সোমবার, আগস্ট ২৬

আবার এক ডাক্তার নিগৃহীত

দেবাশিস ব্যানার্জী

‘দ্য আল্টিমেট ট্রাজিডি ইজ নট দ্য অপ্রেসন এন্ড ক্রুয়েলিটি অফ দ্য ব্যাড পিপল বাট দ্য সাইলেন্স ওভার দ্যাট বাই দ্য গুড পিপল’ – মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র।

আবার এক ডাক্তার নিগৃহীত – নীলরতন মেডিকেল কলেজের এক যুবক ডাক্তার। তার চোট লাগা স্কাল বোন্সের সিটি রিকন্সট্রাকসান এর যে ছবিটা ডিজিটাল মিডিয়ায় দেখছেন, তার থেকে নিশ্চয়ই আন্দাজ করতে পারছেন যে চোটটা কতটা গুরুতর – তাকে কতটা জোরে আঘাত করা হয়েছিল।

আপনি আরও অনেক কিছুই আন্দাজ করতে পারেন। যেমন ধরুন, আপনি আন্দাজ করতে পারেন যে আপনি এ যাত্রায় বেঁচে গেলেন। কোপ অন্য কারুর উপর পড়লো। তাও আবার এক বিশেষ শ্রেণীর মানুষের উপর-এক ডাক্তারের উপর। এরপরের বার যখন মিডিয়ার মাধ্যমে আবার এরকম কোনও খবর পাবেন,  এমন আরেকটা ছবি দেখবেন, আবার চট্‌ করে হিসেব করে নেবেন – সেবার হয়তো শিকার হবে কোনও শিক্ষক বা কোনও ছাত্র অথবা কোনও শিল্পী বা কোনও সাংবাদিক, কিংবা নিদেনপক্ষে কোনও হিন্দু বা মুসলিম। কিন্তু তারপর? –

পাঠক, ঈশ্বর করুন আপনার পালা যেন না আসে – কারণ নিজের কর্তব্য পালন করতে গিয়ে পৈশাচিক হিংস্রতার কবলে পড়া যে কোনো সুস্থ সমাজের সভ্য মানুষের কাছে এক কল্পনাতীত, ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন।

কিন্তু আপনি বুদ্ধিমান, সপ্রতিভ, দূরদর্শী। আপনার সঙ্গে বোধহয় এমনটি ঘটবে না। আপনি হয়ত যে কোনও সাধারণ ডাক্তারের চেয়ে ভালো জানেন কোন্‌ ব্যাধির কি ওষুধ।

আপনি হয়তো, সমাজে যাকে বলে ‘ওয়েল অ্যাডজাস্টেড’ (কী হবে ভাই ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ে)। যেখানে কথা কাজ করে, সেখানে কথা দিয়ে; যেখানে টাকাপয়সা কাজ করে, টাকাপয়সা দিয়ে; যেখানে ধরপাকড়, সেখানে ধরপাকড়; আর যেখানে তোষামোদ…..

নাহ্, আপনার ডাঃ পরিবহ মুখোপাধ্যায়ের মত কিছু অশিক্ষিত গুণ্ডার হাতে মার খেয়ে মৃত্যুর সাথে লড়াই করার কোনও সম্ভবনা বোধহয় নেই। আপনি জীবনযুদ্ধে জয়ী। কে ঠেকায় আপনাকে।

তবে একটু সাবধানে থাকবেন। এইত কদিন আগেই হইচই করে ভোট দিয়ে এলেন। বিভিন্ন দলের পক্ষে, বিপক্ষে প্রচুর তর্ক বিতর্ক করলেন। কিন্তু যে দলই গদিতে থাকুক না কেন, আপনার কি ক্বচিৎকদাচিৎ মনে হয় যে,  যে সমাজে আপনি আছেন, আপনার পারিপার্শ্বিক অবস্থা ক্রমশ নিম্নগামী? অর্থ আর তার মারফত অর্থ-বিজ্ঞান ( অবশ্য এখন ‘বিজ্ঞান’ কথাটি বর্জন করাই শ্রেয়, শুধু অর্থ সন্ধানই গুরুত্বপূর্ণ) আয়ত্ব করাই সকল সাফল্যের মাপকাঠি- তা মেনে নিতে কি মাঝে মধ্যে কুণ্ঠাবোধ হয়? নৈতিক অবনতি কি এখনও কখনও- সখনও গায়ে লাগে? করাপশানের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে চলতে মাঝে মাঝে কি হাঁপিয়ে পড়েন? ঘুষ দিতে বা নিতে, ‘ক্যাচ’ মেরে অন্যায্যভাবে সুবিধে নিতে একেক সময় কি একটু দ্বিধা বোধ করেন? অন্যায় কিছু দেখলে কি এখনও বুকের মধ্যে প্রতিবাদ গুমরে ওঠে?

যদি এগুলোর কোনও একটি প্রশ্নেরও উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে সাবধান! কোনও ভালো জ্যোতিষীকে দেখিয়ে কোষ্ঠী বিচার করিয়ে প্রয়োজন মতো রত্নধারণ অবশ্য করনীয়। কারণ আপনার যে কোনও সময়ে একদল হিংস্র দ্বিপদ দ্বারা নিগৃহীত হবার সম্ভবনা থেকেই যাচ্ছে।

তবে যদি জ্যোতিষীর শরণাপন্ন হওয়ার ইচ্ছে না থাকে,  গ্রহরত্নের উপর ভরসা না থাকে, তাহলে একটু স্থির হয়ে বসে ভাবুন। ভাবুন সমাজের এই অবস্থার জন্য কি বা কারা দায়ী।

যদি বাড়ির ভিতের ইটগুলো এক এক করে ভেঙ্গে ফেলে দেওয়া হয়, তাহলে বাড়িটি আর কতদিন খাড়া থাকতে পারে, বলুন? যে ইটের টুকরো পরিবহ মুখপাধ্যায়ের মাথা ফাটিয়েছে, আপনি কি নিশ্চিত যে সেই ইটের টুকরো আপনার বাড়ির ভিত ভেঙ্গে জোগাড় হয়নি?

লেখক লন্ডনে বসবাসরত চিকিৎসক

Comments are closed.