শুক্রবার, নভেম্বর ১৫

হিংসা ও অসহিষ্ণুতায় দীর্ণ বিশ্বে মুক্তির পথ দেখাতে পারেন মহাত্মাই

প্রণব মুখোপাধ্যায়

মার্কিন ইতিহাসবিদ উইল ডুরান্টের কথা আজ বড় মনে পড়ছে। মহাত্মা গান্ধীর সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন,”বুদ্ধ-র পরে বোধ হয় আর কোনও মানুষকে ভারতবর্ষ এত সম্মান, এত শ্রদ্ধা করেনি। সেন্ট ফ্রান্সিস অফ আসিসি-র পরে পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোনও হৃদয়ের এত কোমলতা ও নির্মোহ চোখে পড়েনি, এমন নিষ্কলুষ অন্তরাত্মা যা কিনা শত্রুর প্রতিও করুণাসিক্ত,- আর দুটি হয়নি। আমরা এক সন্ন্যাসীর বিপ্লবের অনন্যসাধারণ মহিমা দেখেছি।”

ভারতে ব্রিটিশ জমানায় তথা গত শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর আবির্ভাবই যেন হয়েছিল এক ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য। ভারতীয় রাজনীতি ও সমাজ ব্যবস্থার এমন রূপান্তরের জন্য যা শাশ্বত হয়ে থাকবে।

কংগ্রেস দল তথা ভারতের সার্বিক রাজনীতিকে তিনিই জনভিত্তিক করে তোলার পথ দেখিয়েছিলেন। নইলে তার আগে সমস্ত রকমের রাজনৈতিক তর্কবিতর্ক তো হয় কাউন্সিল চেম্বারে অথবা আইনজীবীদের বার-এ বা বিদ্বজ্জনদের বৈঠকখানায় কিংবা পাক্ষিক পত্রিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

গান্ধীজিই প্রথম ব্যক্তি যিনি আসমুদ্র হিমাচলের সমস্ত মানুষকে উজ্জীবিত করে পথে নামিয়ে এক বৃহত্তর স্বাধীনতা আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। শিক্ষক, আইনজীবী, জমিদার, ভূমিহারদের দাবিদাওয়া নিয়ে কিন্তু কখনও খুব একটা ভাবিত ছিলেন না গান্ধীজি। বরং অপুষ্টি ও দুর্দশাগ্রস্ত চাষি, সমাজের অনগ্রসর ও অত্যাচারিত শ্রেণির মানুষ, শিক্ষা এবং সামাজিক সদ্ভাবনাই তাঁর কাছে অগ্রাধিকারের বিষয় ছিল।

গোপাল কৃষ্ণ গোখেলকে তাঁর রাজনৈতিক গুরু মানতেন গান্ধীজি। অথচ তিনি যখন একজন সাধারণ মানুষ হিসাবে ট্রেনের থার্ড ক্লাস কামরায় চড়ে ভারতবর্ষ ঘুরে দেখার জন্য মনস্থির করেছিলেন, তখন গোখেলের মনেই গোড়ায় সংশয় ছিল। পরে অবশ্য অনেক ভাবনাচিন্তার পর গোখেল গান্ধীজিকে বলেছিলেন, এমন নজির এখনও নেই ঠিকই, তবে এটা করলে অভূতপূর্ব সাড়া পাওয়া যেতে পারে। গান্ধীজির সেই ভারত-দর্শনের ফলাফল কী হয়েছিল তা সত্যিই ইতিহাস,- চম্পারণ, খেড়া, আমদাবাদ মিল ধর্মঘট, অসহযোগ আন্দোলন..।

পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, “উনি নম্র স্বভাবের ছিলেন কিন্তু এতোটাই স্পষ্টবাক যে তা হিরের মতোই কঠোর। উনি হাসিখুশিও ছিলেন, খুবই নরম গলায় কথা বলতেন, কিন্তু তাঁর মত ও অবস্থান সম্পর্কে ছিলেন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান ও অনমনীয়। তাঁর দৃষ্টি ছিল শান্ত ও গভীর, কিন্তু সেই চোখেই অসম্ভব তেজ ও প্রত্যয় দেখা যেত। তিনি বলতেন, এক মহাশক্তিধরের বিরুদ্ধে এটা একটা মহান লড়াই হতে চলেছে, সেই লড়াইয়ে নামতে গেলে সব কিছু খোয়ানোর জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে”।

গান্ধীজি যা করেছেন ইতিহাসে তার নজির সত্যিই খুব বিরল। একজন মানুষ তাঁর সমসাময়িক সমস্যা ও বিষয়আশয়ের মধ্যেই সাধারণত নতুন পথের সন্ধান করেন। গান্ধীজি তা তো করেছেনই, সেই সঙ্গে তাঁর ভাবনা ছিল এতটাই সুদূরপ্রসারী যে পরবর্তী প্রজন্মকেও অনন্ত সময়ের জন্য যেন আলো দেখিয়ে গিয়েছেন তিনি।

প্রতিটি ভারতীয়র মধ্যে যে অদৃশ্য শক্তি রয়েছে, যে ভারত-চেতনার কথা আমরা বলি, তাই হল মহাত্মা গান্ধী। গান্ধীজিকে, তাঁর জীবনশৈলীকে ব্যাখ্যা করার এ ছাড়া আর কোনও পথ নেই। তাঁর জন্য আমরা যা কিছু অর্জন করেছি তা যতরকমভাবেই প্রকাশ করি না কেন, তাও কম হবে। গান্ধীজি হলেন এক অসামান্য অদৃশ্য শক্তি, যে শক্তি আমাদের এগিয়ে নিয়ে চলেছে। আমরা সেটা অনুধাবন করতে পারি বা না পারি, গান্ধীজির উপস্থিতি আমাদের জাতীয় চেতনা ও বিবেকের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। তা অদম্য, অবিচ্ছেদ্য এবং অনতিক্রম্য।

ভারতবর্ষকে একটি অখণ্ড রাষ্ট্র হিসাবেই দেখতে চেয়েছিলেন মহাত্মা। যেখানে প্রতিটি মানুষের সমানাধিকার থাকবে, প্রত্যেকে সমান সুযোগ পাবে। তিনি ভারতকে এমন একটি রাষ্ট্র হিসাবে দেখতে চেয়েছিলেন, যে তার বৈচিত্র্য ও বহুত্ববাদকে উদযাপন করবে এবং তা ক্রমশ আরও শক্তিশালী করে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাবে। গণতন্ত্রের প্রতি আমাদের গভীর দায়বদ্ধতার নেপথ্যেও এই ভাবনাই রয়েছে।

গান্ধীজি বলতেন, আমার জীবনই আমার দর্শন। ৯০ টি খণ্ডে গান্ধীজির রচনাসমগ্রের মুখবন্ধে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী লিখেছিলেন, “উনি যা ভাবতেন তাই বলতেন, আর যা বলতেন সেটাই করে দেখাতেন। ওঁর কথায় আর কাজের মধ্যে কোনও ব্যবধান ছিল না। তাঁর দেখানো পথই একটা মহান আন্দোলন গড়ে তুলেছিল এবং অগণিত মানুষের জীবনকে বদলে দিয়েছিল”। ঠিকই বলেছিলেন শ্রীমতী গান্ধী। যে মানুষ সত্যকেই ভগবান জ্ঞান করতে পারেন, একমাত্র তিনিই বলতে পারেন আমার জীবনই আমার দর্শন।

বর্তমানে আমাদের দেশ তথা গোটা বিশ্বে নানা বিষয়ে উদ্বেগ রয়েছে। যেগুলির মধ্যে আমি মনে করি পরিবেশগত বিষয়গুলির গুরুত্ব অন্যতম। গত কয়েক দশকে পরিবেশের প্রভূত ক্ষতি হয়েছে। বায়ুদূষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের মতো সমস্যা বিশ্বজনীন মানুষকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। বন্যা, দাবানল, ভূমিকম্পের মতো ঘটনা ইদানীং আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গিয়েছে।

গান্ধীজি কিন্তু এ ব্যাপারে আমাদের অনেক আগেই সতর্ক করে দিয়ে গিয়েছিলেন। অপরিকল্পিত ও বল্গাহীন শিল্পায়নের ব্যাপারে তিনি ১৯০৯ সালে তাঁর ‘হিন্দ স্বরাজ’ বইতে বলেছিলেন সমূহ বিপদের দিকে এগোচ্ছি আমরা। তাঁর কথায়, “পৃথিবী আমাদের এতো কিছু দিয়েছে যা প্রতিটি মানুষের চাহিদা পূরণ করতে পারে, কিন্তু প্রতি মানুষের লোভ নয়।”

মহাত্মা বলতেন, “এই পৃথিবী, হাওয়া-বাতাস জল, জমি আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাইনি। আমাদের ছেলেমেয়েদের থেকে ধার নিয়েছি। তাই তাদের হাতে তা এমন ভাবে তুলে দিতে হবে, ঠিক যে ভাবে আমরা তা পেয়েছিলাম”।

বরাবরই মানুষের ব্যক্তিগত নৈতিকতা বোধের উপর জোর দিয়েছেন মহাত্মা। তিনি মনে করতেন প্রতিটি মানুষেরই সমাজের প্রতি, দেশ ও গোটা বিশ্বের প্রতি একটা নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। তাঁর কথায়, “এত সহজ সরল জীবনযাপন করো যে অন্যরাও সহজ সরল ভাবেই বাঁচতে পারে।”

১৩০ কোটি মানুষের ভারতবর্ষে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বহু ভাষা ও ধর্মের মানুষ সদ্ভাবের সঙ্গেই সহাবস্থান করছে। আমাদের কাছে এখন পরিষ্কার যে শুধু সহিষ্ণুতা থাকলেই চলবে না পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধার মনোভাব থাকলে তবেই চিরস্থায়ী শান্তির পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব। মহাত্মা ধারাবাহিক ভাবে সে কথাই বারবার বলে গিয়েছেন।

শুধু এ দেশে কেন, গোটা বিশ্বে বহু নেতা গান্ধীজির ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন,- মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র, লেছ ওয়ালেসা, স্টিভ বিকো, নেলসন ম্যান্ডেলা, ডেসমন্ড টুডু এবং দলাই লামা। এমনকী মার্টিন লুথার কিং তো এও বলেছিলেন, “যিশু খ্রিষ্ট চেতনা ও প্রেরণার কথা বলে গিয়েছিলেন, গান্ধী দেখিয়েছিলেন কোন পথে হেঁটে তা খুঁজে পাওয়া যাবে”।  (“Christ furnished the spirit and motivation, while Gandhi furnished their method.”)

পরে একসময়ে তিনি এও বলেছিলেন, মানবজাতিকে যদি বেঁচেবর্তে থাকতে হয়, আরও উন্নতির পথে এগোতে হয়, তা হলে গান্ধী হলেন অপরিহার্য। গোটা বিশ্বে শান্তি ও সহাবস্থানের পরিবেশ কায়েম করতে হলে কোন পথে চলতে হবে তিনি তাঁর জীবন দিয়ে দেখিয়েছেন।

গান্ধীজিই এক বার প্রশ্ন করেছিলেন, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের নামে শুধু যদি ক্ষমতা দখলই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে ওঠে তাতে অনাথ, গৃহহীনদের জীবনে কী হেরফের হবে?

আমার বলতে কোনও দ্বিধা নেই যে সন্ত্রাসবাদ, ধর্মান্ধতা, অসহিষ্ণুতা, প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে ক্রোধে দীর্ণ এই দুনিয়ায় একমাত্র মুক্তির পথ দেখাতে পারেন মহাত্মাই,- সত্যের প্রতি নিষ্ঠা, আলোচনার মাধ্যমে বিবাদ মীমাংসা ও অহিংসার যে পথ গান্ধীজি দেখিয়ে গিয়েছেন তাই একমাত্র রাস্তা।

আজকের দ্বিধাদ্বন্দ্বে জর্জর পৃথিবীতে গান্ধীজির আদর্শ এবং নীতি সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তাঁর এই সমস্ত দর্শনের কথা বহুদূর বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মধ্যে।

গান্ধীজি ছিলেন ব্যতিক্রমী চরিত্রের এক সংগ্রামী। সেই সময়ের নিরিখে তাঁর দূরদর্শিতাও ছিল বিরল। জীবনভর তিনি নিজের এবং অন্যের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। যে কোনও সমস্যা সরিয়ে রাখার চেয়ে তার শিকড় খোঁজার চেষ্টাই তিনি করেছেন অন্তর্দৃষ্টি ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা দিয়ে। গান্ধীজির মৃত্যুর পর জওহরলাল নেহেরু বলেছিলেন, “আলো নিভে গেছে কিন্তু তাও সেই আলো আগামী হাজার বছর ধরে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।”

তার পরবর্তী সময়ে গোটা পৃথিবী সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নানা পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে। কিন্তু গান্ধীবাদ যে সত্য, মানবিকতা এবং নৈতিকতার কথা বলে তা আমাদের জাতীয় চেতনার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে রয়েছে। গান্ধীবাদ কখনওই বাতিল হয়নি। তাঁর মৃত্যুর কয়েক দশক পরেও মানবসভ্যতার উন্নতির জন্য বিশ্বের বিশিষ্ট নেতারা তাঁর আদর্শকে অনুসরণ করে চলেছেন।

গান্ধীজির স্বপ্ন ছিল জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত। তাঁর উত্তরাধিকারী হিসাবে আমাদের ওপরেও তাই বিরাট দায়িত্ব বর্তায়। যে পরিবর্তন হয়ে চলেছে সেখানে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সমর্থন ও অবদান থাকতে হবে। গান্ধীজির জন্মের সার্ধশতবর্ষে তাই আমার আশা ও প্রার্থনা, আমরা যেন গান্ধীজির দর্শনের গভীরতা ও বিস্তৃতি সম্যকভাবে উপলব্ধি করতে পারি। তা যেন আমাদের পাথেয় হয়ে উঠতে পারে। গান্ধীজির স্বপ্ন, আমাদেরও স্বপ্ন। স্বচ্ছ, সবুজ, স্বনির্ভর দেশ গড়ে তোলার সামনে যেসব বাধা তা যেন তাঁর আদর্শ দিয়েই নির্মূল করা যায়।

আমেরিকান লেখক ও ঔপন্যাসিক পার্ল. এস. বাক -এর একটি কথা দিয়েই আমি আমার এই কথা শেষ করব। গান্ধীজি নিহত হওয়ার পর তিনি বলেছিলেন, “তিনি সঠিক ছিলেন, তিনি জানতেন তিনি সঠিক ছিলেন, আমরা সবাই জানতাম তিনি সঠিক ছিলেন। তাঁকে যে হত্যা করেছে সেও জানত তিনি সঠিক ছিলেন। হিংসার মতো নির্বুদ্ধিতা যত ছড়িয়ে পড়বে, ততই প্রমাণিত হবে, গান্ধী সঠিক ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘হিংসার সঙ্গে শেষপর্যন্ত লড়াই করো কিন্তু তা করো অহিংসা দিয়ে। ‘ হিংসায় পৃথিবী পাণ্ডুর হয়ে উঠছে। হে ভারত, তুমি তোমার গান্ধীর জন্য গর্বিত থেকো। ”

লেখক ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি

‘দ্য ওয়াল’–এ প্রকাশিত এই পর্বের সব লেখা পড়ার জন্য ক্লিক করুন নীচের লাইনে

সার্ধশত বছরে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী

Comments are closed.