বুধবার, অক্টোবর ১৬

ডাক্তারদের গণপিটুনি- আমাদের সমাজের প্রতিদিন বাড়তে থাকা হিংস্র মানসিকতার প্রকাশ

দীপাঞ্জন ভট্টাচার্য

প্রথম ঘটনা- মদনবাবু বারাসাতের একটা কলেজে অধ্যাপনা করেন। প্রতিদিনের মতো আজও কোনওমতে দৌড়ে শেষ মুহূর্তে ট্রেনটা ধরে ফেললেন। ‘আরএকটু হলেই মিস করছিলাম’ – একটা স্বগতোক্তি করে সবে নতুন উদ্যমে গুঁতোগুঁতি করে একটু ভিতরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, অমনি খেয়াল করলেন প্যান্টের পকেটে মানিব্যাগটা নেই। ট্রেনের দরজার ঠিক মুখে একটা ১৬-১৭ বছরের ছেলে দাঁড়িয়েছিল, দেখেই একদম লোফারমার্কা লাগে। চারপাশ এক ঝলক দেখে নিয়ে, মদনবাবুর নজরটা প্রথমেই ওই ছেলেটির ওপরে গেল। খপাৎ করে ওর জামার কলার চেপে ধরে বললেন, “এই, আমার মানিব্যাগটা দে”। পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন ডি-আই অফিসের অফিসার পরিমল দে, মদনবাবুর পূর্ব পরিচিত। বিশাল চেহারার পরিমলবাবু অমনি এক চড় চাপিয়ে দিলেন, “এই, তুই-ই তাহলে আগের মাসে আমারও পকেট কেটেছিলি?”। ট্রেনটা ততক্ষণে বিধাননগর ঢুকছে, আরও কিছু উৎসাহী লোকও এগিয়ে এসেছে। ছেলেটির কাকুতি মিনতিতে কান না দিয়ে টেনে-হিঁচড়ে স্টেশনে নামানো হল। ৩০ মিনিট বাদে যখন রেলপুলিশ এসে ছেলেটিকে উদ্ধার করল, ততক্ষণে ছেলেটি আধমরা। কেউ জানল না, ছেলেটি আসলে কে? কেন ট্রেনে যাচ্ছিল? কোথায় যাচ্ছিল? সে কি আদৌ পকেটমার? আর পকেটমার হলেও সে কেন এত কম বয়সে এই কাজে নামতে বাধ্য হয়েছে।

দ্বিতীয় ঘটনা – রতনবাবু দক্ষিণ-কলকাতার একটি নামী স্কুলের অঙ্কের শিক্ষক। ছাত্র-দরদি, কিন্তু বেশ রাগী। অঙ্কের ক্লাসে ফাঁকি দিয়ে ওনার নজরে পড়লে আর নিস্তার নেই। খুব ছাত্র পেটান বলে অল্পবয়সে ওনার ছাত্রমহলে একটু কুখ্যাতি ছিল। এখন দিনকাল বদলেছে, বদলেছে স্কুলের নিয়মাবলীও, তাই এখন আর স্কুলে মারধোর করেন না। কিন্তু সেদিন যে কী হল, নিয়মিত অঙ্ক না করে ক্লাসে আসা একটি ছাত্রকে দুম করে এক চড় কষিয়ে দিলেন। সেদিন ছেলেটি নাকি বাড়ি ফিরে অসুস্হবোধ করে, তার নাকি তীব্র মাথাযন্ত্রণা করছিল, সারা রাত, ছটফট করেছে। পরের দিন সকালে ছেলেটির বাবা আরও ২০-৩০ জন লোক নিয়ে স্কুলের গেটের সামনে জড়ো হলেন, রতনবাবুকে স্কুল থেকে বার ক’রে স্কুলের সামনে রাস্তার উপরে মারধোর ক’রে, চূড়ান্ত অপমান করেন। রাতে প্রবীণ রতনবাবু লজ্জায় আত্মহত্যা করেন।

তৃতীয় ঘটনা – কলকাতার বাইপাসের ধারের ঝাঁ-চকচকে বেসরকারি হাসপাতাল। এক সপ্তাহ হল, আমিনা-বিবি তার ১৫ বছরের ছেলে আমানুলকে এই হাসপাতালে ভর্তি করে, হাসপাতালের সামনেই পড়ে আছেন। আমানুলের পায়ে একটা টিউমার হয়েছে, সঙ্গে জ্বর, বেশ কিছুদিন হল। এদিক-ওদিক, এ ডাক্তার-সে ডাক্তার করে শেষে পাড়ার এক কাকিমার কথা শুনে এই হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। পারিবারিক সামর্থ্য তেমন নেই, কিন্তু যা জমানো ছিল, সব তুলে নিয়ে, গায়ের গয়না বন্ধক রেখে একমাত্র ছেলের চিকিৎসা চালাচ্ছেন। তবে আশার কথা, আজও ডাক্তার বলছে, “ভয় পাওয়ার তেমন কারণ নেই, আমরা তো আছি। ওষুধ চলছে, অপরেশনটা হয়ে গেলেই আশা করি ভালো হয়ে যাবে”।  ছেলেটিও এখন আগের থেকে সুস্থ।

রাতে হঠাৎ হাসপাতাল থেকে তাড়াতাড়ি বাড়ির লোককে চলে আসতে বলল, ছেলের নাকি জ্বর প্রচুর বেড়েছে, জ্ঞানও নেই। কিন্তু আমিনা বিবি পৌঁছতে না পৌঁছতেই সব শেষ। পরের দিন, হাসপাতালের সামনে আমিনুলের পাড়ার ১০০ জন জড়ো হয়ে তুমুল হট্টগোল, ভাঙচুর। ডাক্তারও অল্পের ওপর দিয়ে মার খেয়ে বেঁচে গেছেন তাড়াতাড়ি পুলিশ হাসপাতালে চলে আসার জন্য। ভাগ্যিস, বেসরকারি হাসপাতাল ! সরকারি হাসপাতাল হলে, এত তাড়াতাড়ি পুলিশের চলে আসা ভাবাই যায় না। ডাক্তার প্রাণে বেঁচে গেলেন। বাড়ির লোকের অভিযোগ, ‘রাতে ভুল ওষুধ দেওয়াতেই সমস্যা হয়েছে, ৩-৪ ঘন্টা আগেও আমিনুল তো ভালোই ছিল। খালি পয়সার লোভে ডাক্তাররা পর-পর টেস্ট করে গেছে কোনও অপরেশন করেনি। ছেলেটিকে ভুল ওষুধ দিয়ে মেরে ফেলা হল।’

এগুলো শুধু তিনটি বিক্ষিপ্ত ঘটনা নয়। প্রতিদিন আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া হাজারটা ঘটনার মধ্যে থেকে তুলে নেওয়া তিনটি উদাহরণ মাত্র। এখানে মনে রাখা দরকার, একজন পকেটমার হাতেনাতে ধরা পড়লেও আইনের চোখে সে তখনই পকেটমার যখন কোর্টে বিচার করার পরে সে পকেটমার প্রমাণিত হবে। তার আগে না। তাই পকেটমার সন্দেহে কাউকে মারা হলেও তাকে ওই মুহূর্তে পকেটমার বলা যায় না। তেমনি ভাবেই, একজন ডাক্তারও কোনও রোগীর দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যুর জন্য দায়ী তখনই বলা যাবে, যখন সেটা অনুসন্ধানের পরে তিনি দোষী প্রমাণিত হবেন। এবং উভয় ক্ষেত্রেই শাস্তি দেওয়ার অধিকার কখনই জনগণের হাতে থাকতে পারে না; একটা দেশের পুলিস, প্রশাসন, বিচার ব্যাবস্থা যতই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ুক না কেন। এক্ষেত্রে এরা দোষী কিনা বা অভিযুক্তদের সামাজিক অবস্থান কেমন, সেটা বিচার্য বিষয় নয়।

আমাদের সমস্যা হল, প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকা হিংসাত্মক মানসিকতা। আইনের চোখে যে-কোনও লোককেই জনগণ পেটাতে পারে না, আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না। কোনও একজন গণধোলাইয়ে অংশগ্রহণ করলে ডাক্তার-শিক্ষক হলেও যা অপরাধ, একজন বেকার ছেলে হলেও সমান অপরাধ।

ধর্ষণ-খুন-ডাকাতির মতো আরও গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রেও অপরাধীকে হাতে-নাতে ধরতে পারলেও, গণধোলাই দেওয়া কোন সভ্যতার পরিচয় নয়। এটা সত্যিই যে, আমাদের দেশের সাধারণ লোকের পুলিশ-প্রসাশনের উপরে ভরসা কম। কিন্ত, সেই অজুহাতে কোনও সভ্যদেশে গণধোলাইকে মান্যতা দেওয়া যায় না। এখানে একটা কাজই জনগণ করতে পারে, সেটা হল, জনমত গড়ে তোলা, এবং প্রশাসনের উপরে চাপ সৃষ্টি করা। জনমতের চাপ যে কত ভয়ানক চাপ হতে পারে, নির্ভয়া বা কাটুয়া কাণ্ডের দ্রুত মীমাংসা হয়ে যাওয়াই তার প্রমাণ।

এক্ষেত্রে, আরেকটা ব্যাপারেও দৃষ্টি-আকর্ষণ করছি। একজন পুলিশও জেরা করার নামে, কোনও লোককে লকআপ-এ নিয়ে পেটাতে পারে না, সে যত বড়ই অপরাধীই হোক না কেন। কিন্তু আমরা খুব সহজেই বলে ফেলি, “লকআপ-এ নিয়ে উত্তম-মধ্যম দুটো দিন স্যার, সব বেরিয়ে যাবে”। পুলিশও হামেশাই লকআপ-এ পেটায়, অনেকে মারাও যায়। আইনরক্ষক হয়ে, এমন আইনবিরোধী কাজ করা একেবারেই অনুচিত ।

এদেশে প্রতিনিয়ত শিক্ষক, সৎ অফিসার, আইনজীবী, ডাক্তাররা মার খাচ্ছেন। পকেটমার, পাচারকারী, ইভটিজার, মোলেস্টার সন্দেহে গণপিটুনিতে অনেকেই মারা পড়ছে। প্রতিনিয়ত জনগণ দাবি করছে, ধর্ষণে অভিযুক্তদের  কোনও বিচারেরই নাকি দরকার নেই, রাস্তার মোড়ের ল্যাম্পপোস্টে টাঙিয়ে দেওয়াই একমাত্র উপযুক্ত শাস্তি। এবং তা দেখে কেউ কেউ আগ-বাড়িয়ে আরও কুৎসিত, আরও ভয়ংকর শাস্তির ফরমায়েশ করছে। লোকে দাবি করছে, পুলিশদের বা দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদেরও একমাত্র শাস্তি হল, গণধোলাই।

আর আমাদের দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতাদের কথা তো বাদই দিলাম। তারা খোলাখুলি সংবাদ মাধ্যমের সামনে বলতে পারছেন, “আমাদের পার্টি চুড়ি পরে থাকে না। আমাদের পার্টির উপরে কোনও অত্যাচার হলে, আমরা পাল্টা মার মারব”। এই পাল্টা মার দেওয়ার প্রস্তাবে সুশীল, শিক্ষিত সমাজের সমর্থকরাও তুমুল হাততালি দিয়ে নেতাদের বাহবা দিচ্ছে। একজন ‘বাঘের বাচ্চা’ নেতা এতদিনে তারা পেয়েছে। একজন মানবিক নেতা  যিনি শান্তি চান, যিনি আইনকে আইনের পথে চলতে দেওয়ার দাবি করেন, যিনি ‘মারের-পাল্টা মার’– এই রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না, তিনি আসলে কোনও নেতাই নন’। আজকের দিনে এটা আমাদের দুর্ভাগ্য যে, বাংলারও একটা বড় সংখ্যক মানুষ গান্ধীজীর মতো ব্যাক্তিকেও একজন দুর্বল, ব্যক্তিত্বহীন নেতা বলে মেনে নেওয়া শুরু করেছে। জাতির জনককে জাতীয় ভিলেনে পরিণত করছে।

তাই, এই ডাক্তারদের গণপিটুনিকে বিক্ষিপ্ত কোনও হিংস্র সামাজিক ঘটনা বলে ভাবলে ভুল হবে, এটা আমাদের সমাজের প্রতিদিন বাড়তে থাকা হিংস্র মানসিকতারই পরবর্তী পর্যায়। আমরা এখনই সচেতন না হলে, সমাজের যে কোনও পেশার বা যে কোনও সাধারণ নিরীহ লোকই এর শিকার হতে পারি। আসলে, এই গণপিটুনির সংস্কৃতিতে একটা আলাদা উন্মাদনা আছে। যেটা যে কোনও হিংসাত্মক কাজেই থাকে-  অতিরিক্ত আড্রিনালিন ক্ষরণের একটা বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু একজন মানুষের মনুষ্যত্ব, তার শিক্ষা সেখানেই, যেখানে সে তার আবেগ ও উন্মাদনাকে  সম্বরণ করতে পারে।

নিকটাত্মীয় মারা যাওয়া খুবই কষ্টের, প্রশাসন ঠিক মতো কাজ না করাও সমান হতাশার, কিন্তু সেগুলোর বহিঃপ্রকাশ কখনই গণধোলাই, ধ্বংসাত্মক মানসিকতা বা বর্বরতার মাধ্যমে হতে পারে না। আমাদের এটা ভেবে নেওয়ারও কোনও কারণ নেই যে শুধু ডাক্তার, শিক্ষক বা ওই ধরনের কিছু কিছু জীবিকাতে না থাকলেই আমরা বা আমার পরিবার নিরাপদ, নির্ঝঞ্ঝাট থাকবে। এই মানসিকতা বাড়তে থাকলে, ছোটখাটো মতভেদেও লোকে ছুরি চালিয়ে দিতে পারে। যে কোনও ধরনের জীবিকাতেই এই ধরনের সমস্যা আসতে পারে।

নিজের বাড়ি বসে কে-কী খাবে, কোন ছেলেটা কোন মেয়ের সঙ্গে ঘুরতে যাবে সেগুলোও যে একটা গণ-আক্রোশের কারণ হতে পারে তার উদাহরণও তো আমাদের হাতের সামনেই আছে। তাই শিক্ষিত সুশীল সমাজের একমাত্র কাজ হল, যে কোনও ধরনের হিংসাত্মক প্রবণতা গোড়াতেই বন্ধ করার চেষ্টা করা। আমাদের সমাজ সেদিনই প্রকৃত সভ্য হবে, যেদিন একটা হাঁক দিলে ২০০ জন লোক কোনও বন্ধু বা প্রতিবেশীকে রক্ত দেওয়ার জন্য নীলরতন যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে যাবে, ভাঙচুর আর ডাক্তারদের গণধোলাই দেওয়ায় জন্য নয়।

মতামত লেখকের নিজস্ব

ইতালিতে বসবাসরত লেখক বিজ্ঞান গবেষণার সঙ্গে যুক্ত

Comments are closed.