বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১২
TheWall
TheWall

আলোচনা না করে রাজ্য টুকরো, যদি বাংলাতেও এমন হয়?

নীলোৎপল বসু

৩৭০ ধারা নিয়ে সোমবার রাজ্যসভায় এবং মঙ্গলবার লোকসভায় যা হল, এটা কখনই ভারতের গণতন্ত্রের বিজ্ঞাপন হতে পারে না। কারণ আমরা যখন ব্রিটিশ শাসনে ছিলাম, তখন ব্রিটিশ সরকার ভারতের জনগণকে অংশগ্রহণের সুযোগ না দিয়েই, একতরফা ভাবে অনেক আইন প্রণয়ন করেছে। অনেক ক্ষেত্রে এই আইন গ্রহণ করার বিরুদ্ধে যে সমস্ত লড়াই হয়েছে, তাকেও রক্তে ডুবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। আমরা সদ্য জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শতবর্ষ উদযাপন করলাম। ব্রিটিশদের আনা রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে হিন্দু-মুসলমান-শিখ সব সম্প্রদায়ের মানুষ জালিয়ানওয়ালাবাগে প্রতিবাদ করছিল। তাকে রক্তপাতের মধ্যে দিয়ে, হিংসার মধ্যে দিয়ে থামিয়ে দেওয়ার একটা প্রচেষ্টা ছিল।

মূলত যারা হিন্দুত্ববাদী তাদের পক্ষ থেকে ৩৭০ ধারা নিয়ে প্রথম থেকেই একটা বিতর্ক তৈরি করা হয়েছে। বিজেপি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অনেক আগেই হিন্দুমহাসভা জম্মুতে যে প্রজা পরিষদ ছিল, তারা বিরোধিতা করেছিল। ৩৭০ ধারা ভারতের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার একটা বিশেষ ইতিহাস রয়েছে। কী সেই ইতিহাস? আমাদের দেশ যখন স্বাধীন হয়, তখন ব্রিটিশের হাত থেকে স্বাধীনতা এবং  অধিকারগুলি সরাসরি আমাদের সরকারের হাতে আসেনি। ব্রিটিশ শাসন হস্তান্তর করে ভারত এবং পাকিস্তানকে। তার সঙ্গে যে ৫৮৫ টি রাজন্য শাসনভুক্ত করদ রাজ্য ছিল তারা ভারতের সঙ্গে থাকবে না পাকিস্তানের সঙ্গে যাবে নাকি আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র হবে এই বিষয়টি তাদের বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। ৫৮৫টি রাজ্যের মধ্যে ৫৬৫টি রাজন্য শাসনভুক্ত এলাকা ভারতে অন্তর্ভুক্ত হয়। কিছু রাজ্য পাকিস্তানের সঙ্গে যায়।

তিনটি জায়গা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। জুনাগড়, হায়দরাবাদ এবং জম্মু-কাশ্মীর। জুনাগড়ে একটা বিচিত্র পরিস্থিতি ছিল। সেখানকার নবাব পাকিস্তানে যেতে চাইলেও, সেখানকার জনগণের মধ্যে প্রবল বিক্ষোভ এবং আক্রোশের পরিপ্রেক্ষিতে সেখানে জনসুমারি হয়। তার মধ্যে দিয়ে জুনাগড় ভারতেই অন্তর্ভুক্ত হয়। হায়দরাবাদের ক্ষেত্রে একটা বিস্ফোরণ ঘটে। এবং শেষ পর্যন্ত একদিকে হায়দরাবাদের মানুষের প্রবল আন্দোলন এবং অন্যদিকে ভারত সরকারের সামরিক হস্তক্ষেপের মধ্যে দিয়ে হায়দরাবাদও অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় ভারতে।

কিন্তু জম্মু-কাশ্মীরের ক্ষেত্রে পটভূমিটা খানিকটা অন্যরকম ছিল। তিনটি বৈচিত্র্যপূর্ণ এলাকা নিয়ে জম্মু ও কাশ্মীর ছিল। একদিকে মূলত হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাসের জায়গা জম্মু। কিন্তু সেখানে অল্প হলেও মুসলমান ছিলেন। দুই, লাদাখ। যার দুটো ভাগ। এক দিকে বৌদ্ধধর্মীর সংখ্যা বেশি। আর অন্য দিকে মুসলমান অধ্যুষিত কার্গিল এলাকা। আর কাশ্মীর উপত্যকা, যেখানে মূলত মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষই থাকতেন। কিন্তু ওখানকার রাজা হরি সিং-এর একটা দ্বিধা ছিল।

এটা লক্ষনীয় ব্যাপার যে, কাশ্মীরের কৃষকরা শেখ আবদুল্লাহ’র ন্যাশনাল কনফারেন্সের নেতৃত্বে লড়াই করেছিলেন ভারতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য। মূলত তাঁদের চাপেই যে পরিস্থিতি তৈরি হয় সেই পরিস্থিতিই ভারতবর্ষে যুক্ত হওয়ার অনুকূলে আরও কিছুটা উপাদান যুক্ত করে দেয়। প্রথমে কিছু উপজাতি সম্প্রদায়ের মানুষ এবং পরে সরাসরি পাকিস্তান সেনাবাহিনী কাশ্মীর দখলের জন্য অভিযান করে। হরি সিং তখন ভারতের কাছ থেকে সামরিক সাহায্য পাওয়ার জন্য ব্রিটিশ সরকারের কাছে আবেদন করেন। এরপরে ইনস্ট্রুমেন্ট অফ অ্যাকসেশন স্বাক্ষরিত হয় ভারত সরকার এবং মহারাজা হরি সিং-এর মধ্যে। পরবর্তীকালে ৩৭০ ধারাতেও এই বিষয়বস্তুগুলি অন্তর্ভুক্ত হয়।

এখন ৩৭০ ধারার যে মূল কথা, সেটা হচ্ছে ভারতবর্ষের অন্যান্য এলাকায় যে আইন, সেই আইনগুলি জম্মু-কাশ্মীরের ক্ষেত্রে লাগু হতে গেলে সেখানকার নিজস্ব সংবিধান পরিষদের সম্মতি লাগবে (এই সংবিধান পরিষদ তৈরি হয়েছিল ইনস্ট্রুমেন্ট অফ অ্যাকসেশন অনুযায়ী)।

আমি এর পরের ঘটনা পরম্পরায় যাব না, শুধু এটুকু বলে রাখাই যায়, ৩৭০ ধারায় যে অধিকারগুলি দেওয়া হয়েছিল, সেই অধিকারগুলি ধীরে ধীরে অনেকটাই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। সোমবার যেটা হয়েছে সেটা হচ্ছে সেই ক্ষয়ে যাওয়া অধিকারগুলি চূড়ান্ত ভাবে এই বিল পাশের মধ্যে দিয়ে একেবারেই সমাপ্তি টানা হয়েছে। আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হয়েছে।

রাজ্যের অধিকার, রাজ্যের ক্ষমতা এবং রাজ্যের যে মানচিত্র সেটা বদলাবার যে পদ্ধতি সেটা সংবিধানের ৩ নং ধারা অনুযায়ী হয়। এই ধারা কার্যকরী করতে গেলে, বিশেষ অধিকার না থাকলেও সেই রাজ্যের নির্বাচিত বিধানসভার সম্মতি লাগে। সাম্প্রতিক কালে আমাদের যে নতুন কতগুলো রাজ্য তৈরি হয়েছে, যেমন ঝাড়খণ্ড, ছত্তীসগড়, তেলেঙ্গানা, উত্তরাখণ্ড ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই আলাপ–আলোচনার ভিত্তিতে এবং অবিভক্ত রাজ্যের বিধানসভার সম্মতি নিয়ে দেশের সংসদে বিল প্রস্তাবনার আকারে পেশ ও পাশ হওয়ার পর নতুন রাজ্য তৈরি হয়েছে।

বিশেষ অধিকারের বিষয়টি বাদ দিয়েও বলা যায়, জম্মু–কাশ্মীরের ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে সেটা অভিনব। বহু জায়গায় যেখানে কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল আছে সেখানকার মানুষ লড়াই করেছে পূর্ণ অধিকারের জন্য, পূর্ণ মর্যাদা প্রাপ্ত রাজ্যের জন্য। কিন্তু এটা বোধহয় প্রথম ঘটনা যেখানে পূর্ণ মর্যাদা প্রাপ্ত একটি রাজ্যকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা হল এবং এটা এমন একটা সময় করা হল যখন সেই রাজ্যে বিধানসভা নেই, নির্বাচিত বিধানসভার কোনও অস্তিত্ব নেই। এর পেছনেও একটা ইতিহাস আছে। যখন আমাদের এখানে লোকসভা নির্বাচন হচ্ছিল তখন কোনও অজানা কারণে কেন্দ্রীয় সরকার এবং নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নেয় জম্মু–কাশ্মীরে লোকসভা নির্বাচনের পরিস্থিতি রয়েছে কিন্তু বিধানসভা নির্বাচনের পরিস্থিতি নেই। বিজেপি এবং পিডিপি’র যে সরকার ওখানে ছিল বিজেপি সমর্থন প্রত্যাহার করায় সেই সরকার ভেঙে যায়। পরে ন্যাশনাল কনফারেন্স ও  পিডিপি’র মধ্যে বিধানসভার কাঠামোর মধ্যেই একটা বিকল্প সরকার তৈরি করা নিয়ে যখন আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই কেন্দ্রীয় সরকার রাষ্ট্রপতি শাসন থাকার সুযোগে বিধানসভা ভেঙে দেয়। অর্থাৎ আজকে যখন ৩৭০ ধারার বিলুপ্তি, রাজ্যের মানচিত্র ও শাসন ব্যবস্থার সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের প্রসঙ্গ আলোচিত হচ্ছে সেই আলোচনায় নির্বাচিত বিধানসভার অংশগ্রহণ বা মতামত দেওয়ার প্রশ্ন যাতে না উঠতে পারে তার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার আগেই পদক্ষেপ নিয়েছে। এমতাবস্থায় যে আইনগুলো পাশ করা হল তার ফলে এটা নিশ্চিত হল যে নির্বাচিত প্রতিনিধি তো দূরের কথা এমনকী সাধারণ মানুষের মতামতও এর মধ্যে প্রতিফলিত হল না।

কেন্দ্রীয় সরকারের একটা যুক্তি হচ্ছে, যে কোথাও যদি বিধানসভা না থাকে তাহলে বিধানসভা সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করার ক্ষমতা সংসদের হাতে আছে। কিন্তু মৌলিক প্রশ্ন হচ্ছে যে সিদ্ধান্ত বা আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে এবং যাদের ওপর সেই প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে সেই সাধারণ মানুষদের অংশগ্রহণ না রেখে যেভাবে প্রক্রিয়াটি চালানো হল তাকে কী বলা যায়!

আমরা বামপন্থীরা বলছি যে এটা সরাসরি স্বৈরতান্ত্রিক একটি পদক্ষেপ। যে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো আমাদের আছে এবং আমাদের সংবিধানের যে মূল সুর–  বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য সেটা গড়ে তুলতে গেলে বিভিন্ন রাজ্যগুলিকে অনেক বেশি স্বশাসনের ক্ষমতা দিতে হবে। এই ধারণার মূলেই কুঠারাঘাত করা হয়েছে। ৩৭০ ধারার  অন্তর্গত যে বিশেষ অধিকারগুলো রয়েছে, তার মধ্যে অনেকগুলিই শুধু জম্মু–কাশ্মীর নয় আরও এগারোটি (জম্মু–কাশ্মীর সহ) রাজ্যে সেই অধিকারগুলি রয়েছে। তাহলে এখন সেগুলো কি উঠিয়ে দেওয়া হবে? কারণ এখন এক নতুন রণধ্বনি শোনা যাচ্ছে, ‘এক দেশ এক আইন’। স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠা সংবিধানের যে মূল সুর, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য তার সম্পূর্ণ ভাবে পরিপন্থী এই নতুন রণধ্বনি। কারণ বিভিন্ন রাজ্যের মানুষের ভাষা, সাংস্কৃতিক ও আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য ইত্যাদির কারণে যে চাহিদা, গণতন্ত্রের প্রতি যে আকাঙ্ক্ষা মানুষের মধ্যে তৈরি হয় সেই অনুযায়ী এই অধিকারগুলো দেওয়া রয়েছে। এটা সারা দেশে একরকম হতে পারে না।

এর আগে একই ধরনের স্লোগান আমরা শুনেছি, ‘এক দেশ, এক ট্যাক্স’। কিন্তু   ৩৭১ ‘এ’ থেকে ‘আই’ পর্যন্ত [371 (A) to 371 (I)] যে ব্যবস্থাগুলো রয়েছে তার মধ্যে অনেক ব্যবস্থাই, এমনকী ট্যাক্স না দেওয়ার কথাও বলে আছে। যেমন অরুণাচলে। সুতরাং ‘এক আইন এক ট্যাক্স’ হওয়া সম্ভব নয়। আমাদের মতো একটি বহুত্ববাদী বৈচিত্রপূর্ণ দেশে এই ধরনের একটি পদক্ষেপ গ্রহণ সম্পূর্ণ ভাবে স্বৈরতান্ত্রিক। এটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না।

আমাদের  বিরোধিতা মৌলিক কারণে। সেই কথা নিয়ে আমাদেরই মানুষের কাছে যেতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে যে ভারতবর্ষের মতো দেশে, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের যে মূল নীতি সেই নীতিকে যদি আমরা অস্বীকার করি, সেক্ষেত্রে ভারতবর্ষের এক থাকা মুশকিল। গণতন্ত্রের বিকাশ ভারতবর্ষের মতো দেশে সব জায়গায় সমান ভাবে হয় না। সেই কারণেই আমরা এই ধারা প্রত্যাহারের বিরোধিতা করছি এবং আমরা মনে করি যেভাবে এই আইনটা পাশ করা হল তা সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক। শুধুমাত্র বিধানসভা থাকা এবং না থাকা নয়, গত সাতদিন ধরে সরকারের পক্ষ থেকে সিলেক্টিভলি খবর লিক করা হয়েছে, এবং অন্যদিকে তিনদিন আগে পর্যন্ত রাজ্যপাল নিজে বলেছেন, এরকম কোনও খবর আমাদের কাছে নেই। এখন এটা প্রমাণিত যে রাজ্যপালের সম্মতির ভিত্তিতেই এই প্রেসিডেন্সিয়াল নোটিশ পাঠানো হয়েছিল।

গোটা রাজ্যকে কার্যত একটা কনস্ট্রেশন ক্যাম্পে পরিণত করে শুধুমাত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী মতামত আছে এমন নেতাদের নয়, সমস্ত মূলধারার রাজনৈতিক নেতাদের আটক করা হয়েছে। যারা শত প্ররোচনার মধ্যেও ভারতবর্ষের সংবিধানের কথা তুলে ধরার জন্য আক্রান্ত হয়েছে। আমাদের নেতা কমরেড ইউসুফ তারিগামি’র জীবনের ওপর একাধিক বার আক্রমণ হয়েছে এবং সেটা বিছিন্নতাবাদীরাই করেছে। সেই আক্রমণ মোকাবিলা করেই তারা ভারতের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। তাদেরকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে এই যে কাজটা করা হচ্ছে, আমরা সম্পূর্ণভাবে তার বিরোধী। সরকারের এই পদক্ষেপ আরও সমস্যা বাড়াবে। সমস্যা কমবে না। আমাদের দাবি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই সরকার তার সিদ্ধান্ত বদল করুক। দেশ একটা ভযঙ্কর অবস্থার দিকে চলে যাবে।

এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা উদাহরণ তৈরি করল। যে কোনও রাজ্যের বিধানসভা  ভেঙে রাজ্যপালের সম্মতি নিয়ে বিধানসভার ক্ষমতাকে সংসদের হাতে তুলে নিয়ে এই ধরনের একটা পরিবর্তন যদি করা হয়, তাহলে সেটা খুব বিপজ্জনক একটা প্রবণতা। যদি এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হয় যে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নেই এমন অবস্থায় পশ্চিমবঙ্গকে কয়েক টুকরো করে দেওয়া হল, তার থেকে বিষবৎ পরিত্যাজ্য কোনও ঘটনা ঘটতে পারে না।

লেখক সিপিআই (এম)–এর পলিটব্যুরোর সদস্য ও রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ।

Comments are closed.