মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৭

এ কোন সর্বনাশা জেদ!

মিতুল দত্ত

ঘটনাটা তো জানাই। এনআরএস হাসপাতালে রোগীর মৃত্যু। লরিভর্তি দুশোর ওপর মানুষের তাণ্ডব। ভাঙচুর। ডাক্তারদের ওপর হামলা। পুলিশ, দর্শকের ভূমিকায়। হামলায় গুরুতর আহত হন দুই ইন্টার্ন ডাক্তার, পরিবহ মুখোপাধ্যায় আর যশ তেকওয়ানি, অল্পবিস্তর আঘাত পান আরও কয়েকজন। যশকে এনআরএস-তেই ভর্তি করা হয়। কিন্তু পরিবহর ফ্রন্টাল লোবের একটি অংশ ভেঙে ঢুকে গিয়েছিল মাথার ভেতরের দিকে, যাকে বলে ডিপ্রেসড ফ্র্যাকচার, তাকে ভর্তি করা হয় ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সের আইসিইউ-তে।

এরপর শুরু হয় আন্দোলন। সারা রাজ্য জুড়ে। এমনকী দেশের অন্যান্য কয়েকটি হাসপাতালও এই আন্দোলনে সামিল হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় সমস্ত সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা পরিষেবা। এমার্জেন্সি বাদে। আউটডোর আর প্রাইভেট চেম্বারও। যাকে বলে, শাটডাউন। ডাক্তারদের সংগঠনগুলির যৌথ মঞ্চের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এর পরেও সরকার তাদের দাবি মেনে না নিলে আরও বড় আন্দোলনের রাস্তায় হাঁটবেন তারা। দাবি যথেষ্টই ন্যায্য আর প্রাসঙ্গিক, না মানার কিছু নেই। দোষীদের শাস্তি, পর্যাপ্ত সিকিউরিটি, চিকিৎসার ঠিকঠাক পরিকাঠামো, এইসব।

কিন্তু ব্যাপারটা অত সোজা নয়। ১২ জুন, সকাল নটা থেকে রাত নটা। শাটডাউন।

এই একদিনেই সমস্ত সিস্টেম ধ্বসে পড়ার জোগাড়। সারাটা দিন ধরে শুধু গণ্ডগোল আর হামলার খবর। অজস্র অসুস্থ মানুষজন, যাদের সরকারি হাসপাতালই ভরসা, দুর্বিষহ অবস্থা তাদের। যদিও প্রায় সমস্ত হাসপাতালেই এমার্জেন্সি খোলা। এর মধ্যেও ডাক্তাররা অক্লান্ত চেষ্টা করছেন পরিস্থিতি যতটা সম্ভব সামলে নিতে, কিন্তু এই এত এত মানুষ, সেখানে এই পরিষেবা তো কখনোই পর্যাপ্ত নয়। সমস্যা ক্রমশই গভীর থেকে গভীরতর।

অথচ প্রশাসন অদ্ভুতভাবে, সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত। অপরাধীদের খুঁজে বের করা তো দূরের কথা, উল্টে আন্দোলনকারী জুনিয়র ডাক্তারদের গায়ে বহিরাগতের তকমা সেঁটে দেওয়া হচ্ছে। আহত ডাক্তারের বাড়ির লোকজনকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে অনবরত। এবারে, সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে ক্ষোভ, প্রায় দাবানলের মতোই। যার ফলস্বরূপ ১৪ তারিখে, আবারও একটি মহামিছিল দেখল শহর কলকাতা। সেই নন্দীগ্রামের পর। প্রায় দশহাজার ডাক্তার, বিশিষ্টজন আর সাধারণ মানুষ পা মেলালেন সেই মিছিলে। একের পর এক সরকারি হাসপাতালে গণইস্তফা দিয়ে বেরিয়ে এলেন ডাক্তাররা, এমনকী সিনিয়ররাও।

অদ্ভুত ব্যাপার, এরপরেও প্রশাসন, আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে, আমাদের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী, অনড়! এমনকী, সোমবারের হামলায় মারাত্মকভাবে জখম পরিবহকে একবার দেখতেও গেলেন না। এনআরএস-এ আন্দোলনকারী জুনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে কথাও বললেন না একটিবার। এ কীসের জেদ? যেখানে জুনিয়র ডাক্তাররা অন্যকিছু নয়, তাদের নিরাপত্তা, সুস্থভাবে কাজ করার অধিকারটুকু চাইছেন!

এই জেদের জন্য সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কে, কারা? একেবারে সাধারণ মানুষ, যাদের সরকারি হাসপাতালই একমাত্র ভরসার জায়গা, তারাই তো? এই পাঁচদিনে যা ক্ষতি হল এ রাজ্যের চিকিৎসাব্যবস্থার, তা তো অপূরণীয়। আর দুটো দিনও যদি এভাবে কাটে, ডাক্তারদের অমানুষ, গণশত্রু ভাবতে শুরু করে মানুষ, তাহলে লাভটাই বা আখেরে কার? এমনিতেই এই ডিজিটাল মিডিয়ার যুগে খবর চাপা থাকে না, সমস্ত পৃথিবীর কাছে মাথা হেঁট হয়ে গেছে এ রাজ্যের।

এরপর আবার ‘এসমা’ (এসেনশিয়াল সার্ভিস মেইনটেনেন্স অ্যাক্ট) জারি করার একটা আভাস দিয়েছে প্রশাসন, যে আইন সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য দাবিদাওয়ার আন্দোলনকে দমন করার উদ্দেশ্যে জারি করা হয়। আশার কথা, রাতেই একটি প্রেস বিবৃতিতে জুনিয়র ডাক্তাররা জানিয়েছেন, সারা রাজ্যে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে অবনতি হোক, তারা চান না। আলোচনার রাস্তা খোলা আছে। প্রশাসন একটা হাত বাড়ালে দশটা হাত বাড়িয়ে দেবেন তারা।

জানি না কী হবে, তবু আমরা, ডাক্তারদের ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছি যারা, মনেপ্রাণে চাইব, এই অচলাবস্থা কেটে যাক। প্রশাসন আর জুনিয়র ডাক্তাররা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে যাবতীয় বিভ্রান্তি, দাবিদাওয়া মিটিয়ে নিক। আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরেকটু ভালো হোক। রোগীপিছু ডাক্তারের সংখ্যা বাড়ুক। হাসপাতালের পরিকাঠামোয় আরেকটু বেশি আধুনিকতা আসুক। গ্রামেগঞ্জে হাসপাতালের যা বেহাল অবস্থা, তার একটু উন্নতি হোক। আর ডাক্তাররা যেন ঠিকঠাক নিরাপত্তা পান। কথায় কথায় তাদের বলির পাঁঠা ভেবে নেওয়ার প্রবণতা, এ তো এই সমাজেরই একটা ঘোরতর অসুখ। ডাক্তাররা যে প্রাণ বাঁচাতে চেষ্টা করেন শেষ অবধি,  প্রাণ নিতে নয়, মানুষকে এটা বিশ্বাস করতেই হবে। অবিশ্বাসের হাওয়ায়, আর যাই হোক, ডাক্তার আর রোগীর পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে না। এই বিশ্বাসটুকু ফিরিয়ে আনা, এইমুহূর্তে ভীষণ জরুরি।

মতামত নিজস্ব

মিতুল দত্ত কবি, সঙ্গীতশিল্পী।  বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনে, বারবার, শুধুমাত্র মানবিকতার খাতিরে জড়িয়ে পড়েন।

Comments are closed.