পরিবেশের সংকট: এই সময়

এই মুহূর্তে করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে সারা বিশ্ব উদ্বিগ্ন। সেইসঙ্গে উঠে আসছে পরিবেশ দূষণ ও তার মুক্তির কথাও। এইসব নিয়েই লিখলেন বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ও পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের চেয়ারম্যান কল্যাণ রুদ্র।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    কল্যাণ রুদ্র

    গৃহবন্দি অবস্থায় এই নিবন্ধটি যখন (২৩ মার্চ ২০২০) লিখতে বসেছি তখন পৃথিবী এক গভীর সংকটের মুখোমুখি; করোনাভাইরাসের দাপটে পৃথিবীর উন্নত দেশগুলিকেও অসহায় লাগছে। ২২ জানুয়ারি চিন থেকে শুরু হয়ে এ পর্যন্ত ১৮৬টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে; আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল ক্রমশ দীর্ঘতর হচ্ছে, আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাইরাসের কাছে গোটা বিশ্বকে এতটাই বিপন্ন লাগছে যা আগে কোনওদিন দেখা যায়নি। পৃথিবীর বহু শহরের মানুষ কার্যত বন্দি। বিশ্ব অর্থনীতি ক্রমশ নিম্নগামী, বিজ্ঞানের অগ্রগতির ধ্বজা যেন লজ্জায় অর্ধনমিত। সংশয়ীরা বলছেন, এই ‘কোভিড ১৯’ প্রাকৃতিক নয়, পরীক্ষাগারে তৈরি করা একটি বংশাণু পরিবর্তিত বা ‘জেনেটিকালি মডিফায়েড’ জৈব-মারণাস্ত্র। হয়তো কোনও এক অসতর্ক মুহূর্তে বেরিয়ে এসে স্রষ্টাকেই ধ্বংস করে দিতে উদ্যত। যদি এই অনুমান সত্য হয় তাহলে বুঝতে হবে, আজ হোক বা কাল, এই সভ্যতার ধ্বংস অনিবার্য। এই গভীর সংকটের ইতিবাচক দিক হল অবরুদ্ধ শহরগুলিতে দূষিত বাতাস এখন আবার নিরাপদ, বহমান নদীর জল তার গুণগত মান ফিরে পাচ্ছে, ইতালির উপকূলে আবার ডলফিন খেলা করছে, শহরের শব্দদানব এখন বোতলবন্দি, পাখিরা ফিরে আসছে। এককথায়, আমরা প্রকৃতির কাছ থেকে যা কেড়ে নিয়েছি এবার যেন তা ফেরত দেওয়ার সময় এসেছে। ‘সংযত হও, অন্য প্রজাতিদের তাদের বাস্তুসংস্থানতন্ত্র ফিরিয়ে দাও’— এটাই এই সংকটের শিক্ষা।

    সংকটের সূচনা  

    উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি কিন্তু ১৯৫০-এর দশক থেকে দেখা যাচ্ছে যে পৃথিবীর পরিবেশ খুব দ্রুত বদলাচ্ছে। যে চারটে মূল উপাদান অর্থাৎ মাটি, জল, বাতাস আর ভূ-জীববৈচিত্র্য নিয়ে আমাদের বাস্তুসংস্থানতন্ত্র; তার ওপর একটা বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। শুরু হয়েছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষে, যখন ইংলন্ডে শিল্পবিপ্লবের পর কয়লা, খনিজ তেল, ইস্পাত, সিমেন্ট ইত্যাদির যথেচ্ছ ব্যবহারে বদলে গেল পৃথিবীর শিল্প-মানচিত্র। পরিবেশবান্ধব ছোট শিল্পগুলিকে হারিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াল বড় বড় শিল্প। কয়লার ইঞ্জিন দিয়ে টানা রেলগাড়ি ছুটল এক শহর থেকে অন্য শহরে। শাল গাছের জঙ্গল সাফ করে যোগান দেওয়া হল রেল লাইনের স্লিপার। একদল প্রকৌশলীদের ধারণা হল যে আমরা পৃথিবীর সব কিছু বদলাতে পারি! এই বদলানোটা প্রাথমিকভাবে কিছু সুফল দিয়েছে। মানুষের জীবনযাত্রার গুণগত মানের কিছু কিছু উন্নতি হতে আরম্ভ করল। ১৯৬১ সালের তুলনায় পৃথিবীর মাথাপিছু খাদ্যের যোগান ৩০% বেড়েছে কিন্তু একই সঙ্গে কৃষিজমিতে নাইট্রোজেনের প্রয়োগ বেড়েছে ৮০০% আর সেচের জলের চাহিদা বেড়েছে ১০০%। কিন্তু পরিবেশের ভারসাম্যের কথা কেউ ভাবেননি। প্রায় দুই শতাব্দী পর ১৯৭২ সালে স্টকহোম বসুন্ধরা সন্মেলনে পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা প্রথম বললেন— কারখানার চিমনি থেকে নির্গত ধোঁয়া দূষিত করছে বাতাস, অপরিশোধিত নোংরা জল বিষিয়ে দিচ্ছে নদীর জল এবং যত্রতত্র ফেলে দেওয়া কঠিন বর্জ্য জনস্বাস্থ্যের পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। আমরা অনুভব করলাম; আমাদের নিশ্বাসের বাতাস ও পানীয় জল দূষিত হচ্ছে এবং ভূ-জীববৈচিত্র্য আস্তে আস্তে ক্ষতিগ্রস্ত হতে আরম্ভ করছে। ফলে এককথায় বলতে গেলে— বাস্তুতন্ত্রের সব উপাদান আস্তে আস্তে তাদের কার্যকারিতা হারাচ্ছে!

    পৃথিবীর স্থলভাগ থেকে আমরা যে বাস্তুসংস্থানতান্ত্রিক পরিষেবা গ্রহণ করে বেঁচে আছি তার বাজার মূল্য প্রায় ৫৬×১০১৪ অর্থাৎ ৫৬ কোটি কোটি টাকা, যা পৃথিবীর মোট বাৎসরিক উৎপাদিত দ্রব্যমূল্যের সমান। আর নদী-সাগর আমাদের যে পরিষেবা দেয় তার মূল্য আরও ২৮×১০১৪ টাকা। বিজ্ঞানীরা বলছেন গত ৫০-৬০ বছরে এই বাস্তুসংস্থানতন্ত্রের যে অবক্ষয় ঘটেছে তা পৃথিবীর গত ৮ লক্ষ বছরের ইতিহাসে কখনও ঘটেনি!

    ভূ-উষ্ণায়নের নানা প্রভাব

    এই শতাব্দী সম্ভবত পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণতম শতাব্দী হতে যাচ্ছে! ১৯৬৭ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে উত্তর মেরুপ্রদেশের প্রায় ২৫ লক্ষ বর্গকিলোমিটার এলাকা থেকে তুষারের আবরণ গলে গেছে। ১৮৫০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে সাগরের জলের উষ্ণতা ০.৮৭ সেন্টিগ্রেড বেড়েছে। ১৯০০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে স্থলভাগের উষ্ণতা বেড়েছে ১.৪১ সেন্টিগ্রেড। ১৮৫০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত জল-স্থল মিলিয়ে পৃথিবীর গড় উষ্ণতা প্রায় ১ সেন্টিগ্রেড বেড়েছে। ‘ইন্টার গভর্মেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’-এর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আর ০.৫ সেন্টিগ্রেড বাড়লেই সমূহ বিপদ। পৃথিবীর বাতাসে এই মাত্রাতিরিক্ত গ্রিনহাউস গ্যাস শুধু শিল্পাঞ্চল ও যানবাহন থেকে মিশছে এমন নয়, এই ক্ষতিকর গ্যাসের এক-চতুর্থাংশ ভূমিভাগ থেকেই বাতাসে মেশে। কার্বন ডাইঅক্সাইড মেশে বন কেটে ফেলার ফলে, মিথেন আসে ধানজমি আর আমাদের ফেলে দেওয়া পচনশীল বর্জ্য থেকে, নাইট্রাস অক্সাইড মেশে রাসায়নিক সার থেকে। পৃথিবীর ৪৬% ভূমি শুষ্ক যেখানে বাস করেন প্রায় ৩০০ কোটি মানুষ আর ২০০ কোটি মানুষের বাস উপকূলে এবং প্রায় ৮০ কোটি মানুষ থাকেন মেরুপ্রদেশে বা পার্বত্য অঞ্চলে। ভূ-উষ্ণায়নের প্রভাবে সারা পৃথিবী বিপন্ন হলে তবে এই তিনটি এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হবে সর্বাধিক। আই পি সি সি-র সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, আগামী কয়েক দশকে শুখা এলাকায় বৃষ্টি কমবে এবং আর্দ্র এলাকায় বৃষ্টি বাড়বে। সাগর এগিয়ে আসবে উপকূলের দিকে।

    দেখা যাচ্ছে যে শিল্পবিপ্লব বা তারপর— অষ্টাদশ শতাব্দীর পর থেকে যত কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO2) বাতাসে মিশেছে তার ৪০ শতাংশ মিশেছে গত পাঁচ বা চার দশকে! দ্রুত পৃথিবীর আবহাওয়া বদলে যাচ্ছে। আমাদের পৃথিবীর যে তিন ভাগ সমুদ্র! বিজ্ঞানীরা বলছেন, ১৮৫০ সালের তুলনায় এই শতাব্দীর শেষাশেষি পৃথিবী অন্তত ৩সেন্টিগ্রেড উষ্ণ হয়ে উঠবে! উত্তরমেরু অঞ্চলে ও হিমালয়ের অঞ্চলে যে বরফ জমে আছে তা প্রায় ৪ শতাংশ হারে প্রতিবছর গলে যাচ্ছে! অনেকের আশঙ্কা, এই শতাব্দীর মাঝামাঝি উত্তরমেরু অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে আর কোনও বরফই দেখা যাবে না। ২০১৯ সালের জুন মাসে ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধ থেকে জানা গেছে, ২০০০-২০১৬ সালের মধ্যে হিমালয়ের হিমবাহগুলি ওপর দিক থেকে অন্তত ৪৫ সেন্টিমিটার গলে গেছে, যা পূর্ববর্তী কয়েক বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। প্রতিবছর শীতকালে হিমালয়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চল তুষারের আবরণে ঢেকে যায়; মার্চ মাসের শেষ থেকে ওই তুষারগলা জল গঙ্গা ও তার উপনদীদের বাঁচিয়ে রাখে। উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে তুষার-হিমবাহ এই হারে গলতে থাকলে প্রথম কয়েক বছর নদীতে জল বাড়বে এবং পরে কমে যাবে। প্রথমে উপনদী ও পরে বড় নদীও শুকিয়ে যাবে। আমাদের গঙ্গা বহমান থাকবে শুধু বর্ষাকালে। গত এক শতাব্দীতে হিসেবে দেখা যাচ্ছে যে পৃথিবীর সমুদ্রতল প্রায় ১৯ সেন্টিমিটার উঁচুতে উঠেছে— প্রতিবছর ১.৭ থেকে ২ মিলিমিটার হারে। কিন্তু এখন সমুদ্রের জলস্তর বাড়ছে প্রতি বছর ৩.৬ মিলিমিটার হারে। গত এক শতাব্দীতে আমাদের সুন্দরবন উপকূলে অন্তত ৪২০ বর্গ কিলোমিটার ভূমি ক্ষয়ে গেছে। আর গঙ্গাসাগরদ্বীপ— অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ থেকে হিসেব করে দেখা যাচ্ছে যে সমুদ্র ওখানে অন্তত ১২ কিলোমিটার এগিয়ে এসেছে। সমীক্ষায় প্রকাশ, এই শতাব্দীর শেষে বঙ্গোপসাগর আরও অন্তত ৫২ সেন্টিমিটার ফুলে উঠে সুন্দরবনকে আরও অনেকটা গ্রাস করবে।

    কৃষিক্ষেত্রে রাসায়নিক উপাদান ও পরিবেশের অবক্ষয়

    ১৯৬০-এর দশক থেকে ভারতের চিরায়ত জৈবকৃষি ধীরে ধীরে বদলে গেল। প্রথম সবুজ-বিপ্লব ছিল উচ্চ ফলনশীল বীজ, রাসায়নিক সার, কীটনাশক, বড় জলাধার-খালের নেটওয়ার্ক, মাটির নীচে থেকে জল তোলার প্রকৌশল ইত্যাদি মিলে একটি প্যাকেজ। উল্লেখ্য, ১৯৫০-৫১ সাল থেকে ২০১৭-১৮ সালের মধ্যে ভারতে খাদ্য শস্যের উৎপাদন ধীরে ধীরে পাঁচ কোটি টন থেকে ২৮ কোটি টন অতিক্রম করেছে। ওই সময় ভারতে সেচ-সেবিত এলাকার ব্যাপ্তি ২.২ হেক্টর থেকে বেড়ে ১০ কোটি হেক্টর অতিক্রম করেছে। এই সেচব্যবস্থার অন্তত ৫০ শতাংশ মাটির নীচের জলের ওপর নির্ভর করে। ভারতে কৃষিজমিতে প্রতিবছর (২০১৭-১৮) ৫.৩০ কোটি মেট্রিক টন রাসায়নিক সার ও ৫৯,৬৭০ মেট্রিক টন কীটনাশক ব্যবহৃত হচ্ছে। ভারতে মোট কৃষিজমির পরিমাণ প্রায় ১৪ কোটি হেক্টর। অর্থাৎ ভারতীয় ভূখণ্ডের ৪৩ শতাংশ এলাকা কৃষিকাজে ব্যবহৃত হয়। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির কৃতিত্ব কতটা সেচ ব্যবস্থার বা কৃষিজমির আয়ের আর কতটা উচ্চফলনশীল বীজ, রাসায়নিক সার বা কীটনাশকের সে প্রশ্নের সঠিক উত্তর আজও পাওয়া যায়নি। জানা যায়নি ভূ-জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির পরিমাণ। উল্লেখ্য, ১৯৬০-এর দশক থেকে হেক্টর প্রতি উপাদান ৫২২ কিলোগ্রাম থেকে বেড়ে ২০০০ কিলোগ্রাম হয়েছে। কিন্তু কৃষিক্ষেত্রে এই যথেচ্ছ রাসায়নিক উপাদান প্রয়োগের আঘাত লেগেছে ভূ-জীববৈচিত্র্যে। কৃষিক্ষেত্রে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে কেঁচো, প্রজাপতি, মৌমাছি হারিয়ে যাচ্ছে। আইনস্টাইন একবার বলেছিলেন যে পৃথিবী থেকে কোনওদিন যদি মৌমাছি লুপ্ত হয় তাহলে জানবে যে সভ্যতার আয়ুষ্কাল আর কয়েক বছর মাত্র! কারণ, পরাগমিলন ব্যাহত হলে বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হয়ে যাবে। সেই অবস্থাটার দিকেই আমরা আস্তে আস্তে চলেছি। যে হরিয়ানা ও পঞ্জাবকে বলা হয়েছিল ভারতের শস্যভাণ্ডার সেখানে এখন ঘরে ঘরে ক্যানসার। এমন অবস্থায় ভারত সরকারের ২০১০ সালের বাজেটে পূর্ব ভারতের ৬টি রাজ্যে দ্বিতীয় বা চিরসবুজ বিপ্লবের প্রস্তাব করা হয়েছিল। প্রাথমিক ভাবে বরাদ্দ করা হয়েছিল ৪০০ কোটি টাকা। সরকার ঘোষণা করেছিল— পৃথিবীর ১৭ জনসংখ্যার বাসভূমি এবং তিন শতাংশ কৃষিজমির দেশ ভারতে আরও আরও একটি কৃষিবিপ্লব প্রয়োজন। শুধু খাদ্যসুরক্ষার জন্য নয়, আমাদের শস্য রপ্তানি বাণিজ্যেও অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। উত্তর-পশ্চিম ভারতের কৃষিক্ষেত্রে মাটির নীচের জলভাণ্ডার ক্রমশ নিম্নমুখী এবং জমি বন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে বলেই এবার নজর পড়েছে নিম্ন গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার দিকে। বলা হচ্ছে বংশাণু পরিবর্তিত বা ‘জেনেটিকালি মডিফাইড’ বীজ ব্যাবহার করে উৎপাদন বাড়াতে হবে। ভয় এখানেই; আমাদের দেশজ বীজগুলি চিরতরে হারিয়ে যাবে। তখন আমাদের কৃষিব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করবে কয়েকটি বহুজাতিক সংস্থা।

    প্রতিদিন আমাদের বনাঞ্চল সঙ্কুচিত হচ্ছে। আমাজানের জঙ্গলে আগুন লেগেছিল না লাগানো হয়েছিল, সেই সংশয় আজও থেকে গেছে। ২০১৯-২০ সালে ব্রাজিল ও অস্ট্রেলিয়ায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রায় দুই লক্ষ বর্গকিলোমিটার বনাঞ্চল ও চারণভূমি ধ্বংস হয়েছে। কত প্রাণী মারা গেছে তার কোনও হিসেব নেই। যে বনাঞ্চল আমাদের অক্সিজেন দিয়ে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে তা আমাদের জন্যই হারিয়ে যাচ্ছে। ২০১৮ সালে পৃথিবীর প্রায় ১.২২ লক্ষ বর্গকিলোমিটার বনাঞ্চল শেষ হয়ে গেছে। এখন পৃথিবীতে যত চারণভূমি আছে তার ১/৩ অংশ, যত কৃষিজমি আছে তার ১/৪ অংশ এবং যত বনাঞ্চল আছে তার ১/৪ অংশ তাদের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে এবং ওই অঞ্চলগুলি থেকে আমরা যে বাস্তুসংস্থানতান্ত্রিক পরিষেবা পেতাম তার মূল্য প্রায় ১৯.৫০ লক্ষ কোটি টাকা।

    বায়ু দূষণ

    জলের অন্য নাম জীবন হলেও আমাদের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদান হল বায়ু। জল বিনা একজন মানুষ কয়েক দিন বেঁচে থাকতে পারে কিন্তু অক্সিজেন ছাড়া আমরা কয়েক সেকেন্ডের বেশি বেঁচে থাকতে পারব না। একজন সুস্থ মানুষ একবার নিশ্বাসের সঙ্গে ৬৫০ মিলিলিটার বায়ু গ্রহণ করে এবং প্রতি মিনিটে নিশ্বাস ও প্রশ্বাসের ২০টি চক্র সম্পূর্ণ করে। একজন মানুষের ৭০ বছর বাঁচার জন্য ৪৭৮২৯৬ ঘনমিটার বায়ু গ্রহণের প্রয়োজন হয়। ভূপৃষ্ঠকে ঘিরে আছে নাইট্রোজেন (৭৮%), অক্সিজেন (২১%), ওজোন, কার্বনডাইঅক্সাইড, জেনন, নিয়ন, হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, ক্রিপ্টন, জলীয় বাষ্প ও ভাসমান ধূলিকণার এক স্তর। নির্মল বায়ুস্তরে এইসব উপাদানের পরিমাণের এক ভারসাম্য থাকে। কিন্তু আমাদের পারিপার্শ্বিকের মুক্ত ও বহমান বায়ুতে ভাসমান ধূলিকণা, সালফার ডাইঅক্সাইড, নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, ওজোন, সীসা, অ্যামোনিয়া, বেঞ্জিন, আর্সেনিক ও নিকেল ইত্যাদির মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি জনস্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর।

    সারণি-১

    কয়েকটি দূষকের প্রভাব

    দূষক মানুষের ওপর প্রভাব পরিবেশের ওপর প্রভাব
    সালফার ডাইঅক্সাইড, শ্বাসকষ্ট, হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের সমস্যা, দৃষ্টিহীনতা অম্লবৃষ্টি
    নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড ফুসফুসের সমস্যা, শ্বাসনালীতে সংক্রমণ ট্রপোস্ফিয়ারে ওজোন তৈরিতে সাহায্য
    ধূলিকণা শ্বাসকষ্ট, যকৃতের সমস্যা, হৃদরোগ, হাড়ের সমস্যা দৃশ্যমানতা হ্রাস
    কার্বন মনোক্সাইড দেহে অক্সিজেনের ঘাটতি জলবায়ু পরিবর্তন
    ওজোন শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস বাস্তুতন্ত্রে নানা ক্ষতি

     

    সারা ভারতেই বায়ু দূষণের একটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হল শীতকালে উত্তাপ হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে ভাসমান দূষকরা ভূপৃষ্ঠের কাছে নেমে আসে এবং কলকাতা, দিল্লি ইত্যাদি দেশের ১২২টি শহরে বাতাস নিশ্বাস নেওয়ার যোগ্য থাকে না। গ্রীষ্মে উত্তাপ বাড়লে ভাসমান ধুলিকণা আবার ওপরে উঠে যায়; আর বৃষ্টি নামলে বাতাস আবার দূষণমুক্ত হয়। শুধু উত্তাপ নয়, বাতাসের গতিবেগও দূষণকে প্রভাবিত করে। এই কারণেই শীতকালে বাতাসের গতিবেগ কমে গেলে দূষণ বেড়ে যায়। আবার আকাশ মেঘাছন্ন থাকলেও দূষণের আধিক্য দেখা যায়। কলকাতায় ৮টি স্থানে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের সাহায্যে প্রতিমুহূর্তে বাতাসের দূষণ মাপা হয়। এছাড়া আরও ১৭টি স্থানে পর্যায়ক্রমে সপ্তাহে দু’দিন করে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। কলকাতা ও হাওড়া-সহ সারা রাজ্যেই ভাসমান ধূলিকণাই মূল সমস্যা।  অপেক্ষাকৃত বড় আকৃতির ধূলিকণা হল পিএম ১০, যার ব্যাস ১০ মাইক্রোমিটার বা তার কম, যারা নিশ্বাসের সঙ্গে নাকে বা মুখে প্রবেশ করলেও ফুসফুস পর্যন্ত প্রবেশ করতে পারে না। উল্লেখ্য যে, এই ধরনের কণার মানবদেহের পক্ষে নিরাপদ গড় দৈনিক মাত্রা হল ১০০ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটারে। অপেক্ষাকৃত সূক্ষ্ম ধূলিকণা (পিএম ২.৫), যাদের ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটার বা তার কম, তারা সরাসরি ফুসফুস পর্যন্ত প্রবেশ করতে পারে। একবার এরা ফুসফুস পর্যন্ত প্রবেশ করতে পারলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনও প্রকৌশলের সাহায্যেই তাকে বের করা যায় না। এই অতি সূক্ষ্ম ধূলিকণার নিরাপদ দৈনিক মাত্রা হল ৬০ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটারে। শীতকালে এই ধূলিকণার পরিমাণ নির্ধারিত মাত্রার প্রায় তিন গুণ বেশি থাকে। সারা রাজ্যেই এই একই চিত্র দেখা যায়।

    ২০১৩-২০১৮ সালে কলকাতার বাতাসে দূষণের কারণ অনুসন্ধান করে ন্যাশনাল এনভিরনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, শহরের বাতাস নয়টি মূল উৎস থেকে দূষিত হয় (চিত্র দেখুন)। লক্ষণীয়, মূলত পথ (৫৮%) ও গৃহস্থালি (১৩%) থেকেই পিএম ১০ বাতাসে মেশে আর পিএম ২.৫-এর মূল উৎসগুলি হল পথ (২৫%),গৃহস্থালি (২৮%) ও পরিবহণ (২৩%)।

    কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ বিভিন্ন শহরে এয়ার কোয়ালিটি ইন্ডেক্স বা সূচক হিসেব করে। কলকাতা, দিল্লি, চেন্নাই ও মুম্বই-এর সূচক তুলনা করলে দেখা যায়, আমাদের দেশের প্রশাসনিক রাজধানী দিল্লিতে দূষণ সর্বাধিক (চিত্র ৪ দেখুন)।

     

    কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের বাতাসের গুণগত মানের উন্নতির জন্য সম্প্রতি নানা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সেই ব্যবস্থাগুলি হল—

    • জনপরিবহণে বৈদ্যুতিক বাস চালু করা হয়েছে। ডিজেল চালিত যানবাহনের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমানো হচ্ছে।
    • আশা করা যায় আগামী এক বছরের মধ্যে পাইপ লাইনের মাধ্যমে কম্প্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস বা সি এন জি কলকাতায় এসে যাবে।
    • শহরের সব অটো এখন লিকুইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস-এ চলছে।
    • আরও ছয়টি স্থানে বায়ুর গুণমান পর্যবেক্ষণ ও তথ্য প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
    • অপেক্ষাকৃত চওড়া রাস্তাগুলিতে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ধুলো পরিষ্কার করা হচ্ছে।
    • খোলা স্থানে আবর্জনা এবং ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
    • সব নির্মাণস্থল ঢেকে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
    • ১৫ বছরের পুরনো সব গাড়ি শহরে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
    • কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় রাস্তা নির্মাণে ‘হট মিক্স প্ল্যান্ট’ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
    • কলকাতা ও হাওড়ায় রাস্তার ধারে সব হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলিকে জ্বালানি হিসেবে গ্যাস বা ইলেকট্রিক ওভেন ব্যবহারের জন্য পরিবেশ দপ্তর থেকে ভরতুকি দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে।
    • বাতাসে ভাসমান ধূলিকণা কমানোর জন্য ২০১৯-২০-র শীতকালের রাস্তায় জল ছেটানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ফলও পাওয়া গেছে। গত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের শীতকালের বাতাস ছিল আপেক্ষিক ভাবে অনেক ভাল।

    বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

    সারা পৃথিবীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ক্রমশ জটিল আকার নিচ্ছে। বিশ্বব্যাঙ্ক বলছে ২০২৫ সালে পৃথিবীতে প্রতিদিন ৬০ লক্ষ টন বর্জ্য তৈরি হবে আর ২১০০ সালে ওই বর্জ্যের পরিমাণ বেড়ে হবে ১১০ লক্ষ টন। কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের তথ্য অনুসারে ২০১৫ সালে ভারতে প্রতিদিন ১৪৩৪৪৯ টন বর্জ্য তৈরি হত এবং ওই পরিমাণ ক্রমশ বাড়ছে। ওই তালিকায় আছে গৃহস্থালির পচনশীল বর্জ্য ছাড়াও প্লাস্টিক, ইলেকট্রনিক বর্জ্য, হাসপাতালের বর্জ্য ও নির্মাণজনিত বর্জ্য ইত্যাদি। কিন্তু বর্জ্যকেও সম্পদে রূপান্তর করা যায়। ২০০ কিলোগ্রাম ঘরের বর্জ্য থেকে অন্তত এক সিলিন্ডার রান্নার গ্যাস তৈরি করা যায়। ব্যারাকপুর পুলিশ ট্রেনিং স্কুলে এই প্রকল্পের সফল রূপায়ণ হয়েছে। আমরা প্লাস্টিক ব্যবহার করি কিন্তু পুনর্ব্যবহার করি না। গত এক দশকে আমরা যত প্লাস্টিক ব্যবহার করেছি তা গত শতাব্দীতে ব্যবহৃত মোট প্লাস্টিকের থেকে বেশি। আমাদের ব্যবহৃত ৫০% প্লাস্টিক একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া হয়। প্রতিবছর ৮০ লক্ষ টন প্লাস্টিক সমুদ্রে চলে যাচ্ছে। কলকাতা শহর প্রতিদিন প্রায় ৪৫০০ হাজার টন করে বর্জ্য তৈরি করে, তার ১০% হচ্ছে প্লাস্টিক, যেটা মাটিতে কিছুতেই মিশতে চাইছে না। অথচ এই ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করে নানা পণ্যদ্রব্য বানানো সম্ভব, তৈরি করা যায় জ্বালানি বা আর ডি এফ। পুরনো কম্পিউটারের এক টন প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড থেকে ৩৯০ গ্রাম সোনা, ১৯০ কিলোগ্রাম তামা, ১৪৫ কিলোগ্রাম অ্যালুমিনিয়াম পাওয়া সম্ভব। সুতরাং বর্জ্য পুনর্ব্যবহার একটি জরুরি কাজ।

    দূষিত নদী

    সারা ভারতে নদী পবিত্ররূপে পূজিত হলেও বহমান জল এখন সর্বত্রই দূষিত। দিল্লির যমুনা বা আমাদের আদিগঙ্গা নালার জলের মতো দূষিত। কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ জানিয়েছে, ১১৮টি শহর থেকে বয়ে আসা ১৩৮টি নালা দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৬০৯ কোটি লিটার দূষিত জল গঙ্গায় পড়ছে। শিল্পাঞ্চল থেকে আসছে আরও ৫০ কোটি লিটার বর্জ্যজল। এই হিসেবের মধ্যে ছোট নালাগুলি নেই, ফলে বয়ে আসা নোংরা জলের পরিমাণ আরও বেশি। এই দূষিত জল প্রতিদিন গঙ্গায় ৯৯৯ টন জৈব-রাসায়নিক অক্সিজেনের চাহিদা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এছাড়া ছোট নালাগুলি কত পরিমাণ দূষিত জল নদীতে নিয়ে আসছে বা প্লাবনভূমি থেকে কী পরিমাণ দূষিত পদার্থ নদীতে চলে আসছে তার কোনও হিসেব নেই। এত দূষণ ধারণ করে গঙ্গার জল এখন স্নানের যোগ্য নয়। যদি প্রতি লিটার বহমান জলে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা পাঁচ মিলিগ্রাম হয়, জৈব-রাসায়নিক অক্সিজেনের চাহিদা প্রতি লিটার জলে সর্বোচ্চ তিন মিলিগ্রামের মধ্যে থাকে এবং কলিফর্ম ব্যাক্টেরিয়ার সংখ্যা ১০০ মিলিলিটার জলে সর্বাধিক ৫০০ হয় তবে সেই জল স্নানের যোগ্য বলে বিবেচিত হয়। গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে গঙ্গার জল হরিদ্বার থেকে ডায়মন্ড হারবারের মধ্যে কোথাও স্নানের যোগ্য নয়। দ্রবীভূত অক্সিজেন ও জৈব-রাসায়নিক অক্সিজেনের চাহিদা কোনও কোনও অংশে কাম্য মাত্রার মধ্যে থাকলেও কলিফর্ম ব্যাক্টেরিয়ার সংখ্যা অনিয়ন্ত্রিত থেকে গেছে। শুধু গঙ্গা নয়, দেশের অন্য নদীগুলির হালও একইরকম। যে মাটির নীচের জল একসময় কলেরা ও অন্যান্য জলবাহিত অসুখ থেকে মুক্তি দিয়েছিল সেই জলও এখন আর্সেনিক বা ফ্লুরাইডে দূষিত। সেচের জলের মাধ্যমে ধান, শাকসবজি ও অন্যান্য ফসলে ঢুকছে সেই বিষ। দু’টি কাজ করা জরুরি; প্রথমত, বহমান নদীর স্রোতকে নির্মল ও অবিরল রাখতে হবে, দ্বিতীয়ত, ভূগর্ভ জলের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

    ধ্বংসের পথে

    মানুষের ছড়িয়ে দেওয়া নানা দূষণের আঘাত লাগছে ভূ-জীববৈচিত্র্যে। ডব্লিউ ডব্লিউ এফ (WWF) জানাচ্ছে, ১৯৭০ থেকে ২০১০— এই ৪০ বছরের মধ্যে পৃথিবী থেকে ৫৮ শতাংশ প্রজাতি আস্তে আস্তে লুপ্ত হয়ে গেছে! তারা গবেষণা করে বলছে, সমুদ্রে এবং স্থলে যেসব প্রাণী থাকে; এই ৪০ বছরে তাদের ৩৯ শতাংশ কমেছে। সবচেয়ে বেশি কমেছে মিষ্টি জলের প্রাণী; যা প্রায় ৭৬ শতাংশ কমে গেছে।

    আমাদের বেঁচে থাকতে গেলে যে জমিটা লাগে তার একটা হিসেব যদি করা যায় তাকে বলে বাস্তব্যতান্ত্রিক পদচিহ্ন বা ‘ইকোলজিকাল ফুটপ্রিন্ট’। পৃথিবীতে এখন জনসংখ্যা ৭৫০ কোটির কিছু বেশি। এত মানুষের বেঁচে থাকতে গেলে যে পরিমাণ অক্সিজেন লাগবে, যে পরিমাণ খাদ্য লাগবে, যে পরিমাণ অন্যান্য উপকরণ লাগবে তা যোগান দিতে মাথাপিছু ১.৭০ গ্লোবাল হেক্টর জমি প্রয়োজন। ২০১২ সালে এই চাহিদা ছিল প্রায় ২.৬ গ্লোবাল হেক্টর। অর্থাৎ  ২০১২ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যাকে পরিষেবা দিতে প্রায় দেড়খানা পৃথিবী আমাদের দরকার ছিল! তাহলে বেঁচে আছি কী করে আমরা? আমাদের পৃথিবীর স্থায়ী আমানত (Natural Capital Stock) অর্থাৎ বনাঞ্চল, ভূগর্ভের জলস্তর, বায়ুর নানা উপাদান, ভূ-জীববৈচিত্র্য ইত্যাদিকে আমরা ক্রমশ ধ্বংস করে দিচ্ছি!

    এইমুহূর্তে সারা দেশের মানুষ গৃহবন্দি। বায়ুর দূষণের মাত্রা অনেক নেমে এসেছে, নদী-সাগরের জল ফিরে পাচ্ছে তার গুণমান, আকাশ আবার নীল হচ্ছে, ছেলেবেলায় দেখা তারাদের আবার দেখা যাচ্ছে, যন্ত্রদানব নিশ্চুপ তাই পাখিদের কলতান আবার শোনা যাচ্ছে; প্রকৃতি ফিরে পাচ্ছে তার ভারসাম্য। মানুষ বিপন্ন কিন্তু অন্য সব প্রাণীরা নিরাপদ।

    শেষ করি রবীন্দ্রনাথের সেই অমোঘ সতর্কবার্তা দিয়ে। ১৯৩৪ সালে ‘উপেক্ষিতা পল্লী’ লেখায় তিনি বলেছিলেন— ‘‘বর্তমানে আমরা সভ্যতার যে প্রবণতা দেখি তাতে বোঝা যায় যে, সে ক্রমশই প্রকৃতির সহজ নিয়ম পেরিয়ে বহুদূর চলে যাচ্ছে। …প্রকৃতিকে অতিক্রমণ কিছদূর পর্যন্ত সয়, তার পরে আসে বিনাশের পালা।’’

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More