বুধবার, অক্টোবর ১৬

মোদী আর হারিবেন না কোনওদিন

হিন্দোল ভট্টাচার্য

অতএব পূজনীয় শ্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী অমরত্ব লাভ করিলেন। শুধু তিনিই অমরত্ব লাভ করিলেন, এ কথা বলিলে অন্যায় হইবে। তাঁহার প্রধানমন্ত্রীত্বের কেদারাটিও অমরত্ব লাভ করিল। সরকার নামক শব্দটির সঙ্গে যেমন ভারতের সংযোগ কম, বিজেপির আরও কম, এনডিএ-র তো নাম-কা-ওয়াস্তে, কিন্তু মোদীর বেশি। তেমন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলিলেই আগামী দিনে যে শব্দটি উদয় হইবে, তাহা হইল মোদী। যে ভাবে মোদী জিতিলেন, আমেরিকা, রাশিয়া মায় সৌদি আরব থেকেও অর্থ এবং পুষ্পবৃষ্টি হইল, তাহাতে এই দেশের সাধারণ মানুষের অবস্থা যে আগামী দিনে ভয়ংকর সুন্দর সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। কী আর করা যাইবে! মহাকালের এমত ইচ্ছা। অনেকে ভাবিতেছেন- ইহা কী হইল! অকল্পনীয়! সদ্যসমাপ্ত গেম অফ থ্রোনস-এর ন্যায় জোট হইল, কিন্তু নাইট কিং মরিল না, বরং হিংস্র অবিনশ্বর ভূতেরা পুনরায় শাসনের দণ্ড তুলিয়া রইল। সরলমতি শিশুরা কহিবে, ইহা গণতন্ত্রের রায়। মানুষের রায়ে যদি শার্দুলও সিংহাসন লাভ করে, তাহা হইলে কিছু বলিবার নাই। তথাপি কিছু কথা বলিবার থাকে। মহামতি সক্রেটিস বলিয়াছিলেন, গণতন্ত্র যে নাই, তাহা বলিবার অধিকার অর্জন করাও গণতন্ত্রের প্রমাণ।

পূজনীয় শ্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী যে এক মহান পুরুষ, এ বিষয়ে আমাদের কাহারও মনে কোনও সন্দেহ ছিল না। বীরত্বে মুহম্মদ ঘোরী, প্রকৃতিতে নমস্য অ্যাডলফ হিটলার, আধ্যাত্মিকতায় রজনীশের সহিত তুলনীয় এই ব্যক্তি। তাঁহার জীবনের চলনরেখার সহিত ভারতবর্ষের গণতন্ত্রের নিয়তি যেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের জার্মানির কথা স্মরণে আনে। মহান গণতন্ত্রের মাধ্যমে, জনগণের বিপুল সমর্থনে এবং সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের অপদার্থতায় জার্মানিতে নাৎসিরা ক্ষমতায় আসিয়াছিল এবং তাহার পর সমগ্র জার্মানি ও ইউরোপে কী হইয়াছিল, তাহা সম্পর্কে সকলেই জ্ঞাত। এ কারণেই বিস্ময় বোধ হয় না, যখন প্রত্যক্ষ করি, বিগত এক দশক জুড়ে মোদী ও তাঁহার রাজনৈতিক পরিবারের ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরতান্ত্রিক কর্মের কথা তো বটেই, বিগত পাঁচ বৎসরে দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি, টাকার অবমূল্যায়ন, দেশের অর্থনীতিকে কর্পোরেট ও বহুজাতিক পুঁজির হস্তে বিক্রয়, ইতিহাস বিকৃতি, নোটবন্দি, বেকারত্ব, কর্মসংস্থানহীনতা সহ একটি সরকারের পতনের অজস্র কারণগুলি এ দেশের মানুষ বিস্মৃত হইলেন এবং শুধুমাত্র ব্র্যান্ড মোদীর চাকচিক্যে মজিয়া রহিলেন। ভারতবাসী দেখিলেন সব। দেখিলেন, প্রতিবাদ করিলে, মুখ খুলিলে তাহাদের অবস্থা হইবে কালবুর্গী, গৌরী লঙ্কেশের ন্যায়। দেখিলেন কীভাবে শিক্ষা থেকে সর্বত্র মনুর ন্যায় ফতোয়া জারি করিলেন মোদী পরিবারের, বিজেপি পরিবারের , সঙ্ঘ পরিবারের কর্তারা। এ বঙ্গের মানুষ জানিলেন, বুঝিলেন ত্রিপুরায় কাহারা আসিয়াছে, অসমে কাহারা আসিয়াছে, তবু এ বঙ্গেও মানুষ আশীর্বাদ করিলেন পরম পূজনীয় শ্রী শ্রী মোদীকে, অমিত শাহকে এবং দিলীপ ঘোষদের ন্যায় মানুষদের। সমগ্র দেশে, যে যে স্থলে বিধানসভা হইতে বিজেপি অপসারিত হইয়াছিল, সেই স্থলেও মোদী ছড়ি ঘোরাইলেন সফল ভাবে। দেবমহিমায় পূজিত হইলেন। তাহাতে ভক্তি এবং ভয় উভয়েই হয়ত রহিল।

হায় ভারতবর্ষ! স্বীকার করিতে হইতেছে আমাদের দেশ এক হিন্দু ফ্যাসিস্ট দেশে পরিণত হইয়াছে। সেই দিন আসিতে দেরি নাই, যে দিন সামান্য প্রতিবাদের ভাষা, সামান্য প্রতিরোধ দেখিলেই, আপনার গৃহের সম্মুখ হইতে আপনাকে তুলিয়া হয়ত নশ্বর জীবনের মর্মার্থ বুঝাইয়া দেওয়া হইবে। সেই দিন দূর নয়, যেইদিন, তাহাই লিখিতে পড়িতে জানিতে হইবে, যাহা পরম পূজনীয় মোদী জানাইতে চাহিবেন। ততটুকুই বিজ্ঞান, কাব্য, চিত্রকলা, ইতিহাস, সাহিত্য আপনার জানা প্রয়োজন, যতটুকু জানিলে আপনার মনে মোদী তথা রাষ্ট্রের প্রতি শ্রদ্ধাপূর্বক ভক্তি জাগ্রত হইয়া থাকে। স্মরণে রাখিবেন, আপনি একটি হিন্দু ফ্যসিস্ট দেশের নাগরিক। আপনার পাশের বাঙালি, আপনার প্রতিবেশী ভারতীয় ইহাই মনে করিয়া থাকেন। আপনার দেশ দুই হাত তুলিয়া সমর্থন করিয়াছেন হিন্দু ফ্যাসিস্টদিগকে। দেশের মানুষের দেবতা আপনারও দেবতা। আপনাদের কোনও সমস্যা নাই রামমন্দির প্রতিষ্ঠা ছাড়া, আপনাদের সাহিত্য নাই রামায়ণ ছাড়া। আপনাদের মনীষী নাই সাভারকর– মোদি –যোগী– অমিত শাহ ছাড়া। লাটুরে জল নাই, কৃষকেরা আত্মহত্যা কেন করিতেছে? জয় শ্রী রাম বলিলেই সমস্যার সমাধান হইতে পারে। জয় শ্রী মোদী যেন তাহার পরেই বলা হয়। ধর্মকে ধারণ করিতে প্রবৃত্ত হউন।

দিদি পারিলেন না। কেহই পারিল না। মানুষ এতই নেশায় উন্মত্ত যে মোদীর সমর্থনে প্রাণত্যাগ করিবেন। যে নেশার বাতাসে মানুষ হিংস্র হইয়া যায়, স্থিতিশীল যাপনকেও ত্যাগ করিয়া মোদীপূজা করিতে ব্যস্ত হইয়া পড়ে, সমস্ত সমস্যার মধ্যে প্রধান হইয়া পড়ে ধর্মের উন্মত্ততা, সেই নেশা বর্তমানে সারা দেশে ব্যাপৃত। স্বীকার করিয়া নিন, আপনি আমি সে ও তাহারা একটি হিন্দু ফ্যাসিস্ট দেশের নাগরিক। দিদি চাহিয়াছিলেন আমরা ভালো হিন্দু হইয়া হিন্দু ফ্যাসিবাদের বিরোধিতা করিব। দিদি রামনবমীর পালটা মিছিল বাহির করিয়াছেন। উৎকৃষ্ট হিন্দুত্ব, সহানুভূতিশীল ইসলামত্বের নিদর্শন রাখিতে চাহিয়াছিলেন। তথাপি জনগণ ভাবিল, নরম হিন্দু হইব না, শক্ত হিন্দু হইব। তাহাদের অন্তরে নিহিত সাম্প্রদায়িক লিবিডোকে উদ্বোধিত করিল মোদি-শাহর অনুপ্রেরণা। দিদি হারিয়া গেলেন। দিদি পারিলেন না। নিন্দুকে কহে গোপন আঁতাত। কহে তৃণমূল-ই ভগীরথ হইয়া গঙ্গার স্থলে বানের জল প্রবাহিত করিল। বিশ্বাস হয় না। তথাপি রাজনীতিতে সব সম্ভব। তা না হইলে সিপিএম নিজেদের নাক কাটিয়া অপরের যাত্রাভঙ্গ করিল, নিজেদের কর্মীদের ভোট পড়িল বিজেপিতে। এও দেখিতে হইল। বাম ও রামের মধ্যে ফারাক যে ফুটকি, তাহা এক শূন্য হইয়া বামফ্রন্টের পাশে বসিল। তবু তাহাদের লজ্জা হইল না।

লজ্জা হইল আমাদের। আমাদের বাংলায় বিজেপি বর্তমানে স্বমহিমায় বিরাজ করিতেছে। ঝাড়গ্রাম মেদিনীপুর হইতে বাঁকুড়া-বিষ্ণুপুর, উত্তরবঙ্গ হইতে পুরুলিয়া। এই বাংলার বুকে নাচিবে হিংস্র শ্বাপদ মোদীভক্তরা। সেই দিন আসিয়াই গেল তবে? যেইদিন, কলকাতার বুকে নির্মিত হইবে হিন্দু ফ্যাসিস্টদের আউসউইৎজ। আহা! ইহাই বাকি রহিয়াছে। কবে হইবে?

অবস্থা যথেষ্ট ভয়ের, সন্ত্রাসের। কিন্তু ভয় পাহিবেন না। মোদী হইলেন সেই নিয়তি, যাহা আসিবেই। এভাবেই গ্রহণ করিতে হইবে। না হইলেও গ্রহণ করিতে হইবে। কারণ সেই দিন দূরে নাই, যেই দিন এ দেশ হইবে মোদী-বিরোধীশূন্য। বিরোধী না থাকিলে আর নির্বাচন করিয়া লাভ কী! মোদীর পরাজয়ের আর সম্ভাবনা নাই, কারণ মোদী আর লড়িবেন না কোনও নির্বাচনী যুদ্ধে। ভারতবর্ষে মোদীই দেবতা, মোদীই নিয়তি, মোদীই পরম তপঃ!

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ এই ভারতবর্ষ। ইতিহাস হয়ত লিখিবে, বিশ্বের বৃহত্তম ফ্যাসিস্ট দেশ এই ভারতবর্ষ। আমরা সেই দেশের গর্বিত নাগরিক। আত্মনিবেদন-ই আমাদের পরিচয়। বাংলা ভাষা আর সংস্কৃতির কথা স্মরণে রাখুন। কারণ তাহাদের সমাধি প্রস্তুত হইতেছে। মুখ বন্ধ রাখুন। বলুন, জয় শ্রী রাম। জয় শ্রী মোদী।

মনে ভক্তি আনুন। আনুগত্য আনুন। প্রশ্ন নহে।

মতামত সম্পূর্ণত লেখকের নিজস্ব

পেশাগত জীবনে বিজ্ঞাপন জগতের সঙ্গে জড়িত হিন্দোল ভট্টাচার্য নব্বই দশকের কবি।

Comments are closed.