প্রশান্ত কিশোরের বিজেপি বিরোধিতা কি সোনার পাথরবাটি

শঙ্খদীপ দাস

নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের বিরুদ্ধে গোড়া থেকেই সরব প্রশান্ত কিশোর। জাতীয় নাগরিক পঞ্জি তথা এনআরসি ও জাতীয় জনসংখ্যা পঞ্জি তথা এনপিআরের বিরোধিতাতেও আপসহীন ছিলেন সংযুক্ত জনতা দলের সদ্য বহিষ্কৃত সহ সভাপতি প্রশান্ত। এতটাই যে দলের সভাপতি তথা বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের সঙ্গে তিনি প্রকাশ্যেই এ ব্যাপারে সংঘাতে যেতে দ্বিধা করেননি। ব্যক্তিগত মতাদর্শের প্রশ্নে এতোটা দৃঢ়চিত্ত রাজনীতিক ইদানীং খুব কম দেখা যায়। সুতরাং তাঁর অবস্থান সঠিক হোক বা বেঠিক, প্রশংসা অবশ্যই প্রাপ্য।

এখন প্রশ্ন, নাগরিকত্ব সংশোধন আইন নিয়ে বা এনসিআর ও এনপিআর নিয়ে প্রশান্তের এত আপত্তি কেন? টুইট করে এবং বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে বাইট দিয়ে তিনি এর যে ব্যাখা দিয়েছেন তা থেকে বলা যায়, প্রশান্তের মতে সিএএ সংবিধান বিরোধী। এই আইন দেশের মানুষের মধ্যে ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন তৈরি করতে চাইছে। অর্থাৎ তিনি বলতে চাইছেন, বিজেপি বিভাজনের রাজনীতি করছে। দেশের ধর্মনিরপেক্ষতা ও সম্প্রীতির বাতাবরণ ধরে রাখতে সর্বশক্তি দিয়ে যার প্রতিবাদ করা উচিত।

ভাল কথা। কিন্তু প্রশান্তের এই বিজেপি বিরোধিতা কতখানি খাঁটি? নাকি সোনার পাথরবাটি?

গোটা দুনিয়া জানে, চোদ্দ সালে লোকসভা ভোটের আগে নরেন্দ্র মোদীর অন্যতম পরামর্শদাতা ছিলেন প্রশান্ত কিশোর। এখানে একটা কথা অবশ্যই বলা প্রয়োজন যে, প্রশান্ত তখন একজন পেশাদার হিসাবে সেই পরামর্শ দিয়েছিলেন। সুতরাং, তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস যাই হোক না কেন পেশাদার হিসাবে তিনি তা করতেই পারেন।

আরও পড়ুন: ভারতের অর্থনীতি ও নরেন্দ্র মোদীর উজ্জ্বল মুখের রহস্য

কিন্তু বিজেপির বিরোধিতায় প্রশান্তের সততা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে তার পরবর্তী বেশ কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ২০১৫ সালে বিহারে বিধানসভা ভোটে আবার নীতীশ কুমারের পরামর্শদাতা ছিলেন প্রশান্ত। সে বার বিহারে বিজেপিকে গো হারা হারিয়ে দেয় নীতীশ-লালু প্রসাদ ও কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষ জোট। সেই সাফল্যের পর খুশিতে আত্মহারা সংযুক্ত নেতৃত্বও। এবং নীতীশও। অচিরে দেখা যায়, সংযুক্ত জনতা দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাংগঠনিক পদে অভিষেক হল প্রশান্তের। জেডিইউ-র সহ সভাপতি হলেন তিনি। এবং তখন নীতীশ-প্রশান্ত গলায় গলায় বন্ধুত্ব। ক্যামেরার সামনে প্রায়ই একসঙ্গে পোজ দেন।
এরও কিছুদিন পর দেখা গেল, ধর্মনিরপেক্ষ জোটের বাকি দুই শরিকের সঙ্গে এক প্রকার বিশ্বাসঘাতকতা করে বিজেপির হাত ধরে ফেললেন নীতীশ। প্রশান্ত কিন্তু তখন জেডিইউ-র সহ সভাপতি এবং নীতীশের অন্যতম পরামর্শদাতা বলেই সবাই তাঁকে চেনেন। প্রশ্ন হল, তখন কি আপত্তি করেছিলেন প্রশান্ত? কেন তখন এখনকার মতোই সরব হননি?

শুধু তা নয়, নোটবন্দির পর নীতীশ কুমারের মতোই প্রশান্তও চুপ ছিলেন। তখনও কিন্তু বিজেপি বিরোধিতায় টুঁ শব্দটিও করেননি। তা ছাড়া, লোকসভা ভোটের আগে যখন গোটা দেশে বিক্ষিপ্ত ভাবে উগ্র ডানপন্থীদের একাংশ গণপিটুনির খেলায় মত্ত, তখনও এতটা বিরোধিতা শোনা যায়নি প্রশান্তের মুখে।

ভুলে গেলে চলবে না, বিজেপির বিরুদ্ধে বিভাজনের রাজনীতির অভিযোগ এই প্রথম উঠল এমন নয়। অর্থাৎ সংসদে নাগরিকত্ব সংশোধন বিল পাশ হল বলেই বিজেপির বিরুদ্ধে বিভাজনের অভিযোগ উঠছে তা নয়। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর থেকেই সেই অভিযোগ উঠছে। তার পরেও বিজেপির সঙ্গে কীভাবে বিহারে গাঁটছড়া বাঁধায় সায় দিলেন প্রশান্ত? কেনই বা তখন দল ছাড়লেন না?

আর হ্যাঁ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রশংসা করে প্রশান্ত কিশোরের সাম্প্রতিক একটি টুইটও সন্দেহের উদ্রেক করেছিল তৃণমূলের মধ্যে।

পর্যবেক্ষকদের অনেকে মনে করেন, আসলে প্রশান্ত কিশোর ঘোলা জলে হাঙর ধরতে নেমেছেন। কোনও মতাদর্শের ব্যাপার নেই, তাঁর উদ্দেশ্য আখের গোছানো। এবং নিন্দুকেরা এও বলছেন, কখনও তৃণমূলকে পরামর্শ দিয়ে কখনও আম আদমি পার্টিকে পরামর্শ দিয়ে কোটি কোটি টাকা কামাচ্ছেন প্রশান্ত। যদিও প্রশান্ত বলেছেন, এসব কথা ভিত্তিহীন। তিনি আই প্যাকের (যে সংস্থা প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে পরামর্শ দেওয়ার কাজটি করে) মালিকই নন।

এই সব পর্যবেক্ষকদের প্রশান্তকে নিয়ে সন্দেহের অবশ্য কারণও রয়েছে। তাঁরা মনে করছেন, দিল্লির ভোটে আম আদমি পার্টি তথা অরবিন্দ কেজরিওয়ালের পক্ষে কৌশল সাজানোর বরাত নিয়েছেন প্রশান্ত। দিল্লির নির্বাচনে বিহারীদের ভোটের বড় প্রভাব রয়েছে। কারণ, অন্তত পঁচিশ লক্ষ বিহারী ভোটার রয়েছে দিল্লিতে। এই অবস্থায় প্রশান্ত চাইছিলেন, নীতীশ কুমারও যাতে নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের বিরোধিতা করেন। তা হলে তার প্রভাব পড়তে পারে দিল্লিস্থিত বিহারীদের মধ্যে।
শুধু তা নয়, ওই পর্যবেক্ষকদের এও মত, নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের বিরুদ্ধে প্রচারের কৌশল নির্ধারণের জন্য কংগ্রেস সভানেত্রী সনিয়া গান্ধী সব বিরোধী দলের যে বৈঠক সম্প্রতি ডেকেছিলেন, তাতেও প্রশান্তের পরামর্শে যাননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং এম কে স্ট্যালিন। ওই বৈঠক হয়েছে দিল্লিতে। সব বিরোধী দলের নেতারা সনিয়া-রাহুলের নেতৃত্বে মিটিং করলে কংগ্রেসের অবস্থান মজবুত হওয়ার বার্তা যেতে পারত। তাতে দিল্লির ভোটে কিছুটা হলেও অ্যাডভান্টেজ পেতে পারত কংগ্রেস। সংখ্যালঘুদের আস্থাও কংগ্রেসের প্রতি বাড়তে পারত। অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে সুবিধা পাইয়ে দিতেই হয়তো পিছন থেকে খেলেছেন প্রশান্ত।

আর এই সব সাত সতেরো মিলিয়েই প্রশ্ন উঠেছে, প্রশান্তের বিজেপি বিরোধিতা কতটা সত্যি, কতটাই বা স্রেফ ব্যক্তিগত বাণিজ্যিক স্বার্থে? নাকি তা সোনার পাথরবাটি!

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.