অজিতেশ বন্দোপাধ্যায়; ভারতবর্ষীয় থিয়েটারে এক আশ্চর্য সাধক

১৮

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

পম্পা দেব

‘কে রবে পরবাসে ? ‘ মায়ামন্দ্র , ব্যারিটোন ভয়েস ভেসে আসে কোন সুদূরের পথে। ইটকাঠপাথরের জঙ্গলে, সাইক্লোরামায় কে যেন বলে ‘রজনী চাটুজ্যে ইজ রজনী চাটুজ্যে, মরা হাতি সোয়া লাখ’। …দিলদার..?’

 

বাংলা নাট্যমঞ্চে ‘অজিতেশ বন্দোপাধ্যায় ‘ একটা মাইলফলক । ১৯৫০ থেকে ১৯৫৪ অব্দি ন’টি নাটকের নির্দেশনা , অভিনয়ে যুক্ত থেকেছেন। সাতান্ন’য় তিনি জন্ম দিলেন ‘নান্দীকার’ নাট্যদলের।

এবং এই নাট্যদল ক্রমে হয়ে উঠল কলকাতার নাট্যজগতের তীর্থভূমি । অজিতেশ বন্দোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে অসিত বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের  উদ্যোগে এই নাট্যদলটি একের পর এক মঞ্চ দাপানো নাটক মঞ্চস্থ করতে লাগল। ‘মঞ্জরী আমের মঞ্জরী ‘ ‘শের আফগান ‘,’তামাকু সেবনের অপকারিতা’,’নানা রঙের দিন’, । তাঁর ‘তিন পয়সার পালা’ বের্টোল্ট ব্রেখতের ‘থ্রি পেনিস অপেরা’ র আত্মীকরণে নির্মিত একটি অসাধারণ নাটক যা বাংলা থিয়েটারে একটি মাইলফলক।

অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়ই পরে থিয়েটারে আত্মপ্রকাশ করলেন অজিতেশ বন্দোপাধ্যায় হয়ে।  হিন্দি ও বাংলা সিনেমায় সমান্তরাল অভিনয় করেছেন অন্তত পঞ্চাশটির মতো চলচ্চিত্রে। তরুণ মজুমদার, তপন সিনহার মতো ডিরেক্টরের নির্দেশনায় কাজ করেছেন। ‘কুহেলি’ সিনেমার ‘সত্যভূষণ’ , ‘হাটে বাজারে’ সিনেমার ‘লছমনলাল’ কে ভোলে এমন সাধ্য কার আছে! যখন অভিনয় করতেন সমগ্র সত্তা দিয়ে অভিনয় করতেন। অভিনয় করার সময় চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করতে করতে মনটাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে এমনভাবে নিয়ে আসতেন, যেন অভিনেতা নয়, বরং সমাজেরই একজন প্রতিভূ হয়ে দর্শকের মুখোমুখি হচ্ছেন এবং প্রশ্নের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন দর্শককে।

অজিতেশ বন্দোপাধ্যায় সেই জাতের অভিনেতা, যিনি একই সাথে থিয়েটার, যাত্রা এবং চলচ্চিত্রে দাপিয়ে বেরিয়েছেন। এতটাই জনপ্রিয়তা ছিল তাঁর আক্ষরিক অর্থেই… আবার সাধারণ মানুষের মধ্যে নির্দ্বিধায় অনায়াসে মিশে যেতে পারতেন এবং মানুষের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি আদান প্রদান ছিল তাঁর আড্ডা বা গল্পে মজে ওঠায়। আক্ষরিক অর্থেই সুরসিক আর ভোজন-রসিক মানুষ ছিলেন অজিতেশ বন্দোপাধ্যায় । এবং অভিমানীও।

নিজের হাতে তৈরি নান্দীকার নাট্য গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত থাকাকালীন নির্মাণ করলেন ‘নাট্যকারের সন্ধানে ছয়টি চরিত্র’। মূল নাটক লুইগি পিরানদেল্লোর। এটি একটি ইতিহাস হয়ে যাওয়া নাটক। ১৯৫৪এ  ‘সংঘাত’ নামক প্রথম নিজের একটি মৌলিক নাটক লিখেছিলেন। এই প্রবাদ প্রতিম নাট্যব্যক্তিত্ব অন্তরধর্মে ছিলেন একজন কবিও। নিজের লেখালেখিতে বারবার সেই সাক্ষর রেখে গেছেন তিনি।

১৯৫৭এ গণনাট্য সংঘের সাথে যুক্ত হন, এবং পাতিপুকুর শাখার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আবার সেই সংঘ থেকে বেরিয়েও আসেন।আজীবন মনে প্রাণে একজন কমিউনিস্ট ছিলেন তিনি। বাগুইআটি বিদ্যাপীঠের ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় এরপর গণনাট্য সংঘ এবং পাতিপুকুর শ্রমিক সংঘের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি আত্মমগ্ন হলেন নিজের দল ‘নান্দীকার ‘ এ। চেকভের ‘চেরী  আর্চার্ড’  অবলম্বনে মঞ্চস্থ করলেন ‘মঞ্জরী আমের মঞ্জরী ‘ এবং ‘দ্য সওয়ান সঙ’ অবলম্বনে করলেন ‘নানা রঙের দিন ‘। ব্রেখতের ‘থ্রি পেনিস অপেরা’ র আত্মীকরণে নির্মিত ‘তিন পয়সার পালা ‘ নাটকে তাঁর অভিনীত ‘মহীম বাবু’র চরিত্র ইতিহাস হয়ে গেছে। বেতারেও অজস্র নাটক করেছেন। অর্থাৎ অভিনয়ের সবকটি মাধ্যমেই নিজেকে পরিব্যাপ্ত করে রেখেছিলেন স্বমহিমায়। তাঁর স্থানীকরণে বিদেশি নাটক হয়ে উঠত একেবারে আঞ্চলিক। নির্দেশনা , লেখালেখি,  অভিনয় ছাড়াও নাটকের গানও লিখেছেন একসময়। তাতে সুর দিয়েছেন, কথা বসিয়েছেন।

১৯৬০এর উনত্রিশে জুন যে নান্দীকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই নান্দীকার ছেড়ে বেরিয়েও এলেন একদিন, তৈরি করলেন নতুন একটি পৃথক দল ‘নান্দীমুখ’। এই দলেরই প্রযোজনা ‘পাপ পুণ্য’ নাটকটি। এটিও সেই সময়কার অন্যতম সাড়া জাগানো নাটক।

১৯৮৩ সালের তেরোই অক্টোবর মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়সে পার্থিব পৃথিবী ছেড়ে চলে যান এই প্রবাদ প্রতিম নাট্যব্যক্তিত্ব । ভুবন মোহন এবং লক্ষ্মীরাণী বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুত্র অজিতেশ বন্দোপাধ্যায়ের বাংলা তথা ভারতবর্ষের থিয়েটারে আবির্ভাব, বিস্তার, স্থিতি সবটাই গ্রথিত হয়ে থাকবে চিরকাল । শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্তের সঙ্গেই একাসনে বসে আছেন বাংলা নাটকের ‘দিলদার’ অজিতেশ বন্দোপাধ্যায়।

( লেখিকা পেশায় নাট্যকর্মী, ‘ব্রাত্যজন’এর সদস্য)

 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More