শনিবার, নভেম্বর ২৩
TheWall
TheWall

শিক্ষাঙ্গনে নৈরাজ্যের উৎস কি সংস্কৃতিহীন শিক্ষাব্যবস্থা?

নিশীথ কুমার দাশ

এ দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও মানবসম্পদের সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার। মনে পড়ছে চিন দেশে প্রচলিত সেই প্রবাদটি, তুমি যদি স্বল্পতম সময়ে লাভ করতে চাও তাহলে মরশুমি ফসলের চাষ কর, তবে তুমি এতে ফসল পাবে মাত্র একবার। আর যদি তুমি ১০ বছর ধরে ফল লাভ করতে চাও, তাহলে চাষ কর ফলদার বৃক্ষের। আর যদি তুমি শতাব্দীকাল ধরে ফল পেতে চাও তাহলে মানুষ চাষ কর।

প্রচলিত শিক্ষার অভিমুখ এমন নয় যাতে মানুষের মধ্যে দয়া–মায়া, স্নেহ–মমতা ইত্যাদি মানবীয় গুণাবলি উৎকর্ষ লাভ করে ও বিকশিত হয়, আচার–আচরণ পরিশীলিত ও পরিমার্জিত হয়, চারিত্রিক উৎকর্ষ বৃদ্ধি পায়, মানবিক গুণাবলির বিকাশ ঘটে এবং মানবতা সমুন্নত হয়। পারিপার্শ্বিক বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ের পরিস্থিতি দেখলে বোঝা যায় আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা উন্নত মানসিকতাসম্পন্ন জাতি গঠনে সক্ষম নয়। আমাদের দেশের উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় হচ্ছে নিম্নমানের ও দুর্নীতিগ্রস্থ শিক্ষাব্যবস্থা – যা আমাদের জাতির মেরুদণ্ডকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

বর্তমান সময়ে শিক্ষার অবনতির ফলে শিক্ষার্থীরা জ্ঞানচর্চার প্রতি নিবিষ্ট হচ্ছে না। সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে এখনকার ছাত্ররা যতটা বেপরোয়া, উন্নত জীবনযাপনের ধান্দায় শিক্ষকরাও ততটা বৈষয়িক। এর ফলে ছাত্র–শিক্ষক সম্পর্কের মধ্যে ব্যবধান ক্রমশ বাড়ছে, শিক্ষাঙ্গনে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। ক্ষমতায় যাওয়া ও ক্ষমতা পেয়ে তা আঁকড়ে থাকার রাজনীতি ছাত্রসমাজ ও শিক্ষকসমাজের মধ্যে দুষ্ট প্রভাব ফেলেছে, তারই ফলে দেশের শিক্ষাক্ষেত্রগুলো যেন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এতে শিক্ষার মানের যেমন চরম অবনতি প্রতিনিয়ত ফুটে উঠছে, সে রায়গঞ্জ কলেজ হোক, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় হোক বা রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় হোক, তেমনই শিক্ষা এবং বিশেষত ছাত্র–শিক্ষক সম্বন্ধে সমাজের মধ্যে একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হচ্ছে। মানুষ বস্তুগত অগ্রগতি যত বেশি লাভ করেছে, নিত্য নতুন কামনা–বাসনার সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন সমস্যা ও জটিলতা এবং নৈরাশ্য ও বঞ্চনার হাহাকার মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে।

অপ্রিয় হলেও বাস্তব যে বর্তমানে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত সভ্য সমাজেই প্রতিনিয়ত বিভিন্ন অপরাধের হার বেড়েই চলেছে। এর মূল কারণ প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা অনেকাংশে ভারতীয় সংস্কৃতির দ্বারা সমৃদ্ধ নয়। আমরা ছিন্ন বস্ত্র ও জীর্ণ আসবাবপত্রের জন্য লজ্জাবোধ করি, কিন্তু পঙ্গু দর্শনচিন্তা আর বিকৃত রুচিবোধের জন্য কখনও লজ্জাবোধ করি না। এক্ষেত্রে আমাদের অধিক লজ্জা হওয়া উচিৎ।

বর্তমানে শিক্ষার মূল্যায়নের পদ্ধতি এমন যে সব পর্যায়ে মুখস্ত বিদ্যার দিকে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত শিক্ষা গুরুত্ব পাছে না, কারণ পাঠ্যসূচীকে এমন ভাবে গঠন করা হয়েছে গৎবাঁধা মুখস্ত না করলে কোনও ভাবেই ভালো ফলাফল করা সম্ভব নয়। জীবিকার জন্য সার্টিফিকেট–এর প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু সুস্থ জীবন ধারণের জন্য সুস্থ জীবনদর্শন একান্ত আবশ্যক। সেই দর্শন যা শাস্ত্র থেকে নিঃসৃত হয়ে, ভারতীয় ঐতিহ্যের উপর ভর করে জীবনবোধ ও চিন্তা চেতনাকে সম্পৃক্ত করে তাকে অপাঙতেয় করে রাখা হয়েছে। নৈতিক মূল্যবোধ বর্জিত শিক্ষা পদ্ধতিতে মানুষ যতই উচ্চশিক্ষিত হোক অনৈতিক কাজ করতে সে দ্বিধা করবে না।

শিক্ষার সার্বিক মান উন্নয়নের জন্য শুধু কমিশনের উপর কমিশন কিংবা নতুন নতুন সিলেবাস প্রণয়ন করলেই শিক্ষার মূল উদ্যেশ্য হাসিল হবে না যদি না এগুলোর পাশাপাশি বিশেষ বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ নেওয়া হয়। আবার গত কয়েক বছর ধরে পাবলিক পরীক্ষাগুলোর প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি একপ্রকার স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। এই প্রসঙ্গে শাস্ত্রের সেই লাইনটি– ‘সা বিদ্যা যা বিমুক্তয়ে’ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। শিক্ষা এমন হবে যা আমাদের চারিত্রিক দৈন্যতা, মানসিক দুর্বলতা বা সামাজিক কুপ্রভাব থেকে মুক্ত করবে। শিক্ষাই একমাত্র উপাদান যা মানুষকে পরিপূর্ণ ভাবে সুন্দর করতে পারে, প্রকৃত শিক্ষার দ্বারাই সম্ভব হয় নব প্রজন্মের মধ্যে সংস্কৃতি বোধ জাগিয়ে তোলা এবং শৃঙ্খলার বীজ রোপন করা।

সংস্কৃতিহীন শিক্ষাব্যবস্থার ফল কী হতে পারে আশেপাশে প্রতিনিয়ত আমরা দেখতে পাই, যে সব ছেলে–মেয়ে বিদ্যালয় বা মহাবিদ্যালয় থেকে সসম্মানে বিভিন্ন ডিগ্রি নিয়ে বেরিয়ে আসছে, তাদের অনেকের মধ্যেই বিনয়ের পরিবর্তে অহংকার, আত্ম আস্ফালন ও উদ্ধত আচরণ বিশেষ করে চোখে পড়ে। ওই মানুষগুলো শিক্ষাদীক্ষায় উন্নত, চিকিৎসা, বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্যে ওরা এগিয়ে, কিন্তু যে কোনও স্বার্থপূরণের জন্য কেন ওরা বাঁকা পথ অবলম্বন করেন, তা আজও পৃথিবীর কোনও সমাজবিজ্ঞানী তার সঠিক উত্তর দিতে পারেনি।

সাহিত্যিক এবং নাট্যকাররা বলে গেছেন– আমি ব্যথিত হই না মানুষের মৃত্যুতে, ব্যথিত হই মনুষ্যত্বের মরণ দেখে। মনুষ্যত্ব ধ্বংসের অন্যতম কারণ পাঠ্যক্রমের মধ্যে ভারতীয় সংস্কৃতির ভূমিকাকে গৌণ করে রাখা। সমাজের দিকে তাকালেই আমরা দেখতে পাই বিচ্ছিন্নতাবাদ, সন্ত্রাসবাদীদের তাণ্ডবনৃত্য, নারী নির্যাতন অপহরণ, খুন, ধর্ষণ–– এগুলো এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা, এগুলো এখন মানুষের মনে আলোড়ন সৃষ্টি করে না। চোখ থেকেও অন্ধ, যদিও কান আছে শুনতে পায় না, প্রতিবাদের ভাষাও ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলেছে। আসলে আজকের মানুষ বাকরুদ্ধ এবং সবদিক দিয়ে উদভ্রান্ত ও দিশাহারা, সর্বত্রই একটা অস্থিরতা, অশান্তি। অথচ জীবনযুদ্ধে অবিরত সংগ্রামী মানুষের চাওয়া পাওয়ার শেষ লক্ষ্য হচ্ছে এমন একটা আশ্রয় যেখানে থাকবে না কোনও দ্বন্দ্ব, সংঘাত বা কোনও ভেদাভেদ, শুধু থাকবে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা। তাই মহাজ্ঞানীদের শিক্ষাদর্শনকে আঁকড়ে ধরে চলা আজ আমাদের বড় বেশি প্রয়োজন।

জাতিকে ক্রমবর্ধমান বিপদের হাত থেকে, বিশেষ করে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে ভারতীয় সংস্কৃতির আধারে উন্নত শিক্ষার ব্যবস্থা করে তাদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে সুন্দর ও সমৃদ্ধশালী পশ্চিমবঙ্গ উপহার দিতে পারব। আর তার জন্যই বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান সমস্যাগুলো নির্বাচন করে ভারতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তার সমাধানের সঠিক পথ খুঁজতে হবে আমাদের এবং সরকারকে সেই অনুযায়ী কাজ করতে হবে ও সচেতন হতে হবে। আর তা নাহলে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে রক্তপাত, ছাত্রভর্তিতে তোলাবাজি বা রাজনীতির নেতাদের হাতে মহাবিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অধ্যাপিকাদের মানসিক নিগ্রহ ও শারীরিক পীড়ন চলতেই থাকবে।

আমরা সেই শিক্ষার কথা কি ভাবতে পারি না, যে শিক্ষা সার্থক পথের দিশা দেখাবে, ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সুপ্ত সুকুমার প্রবৃত্তি জাগিয়ে তুলবে ও সৃষ্টিশীল কাজে চালিত করবে? শিক্ষা মানুষে মানুষে শ্রদ্ধা, ভক্তি, প্রেম ও ভালোবাসার কথা বলে; এক সম্প্রদায়ের প্রতি অন্য সম্প্রদায়ের প্রীতির বন্ধন অটুট করে। বিশ্ববিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়গুলিতে দুর্বল প্রশাসন এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতি অদ্ভুত অনীহা, সর্বোপরি প্রশাসনিক কর্তাদের শিক্ষাব্যবস্থা সম্বন্ধে সম্যক ধারণার অভাব বর্তমান শিক্ষাকে পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দিয়েছে, এর ফলে শিক্ষাক্ষেত্রগুলিতে স্থান করে নিয়েছে স্বজনপোষণ ও রেষারেষি। রায়গঞ্জ, গৌড়বঙ্গ, যাদবপুর, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়গুলি সেই দগদগে ক্ষতের চিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছে। কবি নজরুল ইসলামের ভাষায় বলতে হয়, ”আমি প্রেম পেতে এসেছিলাম। সে প্রেম পেলাম না বলে আমি এই নীরস প্রেমহীন পৃথিবী থেকে নীরব অভিমানে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলাম।” এই প্রেমহীন নীরস পৃথিবীতে মানুষের প্রতি মানুষের সম্প্রদায়ের প্রতি সম্প্রদায়ের এবং বিভিন্ন ধর্মালম্বীর মধ্যে সেইদিন প্রেমের বন্যা বয়ে যাবে, যেদিন সুস্থ সংস্কৃতির আবহে শিক্ষা পরিচালিত হবে, আর তা যদি আমরা না করতে পারি তাহলে মানুষ থাকবে মনুষ্যত্ব থাকবে না, অর্থ থাকবে শান্তি থাকবে না।

লেখক ভারত সরকারের পারমাণবিক শক্তি দফতরের বিজ্ঞানী

Comments are closed.