শনিবার, নভেম্বর ১৬

রাজ্যের মানুষ ঠিক করে নিয়েছে, দুষ্টু গরুর বেয়াদপি আর মানবে না

জিষ্ণু বসু

নীলরতন সরকার হাসপাতালের অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ একসঙ্গে পদত্যাগ করলেন। গণ ইস্তফা দিলেন সিউড়ি সদর হাসপাতালের ৬৭ জন সরকারি ডাক্তার। উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজেও কর্মবিরতি ঘোষণা করলেন ডাক্তারবাবুরা। এদিকে রাজ্যের সব হাসপাতালে চিকিৎসা করতে আসা রোগী ও তাদের আত্মীয়স্বজনের অসহায় অবস্থা। রাজ্যের সব শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ চান যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চালু হোক চিকিৎসা পরিষেবা।
কিন্তু অপরাধীদের শাস্তি হওয়াটাও ভীষণ জরুরি। আজ যে সব সাধারণ মানুষ মুমূর্ষু রোগীদের নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কাল গুণছেন, তাঁদের দুভোর্গের জন্য দায়ী এক দল সমাজবিরোধী। স্রেফ ভোট ব্যাঙ্কের কথা ভেবে যাদের শাস্তি দিতে নিস্ক্রিয় সরকার।
গত ১০ জুন রাতে নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দু-ট্রাক ভরে দুষ্কৃতী এসেছিল। জুনিয়ার ডাক্তারদের বেধড়ক মেরে ৮৫ বছরের বৃদ্ধ মহম্মদ শাহিদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিয়েছে তারা। সেই পাশবিক অত্যাচার পুলিশ দাঁড়িয়ে দেখেছে। দেখেছে পরিবহ মুখোপাধ্যায়ের মাথাকে থেঁতলে দিতে। রাজ্যের প্রধান প্রশাসক বলছেন, বাঙালি পরিবহ মুখোপাধ্যায়ের জন্য নাকি কেবল অবাঙালি ডাক্তাররা গণ্ডগোল করেছেন।

এখনও রাজ্য সরকারের তরফে কেউ বলেননি যে এলাকা থেকে সমাজবিরোধীরা এসেছিল সেখানে চিরুণী তল্লাশি করার কথা। কেউ বলেননি যে সব অপরাধী এমন কাজ করেছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক। যাতে অপরাধীর পরিবারের, এমন কি অপরাধীর পাড়াতেও কয়েক প্রজন্ম শত উত্তেজনায়, শত প্ররোচনাতেও যেন আর কোনওদিন কোনও ডাক্তারবাবুর গায়ে হাত তোলার সাহস না পায়।
ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হস্টেলের ছাত্রদের দাবি, ১২ জুন রাতে সিএনএমসিএইচ লিন্টন হস্টেলের এক তলার ঘরে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। ডাক্তারি পড়ুয়াদের বক্তব্য, রাতে প্রথমে হকি স্টিক নিয়ে আক্রমণ করা হয়। তার পর ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলে ভিতরে পেট্রল বোমা ছোঁড়া হয়। এই ঘটনা যদি সত্যিই হয়ে থাকে তা হলে তা দেখবে কে? এমন একটি স্পর্শকাতর সময়ে কত জন পুলিশই বা সেখানে মোতায়েন ছিলেন?
রাজনৈতিক মাফিয়াদের দৌলতে হাসপাতালের পরিচালনার কতটুকুই বা ডাক্তারবাবুদের হাতে থাকে। তবু এই সঙ্ঘবদ্ধ সমাজবিরোধী শক্তির সফ্ট টার্গেট ডাক্তারবাবুরাই।
রাজ্যের কিছু রাজনৈতিক নেতা মধ্যযুগের যুবরাজের মতো চলেন। তাঁদের কনভয়ে যত পুলিশ থাকে তার দশ ভাগের এক ভাগ পুলিশও যদি নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজে থাকত, তা হলে এমন ঘটনা ঘটত না। কেবল পুলিশ বা প্রশাসনিক আধিকারিক থাকলেই হবে না, তাঁদের ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দিতে হবে। অপরাধীর জাত-পাত-সম্প্রদায়ের পরিচয় না দেখে চরম ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার দিতে হবে। কাদের খুশি করার জন্য সমাজের কোন মানুষদের জবাই করা হচ্ছে?
পরিবহ একান্তই নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। এরকম একটি ঘরের এক জন ছেলের সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং বা মেডিকেল কলেজে অ্যাডমিশন পেতে গেলে কতটা মেধা ও সেই সঙ্গে কতটা সাধনার প্রয়োজন সেটা সহজেই অনুধাবন করা যায়। পরিবহ যখন নিজের জীবনে সেই সাধনা করছিল, তখন রাজ্যের বহু নেতা নেত্রী সারদার চিটে গুড়ে নিজেরা জড়িয়ে পড়েছেন। ছেলেটি যখন রাত জেগে মেডিকেলের কঠোর অধ্যয়ন করছে, তখন তাঁর বয়সী কোনও রাজনৈতিক নেতা টালির ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ভেল্কিবাজির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার বাড়ি গাড়ির মালিক হয়ে যাচ্ছেন। দরিদ্র মেধাবী ছেলে পরিবহ তখন রাত জেগে রোগীর সেবা করছিলেন।
রাজনীতিকে যাঁরা ব্যবসা করে নিয়েছেন,- এমন পরিবারের কোনও ছেলে বুঝতেই পারবেন না লেখা পড়া করে নিজের যোগ্যতায় ডাক্তারির মতো মহান পেশায় আসার পিছনের সংগ্রাম-রক্ত-ঘামের দাম।
প্রথমেই বললাম, গ্রাম গ্রামান্তর থেকে আসা অসহায় রোগীদের কষ্ট যত সত্ত্বর মেটানো যায়, মানে সরকারি হাসপাতালে যত দ্রুত কাজ শুরু করা যায় ততই মঙ্গল। অবশ্যই সেটাই প্রথম চাওয়া। কিন্তু ডাক্তারের গায়ে হাত দিলে জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা শুরু হওয়ার কথা। গত সাত বছরে কত জনের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা করেছে পুলিশ? কখনও দু-চারজনকে ভুল করে ধরে আনলে ক্ষমতাসীন দলের নেতা নেত্রীরা রাতের মধ্যে ছাড়িয়ে নিয়ে গিয়েছেন। জুনিয়র ডাক্তারদের হস্টেল ছাড়ার হুমকি দেওয়ার আগে পুলিশ মন্ত্রী সেই অপরাধের রিপোর্ট চেয়ে পাঠান। আজকের আর্ত রোগীদের এই অবস্থার জন্য ডাক্তাররা দায়ী নন, দায়ী রাজনৈতিক দলের আশ্রিত দুষ্কৃতীরা।
আরও একটা বিষয় এ রাজ্যে প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে। অপরাধ করলে সেই অপরাধীর ধর্ম-সম্প্রদায় দেখা হচ্ছে। কলকাতার রাস্তায় হেলমেট না পরে মোটরবাইক চালালে পুলিশ অবশ্যই আইন না মানার জন্য ধরে থাকে। মজার বিষয় হল, কলকাতার বিশেষ কিছু জায়গায় হেলমেট না পরে বাইকে তিন জন চড়ে গেলেও পুলিশের কিচ্ছু করার হিম্মত নেই। হাসপাতালের সঙ্ঘটিত অপরাধের ঘটনাতেও ধর্ম সম্প্রদায়ের জন্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না,-সেটাই দুর্ভাগ্যজনক।
অপরাধীর এবং অপরাধের শিকার কারওরই ধর্ম-সম্প্রদায় বা ভাষা বিচার করা উচিত নয়। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মধ্যেই শুভবুদ্ধি সম্পন্ন বিবেকবান মানুষ রয়েছেন। কিন্তু ওই রাজনীতির ব্যবসায়ীদের কাছে এই সব মানুষের বিশেষ দাম নেই। দাম আছে তাদেরই যারা লরি ভর্তি করে দু’শ লোক আনতে পারে। তারাই হাসপাতালে ডাক্তার ঠ্যাঙায়, তারাই ভোট ব্যাঙ্কের ম্যানেজার। তাদের নুইসেন্স ভ্যালু হল পার্টির কাছে সম্পদ।
তবে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ আজ স্পষ্ট করে বলা শুরু করেছেন, ‘যে গরু দুধ দেয় তার লাথি খেতে হবে’- এ সব কথা নিজের কাছেই রাখুন। ওই গরুর দুধ, ক্ষীর, পায়েস, দই কোনও কিছুই সাধারণ মানুষ খায়নি। যিনি খেয়েছেন, তিনি লাথি খেতেই পারেন। তবে রাজ্যের মানুষ ঠিক করে নিয়েছে, দুষ্টু গরুর বেয়াদপির মাত্রা বেড়ে গেলে তাকে সোজা খোঁয়াড়ে ঢুকিয়ে দিয়ে আসবে। প্রয়োজন হলে তার মালিক বা মালকিনও সেখানে থাকতে পারেন।

 

মতামত সম্পূর্ণত লেখকের নিজস্ব

লেখক সাহা ইনস্টিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স এ কর্মরত। বাংলায় প্রবন্ধগল্প ও উপন্যাস লেখেন।

Comments are closed.