এই ভিড়ের দায়িত্ব কার?

যে রাষ্ট্র তার ১৩০ কোটি নাগরিককে বিনা নোটিশে একুশ দিনের জন্য গৃহবন্দি করে, সে এত অসহায় কেন ব্যক্তি-পুঁজির কাছে? স্মরণে রাখা দরকার, দেশে রাজস্বের ৮৫ ভাগ আসে পরোক্ষ কর থেকে, যাতে এই শ্রমিকদেরও অবদান থাকে দেশের অন্য নাগরিকদের মতো।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দেবত্র দে

    দিল্লির আনন্দবিহারে অভিবাসী শ্রমিকদের (migrant labours) ঘরে ফেরার সমাগম দেখে ভারতের যে কোনও প্রান্তে বসে আঁতকে ওঠাই স্বাভাবিক। প্রাথমিক স্বাস্থ্যবিধান অর্থাৎ ন্যূনতম শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার যে কথা প্রতিনিয়ত বলা হচ্ছে, তা এককথায় চূড়ান্তভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। বিপ্রতীপে আর একদল সপরিবারে দিনরাতকে উপেক্ষা করে কেউ উত্তরপ্রদেশ, কেউবা বিহারের দিকে হাঁটা লাগিয়েছেন, কবে পৌঁছবেন বা আদৌ পৌঁছতে পারবেন কি না তা বিধাতার হাতে সঁপে দিয়ে। কিছু উচ্চকোটি মানুষের দেশে প্রত্যাবর্তন না ঠেকিয়ে অসংখ্য গরিব শ্রমিককে মৃত্যুর মুখোমুখি ফেলার দায়িত্ব কার? নিজেদের বাঁচার তাগিদে যাদের অমানুষিক ভিড়ের সম্মুখীন হতে হচ্ছে তার দায়িত্ব কে নেবেন? নাকি শুধু লকডাউন আর ঘণ্টা বাজানোর নিদান দিয়েই দায়িত্ব সারবে পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র?

    কী কী হতে পারত–
    প্রথমত, পরিকল্পনাবিহীন লকডাউনের আগেই রেল ও সড়ক পরিবহণের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই শ্রমিকদের ঘরে ফেরার ব্যবস্থা করা যেত। বিমুদ্রাকরণ ও জিএসটি যেভাবে দেশের অসংগঠিত ক্ষেত্রের গোড়ায় কুঠারাঘাত করেছিল, এই লকডাউন দেশজুড়ে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত দেশের ৯০ ভাগ কর্মজীবীর মুখের গ্রাস কেড়ে নিতে উদ্যত। হয় ভাইরাসের আক্রমণে, নয় অনাহারে মৃত্যুকে বেছে নাওয়াই তাদের ভবিতব্য।

    দ্বিতীয়ত, যদি আপৎকালীন পরিস্থিতে তাদের ফেরত পাঠানো নাই যায়, তবে তাদের নিজ নিজ সংস্থাকে (সরকারি/ আধা সরকারি ও বেসরকারি) কেন বাধ্য করা যাবে না এই শ্রমিকদের জরুরি পরিস্থিতিতে তাদের থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করার? না হয় সরকার তাদের রেশনের যোগান দিত। যে রাষ্ট্র তার ১৩০ কোটি নাগরিককে বিনা নোটিশে একুশ দিনের জন্য গৃহবন্দি করে, সে এত অসহায় কেন ব্যক্তি-পুঁজির কাছে? স্মরণে রাখা দরকার, দেশে রাজস্বের ৮৫ ভাগ আসে পরোক্ষ কর থেকে, যাতে এই শ্রমিকদেরও অবদান থাকে দেশের অন্য নাগরিকদের মতো। আর এই অব্যবস্থার মাশুল হিসেবে যদি ব্যাপক হারে এই হতদরিদ্র মানুষগুলো সংক্রমিত হন, সে দায় কার?

    তৃতীয়ত, দেশের রাজধানীতে প্রায় সব স্তরের বিদ্যাচর্চার প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামো রয়েছে, যা দেশের অন্য কোনও শহরে নেই। আজ যখন প্রায় সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ, এই মহামারীর কালে কেন সে সব জাতীয় প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হবে না সহনাগরিকের প্রতি সহমর্মিতায়? এই দাবিও কি খুব অযৌক্তিক হবে, এই আপৎকালীন সময়ে দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগারগুলো ব্যবহৃত হোক করোনা পরীক্ষা কেন্দ্র হিসেবে? সরকার প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও দরকারি দ্রব্যের যোগান দিক এই মহামারীকে প্রতিহত করতে।

    আতঙ্কের আর এক জায়গা হল স্থানীয় বাজার, রোজই যেখানে প্রচুর মানুষের সমাগম হচ্ছে, ফলে অপরিসর স্থানে ভিড় হওয়া স্বাভাবিক। প্রথমত, বেশিরভাগ পরিবার এই হঠাৎ লকডাউনে দিশেহারা পরিবারের প্রতিদিনের ক্ষুণ্ণিবৃত্তির যোগান দিতে, উপরন্তু শ্লথ অর্থনীতির প্রভাবে বেশিরভাগ পরিবারের পক্ষেই সম্ভব নয় এতদিনের খাবার মজুত রাখা। দ্বিতীয়ত, পরিবহণ ব্যবস্থা স্তব্ধ থাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহও স্বাভাবিক নয়, ফলে একই দ্রব্যের খোঁজে একজনকে একাধিক স্থানে যেতে হচ্ছে বাধ্য হয়ে।

    এর বিকল্প কী?
    ১. গণবণ্টন ব্যবস্থার এখনও যে পরিকাঠামো টিকে রয়েছে, তাকে ব্যবহার করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সরবরাহ করা হোক বিকেন্দ্রীকৃত পরিকল্পনার মাধ্যমে। প্রয়োজনে এই সময়ে গণবণ্টনকে সর্বজনীন করা হোক, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে যাতে খাদ্যসংকটের সব সম্ভাবনাকে এড়ানো যায়।
    ২. শহরাঞ্চলেই প্রধানত বাজারে জন সমাগমের সমস্যার প্রাদুর্ভাব। গ্রামাঞ্চলের মানুষ বেশিটা নির্ভর করেন সাপ্তাহিক হাটের ওপর, যানবাহনের সমস্যায় সেগুলোয় ক্রেতা-বিক্রেতাদের বিপুল সমাগমের সম্ভবনা তুলনামূলক কম। ফলে অতি-সত্বর এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন, যাতে শাক, সবজি ও মুদিখানার জন্য মানুষকে বাজার অবধি না যেতে হয়।

    উচ্চ জনঘনত্বের দেশে ভিড় এড়ানো সত্যিই এক পাহাড়প্রমাণ দুরূহ কাজ, সরকারের কর্তাব্যক্তিরা তা উপলব্ধি করে আগাম প্রস্তুতি নিতে পারতেন। এই পরিকল্পনার অভাবে যাদের মাস গেলে অ্যাকাউন্টে বেতন চলে যায়, সেই ৫ থেকে ১০ শতাংশ পরিবার ছাড়া দেশের বাকিরা এক অজানা আশঙ্কায় দিন গুনছেন, কর্মহীন হয়ে পড়েছেন অসংখ্য কর্মজীবী। লকডাউনের সাতদিনের মাথায় প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চেয়েছেন এই ভোগান্তির জন্য। বিমুদ্রাকরণের অভিশাপ আজও যারা ভুলতে পারেননি তারা কীভাবে আশ্বস্ত হবেন, কেন না তখনও তো ৫০ দিন সময় চাওয়া হয়েছিল ‘আচ্ছে দিনের’ জন্য। তাই অনেকেই বাইরে বের হতে বাধ্য হচ্ছেন দুটো রুজিরুটির জন্য। রাষ্ট্র যেন মনে রাখে, মহামারীর কালে কেউ সেধে আগুনে ঝাঁপ দেয় না। ফলে এই গরিবগুরবো মানুষগুলোকে দোষ দেওয়ার আগে একবার রাষ্ট্রব্যবস্থার অপদার্থতাকে ধিক্কার দিই, তার নাগরিকদের প্রতি ন্যূনতম দায়িত্ব না নেওয়ার জন্য।

    লেখক বগুলার শ্রীকৃষ্ণ কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক।

    (মতামত লেখকের নিজস্ব)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More