বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ২৩
TheWall
TheWall

নারীবাদ পুরুষবাদ এবং বিবাহভীতি

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

স্মৃতিলেখা চক্রবর্তী

জোলিন গানটা বেশ পুরোনো। গানের প্রথম থেকে শেষপর্যন্ত পুরোটাই একটা করুণ আবেদন। সম্ভ্রান্ত ঘরের একজন মাঝবয়সী স্ত্রী, স্বামীর নতুন প্রেমিকাকে অনুরোধ করছে, অন্য কোনও প্রেমিক খুঁজে নেবার জন্য। নতুন মেয়েটি বয়সে অনেক ছোট, কাজেই অন্য পুরুষ যোগাড় করতে তার খুব একটা অসুবিধা হবে না। কিন্তু এই বয়সে সংসার ভাঙলে, সেটার অভাব পূরণ করা বুড়িয়ে আসা স্ত্রীর পক্ষে অসম্ভব। ৭০-এর মাঝামাঝি সময়ে গানটা তুমুল বিখ্যাত হয়ে ওঠে। ওই সময় থেকেই গানে-গল্পে-সাহিত্য-চেতনায় মেয়েরা বুঝতে শুরু করে, তাদের জীবনে নিরাপত্তা কত কম।

বিয়ে-সংসার-স্বামী, এর সবটাই একটা লটারির মত। ভাগ্য খারাপ হলে, ভোগান্তি ছাড়া উপায় নেই। মেয়েদের চোখ যত বেশি খুলতে লাগল, ততই তারা অনুভব করল, তাদের চারপাশটা এমনই দুঃখী মেয়েতে ভরপুর। কারুর বর মদ-জুয়োতে টাকা ওড়ায়, সংসারে দেয় ছিটেফোঁটা। কেউ আবার বউ পেটায়, দিনরাত্তির খোঁটা দেয়, গালিগালাজ করে কিংবা অন্য নারীতে আসক্ত হয়ে পড়েছে।

যত বেশি করে মেয়েরা এগুলো শুনল, পড়ল, জানল; তত বেশি করে তারা বিয়ে জিনিসটাকে ভয় পেতে শুরু করল। আর মেয়েদের এই বিবাহ-ভীতিকেই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিল নারীবাদ। এই মতবাদ মেয়েদেরকে শেখাল, তাদের হাতেও অনেক রাস্তা আছে। বিয়েটা মেয়েদের জন্য একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। তার বদলে মেয়েদের দরকার চাকরি। তার মাইনে যতই কম হোক না কেন, যে কোনও একটা চাকরি জোটানোই মেয়েদের স্বাধীনতার জীবন্ত দলিল। তা হলেই আর মেয়েদের জীবনে পুরুষের কোনও প্রয়োজন পড়বে না। যে মেয়েরা প্রথম এসব শিখল, তারা মায়ের বয়সী। তাদের পক্ষে আর চাকরির জন্য জরুরি যোগ্যতা অর্জন করা সম্ভব ছিল না। তাই তারা তাদের মেয়েদেরকে শেখাল। খুব করে শেখাল যে, বিয়ের আগে চাকরি। কারণ বিয়েটা যদি না টেকে, স্বামী-শ্বশুরবাড়ি যদি খারাপ কিংবা খুব খারাপও হয়, তা হলেও চাকরি তোমাকে বাঁচাবে। স্বামী-পরিত্যক্তা ফুলমাসি কিংবা রানুপিসির দুরবস্থার গল্প শোনা বাচ্চা মেয়েরা চাকরির বিষয়টা বেদবাক্য হিসেবে গণ্য করল। এক প্রজন্মের মেয়েদের অত্যাচারিত হওয়া পরের প্রজন্মকে ছোট থেকেই নারীবাদী বানিয়ে ছাড়ল।

সব মেয়েই তো চায়, মায়ের প্রজন্মের থেকে নিজের প্রজন্মকে আরেকটু উন্নত করতে।

এরপর পরিবারে স্ত্রীর নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে সরকারি স্তরে আনা হল বিভিন্ন নারীসুরক্ষা আইন। পরিস্থিতি দ্রুত হারে পাল্টানো শুরু হল। মহিলা ক্ষমতায়ন ক্ষতিগ্রস্ত মেয়েদেরকে যেমন শক্তি যোগাল, সুযোগসন্ধানী মেয়েদের হাতে পড়ে সেটাই হয়ে উঠল মারণ অস্ত্র। যাদেরকে অসহায় ভেবে এত শক্তপোক্ত করে আইনগুলো বানানো হল, তাদেরই একটা অংশের হাতে চলতে থাকল এর বেদম অপব্যবহার। খোরপোষ পাবার জন্য ‘শারীরিক নির্যাতন’-এর মিথ্যে অভিযোগ দায়ের করা, কথায় কথায় ৪৯৮এ ধারার ভয় দেখানো, দাবিমত টাকা দিতে অপারগ হলে পিতাকে সন্তানের মুখ পর্যন্ত দেখতে না দেওয়া– এগুলো ধীরে ধীরে গণ-আতঙ্কের চেহারা নিতে থাকল। পাড়ার মোড়ে, অফিস-কাছারিতে কিংবা চায়ের আড্ডায় পুরুষদের মধ্যে মহিলা ক্ষমতায়নের বিরুদ্ধে গুঞ্জন উঠল। কারণ, মহিলা ক্ষমতায়ন শুধু ‘ভাল মেয়ে’-দের ক্ষমতায়ন করে না, ‘খারাপ মেয়ে’-দেরও করে। আর ‘ভাল মেয়ে’-দের দুর্বলতা এবং যন্ত্রণাকে ঢাল করে ‘খারাপ মেয়ে’-দের ক্ষমতায়ন থেকেই জন্ম নিল বিপন্ন পৌরুষ।

পুরুষের বিপন্নতা যত তীব্র হল, পাল্লা দিয়ে বাড়ল তার নারী-বিদ্বেষ। সেও তো শুনছে, পরিবার-পরিজনের মধ্যেই কোন ফুল কাকা কিংবা রানা জ্যাঠার কষ্ট-কাহিনি। গেরস্থ হিংসার সাজানো মামলায় ফেঁসে জেলের ঘানি টানার গল্প কিংবা নিজের সন্তানকে দেখতে পাবার অধিকারের জন্য চাকরি-ব্যবসা সব শিকেয় তুলে রাত-দিন আদালতে চক্কর কাটার ঘটনাগুলো আজকের ছেলেদের মনে গভীর ভাবে প্রভাব ফেলছে। নিজের মান-সম্মানের নিরাপত্তা তাদের মনেও একটা প্রচণ্ড বিয়ের ভীতি তৈরি করছে। তারা মেয়েদের অবিশ্বাস, সন্দেহ করছে এবং ভয় পাচ্ছে। সম্পর্কের কথা ভাবলেই ফুল কাকাদের পরিণতি তাদের মস্তিষ্ককে চঞ্চল করে তুলছে। ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে পুরুষবাদ নামের এক নতুন তত্ত্ব।

সেই হিসেবে কিন্তু, নারীবাদই পুরুষবাদের জন্মদাতা।

নারীবাদ মেয়েদেরকে যে ভুলটা শিখিয়েছিল, পুরুষবাদও ছেলেদেরকে নিয়ে মোটামুটি একই রাস্তায় হেঁটে চলেছে। জীবনটা উপভোগ করার জন্য ছেলেদের কাছে অঢেল রাস্তা এবং সেগুলো সব মেয়েদের ছাড়াই সম্ভব। অথবা ছেলেরা এতটাই ক্ষমতাবান যে, তাদের কখনও মেয়ের অভাব হবে না। এমনই বিষাক্ত সব দম্ভ গিলিয়ে পুরুষবাদ চিবিয়ে খাচ্ছে আজকের ছেলেদের মাথা। মনের আধখানা যখন বিপরীত লিঙ্গের ভয়ে কম্পমান, বাকি মনটুকুতে পৌরুষের অহংকার-এ ধোঁয়া দেওয়ার কাজ চলছে। গড়ে উঠছে দুর্বল, দ্বিধাগ্রস্ত ছেলেদের একটা আস্ত প্রজন্ম।

নারী এবং পুরুষের পারস্পরিক অবিশ্বাস কেবল একে অপরকে দূরেই ঠেলছে না, সুস্থ বৈবাহিক বন্ধনকেই অপ্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। নারী-বিদ্বেষী পুরুষ আর পুরুষ-বিদ্বেষী নারী; এদের মধ্যে বিয়ের মতন কোনও সম্পর্ক সম্ভব না। নারী-পুরুষে দূরত্ব বাড়ছে, দু’জনেই দু’জনকে দেখে ভয় পাচ্ছে, নিরাপত্তার অভাববোধ করছে।

কট্টর পুরুষতন্ত্র থেকেই নারীবাদের উৎপত্তি হয়েছিল। তাকে ঠেকাতে পুরুষবাদের সৃষ্টি। এই দুই বাদের অনাসৃষ্টি মুছবে কে? এটা সভ্যতার অস্তিত্বের প্রশ্ন।

স্মৃতিলেখা চক্রবর্তী প্রাবন্ধিক। কর্মসূত্রে দিল্লির আইন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত।

মতামত লেখকের নিজস্ব। 

Share.

Comments are closed.