শুক্রবার, ডিসেম্বর ১৩
TheWall
TheWall

এ রাজ্যে বামেদের প্রাসঙ্গিকতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে

দেবত্র দে

সপ্তদশ সাধারণ নির্বাচনের ফল অনুযায়ী এরাজ্যে বামেদের ভোট আটকে গেল ৭ থেকে ৮ শতাংশে। অনুমান করা যায় এই  ভোট  মূলত  শিক্ষিত ভদ্রবৃত্তের এবং অবশ্যই যারা বর্ণ হিন্দু। কারণ সাবঅল্টার্ন বলতে আমাদের রাজ্যে যে জনগোষ্টি সমূহকে বোঝায় অর্থাৎ আদিবাসী, নমশুদ্র ও রাজবংশীদের ভোট ইতিমধ্যেই বামেদের হাতছাড়া। মূলত এই প্রান্তিক অংশের মানুষের সমর্থন হারানোই চৌত্রিশ বছরের বাম শাসনের পতনের অন্যতম প্রধান কারণ। এ যেন ফ্রান্স, ব্রিটেন ও আমেরিকার প্রেক্ষিতে ১৯৪৮-২০১৭ অবধি তথ্যের উপর থমাস পিকেটির ২০১৮ সালে লেখা “ব্রাক্ষ্মণ্যবাদী বাম বনাম বণিক ডান” শীর্ষক গবেষণা পত্রের প্রতিধ্বনি। পিকেটি দেখিয়েছেন গত শতাব্দীর সাত ও আটের দশক থেকেই বাম ভোট ক্রমশ আবর্তিত হচ্ছে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে। অথচ পিকেটির মতে ১৯৫০-৬০ অবধি ব্যাপারটা ছিল ঠিক উল্টো, বামেদের সমর্থনের ভিত্তি ছিল প্রধানত নিম্ন আয় ও নিম্নশিক্ষার মানুষেরা।

এ রাজ্যের বাম রাজনীতির অবস্থান ২০১৯-এ এসে স্পষ্টতর হল যা পিকেটির ভাষায় ‘মাল্টি এলিট’ পার্টি পদ্ধতি, যার পরিণামে স্বাধীনতার পর এই প্রথম এ রাজ্য থেকে একজনও বাম সাংসদের নির্বাচিত না হওয়া শুধু নয় একজন বাদে সব বাম প্রার্থীর জামানত জব্দ হওয়া। যাদের পরিচর্যায় গত প্রায় এক শতাব্দী ধরে এ দেশে বাম রাজনীতির পত্তন ও প্রসার হয়েছিল  দু–চার জন বাদ দিলে তাঁদের বেশিরভাগেরই নামের পাশে কোনও এলিট প্রতিষ্ঠানের নাম যুক্ত ছিল না, কিন্তু তাদের যোগ ছিল ‘জনতার মুখরিত সখ্যে’।

বিপ্রতীপে আজ বাম আকাশে উল্টো চিত্রই ধরা পড়ে – সারা দেশে বাম নেতৃত্বের সামনের সারিতে কোনও আদিবাসী, দলিত এমনকি উল্লেখযোগ্য মহিলার মুখও নেই। এর প্রভাব পড়েছিল এ রাজ্যের সরকারি নীতিতেও, সিকি শতাব্দী বাম শাসনের পরও ২০০১–এর আদমসুমারি অনুসারে এ রাজ্যের আড়াই হাজারেরও বেশি গ্রাম ছিল অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভাবে পশ্চাদপদ, যার অধিকাংশই জঙ্গলমহলের আদিবাসী অধ্যুষিত তিন জেলা বাঁকুড়া, পুরুলিয়া ও অধুনা ঝাড়গ্রামে। উন্নয়নের এই বঞ্চনার শিকার হয়েছেন উত্তরবঙ্গের রাজবংশীরাও, সম্ভবত বাম আমলে তাঁদেরও কোনও প্রতিনিধি  ছিল না দল বা সরকারের সর্ব্বোচ্চ নীতি নির্ধারণে।

রাজ্যে ২০১১–র পরিবর্তনের পরে তাই জঙ্গলমহল ছিল সরকারের অগ্রাধিকার। চলতি ব্যাখ্যায় উন্নয়ন বলতে যা বোঝায় অর্থাৎ রাস্তার উন্নতি, পানীয় জলের ব্যাবস্থা এবং অবশ্যই  ঘরে ঘরে দু’টাকা কেজি চাল – জঙ্গল মহলে গেলে তা নজর পড়বেই। কিন্তু স্কুল শিক্ষার মান, নূন্যতম স্বাস্থ্য পরিষেবা কিংবা সম্মানজনক কাজের সুযোগ তার বিশেষ কোনও পরিবর্তন কি হয়েছে?  তা যদি না হয় তাহলে এ উন্নয়ন সাময়িক, তাই অন্তর্জালে জঙ্গলমহলের জার্নালে ফুটে ওঠে ধারাবাহিক বঞ্চনার কথা, ‘স্যার, ২ টাকা চালের ভাত কখনও খেয়েছেন? ওটাও একটা আর্ট।’ যদিও জন প্রতি সপ্তাহে মেলে মাত্র ১ কেজি, যেখানে গড় চাহিদা সপ্তাহে তার পাঁচগুণ কারণ জঙ্গলমহলের বাসিন্দাদের কায়িক পরিশ্রম তুলনামুলক অনেক বেশি। মানব উন্নয়নের  জন্য তাই জরুরি  পছন্দের স্বাধীনতা, সক্ষমতা ও ক্ষমতায়ন যা উন্নয়নের চলতি ধারায় অনুপস্থিত। পরিকাঠামগত উন্নয়নের এই সীমাবদ্ধতার সঙ্গে যোগ হয়েছে  স্থানীয় স্তরে দুর্নীতি, সরকারি চাকরিতে অস্বচ্ছতা সহ নানা ইস্যু। ফলে অভিমানী জঙ্গলমহল যেন হয়ে দাঁড়িয়েছে এ রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলের ভগীরথ।

অন্যদিকে দ্বিতীয়বারের জন্য বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে  আসা দেশের শাসক দল গত পাঁচ বছরে নিঃশব্দে তাদের দলের মণ্ডলায়ন ঘটিয়েছে, সনাতন হিন্দুত্ব থেকে সরে এসে দু’জন বহুজন সমাজের প্রতিনিধিকে দেশের  সর্ব্বোচ্চ প্রশাসনিক আসনে বসিয়েছে। প্রসারিত এই হিন্দুত্ব আখেরে বর্তমান সংসদে সংখ্যার ভিত্তিতে দিশাহীন বিরোধীদের প্রায় অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়েছে – মান্যতা পেয়েছে ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ সবকা বিশ্বাস’ এর সরকারি দাবি। স্বাধীনতার পর প্রথমবার তাই পিছিয়ে থাকা আদিবাসী, রাজবংশী ও ওপার বাংলা থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসা মতুয়া সম্প্রদায়ের ভোটে এ রাজ্যে অভূতপূর্ব ফল করল দেশের শাসক দল।

আগামীদিনে এই সম্প্রদায়গত সমীকরণের উপর অনেকটাই নির্ভর করবে এ রাজ্যের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি। তত্ত্বগত ভাবে এখনও শ্রেণীগত বিশ্লেষণে আটকে থাকা বামেদের এ রাজ্যে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ তাই নিঃসন্দেহে কন্টকময় শুধু নয় যথেষ্ঠ প্রতিকুলও বটে। জাতপাতের বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজের দলকে বড় করার যে অভিজ্ঞতা কেরালার বামেদের আছে বঙ্গীয় বামেদের তা নেই। তার উপর আছে মরিচঝাঁপির মতো কালিমা। ফলে আগামীতে বামেরা এ রাজ্যে নিজেদের কতটা প্রাসঙ্গিক রাখতে পারে সেটাই দেখার।

মতামত লেখকের নিজস্ব

লেখক বগুলা’র শ্রীকৃষ্ণ কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক

Comments are closed.