সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৬

৩৭০ বাতিলে ভোট বাড়তে পারে, দেশের ভালো হবে না

ওমপ্রকাশ মিশ্র

কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত আইনসম্মত কিনা এবং তা সাংবিধানিক ভিত্তিতে স্থিরীকৃত হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।

জম্মু–কাশ্মীরকে ভারতবর্ষে সংযুক্তিকরণের যে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে, এবং বর্তমানে কাশ্মীরকে ঘিরে যে পরিস্থিতি, তার নিরিখে বলা যেতে পারে এই সিদ্ধান্ত দেশের স্বার্থে নয়।

সংবিধানের ৩৭০ ধারার সম্পূর্ণ ভাবে বিলুপ্তি ঘটানোর মধ্যে দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার কোন রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় রাখছেন, সেটা বোঝা সম্ভব নয়। এর আগেই ৩৭০ ধারার নানাবিধ ব্যবস্থাদি দীর্ঘ সময় ধরে লঘু করার প্রচেষ্টা হয়েছে এবং সেটা আইনসম্মত ভাবেই হয়েছে। কিন্তু সার্বিক ভাবে জম্মু–কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনের প্রেক্ষাপটে তাদের যে বিশেষ মর্যাদা ছিল সেটাকে খর্ব করে বা সেটাকে নিশ্চিহ্ন করে বর্তমান ঘোষণা দেশের স্বার্থে করা হয়েছে বলে মনে করছি না।এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিজেপির রাজনৈতিক লাভ হয়তো হতে পারে, কিন্তু ভারতবর্ষের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে কীভাবে তা মজবুত করবে তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।

দ্বিতীয়ত, জম্মু–কাশ্মীরে শান্তি স্থাপনে ও আমাদের নিরাপত্তা বৃদ্ধির স্বার্থে এই পদক্ষেপ কতটা যুক্তিযুক্ত তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।

তৃতীয়ত,যে ভাবে জম্মু কাশ্মীরের বিধানসভার পরিবর্ত হিসেবে কাশ্মীরের রাজ্যপালের সুপারিশক্রমে এটা করা হল, সেটা আইনগত দিক থেকে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে বাধ্য।

চতুর্থত, জম্মু–কাশ্মীরে শান্তির উদ্যোগ ও নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করতে এই সিদ্ধান্ত যে কোনওভাবেই যে যুক্তিপূর্ণ নয় সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

মনে রাখতে হবে জম্মু কাশ্মীরকে সংযুক্তিকরণের যে ঘোষণাপত্র Instrument of Accession, তার পরিপন্থী কোনও অবস্থান শুধুমাত্র ঐতিহাসিক দিক দিয়ে ভুল তাই নয়, রাজনৈতিক দিক দিয়েও এটা বিভ্রান্তিমূলক। জম্মু কাশ্মীর ভারতবর্ষের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এবং অন্যান্য বিভিন্ন রাজ্যের জন্য সংবিধানের ৩৭১ ধারায় যে সমস্ত ব্যবস্থাদি রয়েছে সেই ব্যবস্থাদির নিরিখেই ৩৭০ ধারার প্রয়োজনীয়তার জায়গাটি দেখা যেতে পারে।

অরুণাচল প্রদেশে ইনার লাইন পারমিট ব্যবস্থা রয়েছে। উত্তর–পূর্ব ভারতের বেশ কিছু রাজ্যে অন্যান্য রাজ্যের অধিবাসীরা জমি ক্রয়–বিক্রয় করতে পারেন না। এছাড়াও অন্যান্য বেশ কিছু রাজ্যে সেখানকার প্রয়োজনের নিরিখে বেশ কিছু সাংবিধানিক সংরক্ষণ আছে। সেই দিক থেকে দেখতে গেলে জম্মু–কাশ্মীরের স্পেশাল স্ট্যাটাসটিকে শেষ করার মধ্যে দিয়ে ভোট বৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণ হতে পারে। কিন্তু কোনওভাবেই ভারতবর্ষের জাতীয় সংহতিকে মজবুত করার কোনও প্রচেষ্টা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের ক্ষতি ছাড়া লাভ কিছু হবে না।

সার্বিক ভাবে বলতে গেলে কেন্দ্রীয় সরকারের ঘোষণা বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেলিত করবে, জাতীয় সংহতিকে প্রশ্ন চিহ্নের মুখে দাঁড় করাবে, এবং যে অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এই গোটা প্রক্রিয়াটি কার্যত বলপূর্বক চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা হচ্ছে সেটার ফল হিতে বিপরীত হবে।

মতামত লেখকের নিজস্ব

লেখক যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক (International Relations) বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান।

Comments are closed.