তুমি আমাদের মত নও বলেই

৬১০

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

সৌরদীপ

১ ফেলুদার দাড়ি

সে ছিল রেট্রোস্পেক্টিভের যুগ। সামনে সিধে নাক বরাবর দৌঁড় দেওয়ার আগে পিছন ফিরে এক মুহূর্ত থেমে থমকে দেখে নেওয়ার যুগ ।

তখনও রবিবার বিকেল ছিল, বিকেলের চায়ের ফাঁকে মায়ের, সকালে কাগজের পাতা দেখে জেনে নেওয়া, বাংলা ছায়াছবি ছিল। ইন্টারনেট ছিল না। বরং ছিল, ছায়ার মত উকিঝুঁকি মেরে আমাদের, মানে নব্বইয়ের ছোটদের সেইসব ছবি দেখার চেষ্টা। “বড়দের ছবি” তকমা সেটে যাওয়ায় দেখার সুযোগ মিলতো না প্রায়ই । কিন্তু পাশের ঘর থেকে শোনার সুযোগ জুটে যেত ঠিক। এফ এম আসার আগে, নিভুনিভু রেডিও কালচারের শেষবেলায় “বড়দের ছবি” শুনে বড় হওয়া এইসব ছেলেপুলেদের সিনেমার একটা সিন না দেখেও সাবটাইটেল লিখে ফেলার সমান্তরাল পেশায় একটা ভালো সুযোগ আছে বলেই আমার বিশ্বাস।

তবু কি শিকে ছিঁড়ত না? বেড়ালেরও ছেঁড়ে আর আমি তো মানুষ শাবক। মে মাসের গরমে মাঝে মধ্যেই এক আধটা রবিবার সুযোগ মিলতো বটে, চক্ষু কর্ণের বিবাদ ভঞ্জন করার । এরকমই এক শিকে ছেঁড়া বিকেলে, টিভিতে সেদিন “শাখাপ্রশাখা” রবিবারের সন্ধ্যায় ডালপালা মেলে বসেছে । সত্যজিৎ রায়ের ছবি, এবং এতে গোলমালের কিছু নেই, বাবার কাছে এহেন আশ্বাসে সিট পেয়ে দেখতে বসে প্রথম দৃশ্যেই থ ।

আরে, এ তো ফেলুদা!!!

– “মা, শাখাপ্রশাখায় ফেলুদা আছে বলনি তো?”

“কে ফেলুদা?” — মা অবাক ।

– “আরে ওই তো, সোফায় বসে। দাড়ি রেখেছে বলে চিনতে পারছ না?”

– “দূর গাধা, ও তো সৌমিত্র। চুপচাপ বসে দেখ, বকবক করিসনি। ”

“সৌমিত্র? সে আবার কে?” চুপ হয়ে নিভে যেতে যেতে, নিজেকে সান্ত্বনা দিই, “ধ্যাৎ, মা জানে না, ও হচ্ছে ফেলুদা। দাড়ি রেখেছে তো কি, ওরকম কত ছদ্মবেশ ও জানে। সেদিন যে জয় বাবা ফেলুনাথে দেখালো – ঐখানেও তো দাড়িই পড়েছিল শেষমেশ।”

সৌমিত্র ইজ ইকুয়ালটু ফেলুদা ইজ ইকুয়ালটু আমার প্রথম হিরো — এই সমীকরণটা আজ অবধি ঠিকঠাক ভেঙেছে কিনা সেই নিয়ে ঘোর সন্দেহ এই মধ্য তিরিশেও রয়েই গেছে আমার। তবে,সেদিন ফেলুদাকে খাওয়ার টেবিলে ওরকম থালা ঠকঠক করতে দেখে, ছবিটির আদ্যোপান্ত কিছু না বুঝেও মনে মনে সাবাস জানিয়েছিলাম — “উফ, কী অভিনয়টাই না করল। এই না হলে ফেলুদা !!!”

২ “আমায় একটু আড়াল করে দাঁড়াও তো মা। আমার বড় হাসি পাচ্ছে। ” — একটি জীবন

নাম কখনো কখনো মানুষের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে । কিন্তু, খুব কমই দেখা গিয়েছে, একজন মানুষ তাঁর নামের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছেন । আমাদের নব্বুইয়ের ছোটবেলায় তিনজন ব্যাক্তিত্বকে আইকন হিসেবে পেয়েছিলাম তিন প্রজন্মের হাত ধরে, যাঁরা আক্ষরিক অর্থেই তাঁদের নামের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিলেন। চোখের সামনে খেলতে দেখেছিলাম সৌরভ গাঙ্গুলিকে। দাদাদের মুখে শুনে, একটু পরে বুঝেছিলাম সুমন চট্টোপাধ্যায় কাকে বলে। আর মা মাসিদের যৌবনের ছোঁয়াচ হাত বাড়িয়েছিল উত্তম সৌমিত্রের তুলনায়। আমাদের বড় হয়ে ওঠা হয় এদের কীর্তির নীরব সাক্ষর হয়ে থাকা, নয় ফ্ল্যাশব্যাকে ফিরে দেখে সেই কীর্তিকে আত্মীকরণ করে নেওয়ার চেষ্টামাত্র ।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে দ্বিতীয়টাই ঘটেছিল। আবার ঘটেওনি।

যতদিনে ফেলুদা থেকে সৌমিত্রকে চিনতে শুরু করলাম, সেই অভিযান থেকে ধীরে ধীরে পাহাড়ি পথ পেরিয়ে তাঁর সিনেমা নাটক কবিতা এক এক করে বুঝে ওঠার শিক্ষা আরম্ভ হল, ততদিনে অনুভব করলাম তাঁর পরিধির ব্যাপ্তি । ভয় হল, আমার ধারণ ক্ষমতা যতখানি সীমিত, যতখানি শ্লথ, তাঁর অভিনয়, তাঁর কাজ তার চেয়ে বুঝি ঢের দ্রুত জমে উঠবে। সম্পূর্ণ অনুধাবনের সময় পাব কি? ফলে, সিংজির অন্তর্বিবেক দংশনকে সামান্য বুঝে অপুর জীবন সৌন্দর্যে ডুব দিয়ে উঠতে না উঠতেই সন্দীপ আলগা হাতছানি দেয়। তাঁদেরকে সামলে উঠে ক্ষিদ্দার সংগ্রামে সাড়া দেব কি দেবনা ভাবতে গিয়ে দেখি, ওমা, কখন যে দিন ফুরোলো, কত কী দেখাই না বাকি। আর এদিকে, বেলাশেষে, তিনি এক আকণ্ঠ প্রেমিক হয়ে শেষ বিকেলের নিস্পৃহ উত্তাপ বিলিয়ে চলেছেন।

বড় হয়ে ওঠা আসলে মিথ্যেবাদী হয়ে ওঠা। অতীত থেকে আনত প্রশংসা নিন্দার সাদাকালো স্তোক গজালের মত মাথায় ঢুকিয়ে দিয়ে তারই সম্যক প্রতিধ্বনি শুনতে ও শোনাতে থাকা| মুখের উপর মুখোশের পরতে পরতে জমে উঠে নিজেকে হারিয়ে ফেলাই বুড়িয়ে যাওয়া। একজন আইকন, যিনি জীবন্ত কিংবদন্তি, এক জাতির আবেগের নিয়ত প্রতিমূর্তি, জন্মাবধি তাঁর কাজে আশ্লেষ নিমজ্জিত থেকে, সে সম্পর্কে কিছু বলা বাস্তবে বহুশ্রুত পাঠের পুনরাবৃত্তি মাত্র। যতই সে বক্তব্য আত্ম-অনুভূতি কথনের তকমা থাক না কেন।

তাই নিরপেক্ষতার দাবীতে, বাঙালির সৌমিত্রকে আলাদা করে, শুধুমাত্র তাঁর কাজের ব্যাপ্তিতে অনুধাবন করতে বসলে কেবল দুটোই প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়। একজন অভিনেতা আসলে বেঁচে থাকেন কোথায়? তাঁর চরিত্রের মধ্যে। চরিত্ররা তবে বেঁচে থাকেন কোথায়? মানুষের মধ্যে। আর মানুষের মৃত্যু হলেও, মানব যে বেঁচে থাকেবেই এ কথা কবি বলিয়াছেন। অতএব, অঙ্কের যুক্তিতে, সেইখানেই শিল্পী স্বচ্ছন্দে স্মরণে থাকবেন অমরত্বের বিন্দুমাত্র দাবিদাওয়া না রেখেই।

বাকিটা, অন্তত, আমার সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে আর কিছু বলতে চাওয়ার চেষ্টা তাঁরই চরিত্রের সংলাপ তুলে বলা যায় — ” বড় হাসি পাচ্ছে। ”

৩ “তুমি আমাদের মত নও, তাই তোমাকে আমি ঘেন্না করি।” — টিকটিকি

ব্যতিক্রমীরা বড় স্বাভাবিক হয়ে গেছে আজকাল। যেদিকে তাকাই, ব্যতিক্রমটাই নিয়ম, নিয়মই ব্যতিক্রম হয়ে উঠছে ক্রমে।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, প্রতিটি শট দেওয়ার পর আজও তিনি সহ অভিনেতাকে জিজ্ঞেস করেন, তাঁর কাজটি ঠিক হল কিনা। বিনয় বৃহতের অন্তর্লীন দীপ্তি। তাতে চোখ ধাঁধানো স্তব্ধতা না থাক , মন কেমন করা উষ্ণতা লুকিয়ে থাকে। কিন্তু, কেবল স্বাভাবিক বিনয় বা সৌজন্য নয়, তিনি জানিয়েছিলেন, তিনি এই কাজটা করেন আজও নতুন কিছ শেখার আশায়।

এই ক্ষয়িষ্ণু আত্মম্ভরি জাতির মুখেন মারিতং জগত ব্রহ্মের সামনে নিজের শিল্পে নিমগ্ন এক শিল্পীর অনন্ত প্রশ্ন আসলে শিল্পের সংজ্ঞাকে অসীম করে তোলে না শিল্পীকে অনন্তসন্ধানী বানায় সে তর্ক থেকেই যায়। কিন্তু, এ কথা অস্বীকার করা যাবে না যে ব্যতিক্রমী নিয়মের এই কালে, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আসলে প্রকৃত অর্থেই এক ব্যতিক্রম। বিরল ব্যতিক্রম।

তাঁকে, তাঁর কাজকে যদি বুঝে ওঠা আমার সাধ্যে নাও কুলোয়, অন্তত, তাঁর নাটকের সংলাপ ঘুরিয়ে বলেই যেন তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে পারি — “তুমি আমাদের মত নও বলেই তোমাকে আমি শ্রদ্ধা করি।”

 

লেখক সৌরদীপের জন্ম ও শৈশব-কৈশোর কেটেছে কলকাতায়। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও আই আই এম থেকে স্নাতকোত্তর পড়াশুনা শেষে চাকরি সূত্রে এক দশকের বেশি প্রবাসী। দেশ বিদেশের নানান শহরে বসবাসের পর বর্তমানে দিল্লিতে বহুজাতিক সংস্থায় কর্মরত। ছাত্রজীবন থেকে মূলতঃ বন্ধুবান্ধবের উৎসাহে লেখালেখির চেষ্টা। শখ: গণিতচর্চা ও হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শোনা।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More