বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১২
TheWall
TheWall

‘যদি না আটকাই, আজও না-যদি ঝাঁপিয়ে পড়তে পারি…’

হিন্দোল ভট্টাচার্য

মনে পড়ে যাচ্ছিল সেই যুবকের মুখ। প্রায় দু’দশক পরে মনে পড়ল সেই মুখ। ভয়ার্ত কান্নায় তিনি প্রাণভিক্ষা চাইছেন। মনে পড়ে যাচ্ছিল আর একটি ছবি। একজন উন্মত্ত  সাম্প্রদায়িক হত্যাকারীর ছবি, যিনি মাথায় ফেট্টি বেঁধে হাতে তলোয়ার নিয়ে আক্রমণ করছেন। মনে পড়ে যাচ্ছিল সেই ভয়াবহ আগুনের দৃশ্য। মনে পড়ে যাচ্ছিল এই অমিত শাহ এবং নরেন্দ্র মোদীর পরিকল্পনাতেই বোতলবন্দি করে গুজরাতে কেমন গণহত্যা চালানো হয়েছিল।  মনে পড়ে যাওয়ার কারণ সকলেই জানেন, কীভাবে গো ব্যাক ধ্বনি এবং কালো পতাকা দেখে উত্তেজিত মাথায় ফেট্টি বাঁধা  বিজেপির একদল কর্মী নির্বাচনী প্রচারে এসে উত্তর  কলকাতায় আগুন জ্বালালো। কলেজ স্ট্রিটে বইয়ের দোকান ভাঙচুর করল। এমনকী বিদ্যাসাগর কলেজের মধ্যে ঢুকে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার ঘটনায় যাদের নাম জড়ালো। আশা করি না, এই বীরের দল বিদ্যাসাগরের প্রকৃত ভূমিকা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। এও আশা করি না, বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা নিয়ে তাঁদের একফোঁটাও অনুশোচনা থাকবে। ত্রিপুরায় এরা লেনিন বা সুকান্তকে ছাড় দেয়নি। এখানে বিদ্যাসাগরের মূর্তিকেও ছাড় দেবে, এ আশা করি না। গেরুয়া বাহিনী নামে একটি গ্রুপ লিখেছে- “লেনিন যেমন ভারতবর্ষের জন্য কিছুই করেনি, তেমনি বিদ্যাসাগর হিন্দুদের জন্য কিছুই করেনি। ইংরেজদের … চেটে মালটা সতীদাহ তুলে দিয়ে হিন্দুধর্মকে আঘাত করেছিল। আর  বর্ণপরিচয়? ওটা আধুনিক যুগে আর পড়তে হয় না।”

এ লজ্জা কোথায় রাখি? এ লজ্জা কার? এ লজ্জার দায় কার?  সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী একটি রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে আমরা যে সহিষ্ণুতা, প্রজ্ঞা দাবি করব, তা উচিত কাজ হবে না। কিন্তু নির্বাচন কমিশন-ই হোক বা রাজ্য সরকার, কাদের কাছ থেকে অনুমতি পেয়ে কলেজ স্ট্রিটের মধ্য দিয়ে রোড শো করল অমিত শাহ-এর দল, তা রহস্যজনক।  এরা যদি আর একটু বিশৃঙ্খল হত, তাহলে কলকাতায় আরও বড় গোলমাল হতে পারত। তাতে এদের রাজনৈতিক লাভ হয়তো হত না, কিন্তু বিশৃঙ্খলার  বিনিময়ে রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়াও তো উচিত নয়। মনে হয় না, লক্ষ্যটা সেটি ছিল। কিন্তু একটা বড় ভুল যে হয়ে গেছে, তা নিশ্চয় নির্বাচন কমিশন বা রাজ্য সরকার স্বীকার করবেন।

আপনার ঘরে যদি আরশোলা ঢোকে, বা আপনার গায়ে যদি একটা বিশ্রী ফোড়া হয়, তবে আপনি কী করবেন? আপনি কি আরশোলা বা অসুখের গণতান্ত্রিক অধিকারের কথা মাথায় রেখে সাদরে তাদের আমন্ত্রণ জানাবেন? ‘আহা কৃষ্ণের জীব’ বলে সকলকে আমন্ত্রণ জানালে আর সকলের বেঁচে থাকার দিকে সমান নজর দিলে কিন্তু আপনি সহজেই বিপন্ন হয়ে পড়বেন। অসুখ তখন আপনার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়বে। বা, ঘরে বংশবৃদ্ধি করবে আরশোলা। আপনার কী করা উচিত? এদের ঢুকতে দেওয়া উচিত? না কি ঢোকার আগেই রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া উচিত? ডাক্তার ডেকে অপারেট করে দেওয়া উচিত সেই বিষাক্ত ফোড়া। তাই না? বিরানব্বই সাল থেকে আজ পর্যন্ত কিছু সাম্প্রদায়িক দল নিজেদের ঝাড়েবংশে বাড়িয়েছে বলেই ভারত প্রত্যক্ষ করেছে বেশ কয়েকটি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। গতকালের বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা একটা প্রতীক মাত্র। কারণ বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা নিয়ে যাঁরা এখন সরব, তাঁরা ভুলে যান কীভাবে অসহিষ্ণুতার সংস্কৃতি,  বিদ্বেষের সংস্কৃতি, উঁচুজাত-নিচু জাতের দ্বন্দ্বের সংস্কৃতি, কুসংস্কারের অন্ধ বিশ্বাসের সংস্কৃতি, ইতিহাস বিকৃতির সংস্কৃতি বছরের পর বছর ধরে এই সাম্প্রদায়িক দলটি এ দেশে এবং এ রাজ্যেও ছড়িয়ে চলেছে। মিথ্যে কিছু বিষয়কে বারবার প্রচার করেও সত্যে পরিণত করা যায়। বিশেষ করে ফ্যাসিস্টদের এইটাই কাজ।  মোদী যেভাবে কথা বলেন, সেভাবে কথা বলতে হবে এদের সকলকেই। নিজস্বতা নেই। এরা কলের দম দেওয়া পুতুল। এদের যা বলা হবে, এরা নিজেদের বিবেক বুদ্ধিকে বিসর্জন দিয়ে তা-ই করবে। যদি বলা হয় এদের, তরোয়াল শীর্ষে তুলে নাও মায়ের জঠর থেকে ভ্রুণ– তবে এরা তা-ই করবে। করেওছিল, গুজরাতে। সে সব ইতিহাস কি আপনাদের মনে পড়েছে?

আর কীভাবে সঙ্কেত এলে আপনারা বুঝবেন যে বিপদ আসন্ন? যখন বিরোধিতা করার অপরাধে আপনাকে কালবুর্গী, গৌরী লঙ্কেশ-এর মতো সকলের সামনে হত্যা করবে? যখন আপনি কী খান, কীভাবে খান, তা নির্ধারিত করতে এলাকায় এলাকায় চলবে নজরদারি? যখন এই বাহিনীরা যেভাবে ধ্বংসলীলা চালাতে চালাতে নির্বাচনী প্রচার করল, তেমন ভাবেই পাড়ায় পাড়ায়, এলাকায় এলাকায় এরা নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে হিংস্র আচরণ করবে? তখন কি বুঝবেন যে বিপদ আসন্ন, যেদিন আর আপনি একটি কথাও বলতে পারবেন না? শুধু বলতে হবে মোদী জিন্দাবাদ, বলতে হবে জয় শ্রী রাম, বলতে হবে তা-ই, যা ওরা বলতে বলবে! তা না হলেই খোলা তরোয়াল হাতে এরা ঝাঁপিয়ে পড়বে উন্মাদের মতো। এলাকা থেকে এলাকা সাফ করে দেবে। প্রতি মোড়ে জ্বলবে হিংসার আগুন। এখনও  বুঝতে পারছেন না কীভাবে আপনার মনের মধ্যেও ধর্মান্ধতার বিষ ঢুকিয়ে দিয়েছে এই উন্মাদ ফ্যাসিস্টরা? এখনও বুঝতে পারছেন না, আপনাদের আমাদের রক্ত বিষিয়ে দিচ্ছে এই সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণু হিংসার বিষ? এতদিন কাগজ পড়ে হাসতেন । বলতেন বিপ্লব দেবের ত্রিপুরায় সম্ভব লেনিন সুকান্তর মূর্তি ভাঙা।  গতকাল তো আপনার পাড়ার ভিতর দিয়ে উন্মাদের নৃত্য করতে করতে চলে গেল এরা। কিছু করতে পারলেন? কিছু করতে চাইলেন কি?

বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা হয়েছে তা অবাক হওয়ার মতো কিছু না। কিন্তু লজ্জা তো আমার আপনার। রক্তে ইনফেকশন হয়ে গেলে তা ধরতে না পারার লজ্জা ডাক্তারের। কারণ জীবাণু বা বীজাণু তো তাদের কাজ করবেই। যদি না উপযুক্ত সময়ে প্রতিরোধ করা যায়।

এ রাজ্যের ক্ষেত্রেও ফ্যাসিস্ট শক্তি নিয়ে যা ছিল তত্ত্ব, যা ছিল আলোচনার বিষয়, তা আজ দরজায় কড়া নাড়ছে। আঁচ লাগছে। এই সঙ্কেতও যদি আপনারা বুঝতে না পারেন, তবে ফ্যাসিস্ট শক্তির হাতে এ শহর যে শ্মশানে পরিণত হবে, সে বিষয়ে সন্দেহ থাকার কথা নয়। মনে পড়ে যায় গুজরাত দাঙ্গার পর কবি জয় গোস্বামীর এই কবিতাটি

আজ

আমার সমস্ত বাক্য আগুনে নিক্ষেপ করা শিশু
আমার সমস্ত ধ্বনি জয়ধ্বনি, মারণাস্ত্রগুণ
আমার সমস্ত ছন্দ হত্যায় ওঠানো তলোয়ার
আমার সমস্ত কাব্য তলোয়ার শীর্ষে গাঁথা ভ্রূণ
আমার সমস্ত প্রেম কিছু নয়, কিছু নয় আর
ছেলের চোখের সামনে তার জননীর বলাৎকার

এখনো, এখনো যদি ঘরে ব’সে নিজেকে বাঁচাই
যদি বাধা না-ই দিই, তত্ত্ব করি কী হল কার দোষে
যদি না আটকাই, আজও না-যদি ঝাঁপিয়ে পড়তে পারি
আমার সমস্ত শিল্প আজ থেকে গণহত্যাকারী !

(কাব্যগ্রন্থ : শাসকের প্রতি, বিজল্প প্রকাশন)

পেশাগত জীবনে বিজ্ঞাপন জগতের সঙ্গে জড়িত হিন্দোল ভট্টাচার্য নব্বই দশকের কবি।

মতামত সম্পূর্ণতই লেখকের নিজস্ব

 

Comments are closed.