শনিবার, নভেম্বর ২৩
TheWall
TheWall

সহিষ্ণুতা হারানো পাপ

জিষ্ণু বসু

শ্রীমদ্ভগবতগীতার দশম অধ্যায়ের নাম বিভূতিযোগ। এই অধ্যায়ের ৩২ শ্লোকটি খুব মজার।

সর্গানামাদিরন্তশ্চ মধ্যং চৈবাহমর্জুন।
অধ্যাত্মবিদ্যা বিদ্যানাং বাদঃ প্রবদতাষহম্।।

হে অর্জুন! সমস্ত সৃষ্ট বস্তুর মধ্যে আমি আদি, অন্ত ও মধ্য। সমস্ত বিদ্যার মধ্যে আমি আধ্যাত্মবিদ্যা এবং তার্কিকদের বাদ, জল্প ও বিতণ্ডার মধ্যে আমি সিদ্ধান্তবাদ।

তার্কিকদের বাদ, জল্প ও বিতণ্ডা নিয়েই আজকের লেখা। আমি যা বলছি তা অসত্য জেনেও যুক্তি সাজানো, তর্ক করা হল জল্প। অপরাধী মক্কেলের জন্য যেমন তর্ক করেন আদালতে উকিলবাবুরা। বিতণ্ডা তা নয়। মনের গভীরে যা বলছি তার বিষয়ে প্রত্যয় আছে, আমার বক্তব্যই সঠিক। তাই তর্কের শেষে আমাকেই জিততে হবে। কিন্তু বাদ একেবারে আলাদা। সত্যকে ব্যাখ্যা করার পথে বাদ অন্যতম প্রয়াস মাত্র। বিরোধী সব যুক্তি, প্রতিপাদ্য খোলা মনে গ্রহণ করাটাই সিদ্ধান্তবাদের সৌন্দর্য। এটাই ভারতবর্ষের দর্শনের কথা। হাজার হাজার বছর ধরে ভারতবর্ষের প্রাজ্ঞ মানুষেরা এটা মেনে নিয়েছেন।

রয়্যাল সুইডিস একাডেমি অফ সায়েন্সেস প্রতিবছরই নোবেল পুরস্কার প্রদান করেন। একটি সম্পূর্ণ সারস্বত পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে এই মনোনয়ন এবং শেষে নোবেল পুরস্কার জয়ী নির্বাচিত হন। বাজার অর্থনীতি আর সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি এখনও দুই মূল মেরুকরণ হলেও, অনেক শাখাপ্রশাখার মতো ভাবনাও বহুধারায় প্রবাহিত হয়েছে। গোদা ভাষায় বললে আজকের পৃথিবীর মানুষের সন্তানসন্ততি যেন কালকেও দুধেভাতে থাকে তার সুলুকসন্ধান খোঁজার চেষ্টাই তো করেন পণ্ডিতেরা। এ বছরে নোবেল জয়ীর দেখানো পথ গতবছরের থেকে একেবারে উল্টো হতেই পারে।

এ বছর নোবেলজয়ীদের একজন বাঙলাভাষী। অভিজিৎ ব্যানার্জি ২০১৯ সালের ৫১তম অর্থনীতির নোবেল পুরস্কারের অন্যতম বিজেতা। সঙ্গে স্ত্রী এস্থার ডাফলো আর মাইকেল ক্রোমার। এঁনারা দারিদ্র কমানোর পরীক্ষামূলক পথের কথা বলেছেন। এর মধ্যে কেউ সমাজবাদী ভাবনার গন্ধ পেতে পারেন। তেমনই গত বছরে এই পুরস্কার যাঁরা পেয়েছেন তাঁদের অন্যতম ছিলেন পল মাইকেল রোমার। মার্কিন মুলুকের অর্থনীতিবিদ পল বিশ্বব্যাঙ্কের চিফ ইকোনমিস্ট ছিলেন। তিনি নিশ্চয়ই অভিজিৎবাবুদের বাতলানো পথ দেখাননি। সেটাই তো স্বাভাবিক। ভারতীয়রা বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যকে উদযাপন করে। সেলিব্রেটিং ডাইভারসিটি ইন ইউনিটি।

অর্থনীতি কেবল খাতাকলমে আলোচনার বিষয় তো নয়, প্রয়োগ করা না হলে আর কী লাভ? বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রয়োগ তো করবে সরকার। ভারতবর্ষের কেন্দ্রীয় সরকার দেশে কালো টাকার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নোটবন্দি করেছিলেন। এই অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের কেউ সমালোচনা করতেই পারেন। সমর্থন ও সমালোচনা হবে এটাই ভারতের পরম্পরা। এই দেশটা স্তালিনের রাশিয়া বা পলপটের কম্বোডিয়া নয় যে সরকারের সমালোচনা করলেই গর্দান যাবে। যেদিন ভারতবর্ষ ওইরকম সর্বগ্রাসী শাসনের অধীনে যাবে সেদিন দেশের মৃত্যু হবে। তাই কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকারের আর্থিক নীতির সমালোচনা হতেই পারে এবং তথ্য, যুক্তি ও প্রজ্ঞার নিরিখে তার বিচারও হবে।

কিন্তু এইসব কিছুর থেকে বড় কথা অধ্যাপক অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। ভারতবর্ষের একজন মানুষ হিসেবে বিশেষ করে বাঙালি হিসেবে আমাদের গর্ব হওয়া উচিৎ। অভিজিৎবাবু বাংলাভাষী, জীবনের অনেকটা সময় কলকাতা বা ভারতের শিক্ষাঙ্গনে পড়াশুনো করেছেন। এরকম একজন মানুষের কাজ পৃথিবীর তাবড় অর্থনীতিবিদ প্রণিধানযোগ্য মনে করেছেন, সম্মান দিয়েছেন। এর থেকে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে? তাই উনি আমার মতের পক্ষে কথা বলছেন কিনা, আমার রঙে উনি রঞ্জিত কিনা, ভবিষ্যতে আমি যে দলকে ভালোবাসি, তার বিরুদ্ধে বলবেন কিনা এসব দেখার প্রশ্নই নেই। তার সাফল্যে আনন্দিত হয়ে, ভারতবর্ষের পক্ষ থেকে, বাঙলার পক্ষ থেকে, কলকাতাবাসীর পক্ষ থেকে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে তাঁকে উষ্ণ সম্বর্ধনা দেওয়া উচিৎ। এটাই ভারতবর্ষের সংস্কৃতি।

ঠিক তেমনই অন্যায়ের প্রতিবাদটাও দল, মত, রঙ না দেখেই করা উচিৎ। সন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতার এক নামকরা সংবাদ মাধ্যমে বহুদিন কাজ করেছেন। সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত মুখ সন্ময়বাবু প্রদেশ কংগ্রেসের মুখপত্রের সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন। সন্ময়বাবু ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের পক্ষে পানিহাটি পৌরসভায় চার চারবার নির্বাচিত প্রতিনিধি হয়েছিলেন। তিনি যে রাজনৈতিক মতেরই সমর্থন হোন না কেন, তাঁর নিজের মত প্রকাশের অধিকার আছে। সাংবাদিক হিসেবেও তিনি প্রচারমাধ্যমে কারও সমালোচনা করতে পারেন, অবশ্যই আইনসম্মত ভাবে।

কিন্তু সন্ময়বাবুর বাড়ির লোকেরা বলেছেন, তাঁকে পাশের বাড়ি থেকে সাধারণ পোষাকের কিছু মানুষ মারধর করে তুলে নিয়ে যায়। মহিলাদের হেনস্থা করা হয়। সঙ্গে কয়েকটি মোবাইলও নিয়ে যায় তারা। অনেক পরে জানা যায় যে সন্ময়বাবুকে পুরুলিয়ার পুলিশ গ্রেফতার করেছিল। তাঁকে বিভিন্ন ধারায় এমন মামলায় জড়ানো হল যে এক সপ্তাহের মধ্যেও তিনি জামিন পেলেন না।

আইনের বিরাট পণ্ডিত না হয়েও বলা যায় যে, অধ্যাপক অম্বিকেশ মহাপাত্র বা সন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো প্রকাশ্যে নিজমত প্রকাশকারী মানুষকে এমন নির্লজ্জভাবে হেনস্থা করাটা এ রাজ্যের লজ্জা, রাজ্যের সব মানুষের লজ্জা। পুলিশ যেভাবেই মামলা সাজাক, রাজ্যবাসী বুঝতে পেরেছে এসব আসলে ‘উইচ হান্টিং’। মানে যে বিরোধী মত প্রকাশ করছে তাকে লটকে দাও!

তাই সন্ময়বাবুর বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তাঁর উপর যে ধরনের অত্যাচার হয়েছে সে সবের বিরুদ্ধে সার্বিক প্রতিবাদ হওয়া প্রয়োজন। অসহিষ্ণুতাকে বাড়তে দিলে তা ভয়ানক হয়ে উঠবে। যে সব বুদ্ধিজীবী দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বা দেশের বাইরে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন, যে সব সাংবাদিক কত ছোটখাটো বিষয়ে পাতা জুড়ে ফ্রন্টপেজার তৈরি করেন, কত বিষয় নিয়ে উত্তর সম্পাদকীয় লেখেন, সন্ময়বাবুর বিষয়ে তাঁদেরও কি প্রতিবাদ করা উচিৎ ছিল না? যদি মনে করি এটা কেবল একটি রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব তবে ভুল হবে। এই বিপদের দিনে দল, মত, রঙ ভুলে রাস্তায় নামা উচিৎ। হরিশ মুখার্জি থেকে বরুণ সেনগুপ্তের বাংলার সাহসী সাংবাদিকতার ইতিহাস ছিল। কিন্তু গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ আজ এ রাজ্যে বড্ড নড়বড়ে। একটা সর্বগ্রাসী ব্যবস্থা যখন সমগ্র সমাজকে এক ছাঁচে ঢালতে চাইছে তখন রাজ্যের মানুষকে সব বিভেদ ভুলে আগে ছাঁচটা ভেঙে ফেলতে হবে। না হলে মানুষ মরবে।

মতামত সম্পূর্ণত লেখকের নিজস্ব

লেখক সাহা ইনস্টিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স এ কর্মরত। বাংলায় প্রবন্ধগল্প ও উপন্যাস লেখেন।

Comments are closed.