শিক্ষাক্ষেত্রে গেরুয়াবাহিনীর চোরাগোপ্তা আক্রমণ ছিলই, এবার তা এল প্রকাশ্যেও

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপম চট্টোপাধ্যায়

    দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের ওপর অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের হামলার অভিযোগ ক্রমশ ব্যাপ্তি পাচ্ছে। অন্ধকারে মুখ ঢেকে পরিকল্পিত এই আক্রমণের পিছনে প্রশাসনিক মদতের অভিযোগও উঠেছে। ছাত্রছাত্রীরাই শুধু আক্রান্ত হননি, আক্রান্ত হয়েছেন তাঁদের চিকিৎসা দিতে যাওয়া চিকিৎসক এবং নার্সরাও। তবে এই আক্রমণ নতুন কিছু নয়। বাম ও যুক্তিবাদী ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে আরএসএস-বিজেপির আক্রমণ অনেকদিন ধরেই চলছে। এবারের হামলা প্রকাশ্য গুন্ডামির চেহারা নেওয়ায় শোরগোলটা অনেক বেশি পড়ে গিয়েছে।

    কেন্দ্রে বিজেপি সরকার গঠিত হওয়ার পর রাজনৈতিক ক্ষমতাবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের দিকটিও ক্রমশ প্রবল হচ্ছিল। এরই অংশ হিসেবে শিক্ষায় গৈরিকীকরণ কর্মসূচি আরও গভীরতা পায়। দু’ভাবে এই আক্রমণের ছক তৈরি করা হয়েছে। একদিকে, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জায়গাগুলিতে আর্থিক বরাদ্দ কমিয়ে আনা, অন্যদিকে ক্যাম্পাসে প্রতিবাদীদের চিহ্নিত করে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন নামিয়ে আনা। এরই মধ্যে একটি বিশেষ সামাজিক বাতাবরণ তৈরির চেষ্টা চলেছে। সাধারণ মানুষ অনেককেই বলতে শোনা যায়, যাদবপুর থেকে জেএনইউ, এই ছাত্ররা পড়াশুনার বদলে রাজনীতি করতে বেশি পছন্দ করেন। রাষ্ট্রীয় প্রচার অনেককে ভাবতে শিখিয়েছে, সরকারের পয়সায় উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা করতে গিয়ে রাজনীতিতে, বিশেষ করে সরকার-বিরোধী অবস্থান নেওয়া অনৈতিক। এমনকি এ সব পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে নেশা করার অভিযোগ চারিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এঁদের নেশা নিয়ে যত কথা হয়, মেধা নিয়ে তত কথা হয় না। হস্টেলের ফি-বৃদ্ধি ও আর্থিক বরাদ্দ কমিয়ে স্কলারশিপ ছাঁটাই শুরু হয়ে গিয়েছে।

    বিশ্বভারতী ও শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মত কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানে গবেষকদের স্কলারশিপ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। জেএনইউতে লাইব্রেরির বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য ভাবে ছাঁটাই করা হয়েছে। বিশ্বভারতীতে এমফিল ছাত্রছাত্রীদের স্কলারশিপ না নেওয়ার মুচলেকা দিতে হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের ধারণা, উচ্চশিক্ষায় আর্থিক বরাদ্দ কমালে চাপে থাকবেন পড়ুয়ারা। অন্যদিকে, হিন্দুত্ববাদী ভাবনার মোড়কে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে মুড়ে ফেলার চেষ্টা। প্রকারান্তরে মনুবাদী ভাবনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকে চালাতে চাইছে বিজেপি এবং আরএসএস। সব রকম ভাবে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণারত ছাত্রছাত্রীদের চাপে ফেলতে তৎপর কেন্দ্রের মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক।

    তবে শুধু উচ্চশিক্ষার কেন্দ্রগুলিই নয়, তাদের নিয়ন্ত্রিত বিদ্যালয়গুলিতেও হিন্দুত্ববাদী ভাবনা ছড়িয়ে দিতে মরিয়া এই মন্ত্রক। ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়গুলিতে অতীতের ইংরেজি ও হিন্দির বদলে শুধুমাত্র হিন্দিতে সার্কুলার জারি হচ্ছে। এমনকী শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সই করতে হচ্ছে শুধুমাত্র হিন্দিতে। খোদ পশ্চিম বাংলায় কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়গুলিতেও এই কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। অনেকেই জানেন না, মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের অধীন স্কুলগুলিতে চাকরির নিরাপত্তা তুলে দেওয়া হয়েছে। আর্থিক দিক থেকে সংকটে পড়ছেন এই স্কুলগুলির শিক্ষক-শিক্ষিকারাও। দশ মাস আগে যারা অবসর নিয়েছেন, তাদের প্রাপ্য আটকে দেওয়া হয়েছে। এমনকি পেনশনের যে অংশ কমিউট (বিক্রি) করা হয়েছে, তার টাকাও পাচ্ছেন না শত শত শিক্ষক-শিক্ষিকা। মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের অধীন স্বশাসিত সংস্থাগুলির গ্রুপ ডি কর্মীদের এখন ঠিকাদারের অধীনে নিয়োগ করা হচ্ছে। ফলে যে কাজের জন্য সপ্তম বেতন কমিশনের সুপারিশমত ২৬ হাজার টাকা পাওয়ার কথা, সেই কাজ দশ হাজার টাকায় করতে বাধ্য হচ্ছেন কর্মীরা। এখানেই শেষ নয়, এই বাংলায় বেশ কয়েকটি কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ের এই কর্মীরা গত চার-পাঁচ মাস মাইনে পাচ্ছেন না। এই আর্থিক আক্রমণগুলি প্রকাশ্যে আসছে না।

    আমাদের দেশে যারা রাজনৈতিক নেতা-কর্মী বলে পরিচিত, তারা আসলে দল করেন। রাজনীতি বোঝার দায় তাদের নেই। ফলে সরকার তলে তলে কতটা আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে, তা এদের বোধের বাইরে। জেএনইউ থেকে যাদবপুর, এই প্রতিষ্ঠানের পড়ুয়া ও শিক্ষকদের এক বড় অংশের মধ্যে সরকারি নীতি ও তার প্রয়োগ নিয়ে চর্চার ঐতিহ্য আছে। যে বিষয়টিকে সরকার বিপজ্জনক মনে করে। তাই আর্থিক আক্রমণের পাশাপাশি মুখ ঢেকে শারীরিক আক্রমণে মরিয়া হয়ে পড়েছে শাসকরা। ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে খেপিয়ে তোলার কাজটা মোটামুটি একটা গতি পেয়ে গিয়েছিল।

    অনেকের মনে পড়তে পারে, কানহাইয়া কুমারকে যখন আদালতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন কালো কোটপরা গেরুয়াবাহিনী পুলিশের সামনেই কানহাইয়া কুমারকে দৈহিক নির্যাতন করেছিল। প্রতিবাদের ঝটিকাকেন্দ্র হিসেবে যাদবপুর, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়, জেএনইউ একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে চলেছে। সম্প্রতি জামিয়া মিলিয়াও তাদের প্রতিবাদের সুর চড়া করেছে। সবমিলিয়ে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি সরকারি রক্তচক্ষু অবজ্ঞা করেই প্রতিবাদে সামিল হচ্ছে। বিজেপির মত শাসকের কাছে এটা মোটেই স্বস্তিদায়ক নয়। তাই আরএসএস সরাসরি দায়িত্ব তুলে নিচ্ছে। প্রশাসনিক সহযোগিতায় মুখ ঢেকে এরাই এখন আসরে নেমে পড়েছে।

    এর আগে কালবুর্গি, গোবিন্দ পানসারে, গৌরী লঙ্কেশ প্রমুখ ব্যক্তিবিশেষের উপরে আক্রমণ সংঘটিত হয়েছে। আরবান নকশালদের চিহ্নিত করে যুক্তিপূর্ণ বিরুদ্ধবাদীদের জেলে পোরার ব্যবস্থাও হয়েছে। যার সুবাদে গ্রেপ্তার হতে হয়েছে সোমা সেন, সুধা ভরদ্বাজ, গৌতম নভালখা ও ভারভারা রাওদের। মনুবাদ ও অপবিজ্ঞান বর্তমান শাসকদের বড় হাতিয়ার। ইতিহাস, বিজ্ঞান, অর্থনীতির চর্চাকে বিজেপি-আরএসএস ভয় পায়।

    জেএনইউকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ, স্বাধীন ও স্বতন্ত্র চিন্তার চর্চাকে প্রতিহত করার দায়। এখানে শিক্ষক, পড়ুয়া-গবেষকরা বৌদ্ধিকচর্চার একটি অনুকূল বাতাবরণের ঐতিহ্য বহন করছেন। প্রতিবাদ ও স্বাধীন চিন্তা এখানে হাত ধরাধরি করে হাঁটে। এই ক্যাম্পাস থেকেই অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ভবিষ্যতের রসদ কুড়িয়েছেন। আবার একই সঙ্গে প্রতিবাদী ছাত্র হিসেবে তিহার জেলে রাত কাটিয়েছেন। কানহাইয়া কুমার থেকে ঐশী ঘোষরা এরই উত্তরাধিকার বহন করছেন। একথা গেরুয়াবাহিনী জানে। তাই বার বার আক্রান্ত ও রক্তাক্ত হচ্ছে জেএনইউ ক্যাম্পাস।

    লেখক প্রবীণ সাংবাদিক 

    মতামত লেখকের নিজস্ব 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More