বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৭

ভাষা নিয়ে শ্রীঅমিত শাহকে খোলা চিঠি

হিন্দোল ভট্টাচার্য

অমিত স্যার, আপনার কথার সারমর্ম অনুযায়ী হিন্দি ভাষা ছাড়া আর অন্য কোনও ভাষার ক্ষমতা নেই সারা দেশকে একসূত্রে বাঁধার।  জয়বাবা ফেলুনাথের সেই ভুয়ো সন্ন্যাসীর মতো একভাষা, একসুর, এককার্ড, একধর্ম, একজাতি শোনা যাচ্ছে আপনার কণ্ঠে।  যে দেশের বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে বৈচিত্র এবং বহুত্বকে সম্মান জানানো, সেই দেশে এই একের আধিপত্য বিস্তারের কারণটা বোঝা একদম কঠিন নয়। কারণ এ  ক্ষেত্রে হিন্দি ভাষার প্রতি অধিক ভালোবাসা নয়, বরং শাসকের ভাষার প্রতি অধিক ভালোবাসাই আসলে আপনাদের বচনে, শারীরিক ভঙ্গিমায়, কথা বলার টোনে ধরা পড়ছে। আপনার ভাষা কি হিন্দি? মনে হয় না। আপনার ভাষা হল আধিপত্যবাদ। আপনার ভাষা হল শাসকের ভাষা। কিন্তু শাসকের ভাষা দিয়ে আপনি যে সারা দেশকে একসূত্রে বেঁধে ফেলতে চাইছেন, তা কি আদৌ সম্ভব?

বহুত্বকে স্বীকার করতে একটা স্বৈরতান্ত্রিক বা ফ্যাসিস্ট ভাবনার অধিকারী রাজনৈতিক দলের যে আপত্তি থাকবে, তা বলাই বাহুল্য। কারণ বহুত্বকে স্বীকার করলেই তো আর ‘সর্বশক্তিমান’ বা’ একমেবাদ্বিতীয়ম’ থাকে না। তখন ভারতের ঐতিহ্যের দিকে মুখ ফেরাতে হয়। যেখানে খুব সহজ স্বাভাবিক ভাবে অসংখ্য ভাষা ও সংস্কৃতি সহাবস্থান করছে এবং তাদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ, ভালোবাসা, বন্ধন, বিপ্লব, কান্না, কবিতা, সঙ্গীত কোনও কিছুই ব্যাহত হচ্ছে না। কেন ব্যাহত হচ্ছে না, বরং কেন অসংখ্য ভাষা কয়েক হাজার বছর ধরে নিজেদের মধ্যে মিলেমিশে গেছে, আদানপ্রদান করেছে ব্যাকরণের, শব্দের এমনকী কাজের জগৎ থেকে শুরু করে ব্যবসার জগতেও তৈরি করেছে এক একটা আশ্চর্য ভোকাবুলারি। এ সবের হাত ধরেই গড়ে উঠেছে আরও বেশকিছু আধুনিক ভাষা। না-হলে কেন সংস্কৃত থেকে মাগধী ধরে বাংলা আর সৌরশেনী ধরে হিন্দির উদ্ভব হবে? কেন উর্দুর মতো অতি মিষ্ট ভাষার জন্ম হবে ভেবে দেখেছেন?

অবশ্য আপনি তো এসব ভাববেন না। কবে আর আপনারা ভাষাতত্ত্বের ঐতিহ্য তথা আবহমানতা অনুসরণ করে, বৈজ্ঞানিক ভাবে কোনও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? অর্থনীতিতেও তো দেখেছি আপনাদের একদেশদর্শী হঠকারী সব সিদ্ধান্ত, যেগুলির একটিও বৈজ্ঞানিক ছিল না। হিন্দি ভাষাকে যদি বাধ্যতামূলক একটি ভাষা হিসেবে আপনি চাপিয়ে দিতে চান, তবে তা যে গণতান্ত্রিক উপায়ে জনগণের কাছ থেকে সিদ্ধান্তের সমর্থন নিয়ে করবেন, তা তো নয়। করবেন আপনার আধিপত্যের ভাষা দিয়ে। দুঃখজনকভাবে হিন্দির মতো এত সুন্দর একটি ভাষা, যেখানে কবিতা, গল্প, উপন্যাসের এত মহান ভাণ্ডার, তা পরিণত হয়েছে আপনার আধিপত্যবাদের শিখণ্ডী রূপে।  এতে হিন্দিও যথেষ্ট কষ্ট পাচ্ছে। কারণ তার ভাষার আত্মাতে এই আধিপত্যবাদ নেই। বরং মরমীয়াবাদ আছে।

কিন্তু স্যার আপনাদের সঙ্গে তো মরমীয়াবাদের কোনও সম্পর্ক নেই। ভাষা আপনাদের কাছে একটা হাতিয়ার। যেমন দেশ আপনার কাছে একটা মাধ্যম। ক্ষমতার আসলে কোনও মাতৃভাষা নেই, তার দেশ নেই, তার সংস্কৃতিও নেই।  ক্ষমতার কাছে সবকিছুই হল উপাদান, হাতিয়ার, মাধ্যম। যেমন দেখুন না, আপনি যদি গুজরাতি হতেন শাসক না হয়ে, তাহলে এই মুহূর্তে গুজরাতি ভাষার প্রেক্ষিত থেকেও ভাবতেন। মনে হত নিজের মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করে হিন্দিকে বাধ্যতামূলক করার ভাবনা কি মাতৃভাষাকে অপমান করা নয়? আপনাদের কাছে কেন্দ্রীকরণ করে শাসন করাটাই মুখ্য। আর সেখানে তো ‘বহু’-র ঐতিহ্য ও বিজ্ঞানের স্থান নেই, আবেগ তো দূরের কথা। আপনারা বলেন মন কী বাতের কথা। কিন্তু আসলে তা হয়ে যায় রাজা কী বাতের কথা। একবিন্দু ভেবে দেখেন না, এই ভাবে এ দেশের বহু-র বৈচিত্র নষ্ট করলে শেষে এ দেশের থাকবেটা কী! ধরুন সবাই হয়ে উঠল হিন্দিভাষী দম দেওয়া পুতুল। তাতে আস্তে আস্তে মরে গেল বিভিন্ন ভাষা, ভাষার সঙ্গে জড়িত সংস্কৃতিগুলি হয়ে গেল প্রত্ন, লুপ্ত হয়ে গেল বহু আঞ্চলিক সংস্কৃতি।

অমিত স্যার, আমি জানি, এসব কথা আপনার ভালো লাগবে না। কারণ এই সব তো আপনাদের প্রজেক্ট। শাসকের ভাষা এখন এ দেশের মানুষ কিছুটা হলেও পড়তে পারছে। তার বুকের কাপড়, পেটের ভাত তো বটেই, আগামী দিনে তার কণ্ঠ থেকে যাতে প্রতিবাদের বর্ণমালা না বেরোয়, তার জন্য তার অবচেতনে থাবা বসাতে চাইছেন, সেখানেও আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছেন আপনারা। এর জন্য কোনও একটা ভাষা দিয়ে এই আধিপত্য বিস্তার করতে হতোই আপনাদের। হাতের কাছে হিন্দি আছে, তাকেই আপনারা বেছে নিলেন। এর ফলে হিন্দির উপকার তো হবেই না, বরং চরম অপকার হবে। সেই ভাষাটাও হয়ে উঠবে প্রাণ-রসহীন একটা কম্যান্ডিং ল্যাঙ্গুয়েজ মাত্র, আর কিছু নয়।

তবে আপনাদের কৌশলটা বেশ সুদূরপ্রসারী। ক্ষণিকের লাভ আপনারা দেখেন না। আপনারা জানেন, ভাষাই একটা জাতির, একটা অঞ্চলের মেরুদণ্ড, কণ্ঠ এমনকী ভাবার ক্ষমতাও। ভাবুন অমিত স্যার, বাংলা ভাষা ছিল বলেই তো এখানে ইংরেজদের বিরুদ্ধে গান, কবিতা, প্রবন্ধ স্লোগানে, মন্ত্রে মানুষ পেয়েছিল অবরোধের, প্রতিরোধের, যুদ্ধের শক্তি। আপনারা জানেন একটা ভাষা কত শক্তিশালী। আর সে কারণেই, আগামী প্রজন্মের কাছ থেকে মাতৃভাষার সেই শক্তিটাই কেড়ে নিতে চান। সেই প্রজন্মকে পঙ্গুই করে দিতে চান। তাই আপনাদের এই ভাষার মাধ্যমে আধিপত্যবাদের কারণটিকে বোঝা যায়। বহুর বৈচিত্রকে ‘এক’-এর সাংস্কৃতিক শাসনের আওতায় আনাই কঠিন। কিন্তু বহুকেই যদি টিকিয়ে রাখা না হয়, তাহলে, এক আস্তে আস্তে সর্বশক্তিমান এক-এ পরিণত হতে পারে। আর সেটাই তো আপনাদের কাম্য। সে কাজে আপনারা তো সর্বশক্তি আর কৌশল নিয়ে নামবেন-ই। নেমেওছেন। শুধু শিখণ্ডী হল আপনাদের এই দেশ-দেশ খেলা। তাই আপনাদের বলে কোনও লাভ নেই স্যার। আপনারা আপনাদের ধর্ম পালন করছেন।

কিন্তু ভারতবর্ষের মানুষের আপনার ও আপনাদের এই কৌশল বুঝে নেওয়া উচিত। হিন্দি দিয়ে দেশ বাঁধার এই মিথ্যের বিরুদ্ধে, ‘বহু’ ভাষার ও বহু- সংস্কৃতিকে আরও বেশি শক্তিশালী করে তোলার জন্য মানুষের রুখে দাঁড়ানো উচিত নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থেই। বিশ্বাস করুন, একটা দেশ শাসকের ভাষা দিয়ে একসূত্রে বাঁধা পড়ে না। বাঁধা পড়ে ভালোবাসায়, পারস্পরিক সম্মানে এবং প্রতিরোধেও।

আপনারা জিতলে হয়ত কয়েকবছরের জন্য জিততে পারেন, কিন্তু তার বেশি নয়। এই যে বহুভাষা, বহুসংস্কৃতির ঐতিহ্য, এর উপরে শাসকের বাটিখারা বা গিলোটিন যাই চাপুক না কেন, একদিন বহু-ই এক-কে ছুড়ে ফেলে। কারণ মহাপ্রকৃতির বৈশিষ্ট্যই সব বৈচিত্রকে ধারণ করা। তাদের ধ্বংস করা নয়।

ইতি
বাংলা ভাষার প্রতি কৃতজ্ঞ এক সামান্য নাগরিক

মতামত সম্পূর্ণভাবে লেখকের নিজস্ব

হিন্দোল ভট্টাচার্য কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক। ‘জগৎগৌরী কাব্য’-এর জন্য পেয়েছেন বীরেন্দ্র পুরস্কার (২০০৯) এবং ‘যে গান রাতের’ কাব্যগ্রন্থের জন্য পেয়েছেন বাংলা অকাদেমী পুরস্কার (২০১৮)

আরও পড়ুন

এক জাতি এক প্রাণ একতার ভিত্তি হল একটি সুষ্ঠ ও কার্যকর ভাষা নীতি

Comments are closed.