সোমবার, ডিসেম্বর ৯
TheWall
TheWall

জিডিপি -র অধোগতি: কোন পথে আমাদের অর্থনীতি ?

প্রসেনজিৎ সরখেল

আশঙ্কার মেঘ ছিলই। তবে সব দুর্ভাবনা কে সত্যি প্রমাণ করে জাতীয় সংখ্যাতত্ত্ব কমিশন জানিয়ে দিল ২০১৯-২০ অর্থবর্ষের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে জিডিপি বৃদ্ধির হার নেমে দাঁড়িয়েছে ৪.৫ শতাংশে। ওয়াকিবহাল মহলের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়া স্বাভাবিক। কারণ গত অর্থবর্ষ থেকেই জিডিপির বৃদ্ধির হার ক্রমহ্রাসমান। সুতরাং এই সংখ্যাকে নেহাতই কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দেওয়া মুশকিল। এই ঘটনা অর্থমন্ত্রকের দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। কেননা প্রথম ত্রৈমাসিকে জিডিপির এই অধোগতি আন্দাজ করে সরকার কর্পোরেট কর কমানো, সরকারি সংস্থার বিলগ্নিকরণ ইত্যাদি যে পদক্ষেপ নিয়েছিল তা অন্তত এই স্বল্প সময়ে কাজে লাগেনি সেটা স্পষ্ট।
এই অর্থনৈতিক দোলাচলের মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের সেই “আচ্ছে দিন”-এর স্বপ্ন ক্রমশ “অস্বচ্ছ ” হয়ে উঠছে। সেই ধোঁয়াশায় বিলীন হতে বসেছে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ।

কিন্তু জিডিপি বৃদ্ধির হার কমে যাওয়ার তাৎপর্য্য কী? তাতে কি সত্যিই চিন্তার কোনও কারণ আছে? জিডিপি বলতে বোঝানো হয় একটি নির্দিষ্ট সময়ে দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (দ্রব্য এবং পরিষেবা )-এর পরিমাণ। এই উৎপাদনের কিছুটা ভোগ্যপণ্য যা দেশের ভিতরে বিক্রি হতে পারে অথবা রফতানি করা যেতে পারে। এই উৎপাদনের বেশ কিছু অংশ বিনিয়োগ দ্রব্যও, যা সরকারি ও বেসরকারি দুটি ক্ষেত্রেই ব্যবহার হয়। সুতরাং জিডিপি বৃদ্ধির হার শ্লথ হতে পারে যদি ভোগ্যপণ্যের চাহিদায় ভাটা পড়ে, সরকারি বা বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যায় এবং আমদানির তুলনায় রফতানি কম হয়। অর্থাৎ জিডিপি বৃদ্ধির হার কমে যাওয়া মানে উৎপাদন বৃদ্ধির হার কমে যাওয়া। এর ফলস্বরূপ সামগ্রিক ভাবে আয় কমে যাওয়া।

একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হবে। ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষে ভারতে গড় মাথাপিছু মাসিক আয় ছিল ১০,৫৩৪ টাকা। এখন যদি জিডিপি ৫ শতাংশ হারে বাড়ে তা হলে গড় মাথাপিছু মাসিক আয় বাড়বে ৫২৬ টাকা। এবার যদি জিডিপি বৃদ্ধির হার কমে ৪.৫ শতাংশ হয় তা হলে গড় মাথাপিছু মাসিক আয় বাড়বে ৪৭৪ টাকা। তার মানে মানুষের রোজগার প্রতি মাসে ৫২ টাকা করে কমবে এবং বছরে কমবে ৬২৪ টাকা। মনে রাখতে হবে, মাসিক ৯৬০ টাকা অন্ততপক্ষে রোজগার বা খরচ না করতে পারলে ধরে নিতে হবে সেই লোকটি দারিদ্র্যরেখার তলায় অবস্থান করছে। ভারতে মধ্যবিত্ত, সংগঠিত ক্ষেত্রে চাকুরিরত জনগোষ্ঠীর কাছে তাই এর অভিঘাত যাই হোক, বড় সংখ্যক মানুষের জন্য তা ধাক্কাই বটে। জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যরেখার নিচে বসবাস করেন। এই আয়টুকু কমার ফলে তাঁদের চাপ যে বাড়বে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

জিডিপির মধ্যে রফতানির যে অংশ তার বৃদ্ধি নিশ্চিতভাবেই নির্ভর করে বিশ্বের অর্থব্যবস্থার ওপর। যেহেতু সেখানে অর্থনৈতিক মন্দার প্রকোপ ক্রমবর্ধমান তার ফলে আয় বাড়ানোর জন্যে দেশের ভিতরের চাহিদার ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। কিন্তু কয়েক বছর ধরে সেখানেও ভাটার টান অব্যাহত।

নিয়েলসন তাদের সেপ্টেম্বরের ত্রৈমাসিক সমীক্ষায় দেখতে পেয়েছে, গ্রামাঞ্চলে মানুষের খরচের বৃদ্ধির হার গত বছরের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ কমে গেছে। সমীক্ষায় আরও দেখা গেছে, গ্রামীণ ক্রেতারা এখন কম দামি জিনিসপত্র কিনছেন। এর প্রভাব সব থেকে বেশি পড়েছে উত্তর ভারতে। নিয়েলসন সমীক্ষায় আরও দেখেছে, এই অধোগতি শুধুমাত্র গ্রামের ক্রেতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সেপ্টেম্বর ত্রৈমাসিকে শহরাঞ্চলে খরচ বৃদ্ধির হার ছিল ৮ শতাংশ যা গত বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। অনেকেই প্রবোধ দেওয়ার চেষ্টা করছেন যে এই নিম্নগামী প্রবণতা সাময়িক। এ বছর জলবায়ুর খামখেয়ালি আচরণে নষ্ট হয়েছে ফসল, কমে গেছে কৃষকদের আয়,ফলে চাহিদার ঘাটতিজনিত এই সমস্যা মিটে যাওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। যুক্তি হিসেবে শুনতে ভাল হলেও, প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়, কৃষিক্ষেত্রে আয় কমে যাওয়ার ঘটনা যদি সাময়িকই হবে তা হলে কেন মোদী সরকার তড়িঘড়ি আলাদা করে লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করেছে—২০২০ সালের মধ্যে কৃষকদের আয় দ্বিগুণ করা হবে।
আরও প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে, কৃষিক্ষেত্রে বহু আলোচিত মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের রমরমা ঘোচানোর জন্য সরকার কোনও সুস্পষ্ট নীতি নিয়েছে কিনা।

এছাড়া ইউপিএ আমলের এনরেগার (মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ রোজগার যোজনা) মতো গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার যে বৈমাতৃসুলভ আচরণ করেছে তারও তো একটা প্রভাব নিশ্চয়ই রয়েছে। এবারের বাজেটই এনরেগার জন্য বরাদ্দ অর্থ ছিল গতবারের তুলনায় প্রায় ১ হাজার কোটি কমিয়েছে মোদী সরকার। হিসেবে করে দেখা গিয়েছে গ্রামাঞ্চলে বর্তমান কাজের চাহিদার তুলনায় ওই বরাদ্দ অর্থ যথেষ্ট কম। জব কার্ড রয়েছে এমন পরিবারের সংখ্যা গ্রামীণ ভারতে প্রায় ১৩ কোটি। এঁদের যদি অন্তত ৫০ দিনের কাজও দিতে হয় তাহলে তার জন্য প্রয়োজন হবে ৮১ হাজার কোটি টাকা। অথচ এবারের বাজেটে বরাদ্দ করা হয়েছে মাত্র ৬০ হাজার কোটি টাকা।

নিঃসন্দেহে চাহিদার এই আকাল বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহ করবে। পণ্য উৎপাদন করে লাভ কী যদি ক্রেতা খুঁজে না পাওয়া যায়? বোঝা কঠিন নয় তাই শিল্পোৎপাদনের সূচক পড়ে যাওয়া প্রায় অনিবার্য ছিল। আশঙ্কার কথা হল, আটটির মধ্যে ৬টি কোর সেক্টরেই শিল্পোৎপাদন কমেছে। সেগুলি হল—কয়লা, সিমেন্ট, বিদ্যুৎ, অপরিশোধিত তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং ইস্পাত। অর্থনৈতিক পরিকাঠামো বা কর্মসংস্থান কোনও দিক থেকেই এই চিত্রটা উৎসাহব্যঞ্জক নয়।

সামনের রাস্তা তাই বিপদসঙ্কুল। ভাবের ঘরে চুরি না করে সরকার যত তাড়াতাড়ি এই সমস্যাকে সাময়িক বা স্বকীয় না বলে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা বলে স্বীকৃতি দেয় আমজনতার ততই মঙ্গল। আন্দাজ করতে পারি সরকার হয়তো কর ছাড় দিয়ে মানুষের হাতে খরচযোগ্য টাকার পরিমাণ বাড়ানোর চেষ্টা করবে। কিন্তু অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যদি এরকমই অনিশ্চিত থাকে, মানুষ ভরসা করে টাকা খরচ করবে এমনটা ভাবা মুশকিল। ঠিক এমনটাই ঘটেছে ব্যাঙ্ক গুলির ক্ষেত্রে। গত জুন মাসে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক রেপো রেট কমানো সত্ত্বেও বেসরকারি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়েনি। ধর্মীয় অসন্তোষ ও সামাজিক অস্থিরতায় দীর্ণ এখনকার এই সময়ে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক ভিত্তিগুলিই সুদৃঢ় করলে মানুষের বিশ্বাস ফিরে আসবে কিনা তা সময়েই বলবে।

লেখক কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রোফেসর

Comments are closed.