এ রাজ্যের মানুষ প্রাদেশিকতাকে সিকি পয়সাও খাজনা দেবেন না

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    জিষ্ণু বসু

    যারা ”ভারত তেরে টুকরে হোঙ্গে” বলেছিলেন, তারা হেরে গেছেন। দেশের মানুষ আরও একবার প্রমাণ করলেন, ভারতবর্ষ এক ছিল, এক আছে আর এক থাকবে। জাতপাতের বিভাজনকারী রাজনীতির ব্যবসায়ীদের উত্তরপ্রদেশে দোকান বন্ধ হওয়ার উপক্রম। গত চার বছরে পাঁচতারা হোটেলে থাকা সেলিব্রেটিরা ভারত ছেড়ে যেতে চেয়েছেন, কিন্তু দেশের আপামোর সংখ্যালঘু মানুষ এই দেশের মাটিতেই জান্নাত খুঁজে পেয়েছেন। সাচার কমিটির রিপোর্টে যে বীভৎস চেহারা উঠে এসেছিল, সেই অন্ধকার যেন একটু একটু করে সরে যাচ্ছে। সাম্প্রদায়িক ভেদভাবকে হারিয়ে দিয়েছে দেশাত্মবোধ। সন্ত্রাস, সিন্ডিকেট, টাকার থলির প্রলোভনকে রুখে দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন এরাজ্যের মানুষও। যাঁরা হেরে গেছেন তাঁরা ইভিএম বন্ধ করে আবার ব্যালট পেপার ফিরিয়ে আনতে চাইছেন। মানুষ হাসছেন, কে চায় পালকির যুগে ফিরে যেতে! মানুষ তো ‘ফোর–জি’ থেকে ‘ফাইভ–জি’তে এগিয়ে যেতে চাইছেন।

    ডুবন্ত মানুষ যেমন খড়কুটো ধরে বাঁচতে চায়, তেমন যাঁরা হেরে গেছেন তারা শেষ ভরসা হিসেবে প্রাদেশিকতাকে আঁকড়ে ধরতে চাইছেন। এই রাজ্যের শীর্ষস্থানীয় নেতানেত্রীরা প্রকাশ্যে অবাংলাভাষীদের বলছেন, ”দে আর নট বেঙ্গল পিপল”। এর মানে কী? কখনও গুজরাট সম্পর্কে অসম্মানজনক কথা বলছেন। এ রাজ্যে বহু গুজরাতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আছেন যেমন ভারতের বহু রাজ্যে বাংলাভাষী মানুষ আছেন। দেশের সংবিধান পশ্চিমবঙ্গে গুজরাতিকে বা গুজরাতের বরোদাতে থাকা কোনও বাঙালিকে অপমান করা অমার্জনীয় অপরাধ বলেছে। এই প্রবণতা বিপজ্জনক হবে।

    ভারতের নবজাগরণের সূচনাই হয়েছিল বাংলায়। সেযুগে বাঙালি মনীষীরা কিন্তু সমগ্র ভারতবর্ষের কথাই বলেছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, ”হে ভারত ভুলিও না…”, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতের মহামানবের সাগরতীরে দাঁড়াতে বলেছিলেন। তাই ভারতবর্ষকে বাদ দিলে বাংলার না থাকবে শ্রী না থাকবে ভিত্তি। দেশভাগের সময়ও এমন একটা দোলাচলের আভাস ছিল। ১৯৪৬ সালে ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’–এর নায়ক ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি। তিনি কলকাতার কয়েকজন নেতাকে ভুল বুঝিয়ে ভারতবর্ষ থেকে পৃথক সার্বভৌম বাংলার পরিকল্পনা করেছিলেন। তখন মুসলিম লীগ আর কম্যুনিস্ট পার্টি অব ইণ্ডিয়া সমগ্র বাংলাকে পাকিস্তানের অংশ করতে চেয়েছিল। এই প্রয়াসকে সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করেছিলেন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। সেদিন জিতে গিয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হল। তা না হলে আজ কোলকাতা সহ সমগ্র রাজ্যটাই কোনও এক মুসলিম রাষ্ট্রের অংশ হত। তাই এই রাজ্যের মানুষ ঘর পোড়া গরু, সিঁদুরে মেঘ দেখলেই বুক কেঁপে ওঠে। ভারতীয়ত্বকে বাদ দিয়ে বাঙালিয়ানা দেখলেই মনে হয়, আবার কোনও বড় ফাঁদ নেই তো?

    কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন শিক্ষানীতিতে হিন্দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। তামিল বা মালায়লামভাষীদের পক্ষে তৃতীয় ভাষা হিসেবে বাধ্যতামূলক ভাবে হিন্দি শেখাটা সত্যিই কষ্টকর। কারণ শব্দ বা বাক্যগঠনের রীতি ওই ভাষাগুলিতে অনেকটাই আলাদা। আবার বাংলার মতো সমৃদ্ধ ভাষার নিজেরও একটা মর্যাদা আছে। যাদের বাংলার মতো মাতৃভাষা, যে ভাষাতে এত সাহিত্য, এত গান, এতরকম বই, পত্রিকা, যে ভাষার বিশ্বজোড়া বিস্তার তাদের তো স্বাভিমান থাকবেই। আর ভাষা হিসেবে আজকের হিন্দির বয়সও তেমন বেশি নয়।

    এতসব মেনেও একটা কথা ভাবা প্রয়োজন, এতবড় সুপ্রাচীন দেশটার তো একটি দেশীয় রাজভাষা বা অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ থাকবে। তার বদলে যদি সব প্রদেশের বোঝার জন্য ইংরাজি, ফরাসি বা স্প্যানিস (যেমন অনেক দেশে এখনও আছে) থাকলে কি ভারতীয় হিসেবে আমাদের সম্মান বাড়বে? এই ভাবনা স্বাধীনতার আগেও মহাত্মা গান্ধী বা নেতাজি সুভাষের মতো দেশনেতার মনে এসেছিল। দুজনেই ভেবেছিলেন হিন্দি এই স্থান নিতে পারে। আজকের হিন্দির আদি ধারা মানে মৈথিলি, ব্রজবুলি বা অবধি মূলত বিহার বা যুক্তপ্রদেশের মানুষের ভাষা ছিল। গান্ধীজি বা নেতাজি কেউই ওই অঞ্চলের ছিলেন না। তাই ওইসব মনীষীরা সারা দেশের কথা ভেবেই হিন্দিকে বেছেছিলেন।

    শেষ পর্যন্ত স্বাধীন ভারতে ১৯৬৩ সালে রাজভাষা আইন পাশ হল। হিন্দিকে রাজভাষা বা ভারতের অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ হিসেবে গ্রহণ করা হল। তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন জওহরলাল নেহেরু। এই আইনের সংশোধনের কাজ হল ১৯৬৭ সালে। তখনও কংগ্রেসের শাসন। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। তাই রাজভাষা হিসেবে হিন্দি প্রবর্তনের ক্ষেত্রে কোনওভাবেই আরএসএস বা বিজেপি’র ভূমিকা ছিল না। সে যাই হোক, এবিষয়ে কতগুলি মিথ্যে কথা প্রচার করে বহুসময় প্রাদেশিকতার আগুন জ্বেলে রাজনীতির রুটি সেঁকা হয়। বলা হয় হিন্দি একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। কথাটা একদম অসত্য। সংবিধানের অষ্টম তফসিলে ভারতের ২২ টি ভাষার সবকটি রাষ্ট্রভাষা বা ন্যাশনাল ল্যাঙ্গুয়েজ। রাজভাষা আইন মতে পশ্চিমবঙ্গে কোনও সরকারি কাজ যদি বাংলাভাষায় করা সম্ভব হয়, তাকে হিন্দির মাধ্যমে প্রতিস্থাপনের কথা বলা নেই। বরং ইংরাজির সঙ্গে সঙ্গে অন্তত হিন্দি ভাষান্তর অনিবার্য বলা আছে ”ধারা ৩(৩)” হিসেবে। ”ত্রি ভাষা সূত্র” মতে পশ্চিমবঙ্গে কোনও সংস্থার নামের ফলকে সবচেয়ে উপরে বাংলা তার নিচে হিন্দি এবং সবচেয়ে নিচে ইংরাজি থাকার কথা।

    রাজনৈতিক নেতানেত্রীর সঙ্গে নতুন শিক্ষানীতিতে বাংলার অনেক এগিয়ে থাকা সংবাদ মাধ্যমও ”হিন্দি–হিন্দু–হিন্দুস্থান”–এর গন্ধ খুঁজে পাচ্ছেন। সারা ভারতেই তথাকথিত ”লেফ্ট লিবারাল” সংবাদ জগৎ এই ”ন্যারেটিভ” সঙ্ঘের বিষয়ে পরিকল্পনামাফিক তৈরি করেছে। এর মধ্যে কণামাত্র সত্যতা নেই। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের জন্ম ১৯২৫ সালে নাগপুরে। মারাঠি ভাষার সঙ্গে হিন্দির দূরত্ব বাংলার সঙ্গে হিন্দির দূরত্বের থেকে কম নয়। সঙ্ঘের প্রার্থনা শুরুতে মারাঠি ভাষায় ছিল। পরে তা সর্বভারতীয় গ্রহণযোগ্যতার কথা মনে রেখে সংস্কৃতে করা হয়েছে। কখনোই হিন্দি ছিল না বা হিন্দি করার প্রয়াস করা হয়নি।

    ভারতবর্ষের প্রতিটি প্রদেশের স্থানীয় ভাষা সম্মান পাক আরএসএস তার জন্য লাগাতার চেষ্টা করেছে। ২০১৪ সালে ১৩, ১৪, ১৫ মার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছিল সঙ্ঘের অখিলভারতীয় প্রতিনিধি সভা। সেই সভাতে ”মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা”র প্রস্তাব সর্বসম্মত ভাবে গৃহীত হয়েছিল। প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, সম্ভব হলে প্রতিটি ভারতীয়র মাতৃভাষায় না হলে অন্তত সংবিধান স্বীকৃত প্রাদেশিক ভাষাতে প্রাথমিক শিক্ষাদান নিশ্চিত করতে হবে। ঠিক ৩ বছর পর ২০১৮ সালের প্রতিনিধিসভায় আবার ”ভারতীয় ভাষার সংরক্ষণের ও উৎসাহদান”–এর জন্য প্রস্তাব গৃহীত হয়। ভারতবর্ষের কত ভাষা পৃষ্ঠপোযকতার অভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে সংস্কৃতিও। এদেশে এই বৈচিত্র্য না থাকলে দেশের প্রাণটাই চলে যাবে।

    তাই গতবছর বিজয়া দশমী’র ভাষণে সঙ্ঘের সরসংঘচালক মোহনরাও ভাগবত সারা দেশে হিন্দি বা সংস্কৃতের প্রচলনের বিষয়ে একটি বাক্যও বলেননি। যে দুটি বাক্য নতুন শিক্ষানীতির বিষয়ে বলেছেন তা হল, ”বর্তমানে পাঠক্রমে আর সেইসঙ্গে সমাজজীবন থেকে মূল্যবোধ হারিয়ে যাচ্ছে। (মূল্যবোধ ভিত্তিক) নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়নের জন্য অপেক্ষার কালও অতিবাহিত”। ব্যাস এইটুকুই। তাই হিন্দি, সংস্কৃত প্রভৃতি সম্পূর্ণ আষাঢ়ে গল্প। কিন্তু বাংলার এগিয়ে থাকা কাগজ নির্ভয়ে, নির্লজ্জভাবে এমন আজগুবি খবর ছাপতে পারে কারণ তাদের আত্মবিশ্বাস আছে। কেউ তাদের চ্যালেঞ্জও করবে না। আর লক্ষ লক্ষ বাঙালি গ্যাঁটের পয়সা খরচ করে ওই কাগজ কিনবেন আর হাতে দূর্বা নিয়ে ভক্তিভাবে পড়বেন।

    কিন্তু এভাবে প্রাদেশিকতাকে উস্কানি দিলে ফল ভয়াবহ হতে পারে। রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীদেরও সাময়িক লাভের কথা ভেবে এমন বিপজ্জনক অস্ত্র ব্যবহার করা উচিৎ হবে না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক উত্থান–পতন, পালা পরিবর্তন স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু ভারতবর্ষ ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। উনিশ শতকে বাংলার প্রবুদ্ধ সমাজ সারা ভারতবর্ষে সত্যি সত্যই সবথেকে এগিয়ে ছিল। তাই তাঁরা প্রাদেশিকতার গণ্ডি ভেঙে সারাদেশকে ‘বন্দেমাতরম’ মন্ত্র দিয়েছিলেন। অবনঠাকুর অমন সুন্দর ভারতমাতার ছবি এঁকেছিলেন যা দেখে ভগিনী নিবেদিতা ওই চিত্র কাশ্মীর থেকে মাদ্রাজ পর্যন্ত ঘোরাতে বলেছিলেন জাগরণের জন্য। আমাদের বাঙালি পূর্বপুরুষদের সেই পূণ্য আজকের তথাকথিত এগিয়ে থাকাদের দাপটে ধুয়ে যাবে না তো? যদিও এখনও ধ্বনিবর্ধক যন্ত্রটা ওনাদের হাতেই আছে তবু এরাজ্যের মানুষ ওইসব কথা আর শুনছেন না। প্রাদেশিকতাকে তারা আর সিকি পয়সাও খাজনা দেবে না বলে মনস্থির করেছেন।

    মতামত সম্পূর্ণত লেখকের নিজস্ব 

    লেখক সাহা ইনস্টিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স এ কর্মরত। বাংলায় প্রবন্ধগল্প ও উপন্যাস লেখেন।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More