রবিবার, জুন ১৬

পরিবহরা রোদ্দুর হয়ে উঠুক

হীরক বন্দ্যোপাধ্যায়

অমলকান্তি রোদ্দুর হতে চেয়েছিল। আমাদের পরিবহ কিন্তু ডাক্তার হতেই চেয়েছে। কবি বলেছেন অমলকান্তির ইচ্ছাপূরণ হয়নি। আমাদের ঐকান্তিক প্রার্থনা, সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে পরিবহর ইচ্ছাপূরণ হবে।

কিন্তু সেই ইচ্ছাপূরণের পথ যে এত বন্ধুর হবে, তা কি জানত ডোমজুড়ের ঝকঝকে ছেলেটি? ভেবেছিল এত মূল্য দিতে হবে?

পরিবহ’র মাথায় যে রডের আঘাত, তা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বা অন্ধ রাগের মুহূর্তের বহিঃপ্রকাশ নয়, এর শিকড় অনেক গভীরে।

পরিবহ’র রক্তাক্ত ছবি দেখে আমরা শিউরে উঠছি কেন? হায় হায় করছি কেন? এটাই তো হওয়ার কথা এই বিশ্বাসহীন সমাজে যেখানে ক্রমশ ডোডোপাখির মতো হারিয়ে যাচ্ছে পারস্পরিক আস্থা, ভরসা, সম্ভ্রম। একএকটা ঘটনা ঘটে আর আরও তলানিতে চলে যায় এই সম্পর্ক।

ভাবের ঘরে চুরি না করে এ কথা সোজাসাপটা বলাই যায় যে, ডাক্তার ও রোগী পরস্পরের পরিপূরক, দু’পক্ষেরই দু’পক্ষকে দরকার। স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য, সুস্থ থাকার জন্য, বেঁচে থাকার জন্য রোগী বা রোগীর পরিবার যেমন ডাক্তারের উপরে নির্ভরশীল, ঠিক তেমনই চিকিৎসার দক্ষিণায় ডাক্তারের উপার্জন হয়, গ্রাসাচ্ছাদন হয়, শ্রীবৃদ্ধি হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর মধ্যে কোনও ‘দাতব্য’ নেই। কিন্তু তা হলেও একটা সুস্থ পারস্পরিক নির্ভরশীলতা তো থাকতেই পারে। কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে সে সব?

কেন এমন হয় যে একজন রোগী, সে শিশুই হোক বা বৃদ্ধই হোক, তার মৃত্যু হলেই ট্রাকে করে তার পাড়ার লোকজন লাঠিসোঁটা, রড, হকিস্টিক নিয়ে চলে এসে পেটাবে ডাক্তারদের বা হাসপাতালে উপস্থিত যে কোনও ব্যক্তিকে? ভেঙে তছনছ করে দেবে হাসপাতালের আসবাবপত্র, কাচের শার্সি?

আর তারপরে তার প্রতিক্রিয়া হবে সুদূরপ্রসারী। নাবালক জুনিয়র ডাক্তার থেকে সিনিয়ররা সকলেই বলবেন, অনেক হয়েছে আর সহ্য করা যায় না, বাড়াবাড়ির একটা সীমা–পরিসীমা আছে, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, আর বরদাস্ত নয়। এবং তাঁরা বন্ধ করে দেবেন বহির্বিভাগ তো বটেই, জরুরি বিভাগেও পরিষেবা না পাওয়ার অভিযোগ তুলবেন রোগীর পরিজন। নিট ফল, সম্পর্কের আরও অবনতি।

অন্যদিকে আমজনতা প্রশ্ন তুলবেন, গুটিকয়েক লোকের অসভ্যতা, অরাজকতার জন্য আমরা কেন ভুগব? কেন আমরা মুমূর্ষু রোগী নিয়ে অসহায়ের মতো মাথা কুটব?

অর্থাৎ দু’পক্ষেরই এক কথা, আর কত সহ্য করব ভাই? আর কত দিন? এর শেষ কোথায়? কতদিন ভিশিয়াস সার্কেলের বলি হব আমরা, না কি দু’পক্ষই নিজেদের বিবেক, সুবুদ্ধি, বিবেচনাকে জাগিয়ে তুলে এর অবসানকে ত্বরান্বিত করব?

এর উত্তর আমাদেরই দিতে হবে। যাঁদের গলায় স্টেথোস্কোপ ঝোলে, বা যাঁদের গলায় ঝোলে না–– দু’পক্ষকেই । না হলে পরিবহরা সকলেই অমলকান্তি হয়ে যাবে। রোদ্দুর আর উঠবে না।

হীরক বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ এডিটর, ‘দ্য ওয়াল’

Comments are closed.