কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষানীতি ও ভাষা সমস্যা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দীপাঞ্জন ভট্টাচার্য

    কেন্দ্রীয় সরকার একটি নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করতে চেয়েছে, যাতে বলা হচ্ছে, সারা ভারতের সব বিদ্যালয়েই হিন্দি আর ইংরাজি বাধ্যতামূলক ভাবে পড়ানো হবে। দক্ষিণ ভারতীয়দের তীব্র প্রতিবাদের ঢেউ ঠেকাতে আপাতত সরকার পিছু হটেছে, কিন্তু বাংলায় এই ব্যাপারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাচ্ছে। এই বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই  ছাত্রজীবনে ভাষাশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বোঝা দরকার।

    ভাষাশিক্ষার দরকার প্রধানত দুটি কারণে- প্রথমত, কোনও ভাষার সঙ্গে সেই অঞ্চলের সংস্কৃতি, মানুষের নিজস্ব জীবন-যাপন অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িত। তাই কোনও অঞ্চলে দীর্ঘদিন বসবাস করলে, সেই অঞ্চলের ভাষা অবশ্যই শেখা উচিত। কোনও বিশেষ অঞ্চলের অধিবাসীদের জীবন-যাপন, ইতিহাস সম্পর্কে সামগ্রিক ভাবে জানতে গেলে ওই অঞ্চলের ভাষা জানার দরকার। দ্বিতীয়ত উচ্চশিক্ষার প্রয়োজনে মাতৃভাষা ছাড়াও একটি ভিন্ন ভাষা শেখার প্রয়োজন হতে পারে। এখানে আর একটা বিষয় স্পষ্ট করে বোঝা প্রয়োজন, শুধুমাত্র সাধারণ যোগাযোগের মাধ্যম, বা বেড়াতে গিয়ে কথা বলার প্রয়োজনীয়তায় ভাষা নিয়ে পড়াশোনা করা আবশ্যিক নয়।

    ব্যক্তিগত ভাবে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বা বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ এবং কাজের সূত্রে থাকার কারণে জানি কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চলের ভাষা না জানার জন্য ঘোরার বা কয়েকদিনের জন্য থাকায় বিশেষ কোনও সমস‍্যা হয় না। সেই কারণেই আমার স্পেন বা তামিলনাড়ুর প্রত্যন্ত অঞ্চলে একা ঘুরে আসতে কোনও অসুবিধে হয়নি যেখানে একজন লোকও ইংরাজি জানেন না। বহু ভারতীয় বা বাংলাদেশী প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়েও কাজের সন্ধানে ইউরোপ, আমেরিকা বা মধ্যপ্রাচ্য চষে বেড়াচ্ছে। তারা কিন্তু বাংলা বা হিন্দি ছাড়া আর কোনও ভাষাই জানেন না। আজকের দিনে গুগল-ট্রান্সলেটারের মতো প্রযুক্তি থাকাতে এই ধরনের সমস্যা প্রতিনিয়তই কমে যাচ্ছে।

    এত উদাহরণ দেওয়ার কারণ হল,  যে বেড়াতে যাওয়ার জন্য বা অল্প-সময়ের কোনও কাজের জন্য ভিন্নরাজ্যে, বা ভিন্নদেশে যেতে হলে সেখানকার ভাষা শিখে যাওয়াটা একদমই আবশ্যিক নয়। তা না হলে, যুগ-যুগ ধরে পর্যটকরা এক-দেশ থেকে অন্যদেশে ঘুরে-ঘুরে বেড়াতে পারতেন না এবং এত যুগ ধরে ‘হিউম্যান মাইগ্রেশন’-ও চলতে পারত না। ইউরোপে ইউরো-জোন হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন দেশের লোকেরা এক দেশ থেকে আরেক দেশে মুক্ত ভাবে যাতায়াত করতে পারে, অন্যদেশে কাজ করতে পারে, অনেকটা আমাদের দেশের বিভিন্ন রাজ্যে যাতায়াতের মতো। এইসব বিভিন্ন দেশের ভাষা, সংস্কৃতি কিন্তু আলাদা এবং কাজের জন্য বিদেশে থাকতে হলেও তাঁরা প্রত্যেকেই নিজেদের দেশের ভাষা ও সংস্কৃতি পুরোদমেই রক্ষা করছেন।

    যেহেতু জার্মানীতে ‘জব-মার্কেট’ ভালো, তাই একজন স্প্যানিস ছেলেকে জোর করে ছোটবেলা থেকে ঘাড়-ধরে জার্মান শেখানো হয় না। মনে রাখা ভালো, আলাদা আলাদা দেশ শোনালেও ইউরোপের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের মধ্যে সংস্কৃতিগত ভাবে যতটা পার্থক্য রয়েছে, ভারত একটি দেশ হওয়া সত্ত্বেও রাজ্যগুলির ক্ষেত্রে সেই পার্থক্য অনেক গুণ বেশি। তাই, সংস্কৃতির নিজস্বতা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও আমাদের আরও বেশি সতর্ক হওয়া উচিত। আর তারই প্রথম পদক্ষেপ হল, আঞ্চলিক ভাষাগুলো সম্পর্কে আরও যত্নশীল হওয়া।

    আঞ্চলিক ভাষা সম্পর্কে বলতে গেলে, এখানে এটাও মনে রাখা দরকার যে, কেউ যখন কোনও দেশে বা রাজ্যে পাকাপাকিভাবে বসবাস করছেন, চাকরি বা ব্যবসা করছেন, ছেলেমেয়েদের সেখানকার পরিবেশে বড় করছেন, তখন অবশ্যই ওই অঞ্চলের ভাষা শেখা জরুরি এবং উচিতও। কারণ, ভাষা শেখা মানে, সেখানকার সংস্কৃতি, সেখানকার মানুষজনের নিজস্ব জীবন-যাপনের সাথে পরিচিত হওয়া যায় আর তার চেয়েও বড় কথা, এই ভাষাশিক্ষার মধ্যে দিয়ে ওই অঞ্চলের মানুষের সংস্কৃতি, জীবন-যাপনকে সম্মান করা হয়।

    একটা কথা প্রায়শই বলা হয়, ‘আমাদের ছেলে-মেয়েরা বাইরের রাজ্যে পড়তে, বা কাজের জন্য গেলে হিন্দি জানলে তো কাজের সুবিধে হবে।’ এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য, এই ‘কাজ’ বলতে কায়িক পরিশ্রমের কাজ কেউই বলছেন না, বলছেন মোটামুটি ভদ্রস্থ সরকারি বা বেসরকারি চাকরির কথা। আর এই সব চাকরির জন্য যে ভাষা জানা আবশ্যিক, সেটা হল ইংরাজি কারণ সেখানে কাজের ভাষা হিন্দি নয়।

    চাকরির জন্য অন্য রাজ্যে যাওয়া নিয়ে কোথাও কোনও আপত্তি নেই, থাকার কথাও না। কিন্তু, যাঁরা হিন্দি শিখলে কাজের সুবিধে হয় বলে দাবি করেন, তাঁদের অনেকেই চেন্নাই, বেঙ্গালুরুতে গিয়ে বছরের পর বছর থেকেও একলাইনও তামিল বা কন্নড় শেখেন না। তাদের অনেকেই কিন্তু একবারও বাড়ির ছেলেমেয়েদের বলবেন না, ‘বাড়ির ছেলেটা কন্নড় শিখুক, বেঙ্গালুরুতে পড়তে‌ বা কাজ করতে গেলে সুবিধে হবে’। এরা দক্ষিণ, পশ্চিম ভারতে কাজ করতে গিয়েও স্থানীয় ভাষা না শিখে উল্টে স্থানীয়দের বাধ্য করেন হিন্দিতে কথা বলতে; ঠিক যেভাবে আজকের দিনে কলকাতার বাঙালিরা বাংলায় থেকেও প্রতিনিয়ত হিন্দি বলতে বাধ্য হয়। এই প্রতিবেদক কোনওদিন হিন্দি পড়েনি, কিন্তু বিভিন্ন রাজ্যে কাজের বা ঘোরার ক্ষেত্রে কোনও অসুবিধের সম্মুখীন হতে হয়নি। হিন্দি না জানা দক্ষিণ ভারতের বন্ধুদেরও একই অভিজ্ঞতা। তাই, কাজের জন্য হিন্দি শেখা আবশ্যক সেই যুক্তি মানা সম্ভব নয়।

    আসলে, অন্য রাজ্যে কাজের বা পড়াশোনার সুবিধের জন্য হিন্দি শিক্ষার কথা বলাটা আসলে অজুহাত যার নেপথ্যে রয়েছে সারা ভারতকে এক-ছাঁচে বেঁধে ফেলার চেষ্টা।

    মাতৃভাষা, ইংরাজি উচ্চশিক্ষা

    এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে আজকের যুগে বিজ্ঞানের ভাষা একমাত্র ইংরাজি। উচ্চশিক্ষায় ইংরাজি মাধ্যম আবশ্যক। শুধু বিজ্ঞান নয় বাণিজ্য, চিকিৎসাশাস্ত্র, অর্থশাস্ত্র থেকে কম্পিউটার বা ইঞ্জিনিয়ারিং–এর বিভিন্ন বিষয়ের ক্ষেত্রেই ইংরাজি জানা আবশ্যক। বিজ্ঞান বা টেকনোলজিকাল ম্যাগাজিন ইংরাজিতেই লেখা হয়। বিশ শতকের শেষদিক পর্যন্ত বিশ্বের বড়-বড় ‘নন-ইংলিশ-স্পিকিং’ দেশ যেমন জার্মানি, জাপান, ফ্রান্স, ইটালি, রাশিয়া, চিন ইত্যাদি সবদেশই নিজের নিজের ভাষাতেই বিজ্ঞান চর্চা করত। শুধু বিজ্ঞানচর্চাই নয়, বিশ্বের সব ভালো ভালো বই-ই তারা নিজের দেশের ভাষাতে অনুবাদ করে ফেলেছিল। কিন্তু, সাহিত্য আর সংস্কৃতির উন্নতির ক্ষেত্রে যেমন বৈচিত্র্য জরুরি, তেমনি, বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিশ্বায়নের প্রয়োজন। ঠিক এই উপলব্ধি থেকেই, ইউরোপ, জাপান, চিন বর্তমানে ইংরাজিতে বিজ্ঞান চর্চায় জোর দিচ্ছে এবং তারা এটা করছে নিজেদের ভাষাকে, সংস্কৃতিকে যথাযোগ্য সম্মান দিয়ে।

    বিজ্ঞানের মূল লক্ষ্যই হল তথ্যের আদান-প্রদান, নতুন আবিষ্কারের, নতুন প্রযুক্তির দ্রুত আদান-প্রদান। এবং এই-জায়গাতেই সমস্ত দেশের সারস্বত সমাজ  বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে সমগ্র বিশ্বকে এক ভাষাতে বেঁধে ফেলার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছে। যে কারণে অনেক ‘নন-ইংলিশ-স্পিকিং’ দেশের গবেষণাগারে পেশাদার অনুবাদক রাখা হচ্ছে। সেইসব গবেষণাগারের কাজও দেশীয় ভাষাতে দেশীয় পত্রিকাতে প্রকাশিত না হয়ে অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হচ্ছে বিশ্বের বড় বড় বিজ্ঞান-পত্রিকাতে।

    আমাদেরও সেই কারণে মাতৃভাষা এবং ইংরাজি দুই–ই সমান গুরুত্ব দিয়ে শেখানো উচিত। প্রথম ভাষা অবশ্যই মাতৃভাষা হওয়া উচিত, এবং একটু উঁচু-ক্লাস থেকেই বিজ্ঞান শেখার ভাষা শুধুমাত্র ইংরাজিই হওয়া দরকার। এক্ষেত্রে অবশ্যই বলা দরকার, সর্বস্তরে বাংলা পড়াতে চাওয়ারও কোনও যৌক্তিকতা নেই। ক্লাস-৬ থেকে ইংরাজি পড়ানো শুরু করতে গিয়ে বিগত বাম-সরকার আরেক বিপদ এনে ফেলেছিল। যখন উন্নত বিশ্ব নিজের ভাষা ছেড়ে ইংরাজি ভাষাতে বিজ্ঞান শিখতে শুরু করছে, তখন কোনও পরিকাঠামো ছাড়াই আমরা ইংরাজি শিক্ষাকে অবহেলা করেছিলাম। অথচ,  ব্রিটিশ-ইন্ডিয়াতে বাংলাদেশের বিজ্ঞান চর্চা যে এত উন্নত পর্যায়ে গিয়েছিল তার একটা বড় কারণই হল, ইংরাজি ভাষাতে উচ্চশিক্ষিত বাঙালিদের স্বাভাবিক পারদর্শিতা।

    প্রথম, দ্বিতীয় আর তৃতীয় ভাষা

    একটা রাষ্ট্রের শিক্ষানীতি এমনই হওয়া উচিত, যে একজন শিশু যে অঞ্চলে বড় হচ্ছে, সেই অঞ্চলের ভাষা, সাহিত্য আর সংস্কৃতি যেন তার পঠনপাঠনের আবশ্যিক বিষয় হয়। অর্থাৎ ওই অঞ্চলের মাতৃভাষায় শিক্ষালাভ যেন তার হয়ে থাকে। রাষ্ট্রের দ্বিতীয় কর্তব্য হওয়া উচিত ছাত্র–ছাত্রীদের এমন একটি ভাষাশিক্ষা দেওয়া, যাতে ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে তাদের কোনও অসুবিধে ভোগ না করে। বর্তমানে এই ভাষা হল ইংরাজি। এর সাথে কম গুরুত্বের তৃতীয় ভাষা হিসেবে এমন কোনও ভাষা শেখানো যেতেই পারে, যেটা ওই ছাত্র বা ছাত্রীর নিজের পছন্দের ভাষা। এই তৃতীয় ভাষা হিসেবে ভারতের মতো বহুভাষী দেশে কখনই কোনও নির্দিষ্ট ভাষাকে চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়, কারণ সেটা করতে যাওয়া মানেই ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের ভাষা ও সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা করা।

    বাংলায় একজন পড়ুয়া যদি উর্দু শিখতে চায় সে যেন তার অধিকার পায়, একজন সংস্কৃত শিখতে চাইলে তারও সে ভাষা শেখার অধিকার পাওয়া উচিত। এটা দেখা দরকার,  যে একজন বাঁকুড়া-পুরুলিয়ার সাঁওতাল ছেলে যেন সাঁওতালি ভাষা শিখতে পারে, দার্জিলিং–এর একটা ছেলে যেন নেপালি/গোরখা ভাষা শেখার অধিকার পায়, তেমনি একজন উত্তরবঙ্গের ছেলে যেন রাজবংশী ভাষা পড়ারও সুযোগ পায়। না হলে, সব জায়গাতে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলে, কিছুদিন পরেই এই সব ছোট-ছোট আঞ্চলিক ভাষাগুলো সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। একইভাবে, কলকাতার অবাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলের কোনও ছাত্র যদি তামিল, ওড়িয়া, গুজরাতি শিখতে চায়, এবং ওই বিদ্যালয়ে যদি তার পরিকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হয়, তাহলে সেই ছাত্রও যেন তার অধিকার পায়।

    দেশে কেন্দ্রীয় সরকারের যেসব বিদ্যালয় আছে, সেখানে পড়াশোনা করা ছাত্ররা এমনিতেই ইংরাজি-হিন্দিকে প্রথম আর দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে রেখে পড়াশোনা করে। তাই চাকরির প্রয়োজনে যাদের বিভিন্ন রাজ্যে ঘুরতে হয়, তাদের ক্ষেত্রে সারা ভারতের সমন্বয় সাধনকারী পাঠ্য-ব্যবস্থা বর্তমান পরিকাঠামোতেই মজুদ রয়েছে। কিন্তু, এইসব বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও আঞ্চলিক ভাষাকে অবশ্যই তৃতীয় ভাষা হিসেবে শেখানোর দরকার আছে। হিন্দিকে চাপিয়ে দেওয়ার ফলাফল কিন্তু আমাদের হাতের সামনেই আছে। উত্তর ভারতেও মৈথেলি, ভোজপুরি, মগধি, কুমায়ুনি, গারওয়ালি ভাষা আজ থেকে ৫০ বছর বাদে আর কেউ জানবে না। আরও অনেক আঞ্চলিক উত্তর-ভারতীয় ভাষাও আজ লুপ্ত হওয়ার পথে।

    মতামত সম্পূর্ণত লেখকের নিজস্ব

    ইতালিতে বসবাসরত লেখক বিজ্ঞান গবেষণার সঙ্গে যুক্ত

    আরও পড়ুন

    এ রাজ্যের মানুষ প্রাদেশিকতাকে সিকি পয়সাও খাজনা দেবেন না

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More