবাদের মধ্যে এই সত্যটুকু আছে বলেই মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর জন্মের দেড়শ বছর পরেও এই মতাদর্শ মানুষকে পথ দেখায়। আরও বহু বছর ধরে দেখাবে।

রাজীব সাহা ‘দ্য ওয়াল’–এর সাংবাদিক

‘দ্য ওয়াল’–এ প্রকাশিত এই পর্বের সব লেখা পড়ার জন্য ক্লিক করুন নীচের লাইনে

সার্ধশত বছরে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী

Comments are closed.