বুধবার, ডিসেম্বর ১১
TheWall
TheWall

এত হিংসা কেন

দেবত্র দে

বসিরহাটে নির্বাচনোত্তর হিংসা ও মৃত্যু (উল্লেখ্য যারা মারা গেলেন তারা প্রত্যেকেই বহুজন সমাজের) এই রাজ্যকে আবার খবরের শিরোনামে নিয়ে এল। বলাই বাহুল্য, রাজ্যবাসী হিসেবে এ কোনও গর্বের বিষয় নয়্। কবির ভাষা ধার করে বলা যায়- মুখ ঢেকে যায় লজ্জায় কারণ এ দায় আমার, আমাদের। গত দু–তিন বছর ধরেই রাজ্যের নানা স্থানে সাম্প্রদায়িক বৈরিতা সংঘর্ষের আকার নিয়েছে, কিন্তু তা নিরসনের বদলে বিভিন্নভাবে তা থেকে ফায়দা লুটতেই ব্যস্ত ছিল পরস্পর মুখোমুখি রাজনৈতিক দলগুলো। আগামী বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যে তীব্রতম আকার ধারণ করবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সুতরাং এই ক্রমবর্দ্ধমান প্রতিযোগিতার বলি হবেন আরও কিছু নিরীহ মানুষ যারা জীবন জীবিকার স্বার্থে খানিকটা বাধ্য হন রাজনীতির সংস্রবে থাকতে।

একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে এই বাংলায় জনসংখ্যার নিরিখে বহুজন মানুষদেরই (তফসিলি জাতি ও উপজাতি, অন্যান্য পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায় ও সংখ্যালঘু) প্রাধান্য। আর এই অংশের মানুষের ভোটই যে এ রাজ্যের রাজনৈতিক ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক তা যুযুমান সব পক্ষই বোঝে, ফলে ঐতিহাসিক ভাবে এ রাজ্যে রাজনৈতিক হিংসায় সিংহভাগ ক্ষেত্রে বহুজন সমাজের মানুষই হয় বলির পাঁঠা। আর এই বহুজন সমাজের বেশিরভাগ মানুষই কর্মসূত্রে জড়িত অসংগঠিত ক্ষেত্রে।

এ দেশের মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানের মধ্যে যে সাযুজ্য ধরা পড়েছে জাতীয় নমুনা সমীক্ষার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে তাতে বলাই যায় এই বহুজন সমাজের অধিকাংশই নিম্ন আয়ের পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। সরকারি বিভিন্ন ন্যায্য প্রকল্পের সুযোগ আদায় করা থেকে নিত্যদিনের জীবিকা নির্বাহের ক্ষেত্রে তাই এরা অনেক বেশি নির্ভরশীল ক্ষমতাশীল রাজনৈতিক দলের ওপর। সমাজবিজ্ঞানীরা কেউ একে বলেছেন ‘রাজনৈতিক সমাজ’ কেউ বা ‘পার্টি সমাজ’। উপরন্তু, রাজনৈতিক দলগুলোর জুলুমবাজিও সবচেয়ে বেশি সহ্য করতে হয় এই অংশের মানুষকে।

অতীত অভিজ্ঞতা জানান দেয় বহুজনেরা যখন তাঁদের রাজনৈতিক সমর্থন বদল করে তখনই রক্তাক্ত হয় গ্রাম বাংলা। সুতরাং একে নিছক রাজনৈতিক বা গোষ্ঠী সংঘর্ষ আখ্যা দিলে এর অন্তর্নিহিত অর্থনীতিকে উপেক্ষা করা হবে।

বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের গৃহীত নীতি অনুযায়ী আগামীদিনে দেশের অর্থনীতি মুক্ততর হবে এটা আশা করাই যায়। আরও কোণঠাসা হবে অসংগঠিত অর্থনীতি, যা দেশজোড়া ৯০ ভাগ মানুষের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র। কৃষিক্ষেত্রও এই সংকটের বাইরে নয়- বিগত দু’দশকের কৃষক আত্মহত্যার ঘটনা যা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। প্রয়াত অধ্যাপক কল্যাণ সান্যাল ‘রিথিঙ্কিং ক্যাপিটালিস্টিক ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক বইতে এই অভিমত ব্যক্ত করেন যে পুঁজিবাদের স্বার্থেই অর্থনীতির এই অংশ কোনওদিনই পুঁজিবাদী অর্থনীতির অন্তর্ভুক্ত হবে না, রয়ে যাবে ‘রেসিডুয়াল’ হিসেবে – সস্তায় শ্রম ও কাঁচামালের যোগান ক্ষেত্র রূপে।

অন্যদিকে, রাজ্যে প্রতি বৎসর যে পঁচিশ লক্ষ ছাত্রছাত্রী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হয় মেরেকেটে তার মাত্র দশ শতাংশ পৌঁছতে পারে উচ্চশিক্ষার দোড়গোড়ায়। অর্থাৎ মাঝপথে খসে যাওয়া নব্বুই শতাংশের কাজের জায়গা এই অসংগঠিত ক্ষেত্র যেখানে না আছে কাজের নিরাপত্তা, না আছে কোনও সুযোগ সুবিধা। উপরন্তু আগামী প্রায় দশ বৎসর এ দেশ ভোগ করবে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ যার অর্থ কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত বেশি হবে শিশু ও বয়স্কদের থেকে।

স্মরণে রাখা ভালো, কোনও জাতির ইতিহাসে এই সুযোগ একবারই আসে। সব মিলিয়ে আগামীদিনে বিশেষ করে অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়বে কর্মপ্রার্থীর সংখ্যা বিপুল হওয়ায়। তাই ভোটের লক্ষ্যে অর্থনীতির এই অংশকে নানা ভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে কোনও খামতি রাখতে চাইবে না রাজনৈতিক দলগুলো। ফলে আগামী দিনে জীবন জীবিকার স্বার্থেই হিংসাশ্রয়ী হয়ে ওঠার প্রবল সম্ভাবনা এ রাজ্যের। অর্থনীতির সাধারণ চাহিদা যোগানের তত্ত্বেই রাজ্যে অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোতে এর প্রভাব হবে তীব্রতর। ফলে খুব সাদামাটা ভাবে একথা বলা যায় যে, বিপুল দক্ষ ও অদক্ষ বেকারের এই রাজ্যে শান্তি খুব সহজলভ্য নয়।

মতামত নিজস্ব

লেখক বগুলা’র শ্রীকৃষ্ণ কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক

Comments are closed.